নিঃসঙ্গ এক সন্তের বিদায়

তিনি চলে গেলেন—২০২৬ সালের ৫ জুলাই। তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম ১৯৭০ সালের বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গনে এক সভায়। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কুসুমিত ইস্পাতের কবি হুমায়ূন কবির আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে দেখে ও তাঁর বক্তব্য শুনে আমার একটি শব্দই মনে হয়েছিল—‘ছিমছাম’। মনে হয়েছিল, দেখতে শুনতে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক যেমনি ছিমছাম, তাঁর কথাও তেমনি ছিমছাম —পুরোপুরি বাহুল্যহীন।
আর একটি ব্যাপারে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার হৃদয় আকর্ষণ করলেন। তাঁর পোশাকের ধরণটি ঠিক আমার বাবার মতো। সেই ফুলপ্যান্টের ওপরে পুরোহাতা জামা—ও রকমের পোশাকেই তাঁকে সর্বদা দেখেছি। ঐ রকম জামাকে আমার বাবা ‘বুশশার্ট’ বলতেন। প্রথম জীবনে প্যান্টের ভেতরে শার্ট গুঁজে দিয়ে পরলেও বাবা পরের দিকে প্যান্টের ওপরেই সেই পুরোহাতা শার্ট পরতেন—শুধুমাত্র শীতের সময়ে স্যুট না পরলে। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পোশাকের রকমটিও ছিল সে রকম। আর একজন মানুষকেও ও রকম পোশাকে আমি দেখেছি—তিনি প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ শরীফ।
১৯৭৫ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। ততদিনে তাঁর তিনটে বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল—মুক্তিসংগ্রাম, কালের যাত্রার ধ্বনি ও একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন। সে সময়ে তাঁর লেখা পড়ে ও তাঁর বলা শুনে মনে হয়েছে নিরপেক্ষ চিন্তা ও তত্ত্ব তাঁর চিন্তা-চেতনার মূল খুঁটি। স্বদেশ ভাবনা ও প্রগতিচিন্তাই তাঁর মানস। মানুষটি ‘মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার’ ধারক ও বাহক। সেখানেও ছিমছাম নির্মেদ তাঁর মন ও মানস।
১৯৮৪ সালে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে এলে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে নানা জায়গায় দেখা হয়েছে। কখনো বা শিক্ষকদের বিশ্রামাগারে, কখনো সখনো রাস্তা পার হতে নীলক্ষেত এলাকায়। শিক্ষকদের বিশ্রামাগারে নানা আলোচনায় অনেকের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে অনন্য বলে মনে হতো—তাঁর চিন্তার গভীরতা, জ্ঞানের ব্যাপ্তি, আলোচনার নির্মোহতার কারণে।
কারও প্রবন্ধের আলোচক হলে তিনি কখনো ভাসা ভাসা আলোচনা করেননি, বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পুরো লেখার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করতেন অনেকটা একজন দক্ষ শৈল্যচিকিৎসকের মতো। লেখকের যুক্তির অস্বচ্ছতা, রচনার মধ্যে যুক্তির দূর্বলতা থেকে শুরু করে বানান বিভ্রাট, গ্রন্থপঞ্জির অপ্রতুলতা কিছুই তাঁর মনোযোগ এড়াতো না। সেই সঙ্গে মিশতো তাঁর নিজস্ব মতামত, চিন্তা-চেতনা এবং প্রবন্ধটিকে পরিশীলিত করার জন্যে তাঁর সুপরামর্শ। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কখনো পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত না হয়ে ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না পড়ে আলোচনা সভায় আসতেন না এবং তাঁর তীক্ষ্ণ শাণিত বক্তব্যে আমাদের ঋদ্ধ করতেন। এমন অনন্য সাধারণ আলোচক আর সমালোচক আমি বড় একটা দেখিনি।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পুত্র দীপন (ফয়সাল আরেফিন দীপন) সম্ভবত: আশি বা নব্বুইয়ের দশকে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। আমার শিক্ষক ও সহকর্মীদের অনেকেই আমার বিভাগের বা আমার শিক্ষার্থী ছিল। তাঁদের কাউকে কাউকে জানতাম—যেমন শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পুত্রদ্বয় শোভন ও প্রয়াত সুমন, শহীদ ডা. মোহাম্মদ মোর্তজার কন্যা মিতি, কিংবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কন্যা রুচিরা। কিন্তু আমি জানতাম না যে, দীপন আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও কখনো বলেননি। সত্যিই এমন জানানোর চল ছিল না।
আমরা বাইরে চলে আসি নব্বই দশকের প্রথমদিকে। কিন্তু জনান্তিকে খবর পেয়েছি যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি রচনা করেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা সম্ভবত: ২০০৫ বা ২০০৬ সাল নাগাদ।
পরবর্তী সময়ের বহু ঘটনাই জানা ছিল না আমার। জানতাম না, জলি আর দীপন ঘর বেঁধেছে। জানতাম না, দু’টো ফুট ফুটে শিশুর জনক-জননী হয়েছে তারা। জানতাম না, জলি ডাক্তার হয়েছে আর দীপন আত্মপ্রকাশ করেছে ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রকাশক হিসেবে। জানতাম না বহুকিছুই। জানতাম না দীপনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্যে ছুরি শানাচ্ছে জল্লাদেরা।
তারপরের ইতিহাস বড় কষ্টের আখ্যান। দীপনকে হত্য করা হলো—নিহত হলো একটি শুভ বুদ্ধি, একটি সৃষ্টিশীল মন, একজন সৃজনশীল মানুষ। জলির কষ্টের কথা ভেবে পাই না। কিন্তু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কি কষ্ট, কি অসহায়তা যে তিনি বুকে ধারণ করেছেন তখন, তা যেন তাঁর কথায় বেরিয়ে এসেছে। সে সব পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি হয়তো কোন সাধারন মানুষ নন, এক অনন্য সাধারণ মানুষ! আহাজারি করেননি তিনি, ‘বিচার চাননি তিনি তাঁর পুত্রের হত্যাকাণ্ডের’! হয়তো ভেবেছেন, কি হবে এ পোড়ার বিচারহীন দেশে দীপনের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে।
২০১৮ আগে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন আমার বই বেলা-অবেলার কথার প্রকাশনা উৎসবে। ২০১৭ সালের বইমেলার সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
বহুদিন পরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখলাম। সান্ত্বনার কোন ভাষা আমার মুখে যোগায়নি। কিন্তু তাঁর অবয়বের এক ধূসর বিষন্নতা আমার চোখ এড়ায়নি। মনে হচ্ছিল, তিনি তাঁর মধ্যে নেই এবং তিনি এখানে নেই। বড় কষ্ট হল অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখে।
সে অনুষ্ঠানে তিনি বললেনও ভারী সুন্দর—সেই ছিমছামভাবে। তাঁর বক্তব্যের মায়া-ময়তা, বড় নরমভাবে গাঁথা বাক্যমালার মমত্ব, পর্যবেক্ষণের তীক্ষ্মত্ব আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি যে আমার পুস্তক প্রকাশনা উৎসবে এসেছেন, আমার বইয়ের কথা বললেন, তাতেই আমার মন ভরে থাকল সারাক্ষণ।
২০২৫ সালে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমরা দু’জন একত্রে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এ বছর বইমেলায় দেখা হতে হতেও আমার দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। না, আর কোনোদিনই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে না।
আজ এই সব ভাবনা ছাড়িয়ে হৃদয়ে ভেসে ওঠে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মুখ। আমার মনে হয়, সে মুখ একজন সাধারন মানুষের নয়, সে এক নিঃসঙ্গ সন্তের মুখ।
সেলিম জাহান: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও লেখক
