এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্রের পরিচালক, লেখক, কথক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুলের আজ ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের চিংগাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।। তাঁর পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল। তাঁর বাবা বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সরকারি কর্মকর্তা সা’দত আলি আখন্দ, মা রাবেয়া খাতুন। মুক্তিযুদ্ধে সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল৷ সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০১ সালে তিনি স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ করেন। তিনি একজন কলামিষ্ট৷ তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো- আমি বিজয় দেখেছি (১৯৮৫), বিজয় ’৭১ (১৯৯০), চরমপত্র, নজরুল জীবন সন্ধানে, ভাসানী মুজিবের রাজনীতি (১৯৮৪), মহাপুরুষ (১৯৯১), বায়ান্নোর জবানবন্দী (১৯৮৭)। তিনি ক্যান্সার রোগভোগের পর ২০০৪ সালের ২৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর স্মরণে তাঁর একটি ‘চরমপত্র’ বইচারিতায় পাঠকদের নিবেদন করছি।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষ। আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। ঠাস্ কইয়্যা একটা আওয়াজ হইলো। কি হইলো? কি হইলো? ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়াজী সা’বে চেয়ার থনে চিত্তর হইয়া পইড়া গেছিলো। আট হাজার আষ্টশ’ চরাশি দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট তারিখে মুছলমান-মুছলমান ভাই-ভাই কইয়া, করাচী-
খতম্ তারাবী হইয়া গেল। লাহুর-পিন্ডির মছুয়া মহারাজরা বঙ্গাল মুলুকে যে রাজত্ব কায়েম করছিল, আইজ তার
বাঙ্গালি পোলাপান বিচ্ছুরা দুইশ পঁয়ষট্টি দিন ধইর্যা বাঙ্গাল মুলুকের ক্যাদো আর ন্যাঁকের মাইদ্দে World-এর Best পাইটিং ফোর্সগো পাইয়া, আরে বাড়িরে বাড়ি। ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়াগুলা ঘৎ ঘৎ কইরা দম ফ্যালাইলো। ‘ইরাবতীতে জনম যার ছোমতীতে মরণ।’ আঙ্কা আমাগো চক বাজারের ছক্কু মিয়া ফাল্ পাইড়্যা উডলো, ‘ডাইসা’ব, আমাগো চক বাজারের চৌ-রাস্তার মাইদ্দে পাথর দিয়া একটা সাইনবোর্ড বানামু। হেইডার মাইদ্দে কাউলারে দিয়া লেখাইয়া লমু, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গাল মুলুকে মছুয়া নামে এক কিছিমের মাল আছিলো। হেগো চোপাট্ বাইড়া যাওনের গতিকে হাজারে হাজার বাঙ্গালি বিচ্চু হেগো চুটিয়া-মানে কিনা পিঁপড়ার মতো ডইল্যা শেষ করছিল। এই কিছিমের গেনজামরেই কেতাবের মাইদ্দে লিইখ্যা থুইছে ‘পিপীলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে।’ টিক্কা-মালেক্যা গেল তল, পিঁয়াজ বলে কত জল?
২৫ শা মার্চ তারিখে সেনাপতি ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালিগো বেশুমার মার্ডার করনের আর্ডার দিয়া কি চোপাট্। জেনারেল টিক্কা খান হেই আর্ডার পাইয়া ৩০ লাখ বাঙ্গালির খুন দিয়া গোসল করলো। তারপর, বঙ্গাল মুলুকের খাল-খন্দক, দরিয়া-পাহাড়, গেরাম-বন্দরের মাইদ্দে তৈরী হইলো বিচ্চু। ‘যেই রকম বুনোওল, সেইরকম বাঘা তেঁতুল।’
গেরামের পোলাপান যেমতে কইর্যা বদমাইশ লোকের গতরের মাইদ্দে চোত্রা পাতা ঘইস্যা দেয়, বিচ্চুগো হেই রকম কাম শুরু হইয়া গেল। হেই কাম Begin. ঢাঁই-ই-ই-ই। কি হইলো কি হইলো? ঢাকার মতিঝিলে বিচ্চুগো কারাবর হইলো।
ঘেটাঘ্যাট, ঘেটাঘ্যাট্। কি হইলো? কি হইলো? অংপুরের ভুরুঙ্গামারীতে ভোমা ভোমা সাইজের মছুয়ারা হালাক হইলো। কেইসটা কি? কই নাতো।’ আমাগো মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জে কোনো টাইমেই মছুয়া আছিলো না তো? মেরহামত মিয়া অক্করে চিকুর পাইড়া উঠলো, ‘বুঝছি, বুঝছি, পুরা মছুয়া রেজিমেন্টরে আলাদা না পাইয়া প্যাঁক আর দরিয়ার মাইদ্দে গায়েব কইরা, কী সোন্দর দুই হাত ঝাইড়া বিচ্ছুরা কইতাছে, কই না তো? এইদিকে কোনোদিন মছুয়ারা আহে নাই তো?
ব্যাস, মেসিন গানের লগে মেসিন গান; মর্টারের লগে মর্টারের বাইড়া-বাইড়ি শুরু হইয়া গেল। গাবুর বাড়ির চোটে জেনারেল টিক্কা খান পাকিস্তানে ভাগোয়াট্ হইলেন। লগে লগে আবার ছদর ইয়াহিয়া নতুন ট্রিক্স কইর্যা কয়েকটা বাঙ্গালি হারু মালের মুখে লাগাল লাগাইয়া ‘ক্ষেমতা হস্তান্তর করছি’, বইল্যা চিল্লাইতে শুরু করলো। ঠ্যাটা মালেক্যা গবর্ণর, One Man পার্টির ছলু মিয়া, মাইনকার চরের আবুল কাসেম, খুলনার খবরের কাগজের হকার মাওলানা ইউসুপ্যা, জয়পুরহাটের মাওলানা আব্বাস, ফেনীর ওবায়দুল্লা মজুমদার আর বরিশালের আখতারউদ্দিন মিনিস্টার হইলেন। হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী। পালের গোদা ছিয়াত্তর বচ্ছর বয়সের বুড়া বিল্লি আস্তে কইর্যা ছালার মাইদ্দে তনে বারাইলো। স-অ-ব কামই হিসাব মতো চলতাছে। সাতডা হারু পাট্টিরে এক গোয়ালে তুইল্যা মওলবী সা’বের পেরধান মন্ত্রী হওনের চিরকিৎ হইলো। পুরানা তপনের ন্যাকড়া দিয়া উরা বাইনদ্যা বেডায় হাওয়াই জাহাজে পিন্ডি যাইয়া ছদর ইয়াহিয়া খানের অক্করে কোলের মাইদ্দে বইয়া পড়লো।
সেনাপতি ইয়াহিয়া খান যখন আন্তাজ করতে পারলো যে, কোনো ট্রিক্সেই আর কাম হইতাছে না, তখন পাকিস্তান আর বঙ্গাল মুলুকের লাড়াইডারে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের গেনজম বইল্যা চালু করণের লাইগ্যা ভট্ কইরা কইয়া বইলো, ‘আমি কিন্তু আর নিজেরে আটকাইয়া রাখতে পারতাছি না, আমার লগে নতুন মামু রইছে, বুড়া চাচা রইছে। আমি ইন্ডিয়া Attack করমু।’ দিনা দশেকের মাইদ্দে আমি এই কারবার করমু। এইবার আমি নিজেই পিন্ডির থনে বর্ডারে যামুগা।’ যেই কাথা, হেই কাম। মাথার Upper Chamber খালি ছদর ইয়াহিয়া- যা থাকে ডুঙ্গির কপালে কইয়া কারবার কইর্যা বইলো। কিন্তু মওলবী সা’বরে আর Border-এ যাইতে হইলো না। আত্কা শরাবন তহুরার গিলাস টেবিলের উপর ঠক্ কইরা থুইয়া দ্যাহে কী? লাড়াই রাওয়ালপিণ্ডির দরজায় আইস্যা হাজির হইছে। পাশে আজরাইল ফেরেস্তা খাতা হাতে খাড়াইয়া রইছে। খাতায় লেখা সাদাপাকা মোটা মোটা ভুরু-ওয়ালা আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পিতা Unknown.
হ-অ-অ-অ এইদিকার খবর হুনছেন নি? সবই হবুর কারবার। হবু পেরধান মন্ত্রী চুরুল আমীন, হবু দেশরক্ষা মন্ত্রী মিয়া মোমতাজ মোহাম্মদ দৌলতানা, হবু যোগাযোগমন্ত্রী আগায় খান পাছায় খান খান আব্দুল কাইয়ুম খান, হবু পোস্টপিসের মন্ত্রী ইসলামের যম গোলাম আজম আর হবু ফরিন মিনিস্টার মদারু ভুট্টো। কেউই শপথ লইতে পারে নাইকা-*
টাইম শর্ট। বঙ্গাল মুলুকের বিচ্ছুগো গাজুরিয়া মাইর শুরু হইয়া গেছে। ঠ্যাঁটা ম্যালেক্যার কী কাঁপন! মওলবী সা’বে বাংকারের মাইদ্দে বইস্যা বল পয়েন্ট কলম দিয়া গবর্ণরের পদ থাইক্যা ইসতফা দিছে। এরেই কয় ঠ্যালার নাম জশমত আলী মোল্লা। বেডায় তার স্যাঙ্গাৎগো লইয়া কী সোন্দর হোটেল Intercontinenral-এর মাইদ্দে হান্দাইছে। কিন্তু মওলবী সা’ব বহুত লেটই কইর্যা ফেলাইছে। আপনার ঘেটুগো খবর কি?
ছহি আজাদ পত্রিকার হরলিকের বোতল ছৈয়দ ছাহাদৎ হোসেন, মর্নিং নিউজের এসজিএম বদরুদ্দিন, ছালাউদ্দিন মোহাম্মদ, সংগ্রাম পত্রিকার মাওলানা আখতার ফারুক্যা, দৈনিক পাকিস্তানের আহসান আহম্মদ আশঙ্ক, পাকিস্তান অবজার্ভারের খাসির গুর্দার শুরুয়া খাওইন্যা মাহবুবুল হাক, নেশন্যাল ব্যুরোর দাড়ি নাই মাওলানা ডাঃ হাসান জামান-খোন্দকার আবুল হামিদ এসব মালেরা অখন কি করবো? প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার হরিবল হাক্ চৌধুরীর কোনো খবর নাইক্যা- সিলেটের হারু মাল চুষ পাজামা মাহমুদ আলীর কোনো আও-শব্দ পাওয়া যাইতাছে না। কি হইলো? এদ্দিন তো শাহ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান আর দরদী সংঘের দালাল সম্রাট এ.টি. সাদ’দীরে লইয়া খুবই তো ফাল পাড়াতাছিলা-মাল-পানি জিন্দাবাদ। এলায় হের করবা কি?
আমার সাজানো বাগান হুকায়া গেল। অ্যাঃ এ্যাঃ একটিং জাতিসংঘে মদারু ভুট্টো জেনারেল পিঁয়াজীর ছারেন্ডারের খবর পাইয়া একটিং করছে। পয়লা গরম, তারপর নরম হেরপর আরে কান্দনরে কান্দন! পকেটের রুমাল বাইর কইর্যা চোখ মুইচ্ছ্যা নাক Clear কইরা লইলো। চিল্লাইয়া কইলো, ‘ছ্যারেন্ডার-ছারেন্ডার তো’ Impos-অসম্ভব। আমরা ছারেন্ডার করমু না। আমি পাইট করমু, আমি পাইট করমু। এই না কইয়া মদারু মহারাজ আত্কা গতরের জামাকাপড় পুড়ি- ফ্রান্স-বৃটেনের খসড়া প্রস্তাব টুকরা টুকরা কইর্যা ছিইড়্যা ফেলাইয়া ঘেমেট্ কইর্যা বাইরাইয়া গেল। বাইরাইনের টাইমে ইন্ডিয়া-রাশিয়ার লগে ফ্রান্স-বৃটেনরে তুফান গাইল। সাদা চামড়ার জেন্টেলম্যানরা খালি কইলো, ‘যার লাইগ্যা চুরি করি, হেই কয় চুর।’
জাতিসংঘ থাইক্যা আগাশাহীর রুমে আহনের লগে লগে ‘মওলবী সা’ব খবর পাইলো, ‘খেইল খতম, পয়সা হজম।’ আট হাজার আষ্টশ চুরাশী দিনের সোনার হাঁস, মানে কিনা বঙ্গাল মুলুকসহ পাকিস্তান নামে দেশটা শ্যাষ হইয়া গেছে। আমগো ছক্কু মিয়া একটা গুয়ামরি হাসি দিয়া গালটার মাইদ্দে খ্যাকরানি মারলো। কইলো, ‘ভাই সা’ব ২৬শে মার্চ এই মদারু ভুট্টো ঢাকার থনে করাচীতে ভাগোয়াট্ হইয়া এলান করছিল, ‘আল্লায় সারাইছে, ছদর ইয়াহিয়া বেশুমার বাঙ্গালি মার্ডারের অর্ডার দেওনের গতিকে পাকিস্তানডা বাঁইচ্যা গেল।
এলায় কেমন বুঝতাছেন? বিষ্ণুগো বাড়ির চোটে হেই পাকিস্তান কেমতে কইর্যা ফাঁকিস্তান হইয়া গেল? হেইর লাইগ্যা কইছিলাম, কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষে। অইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ।
আইজ ১৬ই ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।
