বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব— ৭

‘আমি একটা সিগারেট খাবো। অসুবিধে নেই তো ?’
ইন্সপেক্টর জিলানী নিধির চোখে চোখ রেখে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন। চোখ নয় যেন পাঁচ ব্যাটারির টর্চ লাইট ! নিবিড় অনুসন্ধানী দৃষ্টি। নিধি দেখলো, ইন্সপেক্টরের চুলগুলো উসকো খুসকো, ধূসর স্পঞ্জের মতো। কত দিন চিরুনি পড়েনি কে জানে। লোকটা বোধ হয় শুধুই কাজপাগল। নিজের প্রতি কেয়ারলেস !
এ বাড়িতে সে কাউকে ধূমপান করতে দেখে নি। ধূমপায়ী তার পছন্দও নয়। কিন্তু নিষেধ করবে কী করে ! ইতস্তত করে বলল,
‘ঘরে কোন অ্যাশ-ট্রে নেই যে !’
প্যাকেটে সিগারেট একটাই ছিল। ইন্সেপেক্টর খালি প্যাকেটটা খুলে সামনে রাখলেন। বললেন, ‘ওকে, এটাই অ্যাশ-ট্রে।’
নিধি পাশের ডাবল সোফায় বসে আছে। ইন্সপেক্টর লাইটার অন করে সিগারেট ধরাল। যদিও একজন মহিলার সামনে ধূমপান করতে সে অস্বস্তি বোধ করছিল।
ফুস্ করে একটা আওয়াজ হলো। ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আওয়াজটা কিসের ?’
‘প্রেসার কুকারের। মাশকালাইর ডাল চড়িয়েছি।’ নিধি জানালো।
‘এ বাড়িতে আপনার পরিচয় কী ?’
‘আমি এ বাড়ির কেয়ারটেকার।’
‘কেয়ারটেকার তো জানি পুরুষরা হয় !’
‘মেয়েরাও হতে পারে। এখন জানলেন তো।’
‘আপনার পড়াশুনা কোন্ বিষয়ে ?’
‘আমি চার বছরের নার্সিং ডিপলোমা করেছি।’
‘হাসপাতালে চাকরি নিলেন না যে ?’
‘নিয়েছিলাম। বিটা হসপিটালে সিনিয়র স্টাফ নার্স ছিলাম ছয় মাস।’
‘তারপর ?’
‘আমার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী আর চাকরি করতে দেয় নি।’
‘স্বামী এখন কোথায় ?’
‘জানি না। আমাদের ডিভোর্স হয়ে যায় নয় মাসের মাথায়।’
‘দেশের বাড়িতে কে আছে ?’
‘কেউ নেই, ফাঁকা। সৎ মা ছিল সেও মরে গেছে।’
আবার আওয়াজ হলো— ফুস্ । ইন্সপেক্টর বললেন,
‘দুই আওয়াজে আপনার ডাল হয়ে গেছে। যান, বুয়াকে বলে নামিয়ে ফেলুন।’
‘ওটা আমিই চড়িয়েছি।’ বলে নিধি কিচেনের দিকে গেল।
এই ফাঁকে ইন্সপেক্টর জিলানী ধূম্রক্রিয়া শেষ করে ফেললেন।
একটা বড় স্টেইনলেস স্টিলের ট্রেতে গরম পরোটা, ভুনা মাংস, সালাদ এবং এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস নিয়ে এলো বুয়া। পান খাওয়া লাল দাঁতে হাসি দিয়ে বললো, ‘খান স্যার।’
ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি হঠাৎ স্যার বললে যে ?’
‘আফনে বোলে পুলিশের বরো সাব !’
‘কে বললো ?’
‘আফায়।’
‘সে কী করছে ?’
‘মোবাইলে কথা কয়।’
‘রিফাত সাহেবকে চেনো ?’
‘তিন তলার ? চিনি। সুবিধার না।’
‘মালিকের লগে কথা কাডাকাডি করতো, বেয়াদ্দবি করতো। গ্যাছে বছর মালিক হ্যারে লাডি লইয়া দৌড়ানি দিছিলো।’
‘ঠিক আছে তুমি এবার যাও।’
নিধি এসে আবার সোফায় বসলো। হঠাৎ দরজায় এক লোক এসে দাঁড়ালো। নিধি ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘এই আপনি কে ?’ ইন্সপেক্টর বলল, ‘ও আমার ড্রাইভার। জীপে পেট্রল ভরতে গিয়েছিল।’
‘কি, কাজ হয়েছে ?’ ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল।
‘জী স্যার।’ সে উত্তর দিল।
‘থাকো।’
লোকটি নিধির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বের হয়ে গেলো। বাইরে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আওয়াজ হলো। আবার কয়েক মুহূর্ত পর থেমে গেলো।
নিধি বিনয়ের সাথে বললো, ‘প্লিজ একটু খেয়ে নিন।’
‘আমি দুই বেলা খাই, সকালে আর সন্ধ্যায়। দুপুরে কিছু খাই না, চা ছাড়া।’
‘ও আচ্ছা। তাহলে… আপনার ড্রাইভারকে দেই ?’
‘সেও ডিউটির সময় কারও কিছু খায় না।’
নিধি বুয়াকে ডেকে বললো এক কাপ চা করে দেওয়ার জন্য। ইন্সপেক্টর বললেন, ‘এখন থাক। দেখুন, এই কাগজে বেশ কয়েকটি নাম আছে। আপনার চেনা জানা। সবার মোবাইল নাম্বার আমাকে এসএমএস করে পাঠাবেন।’
নিধি বলল, ‘আজই ?’
‘হ্যাঁ আজই।’ ইন্সপেক্টর সাহেবের গম্ভীর জবাব।
ইন্সপেক্টর জিলানী নিধিকে সাথে নিয়ে জেরিনের রুমে ঢুকলেন। মোটামুটি সুন্দর সাজানো গোছানো। দামি আসবাবপত্র, দামি পেইন্টিংস। বুকশেলফে নানা বিষয়ে অসংখ্য বই। পড়ার টেবিলে একটা ডেস্ক ক্যালেন্ডার, বাঁশের তৈরি একটা কলমদানি এবং পেপারওয়েট।
ইন্সপেক্টর টেবিলের ড্রয়ারটা খুললেন। ভেতরে একটা সুন্দর বলপয়েন্ট কলম ও ছোট্ট নোটপ্যাড। তিনি সেটা তুলে নাড়াচাড়া করলেন। কিছু কেনাকাটা ইত্যাদির হিসাব নিকাশ দেখলেন নোটে। নোটবুকটা পকেটে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
‘তাঁর ডায়েরিগুলো কোথায় ?’
‘ডায়েরি ? ম্যাডামকে তো কখনও ডায়েরি লিখতে দেখি নি ! লিখতেন কম, পড়তেন বেশি।’ নিধি জানালো।
ইন্সপেক্টর নিধির দিকে তাকালেন। বললেন,
‘রুমের সবকিছু কি আগের মতোই আছে না চেঞ্জ করা হয়েছে ?’
‘না না, একদম আগের মতোই আছে। এসআই রাজিব সাহেব বলেছিলেন যেমন আছে তেমনই রাখতে।’
‘ওয়েল। আলমারির চাবি কি ম্যাডাম নিয়ে গেছেন ?’
‘না। সব চাবিই আমার কাছে দিয়ে গেছেন।’
‘আলমারি খুলেছেন ?’
‘জী না।’
‘এখন খুলুন।’
নিধি চাবি এনে আলমারিটা খুলল। ইন্সপেক্টর জিলানী একনজর দেখলেন। তাঁর মোবাইলে ছবি তুললেন। বললেন, ‘বন্ধ করে দিন।’
এরপর তিনি বেড-লাগোয়া দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘এই দেয়ালের মাঝখানে একটা স্ক্রু লাগানো। কিছু একটা ঝুলানো ছিল বোঝা যায়।’
‘হ্যাঁ, জেরিন ম্যাডামের বড় একটা পোট্রেট ছিল। আমার খুব পছন্দের। ম্যাডাম নাই। পোট্রেটটা নিয়ে আমার বেডরুমের পেছনের বারান্দায় টাঙ্গিয়েছি।’
‘কারণ ?’
‘আমার রুম থেকে বারান্দায় বের হলেই যেন ম্যাডামকে দেখতে পাই।’
‘তাহলে যে বললেন সব জিনিসই আগের মতো রয়েছে ?’
নিধি একটু আমতা আমতা করে জবাব দিল,
‘জী, এই ছবিটা বাদে।’
ইন্সপেক্টর বারান্দায় ঝোলানো পোট্রেটটা দেখলেন। ওটাসহ বারান্দার একটা ছবি তুললেন।
এরপর রেজাউদ্দিন সাহেবের বেডরুমে ঢুকলেন। খাট, কাঠের আলমারি এবং টেবিল ছাড়া এ রুমে আর কিছু নেই। খাটটা পুরনো দিনের নকশি করা। নিচটা ফাঁকা। ইন্সপেক্টর মাথা নিচু করে খাটের নিচটা দেখলেন— পরিষ্কার।
বিছানার চাদর-বালিশ উল্টে পাল্টে দেখলেন। বললেন, ‘মুরুব্বির দেখাশুনা, যত্নআত্তি কে করতো ?’
নিধি বললো, ‘আমি।’
‘দুটো বালিশের একটা ছিঁড়ে গেছে খেয়াল করেন নি বোধ হয় ?’
নিধি বলল, ‘তাই ?’ তারপর বালিশটার দিকে চেয়ে রইল। ভাবল, এটা সে দেখলো না !’ সঙ্কোচ নিয়ে বলল,
‘সত্যিই তো, কী লজ্জা ! খালুজান ছেঁড়া বালিশে শুয়েছেন ! আসলে উনি কথা বলতে পারতেন না। মুখ দিয়ে যা উচ্চারণ করতেন তা আমি কেন, কেউ বুঝতে পারতো না।’
‘এই আলমারিটা খুলুন।’
নিধি আলমারি খুললো। ইন্সপেক্টর ভেতরের ছবি তুললেন। জিজ্ঞেস করলেন,
‘এটা আগে খুলেছেন ?’
‘না।’ নিধি জবাব দিল।
ইন্সপেক্টর জিলানী মোবাইলে রেজাউদ্দিন সাহেবের বিছানার চাদর ও বালিশের ছবিসহ পুরো খাটের ছবি নিলেন। তারপর ঘরের সমগ্র ফ্লোরের ছবি তুললেন।
এরপর নিধির রুম, সার্ভেন্ট রুম, তিন বারান্দা, ডাইনিং রুম, গেস্টরুম, স্টোর রুম, সবগুলো টয়লেট এবং কিচেন দেখলেন। তারপর তিনি দোতলায় উঠলেন। সেখানে বিশাল একটা ড্রয়িং রুম, বিরাটকায় ডাইনিং হল, বারান্দা, দুটো বেডরুম, স্টোর রুম এবং ওপেন কিচেন রয়েছে। দেখে বোঝা যায় যে কোনটিই আর ব্যবহার করা হচ্ছে না। জেরিনের মা মারা যাবার পর বাবা অসুস্হ হয়ে পড়লে উভয়ে দোতলা থেকে নিচে চলে আসে।
নিধিকে নিয়ে ইন্সপেক্টর সামনের বাগানে গেলেন। নিধি স্পটটা দেখিয়ে দিলো। রেজাউদ্দিন সাহেবের অন্তর্ধানের ঘটনাটা বিস্তারিত বর্ণনা করলো। ইন্সপেক্টর একটা সাদাকাগজে কিছু আঁকিজুঁকি করলেন, কিছু লিখলেন। সদ্যনির্মিত ড্রেনটা দেখলেন। পাশে জমানো বেশ কিছু ইট-বালু দেখে বললেন, ‘ড্রেন নির্মাণ তো কমপ্লিট তাই না ?’
‘জী।’
‘এতো ইট আর বালু রয়েছে যে ?’
‘ও এগুলো ? ওই দেখুন দক্ষিনের বাউন্ড্রি ওয়ালের অর্ধেকটার কী অবস্থা ! ওই অংশ ভেঙে নতুন করে করার জন্য এগুলো রাখা হয়েছে। জেরিন ম্যাডাম থাকতেই এসব এসেছে। আগামী সপ্তায় এই কাজে হাত দেওয়ার কথা।’
ইন্সপেক্টর জিলানী দেখতে দেখতে পুরো বাগানটা চক্কর দিলেন। বাড়ি থেকে বরুবার রাস্তা এবং গেটটা দেখলেন। বাগানের বেশ কয়েকটা ছবি তুললেন।
এক পর্যায়ে তিনি উপরের দিকে তাকালেন। তিনতলার বারান্দায় এক লোক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। ইন্সপেক্টর জিলানী সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার সাথে সাথে সে ভেতরে চলে গেলো।
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘তিনতলার ওই লোক নিশ্চয়ই রিফাত ইসলাম ?’
নিধি উত্তর দিলো, ‘জী।’
‘আমি তাকাতেই হঠাৎ করে ভেতরে চলে গেলো যে ? আমাকে দেখে বোধ হয় লজ্জা পেয়েছে !’
এমন কথা শুনে নিধি হে হে করে হেসে উঠলো। ইন্সপেক্টর জিলানী এতক্ষণে নিশ্চিত হলেন, সিরিয়াস টাইপের এই নারী হাসতেও জানে।
নিধি ভাবছে অন্যটা। রিফাত ‘অফিসে অনেক কাজ পেন্ডিং’ বলে হাসপাতাল থেকে অফিসে চলে গেলো। কিন্তু অফিস বাদ দিয়ে এই ভরদুপুরে সে তার বারান্দায় কেন ? কী চলছে তার ভেতরে ?’
দুপুর গড়াচ্ছে। সূর্যের তেজ কমছে। দর্শনও অন্তপ্রায়।
‘আজকের মতো আসি। শীঘ্রই আবার কথা হবে’— বলেই ইন্সপেক্টর জিলানী জীপে উঠলেন।
জীপটা গেট পার হওয়া পর্যন্ত নিধি দাঁড়িয়ে রইলো।
[চলবে…]
Craft narratives that ignite inspiration, knowledge and entertainment.
Proudly powered by WordPress | Walker News Template by WalkerWP
