কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিতে নীলা নাগ
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এম এ ডিগ্রিধারী, বিপ্লবী ও নারী জাগরণের অগ্রদূত লীলাবতী নাগের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও পরিসংখ্যানবিদ কাজী মোতাহার হোসের স্মৃতিকথা থেকে নীলা নাগ সর্ম্পকে লেখাটি বইচারিতার পাঠকদের নিবেদন করা হলো। নীলা নাগ ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর তৎকালীন সিলেটের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গিরীশচন্দ্র নাগ অবসর প্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। মা ছিলেন কুঞ্জলতা দেবী চৌধুরী। সুশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা একটি পরিবার ছিল। লীলা রায় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন নেত্রী ছিলেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে দীপালী ছাত্রী সংঘ নামে ছাত্রী সংগঠন গড়ে ভারতে প্রথম তার মাধ্যমে ছাত্রীদের মধ্যে রাজনীতি চর্চা শুরু করেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মহিলাদের আবাস ছাত্রীভবন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মহিলা সমাজের মুখপত্র হিসেবে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে জয়শ্রী নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। লীলা রায় ছবি আঁকতেন এবং গান ও সেতার বাজাতে জানতেন। ১৯৭০ সালের ১১ জুন ভারতে এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন।

আমি এই সেগুনবাগানের যে বাড়িতে রয়েছি, সে বাড়ির প্ল্যান থেকে শুরু করে চূণ-সুরকি-বালু-সিমেন্ট কোথায় পাওয়া যাবে এবং কনট্রাকটরের কামলাদের কাজকর্ম ঠিকমত চলছে কিনা এসব দেখাশোনার কাজ উনিই (আমার স্ত্রী) করেছেন। কোথায় ইটের গাঁথনি শিথিল হলো, কোথায় চূণকাম হলো না, কোন মজুরটার কাজে ঘাটতি হলো, এসব তদারক উনিই পূর্ব-অভিজ্ঞতার দরুন সুচারুরূপে করতে পারতেন। অর্থাৎ কত ধানে কত চাল হয়, এসব উনি কলকাতার দালান বাড়িতে বসতকালেই লক্ষ করেছিলেন, তাই বিল্ডিং-এর কনট্রাকটর ওস্তাগারদের গাফলতি চট করে ধরে ফেলতে পারতেন। কাজ খুব সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হয়েছিল। এরজন্য তিনি রোজ অন্ততঃ ৩-৪ ঘণ্টা করে সরেজমিনে উপস্থিত থাকতেন আর আমি সর্বদা নিশ্চিন্তভাবে লেখাপড়ার কাজ করে যেতে পারতাম নইলে হয়ত শিক্ষাক্ষেত্রে আমি অধিক উন্নতি করতে পারতাম না। এই বাড়ির একতলা তৈরি শেষ হয় ১৯৩২ সালে। আমরা তখনই নিজের বাড়িতে উঠে আসলাম। তখন এই বাড়ি দেখে তিনি আনন্দের সঙ্গে বলে উঠলেন, “এই সুন্দর বাড়িটা আমাদের আপন বাড়ি! হাজার শুকুর আল্লাহর, আলহামদুলিল্লাহ।” এই কথা শুনে আমার মনেও যে কি খুশি জেগেছিল তা বর্ণনা করা যায় না।
তবে একটা বিষয়ে আমার মনে দুঃখ ছিল-বাজেট ছিল ৬ হাজার টাকা, কিন্তু বাড়ি তৈরি করতে মোট খরচ লাগল ১০,০০০ টাকা; তাই ওস্তাগার কনট্রাকটররা বাকি প্রাপ্যের জন্য খুব তাগিদ দিতে লাগল। একদিন বিষণ্ণ বদনে ঘরের মেঝেয় বসে আছি দেখে, সাজেদা বিবি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অমন করে বসে রয়েছেন কেন?’ তখন আমি ঋণের কথাটা বললাম। ইউনিভার্সিটি থেকে ৬,০০০ টাকা বাড়ি তৈরি বাবদ ধার নিয়েছিলাম, তাই ওস্তাগার ও কন্ট্রাকটরদের কাছে হাজের চারেক ধার হওয়াতে ওরা জোর তাগাদা লাগাচ্ছে। উনি তখনই উঠে গেলেন আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটা থলে এনে আমাকে দিয়ে বললেন, ‘আমার গহনাগাটি এর মধ্যে আছে আপনি কোন বন্ধুলোকের কাছে এগুলো গচ্ছিত রেখে কিছু টাকা এনে অবিলম্বে এদের ধার শোধ করে দেন।’ আমি নিতে চাইনে, কিন্তু উনি কিছুতেই ছাড়লেন না। তখন আমি শ্রীমতী লীলা নাগের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীগিরীশচন্দ্র নাগের কাছে গহনাগুলো বন্ধক দিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়ে গৃহ-নির্মাতাদের ধার পরিশোধ করে দিলাম।

এখন এই গিরীশ নাগের পরিবারবর্গের বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক বোধ করি। লীলা নাগ ঢাকা কলেজে আমার এক ক্লাস নিচে পড়তেন। এঁর মত সমাজ-সেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর কখনো দেখি নাই। এঁর থিওরি হল, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনো তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না। তাই তিনি মেয়েদের রুমাল, টেবলক্লথ প্রভৃতির উপর সুন্দর নক্সা এঁকে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এইসব বিক্রি করে তিনি মেয়েদের একটা উপার্জনের পন্থা উন্মুক্ত করে দেন। এঁদের বন্ধু-বান্ধবীরা এইসব সূচীকর্ম বিক্রয়ে সহযোগিতা করতেন। এঁদের একটা সঙ্ঘ ছিল, লীলা ও আমি এই সঙ্ঘের যুগ্ম ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলাম, প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিসেস সুজাতা রায়ের স্বামী শ্রীসত্যেন্দ্রকুমার রায় (ইংরেজীর অধ্যাপক)। শুধু এই নয়, মেয়েদের শিক্ষালাভের জন্য আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয়, টিকাটুলীতে কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল এবং তৎকালীন নওয়াবী ব্রিজের অপর পারে নারীশিক্ষা মন্দির ইনিই সৃষ্টি করেছেন। আর এঁর কায়েতটুলীর বাড়ির পাশে একটা প্রাইমারি বালিকা বিদ্যালয় খুলে দিয়েছিলেন। সেইটেই ক্রমশঃ বর্ধিত হতে হতে বর্তমানে দোতলা কলেজে পরিণত হয়ে গিরীশ নাগের পূর্বতন গৃহের সর্বাংশ জুড়ে রয়েছে। এই স্থানটি এখনও আমার কাছে পবিত্র তীর্থস্থান বলে মনে হয়। লীলার বিবাহের পর তিনি লীলা রায় রূপে পরিচিত হন। এঁর দুটো ছোট ভাইকে আমি গৃহশিক্ষকরূপে পড়িয়েছি। আমি উপস্থিত হওয়া মাত্রই গিরীশবাবু গৃহিণীকে ডেকে বলতেন, ‘ওই দেখ আমাদের কাজী সাহেব আসছেন, শিগগিরই ওঁর আহারের বন্দোবস্ত কর।’
আমার জন্য সর্বদাই দুধ, দৈ, চিড়ে, মুড়কি, খৈ বরাদ্দ ছিল। পাকিস্তান হয়ে যাবার পর শ্রীমতী লীলাবতী রায় কলকাতায় চলে যান। সেখানেও তিনি তিন-চারটে স্ত্রী-শিক্ষাভবন চালু করেন। তিনি থাকতেন দক্ষিণ কলকাতার বালীগঞ্জ এলাকায়। আমি ঐ সময় (১৯৩০-৫০ সালে) প্রতি বৎসর উত্তর কলকাতার বরাহনগর এলাকায় ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিটিউটের বৈদেশিক শিক্ষক হিসাবে (আমন্ত্রিত অতিথিরূপে) অবস্থান করতাম। সংবাদ পেলেই লীলাদেবী আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন; আর তাঁর গৃহে নিমন্ত্রণ করে নিজের হাতে রেঁধে-বেড়ে আমাকে খিচুড়ি পোলাও ইত্যাদি খাওয়াতেন। ঢাকাতেও আমরা যখন ভাড়াটে বাড়ীতে ওঁদের পল্লীতে থাকতাম, তখন আমিও সস্ত্রীক ওঁদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতাম, উনিও আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, আর আমার স্ত্রীর সঙ্গে নারী-মঙ্গল ও নারীর মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করতেন। এই মহীয়সী মহিলা ১৯৬০-এর দশকে রোগাক্রান্ত হয়ে কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকবার সময় আমার কাছ থেকে একটা শেষবার্তা নেবার জন্য তাঁর দুইজন ভলান্টিয়ার পাঠিয়েছিলেন। আমিও শোকার্ত চিত্তে আল্লাহ্র কাছে এই পবিত্র মহিলার রোগমুক্তির প্রার্থনাসূচক বাণী পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় শিগগিরই তিনি নশ্বর মর্তধাম ত্যাগ করে মহাপ্রস্থান করলেন। পৃথিবীর একটা উজ্জ্বল আত্মা আকাশের তারকামণ্ডলে গিয়ে তার শোভাবর্ধন করল।
সূত্রধর : স্মৃতিকথা, কাজী মোতাহার হোসেন
