জন্মই আমার আজন্ম পাপ-এর কবি দাউদ হায়দার

সত্তর দশকের বিখ্যাত বিতর্কিত নির্বাসিত  অকৃতদার কবি দাউদ হায়দার গত ২৬ এপ্রিল ২০২৫ শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টা ২০ মিনিটে ইহজগৎ থেকে বিদায় নিলেন। তিনি জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত একটি বয়স্ক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলার দোহারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একটি কবিতা লেখার অপরাধে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে দেশ থেকে নির্বাসনের পর তিনি প্রথমে তের বছর ভারতে ও ১৯৮৭ থেকে জার্মানিতে কাটান। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছিলেন একজন ব্রডকাস্টিং সাংবাদিক। বাংলা ভাষার আধুনিক কবি হিসেবে সত্তর দশকেই পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যের নাম ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 সংবাদের সাহিত্যপাতায় ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়’ নামে একটি কবিতায় লিখেছিলেন  হজরত মুহাম্মদ (সাঃ), যিশুখ্রিস্ট এবং গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে অবমাননাকর উক্তি । তাতে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল। বাংলাদেশ সরকার তখন চায়নি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন হারাতে। ১৯৭৩ সালে কবিকে নিরাপত্তামূলক কাস্টডিতে নিয়ে ১৯৭৪ এর ২০ মে সন্ধ্যায় তাঁকে জেল থেকে মুক্ত করে ২১মে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ নির্দেশে কলকাতাগামী একটি ফ্লাইটে তুলে দেয়। ওই ফ্লাইটে আর কোনো যাত্রীই ছিল না। তাঁর কাছে সে সময় ছিল মাত্র ৬০ পয়সা এবং কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগ। ব্যাগে ছিল কবিতার বই, দু’জোড়া শার্ট, প্যান্ট, স্লিপার আর টুথব্রাশ। কবির নিজেই বলেছেন: “আমার কোনো উপায় ছিল না। মৌলবাদীরা আমাকে মেরেই ফেলত। সরকারও হয়তো আমার মৃত্যু কামনা করছিল।” যে কবিতাটির জন্য তাকে দেশ ছাড়তে হয় তার কয়েকটি পংক্তি এরকম :

“অদ্ভুত আলখেল্লা পরিহিত মিথ্যুক বুদ্ধ

বুধি বৃক্ষতলে

যিশু ভন্ড শয়তান,

মোহাম্মদ আরেক বদমাশ

চোখে মুখে রাজনীতির ছাপ।”

দাউদ হায়দারের কাছে কলকাতাও ছিল  একবারে অচেনা এক শহর, তিনি কাউকেই চিনতেন না।  দমদম এয়ারপোর্টে নেমেই কেঁদেছিলেন নিরাপত্তাহীনতায় । তবে অল্প সময়ের মধ্যেই  তিনি প্রথম গৌরকিশোর ঘোষের কাছে আশ্রয় পান। সেখানে একমাসের মতো থেকে লেখালেখিও শুরু করেছিলেন। কলকাতার কঠিন বাস্তবতার মাঝে তিনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়ও লেখেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক তুলনামূলক সাহিত্যের’ ছাত্র ছিলেন।

তাঁর জীবনে প্রেমও এসেছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণী তাঁকে প্রেম নিবেদন করে। তারপরও তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি একা কলকাতা শহরের মতোই নিঃসঙ্গ।  একজন আগন্তুক মাত্র। পরে অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন । কিন্তু পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে  স্থায়ীভাবে বসবাসেরও সমস্যা দেখা দিলে ভারত সরকার দায়িত্ব নিতে চায় না নির্বাসিত কবির। তিনি অন্য কোনো দেশেও যেতে পারেন না। এমন এক সংকট মুহূর্তে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান কবিবন্ধু নোবেল বিজয়ী জার্মান কবি গুন্টার গ্রাস। তিনি জার্মান সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত কবিকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ২২ শে জুলাই ১৯৮৭ এর কোনো এক ভোরে জার্মানির বার্লিনে গিয়ে পৌঁছান দাউদ হায়দার। জাতিসংঘের বিশেষ ‘ট্রাভেল ডকুমেন্টস’ নিয়ে দেশান্তরে ঘোরার সুযোগ পান। সেই থেকেই  কোনো পাসপোর্ট নেই তাঁর। জার্মানি যাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানের ‘ডয়েচে ভেলে’ রেডিও চ্যানেলের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক। তবে এক মুহূর্তের জন্যও পা ছোঁয়াতে পারেননি জন্মভূমির মাটিতে। দেশে ফেরার জন্য নিয়মিতই চোখের জল ঝরিয়েছেন। দেশান্তরী হওয়ার সেই গভীর বেদনার কথা লিখেছেন ‘তোমার কথা’ কবিতায়। ১৯৮৩ সালে কলকাতায় অবস্থানকালে:

“…মাঝে মাঝে মনে হয়

অসীম শূন্যের ভেতর উড়ে যাই।

মেঘের মতন ভেসে ভেসে, একবার

বাংলাদেশে ঘুরে আসি।

মনে হয়, মনুমেন্টের চূড়ায় উঠে

চিৎকার করে আকাশ ফাটিয়ে বলি:

দেখো, সীমান্তের ওইপাশে আমার ঘর

এইখানে আমি একা, ভীনদেশী।”

 দেশের জন্য কবির এই টান, এই মর্মবেদনা আরো বহু কবিতায় ফুটে উঠেছে। হৃদয় উজাড় করা আকুলতা ছত্রে ছত্রে প্রাণের আবেগে পাঠককেও স্পর্শ করে। ২২ বছর বয়সে তরুণ এই কবি বুকে প্রচণ্ড অভিমান আর প্রবল রক্তক্ষরণ নিয়ে ছেড়েছিলেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রিয় জন্মভূমি।     তিনি প্রায় ৩০টির মতো বই লিখেছেন জার্মান, হিন্দি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জাপানিজ ও স্প্যানিশ ভাষায়।এছাড়া সাপ্তাহিক ২০০০ এ প্রকাশিত হওয়া তাঁর আত্মজৈবনিক লেখা ‘সুতানটি সমাচার’ ২০০৭ সালে ধর্মীয় মুল্যবোধে আঘাত দেয়ার অভিযোগে সরকার বাজেয়াপ্ত করে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: সংগস অব ডেস্পায়ার (১৯৯২), এই শাওনে পরবাসে(১৯৮২),বানিশম্যান্ট (১৯৭৯),আমি পুড়েছি জ্বালা ও আগুনে (১৯৮২), এলোন ইন ডার্কনেস অ্যান্ড আদার পোয়েমস (১৯৭৮), হোল্ডিং অ্যান আফটারনুন অ্যান্ড আ লিথ্যাল ফায়ার আর্ম (১৯৮১)। এছাড়াও ‘অবসিডিয়ান’, ‘সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য’ বিষয়গুলি রয়েছে। আমেরিকান সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল পেন তাঁকে ‘বিশিষ্ট কবি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তৈমুর খান : কবি

আরও পড়ুন