ডানা ভাঙা সাইকেল—প্রকৃতির ঘ্রাণমাখা শৈশবের ইতিকথা

‘ডানা ভাঙা সাইকেল’ নামটা অদ্ভূত না? অদ্ভুত হলেও সুন্দর না নামটা? এবার বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপটা পড়েন। প্লিজ এইটুকু পড়েন। এবার বলেন, অদ্ভুত না?
জ্বি, লেখক মাসুম বিল্লাহ মানুষটাও অদ্ভুত রকমের সুন্দর৷ ভেতরে বাহিরে অদ্ভুত সুন্দর। এবার উপরের বাক্যগুলো একটা সুতায় গাঁথি—একটা নাম সুন্দর, ফ্ল্যাপটাও ভিন্নরকম রুচির। পড়লে মনে হয় কিছু আন্দাজ করতে পারছি। তবে আরো কি যেন বুঝতে, জানতে বাকি আছে। সুতরাং পড়ি, পড়তে হবে।
আর মানুষটাও যেহেতু ভেতরে বাহিরে অদ্ভুত এবং সুন্দর, তাহলে তার সৃষ্টিটাও রুচিশীল এবং ভিন্নরকম সুন্দর—সে তো জানা কথা। মাসুম ভাইয়ের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার লেখার মান; সাথে সাথে তার বইয়ের, কাগজের এবং মলাটসহ অন্যান্য বিষয়গুলোতে রুচির সমন্বয়। ওহ্ আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বইটা প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ বইমেলার ২৯ ফেব্রুয়ারি, মানে মেলার শেষদিনের শেষ বিকেলে; একেবারে চুপিসারে।
বইয়ের পাতা উল্টালেই টের পাওয়া যায় এর ভেতরের ভিন্নতা। মেলার শেষ বিকেলে চুপিসারে আসা এই বইটি নিয়ে তাই পাঠকের কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। চলুন, একনজরে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক বইটির ভেতরে থাকা গল্পগুলোর ভুবনে—
কিশোর গল্প পড়তে গেলে মনটাকে কিশোর করে তৈরি করতে হয়। পড়তে হয় জানতে, পড়তে হয় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে কী তুলে দিচ্ছি বা কী তুলে দেওয়া উচিত তা বোঝার জন্য হলেও অন্তত। আর লেখককে হতে হয় একজন কিশোর, অথবা মিশে যেতে হয় অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কিশোর সম্প্রদায়ের সাথে।
কিছু বই থাকে যা কিনা কোনো বয়সের জন্য আলাদা হতে পারে না বিভিন্ন কারণে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটা হলো—বিন্দুর মাঝেও যে সিন্ধু থাকে। অনেক কিছু শিক্ষণীয় থাকে যা বড় বড় বইয়ের ভিড়ে আমরা জীবনের জন্য এসব সূক্ষ্ণ গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো খুঁজতে যাই না, খুঁজে পাই না। তেমনি একটা বই মাসুম বিল্লাহ’র ‘ডানা ভাঙ্গা সাইকেল’।
বইয়ের প্রথমেই “এলিয়েন বিহানের কলম” দারুণ এক শিক্ষা দিয়ে যায় মানব সম্প্রদায়কে। যা কি’না শৈশব থেকেই শিখে নেওয়া দরকার। তাহলে বিশ্বাস আর বাস্তবতার মিল খুঁজতে গিয়ে দিকভ্রান্ত হতে হবে না।
“ফুলবন্ধু” গল্পে ফুলটিও জেগে ওঠে, প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পায় তার বিপরীত জীবন-যাত্রার প্রভাব থেকে বের হওয়ার কথা শুনেই। মানুষের জীবনও ফুলবন্ধুর মত পরিবেশ আশা করে অনেক সময় অজান্তেই।
“লেখক ও একটি মশার গল্প”-তে কখন যে একটা গল্প শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত এক চমৎকার আখ্যানে রূপ নেয়, তা লেখকের সূক্ষ্ণ নিপুণতায় টেরই পাবেন না।
“নারিকেল গাছটি হাঁটতে পারে”—এই গল্পের নাম দেখেই মনে হবে এক্ষুনি পড়ে ফেলি। প্রথমে কেবল ফাহিমের কিশোর ভাবনা ভেবেছিলাম, কিন্তু না…
“পাখিবাড়ি”—সেটা কি পাখির বাড়ি? তাহলে তো পাখির বাসা বলা যেতো। তাহলে কি পাখিরা একটা বাড়ি দখল করে নিলো? এমন অবাস্তব গল্প!! এসব না ভেবে পড়ে নিলেই বেশ হবে। কী করে কোমল কিছু ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে আমূল বদলে যায় সব কিছু।
“তুরিনের প্রিয় পতাকা” নামেই বোঝা যায় এর ভেতরে কী থাকতে পারে। তবে পতাকার প্রতি ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত কীভাবে প্রকাশ পায়? তুরিন কি তার পতাকা নিয়ে উচ্ছ্বাসের চূড়ায় উড়তে পারে?
“দাদুর ডায়েরী”-তে কী আছে? দাদুর ডায়েরী কী করে পেলো? কে ছিল দাদু? অবাক হয় কেন দাদুর ডায়েরী পড়ে? দাদুর মত সবাই চায় এমন করে। আমি চাই, আপনি চান। অবশ্য এমন চাওয়াগুলো এমন হলে কেন পাগল ভাবে?
“সোনার ছেলে”—ছেলে হওয়ার শিক্ষাটা পরিবার থেকে আসে। সোনার ছেলে হিসেবে সবার সন্তানকে গড়ে তুলতে এমন সব ছোট ছোট শিক্ষা এবং নৈতিক শিক্ষা চাই। গল্পে কী করে সোনার ছেলে হলো ছেলেটি…? জানতে পড়ুন…
“পাখিরাও খাঁচায় মানুষের বাচ্চা পোষবে”—কী দারুণ গল্পের শিরোনাম! জ্বি, পুষবেই। পুষতে বাধ্য হবে। এসব প্রকৃতির বিচার। প্রকৃতি করোনায় যেমন নিজের মাধুর্য্যে মেতেছে, তেমনি এমন অনেক পরিবর্তন গল্পের মত করে আসতেই পারে।
“তিতি ও একটি কুকুর”—গল্পটা কী? একটা কুকুর পুষে তিতি—এমন মনে হচ্ছে না? কিন্তু মোটেও তা না। এটা একটা সম্প্রদায়ের গল্প। সৃষ্টির প্রতি এক সহানুভূতির গল্প।
“ডানা ভাঙ্গা সাইকেল”—সাইকেলের আবার ডানা! সেই ডানা আবার ভাঙা! সরল গল্পও বলা যায়, আবার রূপকও বলা যায়। সজীবের সাইকেলের ডানাতো ভেঙে গেছে অনেক আগেই। নতুন করে তা কেবলই বুঝতে পারা। সজীবদের সাইকেলের ডানা যেন না ভাঙ্গে। হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে যেন উড়ে চলতে পারে… এই চাওয়াটা হোক সবার…
বইয়ের সবগুলো গল্পেই শিশু-কিশোরদের জন্য কোমলতা আছে। সেখানে প্রকৃতির সব উপাদান কথা বলে যায়—একেকবার একেক নামে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সাথে। প্রকৃতি সে তো জীবন্ত। তার সব কিছুর-ই জীবন আছে। যাদের জীবন আছে, তাদের ভাব প্রকাশের ভাষাও আছে। সেই ভাষা প্রকৃতির আরেক অপার সৌন্দর্য্য, যা শিশু-কিশোররা তো খুব সহজেই বুঝবে।
সেই ভাষা লেখায় রূপ পেলো কিশোর মাসুম বিল্লাহ’র কলম ধরে। সকলের জন্য সুপাঠ্য এই বইটি পড়লে পাঠকের তৃপ্তি মিলবে গল্পগুলোতে। একটুও সময় নষ্ট হবে না মেদহীন এই গল্পগুলো পড়ে।
এই বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন—এত সব অদ্ভুত এবং সুন্দরকে একই সূত্রে মলাটবন্দী করার কারিগর লেখকের সাথে।
বই পড়ুন। বই পড়ে সমৃদ্ধ হোন।
কিশোর গল্পগ্রন্থ: ডানা ভাঙ্গা সাইকেল
লেখক: মাসুম বিল্লাহ
প্রথম প্রকাশ: ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রকাশনা: ম
প্রচ্ছদ: নাইমুর রহমান মাহি
প্রচ্ছদমূল্য: ২০০ টাকা
