কাজী লাবণ্যের একগুচ্ছ কবিতা

আষাঢ়ের বিকেল

আষাঢ় এলো চুপিচুপি
মেঘের পালে রূপের ঝুপি
কাঁদে আকাশ, হাসে ধরা
অথৈ জল পুকুর ভরা।

তাল গাছের মাথায় বাতাস
খেলা পাড়ায় বায়ান্ন তাস
পানকৌড়ি ভিজে ডানায়
জলের ফোঁটা কচুরিপানায়।
 
মাটির গন্ধ, কাদার টান
শিশুরা খেলে, হাসে প্রাণ
আষাঢ় যেন প্রেমিক পুর
হৃদয় ভেজায় জল নূপুর।

চিঠি আসে মেঘের কোলে
স্মৃতির বাদল সুরে দোলে
কোন জানালায় চেয়ে আছি
মন মহুয়ার কাছাকাছি।

বিকেল

অনাদিকালের ওপার থেকে কে যেন স্মৃতির ঘরে টোকা দেয়। যেখানে খোদাই করা আছে আনন্দলোকের শিলালিপি। যেখানে বিশুদ্ধ আনন্দের আলাদা একেকটা বিকেল ঘুমিয়ে আছে, সুগভীর নিদ্রায়।
হারানো সেই ভূর্জপত্রকে ভুলে গিয়েছি।
ভুলেই গিয়েছি সেই আস্ত এক একটা বিকেলের কথা। যে বিকেল তরতাজা বৃক্ষগুলোর মাথায় মাথায় ছড়িয়ে দিত আবির। যে বিকেল ছায়া হয়ে মায়া হয়ে বিছিয়ে থাকত বারান্দা থেকে উঠোন, মাঠ থেকে পথ, আর প্রতিটা পাড়ায় পাড়ায়। যে বিকেল অঙ্ক স্যারের অনুপস্থিতিকে উল্লাস মাখিয়ে দিত, ছেলেমেয়েদের পায়ে পায়ে গতি এনে দিত, কোলাহল এনে দিত বউছি খেলার ছোট্ট বউটিকে ঘিরে। যেই বিকেলে আঁচল উড়িয়ে হাওয়ারা বেরিয়ে পড়ত হাওয়া খেতে। তার গায়ে লেগে থাকত বড়দের ব্যস্ততা ছোটদের দৌড়ঝাঁপ। জোড়া বিহঙ্গের নীড়ে ফেরার সাথে ছিল বাবা চাচাদেরও ঘরে ফেরা।
আহা বিকেল!
আমার হারিয়ে যাওয়া বিকেল!
তুমি কি করে ফিরে এলে এই সোয়ান নদীর তীরে, শেনটন এভিনিউ
জুনডালাপের সবুজ বনবিথির পথে!

প্রত্যাশা

সময়ের ঘুলঘুলি ভেঙে নিত্য পেরিয়ে যাচ্ছি অনিশ্চয়তার
হলুদবনি মাঠ,

পেছনে পড়ে থাকুক আক্ষেপ আর ভুল শোধরানোর
শ্মশানপোড়া কাঠ।
ভালো ছিলাম-ভালো নেই, সর্পমন্ত্র ভাসিয়ে দিই
চিকলি বিলের স্রোতস্বিনী জলে।

তবে যাহা বলিব সত্য বলিব,
কোনো এক প্রাচীনকালে সে এক ভালো থাকা ছিল
হাতে পাতে সরলতার ঘানিতেল মেখে।
আজ দেখ,
বিশ্বসেরা সেফোরা’র লোশন সেরামেও
ভালোত্বের ঔজ্জ্বল্য ফোটে না।
 
পৌনঃপুনিক অনুশীলনে বিদায়ের শেষবাণী উচ্চারণে
আর জড়তা থাকবার কথা নয়
বরং স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিই স্থান।

তরুণ তুর্কী! নবীন নাবিক!
নিজেকে গড়
আর,
গড়ে তোলো মাটি মাতৃকার ঘানিতেল মাখা
জগত উজ্জ্বল বরনীয় মানচিত্র।

বৃষ্টিতলে

আকাশ ভেজা সুরের স্নান
মেঘমল্লার ছোঁয় যে প্রাণ
নূপুর ধ্বনি ছাদে নামে
শব্দ খেলে পুরনো খামে।

ভেজা পাতার গোপন কথা
বুকে জাগায় কোন সে ব্যথা
অতীত সেতো বজ্রে মরে
বৃষ্টি কথা বুকের ‘পরে। জৈষ্ঠ্য বৃষ্টি চির চেনা
আজও কাঁদায় বাড়ায় দেনা
ভেজা মন, মনের জলে
ফিরে এসো বৃষ্টি  তলে।

মেদিনী মেয়ে

জারজ সব যুদ্ধ শরীরে নিয়ে
আবর্তিত হচ্ছে প্রিয় মেদিনী।

তারপরও,
আষাঢ়ের মেঘেরা ঝুরঝুর ঝরে পড়ে
জল সিঞ্চনে পুষ্ট করে ফসলের মাঠ
চারপাশ ঝলমল করে ওঠে অমলতাস রোদ।

আকাশের গভীর থেকে মুঠো মুঠো মায়া নিয়ে
খলবল বয়ে চলে,
চিকলি, তিস্তা, ঘাঘট, ধরলা…
রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, খেকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে,
এমন বিয়ের দিনে
কখনো কারো মন খারাপ হয় না,
কিন্তু মেদিনী মেয়ের বড় মন খারাপ।

বন্ধু

প্রতিদিনের কাজের পথে রাশ
চলছে জীবন, স্বাধীন বারোমাস
ক্লান্ত-বুকে সকল কাজের পরে
আলো নিভলে ফিরি অন্ধ-ঘরে।

যখন আমি গাছের মতো অমর
শাখায় শাখায় পাতার মর্মর
বেশ তো থাকি মর্মরিত সুরে
আলোর নাচন নাচে অন্তঃপুরে।

যখন আমি বন্ধু বিহীন অনাথ
আসেন তখন স্বয়ং  রবীন্দ্রনাথ
আমার ভেতর গোপন কিছু নাই
অকপটে  তাহারে  জানাই।

নিত্যদিনের খবর আসছে কানে
ছুটছে জীবন মহামারীর পানে
থামাও তোমার ভয়াবহ থাবা
জীবন গানে ফুটে উঠুক জবা।

আরও পড়ুন