বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব—২২

‘গলা-টলা, বুক-টুক সব শুকিয়ে গেছে স্যার। অনেক পিপাসা পেয়েছে। পানি খাবো….পানি।’
রোমেল অনেকক্ষণ অতি উত্তাপের নিচে দাঁড়ানো অবস্থা ছিল। ফলে অত্যধিক ঘামে তার শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে এক কলস পানি পেলে তৎক্ষণাৎ সে পুরোটাই সাবাড় করবে !
জিলানী স্যান্ট্রিকে ডাক দিয়ে এক জগ পানি ও একটা গ্লাস আনালেন। রোমেলের সামনে রাখলেন।
‘নাও পানি খাও।’ জিলানী বললেন। রোমেল গ্লাসে না ঢেলে জগটা হাত দিয়ে ধরে মুখের কাছে রেখে ঢক ঢক করে পানি খাওয়া শুরু করল। জিলানী দেখেন পানি খাওয়া থামছে না ! যখন জগের প্রায় অর্ধেক পানি খাওয়া হয়েছে তখনই জিলানী জগটা ধরে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
‘উঁহু, আর খেও না। একনাগাড়ে এতো পানি খেলে তো ক্ষতি করবে। লাগলে পরে খাবে।’
‘খুব শান্তি লাগছে স্যার। আপনি অনেক দয়ালু।’ পানি পানশেষে রোমেল কৃতজ্ঞচিত্তে বলল। জিলানী মৃদু হাসলেন। ভাবলেন, অন্তত একজন আসামি হলেও তাঁকে দয়ালু বলেছে। এবার তিনি রোমেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,‘তুমি দেখেছো গাড়ির ভেতরে দুজন মহিলা। তাদেরকে চিনতে পেরেছো তো ?’
‘না স্যার, দুজনের কাউকে আমি চিনি না। তাদের মধ্যে চশমা পরা সুন্দর মহিলাটা বেহুঁশ ছিল।’
‘আচ্ছা ! তার পরনে কী ছিল ?’
‘শেলওয়ার-কামিজ আর ফুল হাতা সোয়েটার। স্যান্ডো যখন ওই গাড়ির কাছে গেল, তখন রিফাত সাহেব তাকে বলল—‘জলদি তোমাদের গাড়িতে তোলো।’ অপর মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল—‘এখন শ্বাস আছে ?’ অপর মহিলা বেহুঁশ মহিলার নাকের সামনে হাত রেখে জবাব দিলো- ‘না।’
এরপর স্যান্ডো আমাকে বলল—‘এই, একটু হেল্প করো। তাড়াতাড়ি।’
‘তারপর ?’
‘স্যান্ডো, সেই মহিলা ও আমি বেহুঁশ মহিলাকে ধরাধরি করে আমাদের কারের পেছনের সিটে এনে শুইয়ে দেই। স্যান্ডো সামনের সিটে বসে বলল—‘চলো আরিচা ঘাট।’ আমি বললাম— ‘আরিচা ঘাটে কেন ?’ সে বলল— ‘একদম কোন প্রশ্ন করবি না। যা বলবো তাই করবি।’ দেখলাম স্যান্ডো রেগে গেছে। রেগে গেলে সে ভয়ঙ্কর হয়। তার মায়া-দয়া নেই।’
‘আচ্ছা। অন্য মহিলাটা দেখতে কেমন ছিল ?’
‘অন্য মহিলাটা দেখতে চিকন চাকন, কেমন যেন গম্ভীর। সেও শেলওয়ার কামিজ পরা ছিল। গায়ে ছিল গরম চাদর। সে আর কোন কথা বলে নি। তারপর সে যখন গাড়িতে উঠল, গাড়িটা আবার ঢাকার দিকে চলে গেল। আমরা রওয়ানা দিলাম আরিচার দিকে।’
‘রিফাত কী পরা ছিল ?’
‘কোট টাই।’
‘তারপর কী হলো ?’
‘আরিচা যাওয়ার পথে ধামরাই পার হয়ে ‘পেন্টাগন ফ্যাশন’ এর পরে ধলেশ্বরী ব্রীজে উঠলে স্যান্ডো গাড়ি থামাতে বলে। আমি থামিয়ে দেই। স্যান্ডো আমাকে বের হতে বললে আমিও তার সাথে গাড়ি থেকে বের হই। তারপর সে বলে—‘ওই পাশে যাও লাশটা ধরো, নিচে ফেলে দিতে হবে।’ আমি তো আশ্চর্য ! বললাম ‘আমি এটা পারবো না।’ সে সাথে সাথে রেগে গেল। পকেট থেকে চকচকে একটা ছোরা বের করে আমার দিকে ধরলো। এরপর বলল— ‘শুয়রের বাচ্চা, এখন যদি নখরা করিস তোকেও মেরে নিচে ফেলে দেবো।’ উপায় না দেখে স্যান্ডোর সাথে আমিও মহিলার লাশটা ধরি।’
‘এই রোডে তো রাত-দিন যানবাহন চলাচল করে। কোনো গাড়ির লাইট তোমাদের উপর পড়ে নি ? কেউ কিছু দেখে নি ?’
‘স্যার, সে রাতে শীতের ঘন কুয়াশা ছিল। সামান্য দূরে কোন কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। ব্রীজের দুই পাশে যখন কোন গাড়ি টাড়ি ছিল না, তখন দুজনে মিলে মহিলার লাশ ব্রীজের রেলিংয়ের উপর দিয়ে নিচে ফেলে দেই।’
একথা বলার সাথে সাথে রোমেল ডুকরে কেঁদে ফেললো। জিলানী তার পিঠে আলতো করে হাত রাখলেন। এতে রোমেলের কান্না আরও বেড়ে গেলো। বলল, ‘স্যার, আমি খুবই অন্যায় করেছি, পাপ করেছি। কেন তার কথা মানতে গেলাম !’
‘হ্যাঁ তুমি স্যান্ডোর কথা না শুনে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কাছাকাছি থানায় চলে যেতে পারতে ! পুলিশকে জানাতে পারতে !’
‘তাহলে তো সে আমাকে গুলি করতো ! তার কোমরে পিস্তল ছিল।’
‘তাই ? আচ্ছা তারপর বল।’
‘তারপর গাড়ি ব্যাক করে দুজন ঢাকায় চলে আসি।’
‘ওই মহিলার লাগেজ, হ্যান্ড ব্যাগ, পায়ের জুতা, চশমা এসবও কি নদীতে ফেলে দিয়েছিলে ?’
‘না স্যার। ওইসব জিনিস আমি দেখি নি। শরীরে শুধু কাপড়চোপড়ই ছিল।’
‘গাড়ি করে ফেরার সময় স্যান্ডো কি কারও সাথে মোবাইলে কথা বলেছিল ?’
‘স্যান্ডোকে একটা কথাই আমি মোবাইলে বলতে শুনেছি স্যার।’
‘কী কথা ?’
‘ফিনিশ।’
‘তোমাকে কতো টাকা দিয়েছে ?’
‘কে ?’
‘কে সেটা তুমি বলবে।’
‘স্যান্ডো ফেরার পথে গাড়িতে আমাকে বলেছিল— ‘তুমি কিন্তু অনেকগুলো টাকা বখশিস পাবে।’ আমি বলেছি— ‘আমার দরকার নেই। তুমি আমাকে দিয়ে এমন জঘন্য কাজ করালে !’
সে বলল—‘করে তো ফেলেছো। এখন আমি আর তুমি সমান সমান।’ এ কথা শুনে আমার খুব কষ্ট পেয়েছিল স্যার।’
‘যখন মহিলাকে নিচে ফেলে দিলে তখন কয়টা বাজে ?’
‘ঘড়ি তো দেখিনি, রাত দেড়টা-দুইটা হতে পারে।’
‘জায়গাটা ঠিকঠাক মনে আছে তো ?’
‘কী বলেন স্যার, সারা জীবনেও ভুলবো না !’
‘মি: টিটি, মানে তোমার বসকে ঘটনাটা কখন বলেছো ?’
‘আমি কিছুই বলিনি। কিন্তু উনি পরে জেনেছেন।’
‘কার কাছে ?’
‘তা জানি না।’
ইন্সপেক্টর জিলানী ভাবলেন— রোমেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সবই রেকর্ড করে রাখা হলো। তার কাছে থেকে কৌশলে আরও কিছু কথা বের করতে হবে। তারপর তাকে দিয়ে কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি করাতে হবে। জিলানী দ্রুত সোহরাবকে ডাক দিয়ে বললেন,‘সোহরাব, ওর খাবারটা দিতে বলো। আর, বাইরে থেকে কিছু কাবাব এবং কোল্ড ড্রিংক্স আনিয়ে রাখো। তুমিও খেয়ে আসো। রোমেলকে সাথে নিয়ে স্পটে যেতে হবে।’
নিধি খুব চটে আছে। আজ সকাল থেকে তাকে গেটের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। বলেছে জরুরি কাজ আছে, খাতায় এন্ট্রি করে যাচ্ছি, তাও বের হতে দেয় নি। জেরিন ম্যাডামের একজন কলিগ এসেছিল। তাকেও ঢুকতে দেওয়া হয় নি। এটা কোন কথা হলো ! বাড়ি কার, মাতব্বররি করে কে !
ওদিকে পিন্টুকেও বাইরে থেকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয় নি। সে অনেক অনুরোধ করেছে যে গাড়িটা স্টার্ট না দিলে ইঞ্জিন বসে যাবে, সিকিউরিটি রুস্তম কোন কথাই আমলে নেয় নি। নিধিও বলেছে, আমাকে যেতে না দাও, পিন্টুকে আসতে দাও। দেয় নি। শুধু বলেছে, উপরের অর্ডার। পিন্টু রাগ করে ফেরত চলে গেছে।
নিধি তিনতলায় উঠে রিফাতের বাসায় যায়। রিফাত ইসলাম কারাগারে। নিধি এই রুম দেখে, ওই রুম দেখে। বিছানার চাদর ঠিকঠাক করে। ব্যালকনিতে গিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে। আবার উপরে চোখ মেলে আকাশে মেঘের দৌড়াদৌড়ি দেখে। ওই মেঘমালার মতো পুঞ্জ পুঞ্জ ভাবনা তার মনের মাঝে এসে ভর করছে। না জানি আর কতো কাল তাকে একা একা বাড়িটা পাহারা দিতে হবে !
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। জিলানী স্ত্রী সাজিয়াকে ফোন করে।
‘নাভিদ কী করে ?’
‘কী আর, গেম খেলছে। আজ তার কোচিংও ছিল না। কেন বলো তো ?’
‘এমনি। শোনো, আমি একটু কাজে যাচ্ছি। ফিরতে রাত হবে। ঘরের দরজা ভালো করে আটকে রেখো। তুমি খেয়ে শুয়ে পোড়ো কেমন ?’
‘আচ্ছা। কেয়ারফুল থেকো। ঢাকার বাইরে যাচ্ছো ?’
‘হ্যাঁ। মোবাইল খোলা রেখো। জরুরি হলে ফোনে কথা হবে।’
ইন্সপেক্টর জিলানী চিন্তা করলেন— যেহেতু রোমেলকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে সেহেতু অ্যারেস্টের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে, অর্থাৎ আগামীকাল, তাকে আদালতে হাজির করতে হবে। কাজেই রোমেলকে নিয়ে স্পটে যেতে হলে এ বিকেলেই রওয়ানা করা শ্রেয়।
জীপ রেডি। ইন্সপেক্টর জিলানী তাঁর নিষ্ঠাবান সহযোগী এসআই সোহরাবকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। আরও দু’জন সাদা পোশাকের সসস্ত্র পুলিশ রোমেলকে নিয়ে জীপের পেছনে উঠে বসেছে। জিলানী ড্রাইভারের বললেন,‘উত্তরা পার হয়ে আশুলিয়ার দিকে যেতে হবে।’
‘জি স্যার।’ স্বল্পভাষী ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল।
আশুলিয়া ভেড়িবাঁধের কাছে এসে জীপটা থামানো হলো। তখনও কিছুটা বেলা আছে। জিলানী ও সোহরাব গাড়ি থেকে নামলেন। এসকর্টসহ রোমেলকেও নামানো হলো। রোমেল সেই জায়গাটা জিলানীকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো যেখানটায় তার ভাষায় ‘বেহুঁশ’ মহিলাকে এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়িতে ওঠানো হয়েছিল।
ইন্সপেক্টর জিলানী নিচের দিকে চেযে চায়ে ধীরপায়ে পায়চারি করলেন। কিছু খুঁজলেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না। তিনি তাঁর মোবাইলে স্পটের ছবি তুললেন। তারপর ড্রাইভারকে বললেন, ‘আরিচা রোডে চলো।’
জীপটা ভেড়িবাঁধের কাছ থেকে যখন মূল সড়কে উঠছিল, তখন জিলানী গাড়ি থামাতে বললেন। জিলানী নেমে গিয়ে সড়কে কিনার থেকে ছোট ছোট দুর্বাঘাসে আটকে যাওয়া কিছু একটা হাত দিয়ে তুললেন। সোহরাবও নেমে পড়লো। সে জিলানীর হাতে দেখলো দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া কাঁচবিহীন চশমার একটা মেটাল ফ্রেম। বোঝা যায় রঙটা তার সোনালি। জিলানী সোহরাবকে বললেন,‘দেখেছো সোহরাব, এটা জেরিনের চশমার ফ্রেম। আমি তার ছবিগুলোতে এই ফ্রেমের চশমা দেখেছি।’
জিলানী ভাঙ্গা ফ্রেমের ছবি তাঁর মোবাইলে তুলে নিলেন।
ফ্রেমটা সোহরাবের কাছে দিয়ে ওটা ‘জব্দ’ দেখাতে বললেন।
আরিচা রোড ধরে চললো গাড়ি। ধামরাই সদর এলাকা পার হলো। ‘পেন্টাগন ফ্যাশন বাংলাদেশ’ পার হলো। কিছুক্ষণ পর ধলেশ্বরী ব্রীজের উপর জীপটা থামলো। জিলানী এবং সোহরাব নামলেন। রোমেলকেও নামানো হলো। সাথে পুলিশ এসকর্ট। তখন রাত আটটা।
রোমেল ব্রীজের এক পাশে এসে স্পটটা দেখাতে শুরু করল। রোমেলের শরীরটা তখন কাঁপছে। কাঁপছে তার হাতের সবগুলো আঙ্গুল। অপরাধবোধে পাংশু হয়ে গেছে তার মুখমণ্ডল।
জিলানী দেখলেন, যে জায়গায় জেরিনকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল সেখানটায় পানির গভীরতা কম। জানুয়ারিতে ছিল শীতকাল। নিশ্চয়ই সেসময় পানি আরও কম ছিল। তাহলে প্রশ্ন জাগে- জেরিন কি নদীর পানিতে ভেসে গিয়েছিল, না ডুবে গিয়েছিল ? নাকি স্বল্প পানি থেকে কিংবা শুকনো জায়গা থেকে কেউ তাকে তুলেছিল ? যদি তুলে থাকে, কী অবস্থা তুলেছিল ?
জিলানী পুরো ধলেশ্বরী ব্রীজের এমাথা ওমাথা পর্যবেক্ষণ করলেন। রেলিংটা ভালো করে দেখলেন। নিচের দিকে ঝুঁকে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর মোবাইলে কয়েকটা ছবি তুললেন।
এবার তিনি নিকটবর্তী থানায় যেয়ে খোঁজ নেবেন। দেখবেন সেখানে এ বিষয়ে কোন তথ্য রয়েছে কিনা।
চলবে….
আরও পড়ুন :
বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব-১
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ৩
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৪
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৫
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৬
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৭
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৮
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৯
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ১০
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১১
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১২
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৩
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৪
বিধ্বংসী প্রহর,পর্ব— ১৫
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৬
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৭
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ১৮
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ১৯
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২০
বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব—২১
