মিলটন রহমানের কবিতাগুচ্ছ

অহংকার

আমি কোনো পাহাড় কিনতে চাই না
পাহাড় কেনার ক্ষমতা অন্য রকম,
সমুদ্র কিংবা দ্বীপের বদলে আস্ত একটা
পাহাড় কিনতে চাওয়া
শৈশব এবং কৈশোর ভুলে যাওয়া
আমার পক্ষে সম্ভব নয়,
আমি যার অবস্থান যেখানে দেখেছি
তাকে সেখানেই দেখতে চাই,
সমুদ্রকে পাহাড়ে নয় কিংবা ফেলে আসা
কোনো দ্বীপকে দেখতে চাই না সমুদ্রে
জানি কেউ কখনো পেছনে ফিরতে পারে না
কিন্তু পেছনে রেখে আসা রেণু রেণু সুখ দুঃখ
একদিন হীরের মতো জ্বলে ওঠে
কেউ কেউ সমতল ছাড়িয়ে পাহাড় চূড়ায় ওঠে
যদি বলে সব মানুষের মধ্যেই আছে অহংকার
আমি মানতে নারাজ
পাহাড় চূড়ায় উঠে নিজেকে শেরপা ভাবা যায় না
বরং আকাশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে
নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব টের পেয়ে আমি বহুবার
নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি,
আমি এভাবেই হেরেছি
হেরে যাওয়ার কোনো কৌশল আমার রপ্ত ছিল না,
আমি ঈশ্বরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বারবার বলেছি
জীবনের কোনো কিছুই অবহেলায় দাওনি তুমি
দাওনি পাহাড় গিলে ফেলার একচ্ছত্র ক্ষমতা
বলি-
তুমি ক্ষান্ত হও হে সর্বগ্রাসী দানব
অন্তত একবার হেরে যাওয়ার সুযোগ নাও। 

টিপ

কপালে ফুটে থাকা সাদা টিপ ফেটে
গড়িয়ে নামছে সহস্রধারা
জীবনের কোন কোন সময় এমন হয়
সমস্ত সাজসজ্জা মলিন করে
নেমে আসে মাঘের আকাশ
কপালে ফুটে থাকা টিপের ভেতর
বেজে ওঠে ফিকে স্বপ্নের কোরাস।
আমি এমন বহু টিপের কাছে জিজ্ঞেস করেছি
কোথায় কতদূর তার ঠিকানা, পাইনি উত্তর
তবে দেখেছি, দু’গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে
অধরা সুখ-স্বপ্ন!

বাড়ি

একটা বাড়ি বানাব
কোনো মানুষ থাকবে না তাতে
থাকবে কেবল শূন্যতা
বিকট-বৃহৎ শূন্যত
কোনো মানুষের কথা শোনা যাবে না
থান থান শূন্যতা ভেদ করে
ফিস ফিস করে বাতাস কথা বলবে
পাতার বাঁশির মতো মিহি সুরে
অন্তত মানুষের কোনো পদছাপ
সে বাড়িতে থাকবে না
একটা পাতা নড়ে ওঠলেও শোনা যাবে
কোলাহল হীন সেই বাড়িতে
মানুষের ছায়া পড়ুক আমি চাই না
এমন কী আমার ছায়াও নয়।
এমন একটি বাড়ি আমাদের প্রয়োজন
প্রার্থনা করি পুরো দেশ এমন একটি
বাড়ি হয়ে উঠুক
যেখানে মানুষের মতো মানুষ থাকবে না
বিরান সে বাড়িতে শূন্যতার বিকট শব্দে
ভেঙে যাবে ক্ষুদিত পাষাণের রাজ প্রাসাদ!

মানুষ

এক ভর পূর্ণিমা রাতে আমার ছায়া দু‘ভাগ হয়ে গেল!
হঠাৎ মেঘের কার্তুজের আঘাতে দু‘ভাগ হয়ে গেল চাঁদ
কালো রক্তে তড়পাতে তড়পাতে আমার দ্বিখণ্ডিত ছায়ারা
তারার থুতনিতে ঝুলে, ইতিহাসের পাতা খুলে বসেছে
এসব কোনো খোয়াবি কিংবা চটুল গল্পের আখ্যান নয়
দেখলাম প্রপিতামহ জলের সাম্পান বেয়ে বসেছে পাশে
আমার মগজে কইছালি করতে করতে তীরন্দাজ তিনি
জিজ্ঞেস করলেন-আমাকে চিনতে পেরেছিস তুই?
আমার দ্বিখণ্ডিত ছায়া ততক্ষণে প্রপিতামহের গল্প শেষে
আঠা দিয়ে ভেঙে যাওয়া চাঁদের শরীর জোড়া দিতে ব্যস্ত
আমাদের এমন ব্যস্ততা দেখে বললেন, তোরা বড় অস্থির
চতুর্দিকে কেবল কঙ্কাল, কোথাও রক্ত-মাংসের মানুষ নেই।
কোথাও তো কিছু ভাঙা নেই, ভেঙেছিস তোরা!

অবস্থান

ভোরের সঙ্গে কিসের এত সখ্যতা
নদীর মাপের তিলগুলোতে
দরিয়া মাপের চোখগুলোতে
কেনো আমার জমে এত মুগ্ধতা।
দুপুর হলে ফুটে ওঠে চোখগুলো
ঠোঁটেও তুমি বুলিয়ে নিলে রঙ-তুলি
পাহাড় মাপের টপগুলোতে
মেঘের মাপের চুলগুলোতে
কেনো আমি লেপ্টে থাকি হরবেলা।
হরবেলাতে হরবোলা কয় মেঘদূতে
তবুও তুমি চাওনা কেনো রঙ ছুঁতে
আকাশ মাপের ক্ষণগুলোতে
ঠোঁটের মাপের প্রেমগুলোতে
কোথাও আমায় রাখলে না সেই প্রদ্যুতে।

আরও পড়ুন