ভালোবাসাকে ঘিরে বৃক্ষ রোপণ : শাহ সিকান্দার আহমদ শাকির

বৃক্ষ রোপণ যাঁর ধ্যানে, ভালোবাসায়। তিনি হলে সিলেটের বৃক্ষপ্রেমিক শাহ সিকান্দার আহমেদ শাকির। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় করেছেন লেখক মনোয়ার পারভেজ।
মনোয়ার পারভেজ: প্রায় ৩৫ হাজারের মতো গাছ রোপণ করেছেন। এই যাত্রাটা কিভাবে শুরু হয়েছিল আপনার?
শাহ সিকান্দার আহমেদ শাকির : আজ ৩৫ হাজার বৃক্ষ রোপণ হলেও, শুরুতে ভাবিনি এমন করে এতো বৃক্ষ রোপণ করতে পারব। শুরু ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বর্ষার কদম গাছ রোপণ দিয়ে। তখন এতো বৃক্ষ নিয়ে জ্ঞান ছিল না। দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে এখন বৃক্ষ রোপণে টুকটাক জ্ঞান ও বৃক্ষ সম্পর্কে বলতে পারি। ভালোবাসাকে ঘিরে বৃক্ষ রোপণ। কিন্তু আজ বৃক্ষের ভালোবাসায় নিজেকে বৃক্ষের কাছেই আপন করে তুলেছে।
ম. পা: এই ভালোবাসা বলতে কী এখানে বিশেষ কোনো কারণ ছিল? আর অন্যকিছু রেখে গাছেই কেন রোপণ করতে গিয়েছিলেন?
শা সি আ শা: বিশেষ কারণ বলতে, কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন ছিল সেদিন। আমি তাঁর একজন অনুরাগী বলতে পারেন। পাশাপাশি পছন্দের মানুষের জন্য বৃক্ষ রোপণ করে স্মরণ করে রাখা। পৃথিবীতে অনেক কিছুই চাওয়া-পাওয়া থাকে। কিন্তু আমার বৃক্ষ রোপণের প্রতি কেন জানি শৈশব থেকেই আগ্রহ ছিল। বৃক্ষের দেওয়ার চেষ্টা থাকে পরিবেশকে সুস্থ রাখতে। মা-বাবার প্রতি যেমন সন্তানের দায়িত্ব থাকে, তেমনি জন্মভূমির প্রতি কিছু দায় থাকে। সেই ঋণের কিছু অংশ পরিশোধের চেষ্টা। আর গাছ যে অক্সিজেন দিচ্ছে আমাদেরকে, সেটাযে এতটা মূল্যবান যা বুঝেছিলাম করোনার সেই সময়ে।
ম. পা: আমি যতটুকু জানি আপনি ব্যক্তিগতভাবে একাই এই কাজ করছেন। কোনো সংগঠন বা সংস্থার হয়ে নয়। বৃক্ষ রোপণ করতে গিয়ে কখনো কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন কি না? এবং আপনার পরিবার এটাকে কিভাবে দেখছে?
শা সি আ শা: জ্বি ঠিকই শুনেছেন। সাধারণত আমি একাই বৃক্ষ রোপণ করি। তবে মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গে এসে যুক্ত হোন কেউ কেউ। অথবা বিভিন্ন সংগঠন বা সংস্থার আমন্ত্রণ পেয়ে একজন সেচ্ছাসেবক হিসেবে গিয়ে তাদের সঙ্গে গাছ লাগিয়েছি। তারা গাছ নিয়ে আসলেও তা আমি নিজের হিসেবে যুক্ত করি না, তবে যত্ন নিয়ে থাকি সব বৃক্ষের। বৃক্ষ রোপণে বহু প্রতিবন্ধকতা এসেছে। বৃক্ষ রোপণ করি বলে অনেক মানুষকে দেখেছি আমাকে এড়িয়ে চলতে। মুখের ওপর বলতে শুনেছি, গাছ লাগিয়ে লাভ হবে না বা এসব আমার জায়গায় রোপণ করবেন না, নগদ লাভ হলে আসবেন। এমন অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু এখন বহু মানুষ আমার বৃক্ষ রোপণ নিয়ে কথা বলছেন, আমার সঙ্গে এসে রোপণ করছেন। এটা আনন্দের বিষয়। পরিবার এক সময় বহু কথাই শুনিয়েছে। বাড়তি টাকা খরচ হয় আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এটা অবশ্যই কষ্টের। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল জীবনের, গাছ রোপণের জন্য আপন বন্ধুর বা প্রিয় মানুষের দূরে সরে যাওয়া। কিন্তু বৃক্ষের মতোই আপন হয়ে প্রকৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে সহধর্মিণী। সত্যি বলতে এটা প্রকৃতিরই সেরা উপহার মনে হয়। এছাড়া বৃক্ষের ছায়ায় পেয়েছি হাজারও ভালোবাসার মানুষ।
ম. পা: আপনার বৈবাহিক জীবনের জন্য শুভ কামনা। আপনার স্ত্রী আপনার এই কাজকে কিভাবে দেখেন? এবং বর্তমান সংসার জীবনে এর কোনো প্রভাব আছে কি না? থাকলে সেটাকে সামাল দিচ্ছেন?
শা সি আ শা: এখানে আমার জন্য ভালোলাগার গল্প আছে। আমি স্ত্রীর পরিবার আমার এসব কার্যক্রম দেখেই আমাকে পছন্দ করেছিল। বৃক্ষ রোপণ নিয়ে তার কোন বাধা নেই। তবে মাঝেমধ্যে বাসায় ফিরতে একটু দেরি হলে বলবে, আজ নিশ্চয়ই গাছ রোপণ করতে গিয়েছিলে? আর অর্থনৈতিক যে চাপটা সেটা তাকে বুঝতে দেই না। একটু হিসাব করে চলতে হচ্ছে। তবে এক রকম না এক রকম হয়ে যাচ্ছে আরকি।
ম. পা: কিছু দিন আগে জাতীয় দৈনিক এদিন পত্রিকার সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে আপনাকে এই কাজের জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এর আগে কখনো এরকম সম্মাননা বা পদক পেয়েছেন কি না? যদি পেয়ে থাকেন এটা আপনাকে কিভাবে অনুভূত করে?
শা সি আ শা: জাতীয় দৈনিক এদিন পত্রিকার সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে, এই সম্মাননা প্রাপ্তি আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের এবং আনন্দের ছিল। পরিবেশ রক্ষায় এবং গাছ লাগানোর মতো একটি মহৎ কাজে যুক্ত থাকতে পারাটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। আর সেই কাজের স্বীকৃতি যখন কোনো প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম থেকে আসে, তখন তা আমার কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দেয়। আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, এর আগেও আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা পেয়েছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আমব্রেলা পরিবেশ প্রেমী অ্যাওয়ার্ড-২০২২। প্রতিটি সম্মাননা আমার কাছে ভিন্ন এক অনুভূতি নিয়ে আসে এবং আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়। আমি মনে করি, এই অর্জনগুলো কেবল আমার নয়। বরং আমি মনে করি এগুলো সেই সব মানুষের অর্জন, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করেছেন এবং আমার গাছ লাগানোর আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। এই ধরনের স্বীকৃতি আমাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করে। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের আরও অনেক কাজ বাকি আছে। প্রতিটি সম্মাননা আমার দায়িত্ববোধকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং আমাকে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার শক্তি যোগায়। বিশেষ করে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে সবুজ করে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে আমি কাজ শুরু করেছিলাম, এই সম্মাননাগুলো সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আমার জন্য বড় বড় অনুপ্রেরণার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
ম. পা: পদক ও সম্মাননা পেয়ে আপনার বক্তব্য কী ছিল?
শা সি আ শা: আমার এসব পাওয়ার ইচ্ছে থেকে বৃক্ষ রোপণ ও পরিবেশের হয়ে কথা বলতে চাই। বৃক্ষের প্রাণ বাঁচাতে চাই, সে আওয়াজ জনপ্রতিনিধির কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তাদের কাছে বৃক্ষ রক্ষা ও পরিবেশের যত্নের জন্য বিশেষ অনুরোধ করতে পেরেছি। যেগুলো এইরকম মুহুর্ত তৈরি না হলে হয়তো বলতে পারতাম না।
ম. পা: বৃক্ষ রোপণের অবিরাম ছুটে চলার এই যাত্রায় আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? কোনো ধরনের ফাউন্ডেশন বা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান কি না?
শা সি আ শা: আমরা পরিবারের সদস্যদের জন্য দৈনিক খাবার, দায়িত্ব এসব পালন করি পরিকল্পনা ছাড়া। বৃক্ষকে আমার সবচেয়ে আপন বন্ধু বলি, তার জন্য আমার পরিবারের মতোই দায়িত্ব ও পরিকল্পনা। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চেষ্টা করব বৃক্ষের পাশে থেকে বৃক্ষের যত্নে কাজ করতে। সংস্থা বা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছে আছে। যেখানে দেশীয় গাছ উৎপাদন ও গাছের চিকিৎসা হবে। সুস্থ পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে চর্চা করা জরুরি আমাদের। বর্তমান সময়ে বৃক্ষ ধ্বংস বা নিধন করা হচ্ছে। তার রক্ষার গুরুত্বের বিষয়ে জনসাধারণের প্রতি বার্তা দেওয়া, বসতবাড়িসহ সব জায়গায় গাছ কিভাবে রক্ষা করা যায়, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য।
ম. পা: সিলেটে আপনার বেড়ে উঠা। সিলেট ছাড়া দেশের আর কোথাও কী বৃক্ষ রোপণ করেছেন?
শা সি আ শা: সিলেট শহরে থাকার সুবাদে সিলেটে বৃক্ষ রোপণ করা হলেও, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে যাওয়া হয়েছে একটি হলেও বৃক্ষ রোপণের চেষ্টা করেছি। ঢাকায় একটা চাকরি সূত্রে কিছু দিন ছিলাম সেখানেও লাগিয়েছি। এছাড়া বলা যায় দেশের যেসব অঞ্চলে আমার যাওয়া হয়েছে, আমার বৃক্ষ রোপণের একটা ছাপ রেখে আসতে চেষ্টা করেছি।
ম. পা: বৃক্ষ রোপণ ও পরিবেশ রক্ষায় দেশবাসীর প্রতি আপনার বার্তা কী?
শা সি আ শা: আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে সবুজ ও বাসযোগ্য করে তোলা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। এটা আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। আমি গত কয়েক বছরে ৩৫,০০০-এর বেশি গাছ লাগানোর মাধ্যমে যে স্বপ্ন নিয়ে পথ চলছি, তা কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি একটি অঙ্গীকার—আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অক্সিজেন সমৃদ্ধ নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার। বাড়িতে একটি হলেও ফলের গাছ রাখতে অনুরোধ করছি, এখন বৃক্ষ রোপণের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষের বৃক্ষ রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে দেশীয় ফলের গাছ রোপণ ও রক্ষা করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। তাহলেই বৃক্ষ রোপণের প্রকৃত ফলাফল পাবে বাংলাদেশ।
অসংখ্য ধন্যবাদ
