ক্ষুদিরাম থেকে আজকের যুবক—কোন পথে হাঁটছে সময়?

আঠারো বছর বয়স। বয়সটা শুনলেই আজকাল প্রথমে মনে পড়ে বোর্ড পরীক্ষা, কলেজে ভর্তি, কোচিং, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং। খুব বেশি হলে প্রেম। আর যদি ছেলেটি বা মেয়েটি একটু সাহসী হয়, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনও স্বপ্ন দেখে। কিন্তু একশো উনিশ বছর আগে এই বয়সেই এক তরুণ নিজের ভবিষ্যৎকে সরিয়ে রেখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন। তাঁর নাম ক্ষুদিরাম বসু। তাই তাঁর জন্মদিন এলেই শুধু একজন শহিদকে স্মরণ করার ব্যাপার থাকে না; সময়ের দুই প্রান্তও যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। একদিকে আঠারো বছরের ক্ষুদিরাম, অন্যদিকে আজকের আঠারো বছরের তরুণ। মাঝখানে কেটে গেছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়। দেশ স্বাধীন হয়েছে, পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে, জীবন অনেক দ্রুত হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—যুবসমাজ আসলে কোন পথে?
প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলেই অবশ্য একটু হোঁচট খেতে হয়। কারণ ‘আজকের যুবসমাজ’ বলে একটিমাত্র দল নেই। কেউ সারাদিন মোবাইলে রিল দেখে, আবার সেই একই প্রজন্মের আর একজন রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, কেউ নিজের তৈরি অ্যাপ নিয়ে কাজ করছে। কেউ ফেসবুকে তর্ক করে, কেউ সামাজিক কাজে মাঠে নামে। কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ নিজের গ্রামে ফিরে কিছু করার কথা ভাবে। কেউ শুধু নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, আবার কেউ নিজের সময়ের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তাই আজকের যুবসমাজকে এক কথায় ‘বিগড়ে যাওয়া প্রজন্ম’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনই তাদের সবকিছুকে আধুনিকতার নামে মেনে নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আমাদের বড়দের একটি প্রিয় বাক্য—“আমাদের সময়ে এসব ছিল না।” বাক্যটি এত পুরনো যে এখন সেটিও প্রায় ঐতিহ্য। আমাদের সময়ে মোবাইল ছিল না, ফেসবুক ছিল না, রিল ছিল না, সেলফি ছিল না—এসব বলতে বলতে আমরা এমন একটা পৃথিবীর ছবি আঁকি, যেখানে সবাই বই পড়ত, সবাই দেশপ্রেমী ছিল, সবাই ভদ্র ছিল, সবাই সময়মতো বাড়ি ফিরত এবং কারও কোনও দুর্বলতা ছিল না। ইতিহাস অবশ্য এত সুন্দর ছিল না। প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যেই ভালো-মন্দ ছিল, আদর্শবাদ ছিল, স্বার্থপরতা ছিল, সাহস ছিল, ভীরুতাও ছিল। পার্থক্য শুধু এই—আগের প্রজন্মের ভুলের ছবি তুলতে মোবাইল ছিল না।
আজকের যুবককে বুঝতে গেলে তাই শুধু তার হাতে থাকা মোবাইলের দিকে তাকালে চলবে না; তার চোখের ভিতরেও তাকাতে হবে। সেই চোখে যেমন দ্রুত সাফল্যের স্বপ্ন আছে, তেমনই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ও আছে। প্রতিযোগিতা যত বেড়েছে, অনিশ্চয়তাও তত বেড়েছে। ভালো ফলাফল এখন আর নিশ্চয়তার টিকিট নয়। একটি ডিগ্রি চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না, একটি চাকরিও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে যুবকের জীবন ক্রমশ হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘ অপেক্ষা—কখন সুযোগ আসবে, কখন পরীক্ষা হবে, কখন ফল বেরোবে, কখন চাকরি হবে, কখন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যাবে।
এই অপেক্ষার মধ্যে মোবাইল এসেছে এক অদ্ভুত সঙ্গী হয়ে। সে একসঙ্গে বন্ধু, শিক্ষক, বিনোদন, সংবাদপত্র, বাজার, চাকরির দপ্তর এবং কখনও কখনও সময়-চোর। এক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নেওয়া হয়, তারপর দেখা যায় চল্লিশ মিনিট কেটে গেছে। একটি রিলের পর আর-একটি, তার পর আর-একটি। অ্যালগরিদমেরও যেন এক আশ্চর্য ধৈর্য—মানুষ যতক্ষণ দেখে, সে ততক্ষণ দেখায়। বইয়ের একটি অধ্যায় পড়তে মন বসে না, কিন্তু পঞ্চাশটি ছোট ভিডিও দেখতে কোনও অসুবিধা নেই। মনোযোগের এই নতুন অর্থনীতিতে যুবকের সামনে সবচেয়ে বড় লড়াই হয়তো বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নয়, নিজের মনোযোগের সঙ্গেই।
অবশ্য মোবাইলকে খলনায়ক বানিয়ে ফেললে সত্যের অর্ধেকটাই বলা হবে। এই ছোট যন্ত্রটির ভিতরেই তো আজকের তরুণের বিশ্ববিদ্যালয়। দূরের শিক্ষককে সে শুনতে পারে, নতুন ভাষা শিখতে পারে, পৃথিবীর কোনও প্রান্তের গবেষণা পড়তে পারে, চাকরির আবেদন করতে পারে, নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারে, নিজের শিল্পের পরিচিতি তৈরি করতে পারে। যে ছেলেটি একসময় গ্রামের গণ্ডি পেরোতে পারত না, সে আজ পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলতে পারে। যে মেয়েটির প্রতিভা তার পাড়ার কয়েকটি বাড়ির বাইরে কেউ জানত না, সে আজ হাজার মানুষের সামনে নিজের কাজ তুলে ধরতে পারে। প্রযুক্তি তাই বিপদও, সম্ভাবনাও। প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়; প্রশ্ন ব্যবহারকারীর হাতে কতটা বিচারবোধ আছে।
সামাজিক মাধ্যম সেই বিচারবোধের পরীক্ষাটা আরও কঠিন করেছে। আগে মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবনের তুলনা করত। এখন তুলনাটা সারাক্ষণ চোখের সামনে। একজন পাহাড়ে গেছে, আর একজন বিদেশে পড়ছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে, কেউ নতুন চাকরি পেয়েছে, কেউ ব্যবসায় সফল, কেউ প্রেমে সুখী। পর্দায় পৃথিবীর সবাই যেন সফল, শুধু আমি নই। অথচ সেই ছবির পিছনে কত ব্যর্থতা, কত ঋণ, কত কান্না, কত অনিশ্চয়তা—তা দেখা যায় না। যুবক তখন নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে অন্যের সাজানো জীবনের তুলনা করে বসে। এই তুলনা থেকেই তৈরি হয় অস্থিরতা। নিজের জীবনটাকে ছোট মনে হতে থাকে।
সেলফির গল্পটাও তাই এত সহজ নয়। সেলফি নিয়ে আমরা হাসি, কিন্তু তার ভিতরে আছে নিজেকে দৃশ্যমান করার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ চায় তাকে দেখা হোক, তার কথা শোনা হোক, তার অস্তিত্ব স্বীকৃতি পাক। আগে এই স্বীকৃতি সীমিত ছিল; এখন তা প্রকাশ্য। সমস্যা তখনই, যখন ‘আমি আছি’ ধীরে ধীরে ‘আমাকেই দেখতে হবে’-তে বদলে যায়। তখন অন্যের আনন্দেও নিজের তুলনা, অন্যের সাফল্যেও নিজের অস্বস্তি, অন্যের মতামতেও নিজের পরিচয়ের প্রশ্ন।
ক্ষুদিরামের সময় এই দৃশ্যমানতার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর কোনও ছবি ভাইরাল হয়নি, কোনও পোস্টে হাজার লাইক পড়েনি, কোনও ভিডিও লক্ষ মানুষ দেখেনি। তিনি যা করেছিলেন, তার দর্শক ছিল না। ইতিহাস পরে তাঁকে চিনেছে। আজ আমরা অনেক সময় ইতিহাস হওয়ার আগেই নিজেদের প্রচার করে ফেলি। কোনও সামাজিক কাজ শুরু হওয়ার আগেই ব্যানার তৈরি হয়, কাজের শেষে ছবি ওঠে, তারপর পোস্ট। যেন কাজটি ঘটেছে কি না তার চেয়ে কাজটি কতজন দেখল, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য এখানেও পুরো দায় যুবকদের নয়। সমাজই তো তাদের শিখিয়েছে—যা দেখা যায়, তার মূল্য বেশি; যা প্রচারিত হয়, সেটাই সাফল্য।
এখানে ক্ষুদিরামের সঙ্গে আজকের যুবকের তুলনাটা নতুনভাবে ভাবা দরকার। তাঁকে আদর্শ করে আজকের তরুণকে তাঁর মতো হতে বলা অর্থহীন। সময় বদলেছে। স্বাধীনতা রক্ষার অর্থও বদলেছে। আজকের তরুণকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়তে হবে না। কিন্তু তাকে মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হতে পারে। দুর্নীতির সঙ্গে আপস করার প্রলোভনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হতে পারে। ঘৃণার ভাষার বদলে যুক্তির ভাষা বেছে নিতে হতে পারে। নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলতে হতে পারে। এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ালে নিজের সামান্য সুবিধাটা চলে যাবে।
এই জায়গায় এসে ক্ষুদিরাম আর অতীতের মানুষ থাকেন না। তিনি বর্তমানের প্রশ্ন হয়ে ওঠেন। কারণ বিপ্লব সবসময় বন্দুক বা মিছিলের চেহারায় আসে না। কখনও বিপ্লব খুব ছোট। পরীক্ষার হলে সবাই নকল করছে, আপনি করছেন না—এটাও এক ধরনের অবস্থান। অফিসে সবাই নিয়ম ভাঙছে, আপনি ভাঙছেন না—এটাও। নিজের পরিচিত মানুষ অন্যায় করেছে, তবু তাকে অন্যায় বলছেন—এটাও। সামাজিক মাধ্যমে সবাই কোনও গুজব ছড়াচ্ছে, আপনি যাচাই না করে শেয়ার করছেন না—এটাও। রাস্তায় একজন অসহায় মানুষ পড়ে আছে, আর আপনি পাঁচ মিনিট থেমে তাকে সাহায্য করলেন—এটাও। এগুলোর কোনওটির সঙ্গে মাইক নেই, ব্যানার নেই, সংবাদপত্রের শিরোনাম নেই। কিন্তু সমাজের চরিত্র তৈরি হয় এমনই ছোট সিদ্ধান্তে।
আজকের যুবসমাজের সামনে আর একটি বড় প্রশ্ন—সাফল্য বলতে সে কী বোঝে? বেশি টাকা? বড় চাকরি? বিদেশে যাওয়া? গাড়ি-বাড়ি? জনপ্রিয়তা? নাকি নিজের পছন্দের কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা? উত্তর সহজ নয়। পরিবার একরকম উত্তর দেয়, সমাজ আর-এক রকম, বাজার তৃতীয় রকম, আর তরুণের নিজের মন চায় হয়তো অন্য কিছু। এই টানাপোড়েনে অনেক তরুণ পথ হারায়। তাদের শুধু ‘আদর্শহীন’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না।
বরং আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি তরুণদের শুধু সফল হতে বলছি, নাকি ভালো মানুষ হতেও বলছি? আমরা কি তাদের নম্বরের জন্য প্রশংসা করি, কিন্তু সততার জন্য কতটা করি? চাকরি পাওয়ার খবর শুনে আনন্দ করি, কিন্তু সে কীভাবে পেল, সেই প্রশ্ন করি কি? আমরা সন্তানকে বলি, “জীবনে বড় হও।” কিন্তু ‘বড়’ বলতে কী বোঝাই? পদ? টাকা? পরিচিতি? নাকি চরিত্র?
এই প্রশ্নগুলি এড়িয়ে গিয়ে যুবসমাজকে দোষ দেওয়া সহজ। কারণ তাতে আমাদের নিজেদের দায় থাকে না। আমরা বলতে পারি—“আজকের ছেলেমেয়েরা নষ্ট।” অথচ তারা যে পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, সেই পৃথিবীর নিয়ম কে তৈরি করেছে? আমরা। যে প্রতিযোগিতার মধ্যে তারা দৌড়াচ্ছে, সেই প্রতিযোগিতার কাঠামো কে বানিয়েছে? আমরা। যে সমাজে পরিচিতি কখনও যোগ্যতার চেয়ে শক্তিশালী, সেই সমাজ কে তৈরি করেছে? আমরাই। যে পৃথিবীতে একটি ভুলকে নিয়ে হাজার মানুষ হাসে, কিন্তু একজনের ভালো কাজ নিয়ে পাঁচ মিনিটের বেশি কথা হয় না—সেটিও আমাদেরই তৈরি করা পৃথিবী। তাই ক্ষুদিরামের জন্মদিনে শুধু যুবকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। আজকের প্রজন্মকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি আগের প্রজন্মকেও আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে।
আশার জায়গা কম নয়। বরং অনেক সময় আমরা সেই আশাটাই দেখতে পাই না। যে তরুণ নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়, যে তরুণ নিজের চাকরির ফাঁকে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়ায়, যে তরুণ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে, যে তরুণ নিজের ছোট ব্যবসা দাঁড় করিয়ে আরও দু’জনকে কাজ দেয়, যে তরুণ রক্তদান করে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়, যে তরুণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে—তাদেরও তো এই প্রজন্মেরই বলা হয়। শুধু তারা সবসময় ক্যামেরার সামনে থাকে না।
আজকের যুবসমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার সংযোগ। পৃথিবীর এক প্রান্তে কী হচ্ছে, অন্য প্রান্তের তরুণ কয়েক সেকেন্ডে জানতে পারে। কোনও অন্যায়ের ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনও বিপদের সময় মানুষকে সংগঠিত করা যায়। কোনও নতুন ভাবনা হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু তরুণকে ভোগের দিকে ঠেলে দেয় না; চাইলে তাকে পরিবর্তনের শক্তিও দিতে পারে। একটি প্রজন্মের হাতে যদি এমন যোগাযোগের ক্ষমতা থাকে, তবে তার দায়িত্বও কম নয়।
সেই দায়িত্ববোধ তৈরি হবে কীভাবে? শুধু বক্তৃতায় নয়। শুধু ক্ষুদিরামের জন্মদিনে নয়। পরিবারে, স্কুলে, সমাজে, রাষ্ট্রে—সব জায়গায়। শিক্ষক যদি শুধু নম্বরের কথা বলেন, পরিবার যদি শুধু চাকরির কথা বলে, সমাজ যদি শুধু সাফল্যের বাহ্যিক চেহারা দেখে, তাহলে তরুণের কাছ থেকে গভীর মানবিকতা আশা করা কঠিন। তাকে শুধু বলা যাবে না—“ভালো মানুষ হও।” তাকে দেখাতে হবে, ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাও সম্ভব।
ক্ষুদিরামের জন্মদিন তাই আজকের যুবসমাজকে ছোট করার দিন নয়। বরং তাদের শক্তিটাকে নতুন করে চিনে নেওয়ার দিন। তাঁকে শুধু মূর্তিতে, পোস্টারে, পাঠ্যবইয়ে আটকে রাখলে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে না। তাঁর সময়ের সাহসকে আজকের সময়ের ভাষায় অনুবাদ করতে হবে।
আজকের ক্ষুদিরাম হয়তো কোনও মিছিলে নেই। হয়তো সে কোনও পরীক্ষার হলের শেষ বেঞ্চে বসে নকল না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। হয়তো কোনও তরুণ সাংবাদিক চাপের মধ্যেও সত্য খবর প্রকাশ করছে। কোনও ডাক্তার রোগীর অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছে না। কোনও শিক্ষক অর্থের বিনিময়ে নম্বর বাড়াচ্ছেন না। কোনও তরুণ নিজের বন্ধুর অন্যায়কে সমর্থন করছে না। কোনও মেয়ে নিজের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কোনও ছেলে সামাজিক চাপের বিরুদ্ধে নিজের পছন্দের পেশা বেছে নিচ্ছে। কোনও তরুণ গুজব না ছড়িয়ে সত্যিটা যাচাই করছে। ইতিহাস হয়তো তাদের নাম জানবে না। কিন্তু সমাজ তাদের সিদ্ধান্তেই একটু একটু করে বদলাবে।
প্রশ্নটা ‘বর্তমান যুবসম্প্রদায় কোন পথে?’—এভাবে করা ঠিক নয়। কারণ পথ একটিই নয়। এই প্রজন্মের সামনে অসংখ্য রাস্তা খোলা। কেউ যাচ্ছে ভোগের দিকে, কেউ সাফল্যের দিকে, কেউ জনপ্রিয়তার দিকে, কেউ বিদেশের দিকে, কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে, কেউ সমাজের দিকে। আসল প্রশ্ন—এই বহু পথের ভিড়ে তারা মানুষ হওয়ার পথটি হারিয়ে ফেলছে কি না।
ক্ষুদিরাম আমাদের সেই পথটির কথাই মনে করিয়ে দেন। তাঁর হাতে মোবাইল ছিল না, কিন্তু তাঁর হাতে ছিল একটি স্বপ্ন। আজকের তরুণের হাতে মোবাইলও আছে, প্রযুক্তিও আছে, সুযোগও আছে। তার সামনে পৃথিবী আগের যেকোনও প্রজন্মের চেয়ে বেশি খোলা। তাই তার দায়িত্বও বড়।
হয়তো তাকে ক্ষুদিরাম হতে হবে না। হতে হবে না শহিদ, হতে হবে না বিপ্লবী। শুধু নিজের সময়ের অন্যায়ের সামনে সুবিধামতো নীরব না থাকলেই অনেকটা পথ এগোনো যায়। সত্যিটা সত্যি বলে মেনে নেওয়া, ভুল হলে ‘ভুল করেছি’ বলা, নিজের মানুষ অন্যায় করলে তাকে থামানো, দুর্বল মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা, সাফল্যের জন্য নিজের বিবেককে বিক্রি না করা—এই ছোট ছোট কাজই আজকের সময়ের বড় সাহস।
প্রতি বছর ক্ষুদিরামের জন্মদিন পালন করি। অনুষ্ঠান শেষ হয়। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়। আজকের যুবক কোন পথে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—আমরা তাকে কোন পথ দেখাচ্ছি? আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হয়তো শেষেই—ক্ষুদিরাম তাঁর সময়ের জন্য যা করেছিলেন, আমাদের সময়ের জন্য আমরা কী করছি? এই প্রশ্নের উত্তর কোনও মঞ্চে দিতে হবে না। কোনও পোস্টেও নয়। উত্তরটা দিতে হবে নিজের জীবন দিয়ে—খুব ছোট ছোট কাজে, খুব নীরবে।
ইতিহাসে ক্ষুদিরাম একবারই এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর জন্মদিন প্রতি বছর আমাদের কাছে ফিরে আসে একটি নতুন সুযোগ হয়ে—নিজেদের দিকে তাকানোর সুযোগ। ফুল শুকিয়ে যায়, পোস্ট হারিয়ে যায়, মাইক থেমে যায়। কিন্তু একজন শহিদের প্রশ্ন থেকে যায়। আর সেই প্রশ্নের সামনে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে না ‘যুবসমাজ’—দাঁড়িয়ে থাকে আমরা সবাই।
দীপক সাহা : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
