শত কথার শত গল্প (প্রথম খণ্ড) বইয়ের সবগুলো গল্পই সেরা…

আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে প্রথমেই আছেন— ‘বনফুল’। তো একবার বনুফলের গল্পসমগ্র কিনলাম বাজার থেকে। প্রথমেই আমার মেজাজ চরমে ওঠল, বইয়ের সম্পাদক ১৪ পৃষ্ঠার ভূমিকা লিখেছেন! যেখানে বনফুলের প্রায় গল্পই এক, দেড় পাতার। তাও ভূমিকা পড়ায় মন দিলাম। মন ভালো হলো না। ইনিয়ে-বিনিয়ে বনফুলের লেখার প্রশংসা, কাটাছেঁড়া, আলোচনা, সমালোচনা। ধ্যাত্। শেষে কাচি দিয়ে ভূমিকাপাতাগুলো কেটে ফেলে দিলাম। এবার বইটাকে শুধুমাত্র বনফুলের বই বলে মনে হলো।

গল্পেও আমি প্রত্যাশা করি, মেদহীন গল্প। অযথা বাক্যচয়ন পাঠকের কাছে বিরক্তিকর। তবে এখানে কথা থাকে, দীর্ঘ উপন্যাসগুলোর বেলায় আমার এমন মনোভাব কি না? না। সুলেখকদের সুদীর্ঘ লেখা পড়া শেষে মনে মনে বলি, আরে এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল, আর কয়েকটা পাতা থাকলে কী হতো! আবার আমিও যখন কিছু লিখি তখন ইনিয়ে-বিনিয়ে শব্দের পর শব্দ, বাক্যের পর বাক্য দিয়ে পাতার পর পাতা ভরাতে পারি না। কেমন করে যেন লেখাটা দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। চাইলেও টেনে বড় করতে পারি না। ব্যাপারটায় আমার কোনো হাত নেই। গর্ভ থেকে একটা শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার মতোই ঘটনা হলো লেখকদের একটা লেখা লিখে শেষ করা।

দীর্ঘ ভূমিকার অবতারণা হেতু আমাদের প্রিয়জন আবু সাঈদ এর সৃষ্টি ‘শত কথার শত গল্প’ বইটার জন্যে। প্রথম যেদিন তিনি বললেন, ১০০ শব্দে গল্প লেখার আয়োজন করতে চাই, কেমন হবে? আমি লাফিয়ে উঠি। কারণ, বিষয়টা আমার পছন্দ সই ছিল। একবাক্যে রাজি হই। তবে আরো যাদের কাছে আমি লেখা চাইতে গেছি, তারা সবাই চোখ কপালে তুলে বলেছে, ১০০ শব্দে গল্প? অনেকে ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে গেছে। তাই বলে কী স্বপ্ন থেমে ছিল। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি লেখা এসে জমা হয়েছে। শেষ অবধি সাঈদ ভাইয়ের কাজটি যে সফল ও সুন্দর হয়েছে তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

গল্পগুলো বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার আগে রাত জেগে পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এক একটি গল্প পড়ছি আর বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছি। আরে বাস্ এ তো এক একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের গল্প যেন! কী করে সম্ভব? এ চর্চা কী তাদের আগে ছিল? গল্পগুলো আমার সঙ্গে আরো একজন পড়েছিল, তরুণ কবি ও গীতিকার ইকবাল রাশেদ। শেষে আমরা দুজন গল্পগুলো নিজের পছন্দ সই নম্বর দিয়েছিলাম। কোনোটাতে আমি যদি ১০ এর ১০ দিয়েছি, ইকবাল দিত ৯। এভাবে প্রথম রাতটা আমাদের ভোর হয়েছিল। উত্তেজনায় বইটি প্রকাশের অপেক্ষা করেছি।

প্রথমেই পড়েছিলাম— ‘মুখোশটি খসে পড়ার পর’ গল্পটি। পড়েই চমকে উঠেছি— আরে! ভালোই ত লিখছে।

দ্বিতীয় পড়েছি আবু সাঈদের ‘অনুভবে জেনেছিলেম’। বরাবরের মতো মুগ্ধময়।

‘অঞ্জলী’ গল্পটাও বেশ। সুন্দর।

‘প্রাক্তন’ গল্পটাও বেশ সিনেমাটিক। ভালো।

‘হারান জ্যোতিষী’ বেশ উপভোগ্য। জমজমাট।

‘৬০ টাকার গল্প’ আমার কাছে সেরা ছিল।

‘হাবু ডাক্তার’ বেশ মনে ধরেছিল। গল্পে গল্প ছিল খুব।

‘ঘড়ি’ গল্পের আকাশে চিরদিন টিক টিক করবে।

‘ভুল’ গল্পটা রোমান্টিক। ভালো।

‘মাথা’ — ওহ্ কী চমৎকার আইডিয়া গল্পকারের মাথা থেকে বের হয়েছে। দারুণ।

নুরুন আখতারের ‘পুরষ্কার’ বাস্তবিক গল্প।

আহ্ ‘প্রজাপতি’ গল্পটায় মন যেমন খারাপ হয়েছিল, তেমিন শেষে একটু মন ভালো করে দিল গল্পটা।

দমবন্ধ করা গল্প ‘হাসি’। কী নিদারুন বাস্তবতা। হায়।

মৌসুমী রহমানের ‘ফুকলি’। ফুকলিদের জয় হোক প্রতিবার।

‘লাশ’ গল্পটা আমাদের মায়েদের। আমাদের মায়েরা চিরদিন এমনই।

‘রাতের গান’ সুন্দর গল্প। ভালোলাগারও।

‘মুমুর সকাল’ গল্পটা আমি চাইছি— মুমুরা যেন প্রতিদিন একটি নির্ভার নতুন সকাল পায় নিজেদের মতো করে।

‘একদা বাসররাতে’। হি হি হি। মজার ছিল গল্পটা।

ফাটাফাটি গল্প ‘শব্দ’। আমি মুগ্ধ। প্রিয় তালিকায় থাকবে। সিম্পলি অসাধারণ।

শহরের গল্প ‘দুই বারান্দার গল্প’। বেশ। ‘উপলব্ধি’ এ সময়ে চিত্র। এভাবেই হোক উপলব্ধি।

আচ্ছা, শেষ একটা কথা বলি, শোনেন— প্রতিটি গল্পই সেরা। একটি গল্প বাদে। ব্যস। প্রশ্ন, সেই একটি গল্প খুঁজে বের করা ভার পাঠকের ওপর ছেড়েছিলাম।

অসাধারণ প্রচ্ছদের জন্য তুলি ভাইকে— নো থ্যাঙ্কস। হা হা।

প্রিয় লেখক, প্রিয় মানুষ, শব্দ সৈনিক আখতার হুসেন ভাইয়ের মুখবন্ধের জন্য কৃতজ্ঞতা।

বইটির কাগজ, ছাপা, বাঁধাই অতি সুন্দর। সে তুলনায় বইটি দাম কম কেন? যাতে পাঠক বইটি সহজে নিজের করে নিতে পারে। ১০০ টাকায় এমন একটি বই সত্যি অবিশ্বাস্য। হে পাঠক, বই কেন কিনবেন না? পড়বেন না? অবশ্যই কিনবেন। অবশ্যই পড়বেন।

সবশেষে একটি কোটি টাকার প্রশ্ন রেখে বিদায় নিচ্ছি— বইয়ের ১০০জন লেখকের ১০০টি গল্প ছাপা হয়েছে, এই সবাই কী সবার গল্প পড়েছেন? যদি পড়ে থাকেন তাহলে ধন্যবাদ। আর যদি এখনো না-পড়ে থাকেন, তাহলে পড়ে ফেলুন। অগ্রিম কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ। শুভ হোক সবার।

আরও পড়ুন