গী দ্য মোপাসাঁ ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পভাষী এবং কিছুটা লাজুক প্রকৃতির

বাংলা সাহিত্যে যাঁর নাম উচ্চারিত হয় অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থার সঙ্গে, তিনি হলেন ফরাসি তথা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার গী দ্য মোপাসাঁ (Guy de Maupassant)। তাঁর নামের প্রকৃত ফরাসি উচ্চারণ এবং বাংলা রূপান্তর মিলেমিশে এমন এক নান্দনিক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যা আজ বিশ্বসাহিত্যের পাঠকদের কাছে সুপরিচিত। সাধারণ জীবনযাত্রার ভেতর লুকিয়ে থাকা জটিল মানবমনস্তত্ত্ব, সমাজের নির্মম বাস্তব চিত্র এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।
১৮৫০ সালের ৫ আগস্ট ফ্রান্সের মনোরম নরমান্ডি প্রদেশের এক বমূর্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে মোপাসাঁর জন্ম। শৈশব ও কৈশোরের চারপাশের পরিবেশ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর গল্পে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পভাষী এবং কিছুটা লাজুক প্রকৃতির। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে মানবজীবনের গভীরে অবগাহন করাই ছিল তাঁর মূল স্বভাব।
প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার (Gustave Flaubert)-এর স্নেহধন্য ও শিষ্য ছিলেন মোপাসাঁ। ফ্লবেয়ারের নিখুঁত পর্যবেক্ষণ এবং লেখার মুন্সিয়ানা তাঁকে অল্প সময়েই একজন সিদ্ধহস্ত কথাসাহিত্যিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।
মোপাসাঁর সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল তাঁর প্রথম বড় গল্প ‘ব্যুল দ্য সুইফ’ (Boule de Suif)-এর প্রকাশ।
ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এক অবহেলিত ও সমাজের চোখে প্রান্তিক নারীর (বেশ্যা) দেশপ্রেম ও ত্যাগের এই অমর কাহিনী প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় এক প্রবল ভূকম্পন সৃষ্টি হয়।
রাতারাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর খ্যাতি। সমালোচকরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, ধ্রুপদী সাহিত্যের ভান্ডারে এই গল্পটি এক অমূল্য রত্ন।
মোপাসাঁকে ফরাসি সাহিত্যের ন্যাচারালিজম (Naturalism) বা বাস্তবতাবাদের অন্যতম প্রধান ও সর্বশেষ প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর গল্পে অতিরিক্ত কোনো রোমান্টিক কল্পকাহিনি বা কৃত্রিম অলংকার থাকে না; বরং জীবনের রূঢ় সত্য, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, ভণ্ডামি এবং নিয়তির নির্মম পরিহাস অত্যন্ত নিপুণ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশিত হয়।
অল্প বয়সেই বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে এই প্রতিভাবান কথাশিল্পী ১৮৯৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁর এই অকাল প্রয়াণ বিশ্বসাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিসমূহ তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।
শ্রেষ্ঠ গল্প: গী দ্য মোপাসাঁ
বইটির পাতার পর পাতা জুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রেম, সমাজ, বিয়ে এবং মানব সম্পর্কের এক ভিন্ন ও খোলামেলা দর্শন। নিচে নির্বাচিত কিছু অংশের বিস্তার ঘটানো হলো:
“ক্ষণস্থায়ী অবৈধ মিলন কামনায় পুরুষ যে নারীর সঙ্গ চায়, যার সঙ্গে অভিনয় করা যায় অথবা পতিতা বলে যাকে মনে করে চলে— তাদের কারও সঙ্গে এর তুলনা হয় না। এই রমণীকে তিনি ভালোবাসেন, তাকে তিনি জয় করে নিয়েছেন।” (পৃষ্ঠা-১৮)
প্রেম এবং নারী-পুরুষের সম্পর্কের পবিত্রতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে মোপাসাঁ যে আপসহীন ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
“যেদিন তোমাকে ভালোবাসি বলে অনুভব করেছিলাম, সেদিন নিজের মনে বলেছিলাম সেই কথা— যে কথা প্রত্যেকটি প্রেমিকের মনে-মনে উচ্চারণ করা উচিত। কোনো পুরুষ যখন কোনো রমণীকে ভালোবাসে, যখন সে তাকে জয় করতে চেষ্টা করে, যখন সে তাকে পায়, তার সঙ্গ লাভ করে—তখন উভয়ের দিক থেকেই তা হয়ে দাঁড়ায় একটি পবিত্র অঙ্গীকার। লক্ষ করো, এখানে তোমার মতো নারীর সঙ্গ ব্যবহার করার প্রশ্ন— উচ্ছ্বাসপ্রবণ সাধারণ মেয়ের সঙ্গে নয়।”
সমাজ ও প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে সত্যিকারের ভালোবাসার মুক্তি কোথায়, তা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে পরবর্তী পংক্তিগুলোতে:
“বিয়ের সামাজিক মূল্য অনেক, আইনগত মূল্যও যথেষ্ট। কিন্তু যে-সমস্ত পারিপার্শ্বিকে সাধারণত বিয়ে হয়, সেসব ধরতে গেলে আমার চোখে বিয়ের নৈতিক মূল্য অতি সামান্যই।”
“কাজেই যখন কোনো স্ত্রীলোক এই আইনের বাঁধনে বাঁধা পড়ে, অথচ স্বামীকে ভালোবাসতে না-পারায় তার প্রতি কোনো আসক্তি বোধ করে না; ফলে যখন মুক্ত হৃদয়ে সে তার মনের মতো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়, সেই পুরুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, আর পুরুষটিও যখন আর কোনো বন্ধন না-থাকায় তাকে গ্রহণ করে—আমি বলব তাদের সেই পারস্পরিক বন্ধনহীন শর্তের মধ্যে যে অঙ্গীকার থাকে, নগরাধ্যক্ষকে সাক্ষী রেখে ‘হ্যাঁ’ বলার চেয়ে অনেক বেশি।”
“আমি বলতে চাই তারা উভয়েই সম্মানিত ব্যক্তি হলে তাদের মিলন সমস্ত ধর্মীয় মন্ত্রপূত বিয়ের মতো কল্যাণময় পবিত্র না হলেও তার চেয়ে অনেক বেশি প্রগাঢ়, অধিকতর সত্য, আরও বেশি সুস্থ।” (পৃষ্ঠা-২২)
এই চমৎকার সংকলনটিতে মোপাসাঁর সেরা গল্পগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের উপযোগী করে তুলে ধরেছেন বাংলার প্রথিতযশা অনুবাদকরা। নিচে গল্প ও অনুবাদকদের তালিকাও দেওয়া হলো:
নেকলেস — অনুবাদক: সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
নববর্ষের উপহার — অনুবাদক: অরুণ চক্রবর্তী
প্রেম — অনুবাদক: বিমল দত্ত
বোঝাপড়া — অনুবাদক: বিমল দত্ত
অনুতাপ — অনুবাদক: অরুণ চক্রবর্তী
প্রতিহিংসা — অনুবাদক: বিমল দত্ত
আরদালি — অনুবাদক: মীজানুর রহমান
ঘোড়ার পিঠে — অনুবাদক: সুনীলকুমার ঘোষ
এগারো নম্বর ঘর — অনুবাদক: গীতা গুহ রায়
ম্যাদমজেল ফিফা — অনুবাদক: সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
একজন যাত্রীর গল্প — অনুবাদক: বিমল দত্ত
শিল্পী — অনুবাদক: সুনীলকুমার ঘোষ
বেড নম্বর ২৯ — অনুবাদক: সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ
একটি সুতার কাহিনী — অনুবাদক: বিমল দত্ত
কৈফিয়ত: মোপাসাঁর গল্পের এই সংগ্রহ নিয়ে আমার এই লেখাটি কেবল কোনো সাধারণ গ্রন্থালোচনা বা রিভিউ নয়; বরং এটি হলো পাঠকদের জন্য এক অমূল্য বইয়ের সন্ধান দেওয়া। যাতে নতুন প্রজন্ম ভালো লেখক ও তাঁদের কালজয়ী বইগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, বই সংগ্রহ করতে পারে এবং পড়ার আনন্দে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।
বইয়ের নাম: শ্রেষ্ঠ গল্প | গী দ্য মোপাসাঁ
সম্পাদনা: আখতার হুসেন
প্রথম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫
দশম মুদ্রণ: অক্টোবর ২০১২
প্রচ্ছদশিল্পী: ধ্রুব এষ
মূল্য: একশত টাকা মাত্র
