বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব-২

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ধানমণ্ডি থানা থেকে এইমাত্র টেলিফোন এসেছে। পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর রাজিব আসবেন কিছুক্ষণের মধ্যে। নিধিকে বলা হয়েছে জিনিসপত্র, ঘর-বাড়ি, আঙ্গিনা, বাগান ইত্যাদি যেভাবে রয়েছে সেভাবেই যেন থাকে। কোন ঝাড় পরিষ্কারও করা যাবে না। এ বাড়ির সব বাসিন্দা এবং কর্মী ও কর্মচারীদের উপস্থিত রাখতে হবে।

নিধি ড্রাইভার পিন্টুকে খবরটা দিল। ভাড়াটে রিফাতকেও জানালো। ফোন পেয়ে দুজনকেই মনে হলো অস্বাভাবিক গম্ভীর।

ভেবেছিল—  পুলিশ অফিসার আসবে, হয়তো পুরো ঘরটা দেখবে, তাই ঘর-দোর পরিষ্কার করে রাখি। এখন আর নয়। তবে কিছু চা-নাস্তা তো পরিবেশন করতে হবে। নিধি কিচেনে ঢোকে। সিংকের নলে কয়েকটা চায়ের কাপ ধোয়, তারপর ট্রে, চামচ, কোয়ার্টার প্লেট।একটা প্লেট হাত থেকে পড়ে সামান্য ভেঙ্গে যায়। ‘ইস্, সুন্দর প্লেটটা ভেঙ্গে গেলো’— নিধির রাগ উঠে। অল্প ভাঙ্গা আর পুরোটা ভাঙা তো একই। এটা আর ব্যবহার করা যাবে না। নিধি প্লেটটাকে বাহুর জোর দিয়ে ফ্লোরে আছাড় মারে। ওটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

কিন্তু তার এরকম নার্ভাস নার্ভাস লাগছে কেন ? ভয় ? কিসের ভয় ? নাকি ‘পুলিশ’ শব্দটাই এমন ?

শাওয়ার নেয়ার পর নিধি কমলা রঙের থ্রি-পিস পরেছে। হাল্কা মেক-আপ করে জেরিন ম্যাডামের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অনেকদিন পর নিজের মুখটা মনোযোগ দিয়ে দেখেছে। জেরিনের আলমিরার চাবিও তার কাছে। কিন্তু ওটা খুলে লাভ নেই। সেখানে  সংখ্যায় থ্রি-পিস কম, ওয়ান-পিস বেশি। শাড়িও অনেক। জেরিন ওয়ান-পিসের সঙ্গে ট্রাউজার পরতো। নিধি ভাবে, মাস্টার মানুষ তাই জমকালো পোশাক বেমানান। জেরিন ম্যাডামকে বেশ ফিল করছে সে।

রুমে জেরিনের বিশাল বড় একটা পোর্ট্রেট। নিধি অপলক তাকিয়ে থাকে। কী পরিশিলীত মুখ ! এই মুখটা চট্ করে নাই হয়ে গেলো ! নিধি ভাবে। ভাবতে ভাবতে পোর্ট্রেটটা অনেক কষ্টে সেখান থেকে সরিয়ে পেছনের বারান্দার কোণায় দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলো।

নিধি এই বারান্দায় বেশিক্ষণ থাকে, তাই এখান থেকে জেরিন ম্যাডামকে সে ঘন ঘন দেখতে পাবে।

এতক্ষণে পরিধানের ড্রেসটা পাল্টে সাদার মধ্যে প্রিন্টওয়ালা থ্রি-পিস পরে নিয়েছে সে। বাড়ির মালিক নিরুদ্দেশ, এসময় গর্জিয়াস পোশাক মানায় না। পুলিশ অফিসারও ভুল বুঝতে পারে। যতটুকু মেক-আপ করেছিল তা তুলে ফেললো। খোলা চুলগুলো একবেণি করে ফেললো। বেণির উপরিভাগে একটা হেয়ারব্যান্ড লাগাল।

আকাশটা মেঘলা ছিল। কিছুক্ষণ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। এখন বৃষ্টি নেই। মেঘগুলো তুলো তুলো সাদা, ফাঁকে ফাঁকে আকাশের নীল। বাগানের পরিচিত গাছগুলো কিঞ্চিৎ হলেও শীতলতা অনুভব করছে। বৃষ্টিটা জোরদার হলে বৃক্ষরাজি স্নান সেরে উঠতো। তবে বাড়ির ফিডার রোড মোটামুটি ঝকঝকে পরিষ্কার।

কলবেল বেজে উঠল। নিশ্চয়ই পুলিশ অফিসার! ওড়নাটা ঠিক করে দরজা খুলল। এ যে সালেকা বুয়া ! মা অসুস্থ বলে তিন দিনের ছুটি নিয়ে আজ পাঁচদিন পরে এসেছে। গ্রামে থেকে তার চেহারাটা আরও কালো হয়ে গেছে। সকাল আটটা থেকে দুপুর দু’টা পর্যন্ত ডিউটি তার। এরপর আরেক বাসায় সন্ধ্যা ছ’টা অবধি।

‘তাহলে তুমি এসেছো ! তোমার মা কেমন?’ নিধি বলল।

‘মায়ের শইলডা ইকটু ভালা। ম্যাডাম কি আইছে ?’

‘না।’

‘আফা, আমার কিছু টাকা লাগব। খুবই দরকার।’

‘কত ?’

‘তিন হাজার। আফনে পুরাডা না পারলে দুই হাজার দেন। ওই বাসা থেইকা এক হাজার নিমু। আমার আবার এখনই যাইতে হইবো। পরশু দিন আমু নে।’

‘দাঁড়াও।’

নিধি তিন হাজার টাকা এনে বুয়ার হাতে দিলো। বলল, ‘এই নাও, পুরোটা দিলাম। তোমার উপকার হবে। পরশুদিন কিন্তু অবশ্যই চলে আসবে।’

‘আমু আফা। জানি আপনার কষ্ট অইতাছে।’

ইত্যবসরে ড্রাইভার পিন্টু এসে পড়ল। সালেকা বুয়া একবার ড্রাইভারের দিকে আরেকবার নিধির দিকে তাকালো। তারপর ‘যাই আফা’ বলে চলে গেল।

পিন্টুর মুখটা শুকনো। ভালো বাংলায় উদ্বিগ্ন। নিধি এটা লক্ষ্য করলো। বলল, ‘তুমি কি দুপুরে খেয়েছো ?’

‘হ্যাঁ খেয়েছি।’

‘এতো চিন্তিত কেন ? সত্যি করে বলো তো, খালুজানের ঘটনাটা আসলে কি ? তোমার যদি কোন ভূমিকা থাকে তাও আমাকে বলতে পারো।’

পিন্টু চমকানো চোখে তাকালো। এরপর রেগে গেল। ‘কী বলছো এসব ? বুঝে শুনে কথা বলো।’

‘আহা, মাইন্ড করো কেন ? আমি তো তোমার কাছের মানুষ। জিজ্ঞেস করলাম আর কি। আমি কি কাউকে বলতে যাবো ?’

‘কাছের মানুষ হয়ে এই চিনলে আমাকে ?’

‘সরি। আমি মিন করে বলিনি। এসো, ভেতরে এসে বসো।’

পিন্টু ধীরপায়ে ভেতরে এলো। নিধি তার পিঠে হাত রেখে বললো, ‘তোমার ভেতরটা ভালো আমি জানি। এমন নার্ভাস হলে পুলিশ তো এর চেয়েও কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ করবে।’

পিন্টু আবার নিধির দিকে তাকালো। নিধিও পিন্টুর দিকে।

একটা মোটরবাইকের আওয়াজ শোনা গেলো। নিধি এগিয়ে গেল। একজন পুলিশ অফিসার। বয়স ত্রিশ/ পঁয়ত্রিশ। দেখতে সুঠাম ও সপ্রতিভ। নিধিকে দেখে বললেন, ‘আমি এসআই রাজিব।’

নিধি সালাম দিয়ে বলল, ‘আমার নাম নিধি। এ বাড়ির কেয়ারটেকার। আমার সাথেই ফোনে কথা বলেছিলেন।’

‘বুঝেছি।’

‘ঘরে এসে বসেন।’

‘না, চলুন আগে পি.ওটা ঘুরে দেখি।’

‘পি.ও, মানে…’

‘যে জায়গা থেকে আপনার মালিক লাপাত্তা হয়েছে বলেছেন।’

‘ও আচ্ছা। চলুন দেখাচ্ছি। গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে উনি এই বাগানে খুব ধীরে ধীরে পায়চারি করছিলেন। আমি এসে ওনাকে হেল্প করি। পরে একটা চেয়ার এনে ঠিক এইখানটায় রাখি।’ নিধি অঙ্গুলি নির্দেশ করে একটি জায়গা দেখিয়ে দেয়।

‘তারপর ?’ এসআই রাজিব বললেন।

‘বলি খালুজান বসে একটু রেস্ট নেন। আমি চা নিয়ে আসছি।’

পরে ঘর থেকে চা বিস্কুট নিয়ে এসে দেখি উনি নেই !’

‘নেই মানে ?’

‘মানে চেয়ারে নেই। ভাবলাম হয়তো কাছাকাছি পায়চারি করছেন। অনেক জায়গায় অনেক তালাশ করলাম। পেলামই না। কোথায় যে চলে গেলেন !’

‘আপনি একাই তালাশ করেছেন ?’

‘জী। না না, ড্রাইভার পিন্টুও সাথে ছিল।’

‘তাকে পেলেন কিভাবে ?’

‘সে গতকাল আসে নি। খালুজানকে না পেয়ে তাকে মোবাইল করি। সে দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসে।’

‘ড্রাইভারের বাসা কোথায় ?’

‘শঙ্কর।’

‘মোটরসাইকেল আছে ?’

‘না। রিকশায় অথবা বাসে করে আসে।’

‘শঙ্কর থেকে দশ মিনিটে ধানমন্ডি আট নম্বর রোডে চলে এলো ?’

নিধি এর জবাব দিতে পারল না। এসআই রাজিব দেখলেন বাগানের চতুর্দিক দিয়ে পাকা ড্রেন বানানোর কাজ চলছে। বললেন, ‘ড্রেন বানাচ্ছেন ?’

‘জী। বৃষ্টি বেশি হলে পানি বাগানের ভেতরে আটকে থাকে। ওই পানি নিষ্কাশনের জন্যই এই ড্রেন।’

‘কাজ কবে শেষ হয়েছে ?’

‘গতকাল দুপুরে।’

‘কয়জন কাজ করেছে ?’

‘দুইজন। রাজমিস্ত্রী আর লেবার মানে হেলপার একজন।’

‘ওদের আসতে বলেন নি ?’

‘না।’

‘কেন ? আমি তো বলেছিলাম কর্মীসহ বাড়ির সবাইকে রাখতে। ফোন দেন। এখনই।’

নিধি রাজমিস্ত্রীকে ফোন লাগায়। দ্রুত আসতে বলে। রাজমিস্ত্রী জানায় সে এখন সাভারে। বললে কাল আসতে পারবে। এসআই একথা শুনে বললেন রাজমিস্ত্রী এবং তার হেলপারকে আগামীকাল বিকেলে আসবার জন্য।

পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে কাগজে কী কী যেন নোট করলেন, পি.ও’র খসড়া স্কেচম্যাপ আঁকলেন। বললেন, ‘আর কে কে এসেছে ?’

নিধি জবাব দিলো, ‘ড্রাইভার এসে অপেক্ষা করছে।’

‘চলুন।’

এসআই রাজিব ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। একতলা ও দোতলার সবগুলো রুম ঘুরে ঘুরে দেখলেন। কিছু নোট নিলেন। বললেন, ‘তিন তলায় কে থাকে ?’

‘ভাড়াটে।’ নিধি জানাল।

‘ওনাকে থাকতে বলেন নি ?’

‘বলেছিলাম। কিন্তু কেন যে এলেন না !’

‘দেখলাম, তিনতলা থেকে নিচে বাগানটা পরিষ্কার দেখা যায়। ওনাকে কাল ১২টার সময়ে থানায় আসতে বলবেন। এবার যেন মিস না করে।’

‘জী, বলব।’

এসআই রাজিব ড্রাইভার পিন্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনিও আসবেন একই সময়ে।’

পিন্টু বললো, ‘জী স্যার। অবশ্যই আসবো।’

এসআই জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা রেজাউদ্দিন সাহেবের কি ওই একটা সন্তানই ?’

‘জী, এক মেয়ে। শুনেছি প্লেন ক্রাশ করে….।’ নিধির কান্না চলে এলো।

এসআই তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমরাও তো সেরকমই শুনেছি।’

নিধি চট করে চা এবং চাওমিন ট্রেতে করে নিয়ে এসে বললো, ‘একটু চা..।’

‘এখন ব্যস্ত আছি। অন্য সময়ে। ও হ্যাঁ, আপনার, ড্রাইভার সাহেবের, তিনতলার ভদ্রলোকের এবং রাজমিস্ত্রী ও হেলপারের এনআইডি কার্ডের কপি  কাল সকালের মধ্যে আমার কাছে পৌঁছাবেন। আপনাদের মোবাইল নম্বর এবং রেজাউদ্দিন সাহেবের একটা ছবিও। আমরা সব বৃদ্ধাশ্রমেও খোঁজ নেবো।’

‘ঠিক আছে।’ নিধি নিশ্চিত করল।

’মনে পড়েছে। পত্রিকায় কালই তাঁর ছবিসহ নিখোঁজ সংবাদ ছাপিয়ে দিন। ফেসবুকেও দেবেন।’

‘আমার তো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই।’

‘বলেন কী ! আচ্ছা, যার আছে তার হেল্প নিয়ে করুন। ঠিক আছে ?’

‘জী।’

এসআই রাজিব চলে গেলেন। বলে গেলেন খুব শীঘ্র আবার আসবেন।

কিছুক্ষণ পর মোবাইলে রিফাত ইসলামের কল এলো। নিধি কলটা রিসিভ করল।

‘হ্যালো। আপনি এলেন না কেন ? পুলিশ আপনাকে খুঁজেছিল।’

‘তার আগে বলো, এটা কি তোমার নাম্বার ? দুপুরেও এই নম্বরে কল করেছিলে।’

‘হ্যাঁ আমার।’

‘তার মানে তুমি মোবাইল নাম্বার চেঞ্জ করেছো ! এ জন্যই জেরিনের পরিচিত জনেরা তোমার নাম্বারে কল দিয়ে পাচ্ছে না !’

‘করেছি। যেভাবে কলে-মিসকলে জানা-অজানা পুরুষেরা টিজ করে ! ও আপনি বুঝবেন না।’

কলটা কেটে গেলো।

[চলবে….]

আরও পড়ুন