মানুষের বহুমাত্রিক সৃজনশীল চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে

লেখক, শিক্ষক ও প্রকাশক খান মাহবুব। ১৯৭১ সালে ৩ মে নানাবাড়ি টাঙ্গাইলের করাতিপাড়ার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন সংস্কৃতিমনস্ক অনুসন্ধিৎসু মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন পলল প্রকাশনী। তাঁর উল্লেখযোগ্যগ্রন্থ: বইমেলা ও বই সংস্কৃতি, বই, বইমেলা ও প্রকাশনার কথকতা, গ্রন্থ চিন্তন, টাঙ্গাইল জেলা পরিচিতি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ’ বিভাগ চালুর অন্যতম উদ্যোগী। বর্তমানে ওই বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বইপড়া, প্রকাশনা ও প্রকাশনাবিষয়ক শিক্ষকতা নিয়ে কথা বলেন বইচারিতার সম্পাদক আবু সাঈদ।
আবু সাঈদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন প্রকাশনাবিষয়ক বিভাগ চালু করা হলো?
খান মাহবুব: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনাবিষয়ক বিভাগ হুট করে চালু হয়নি। এটা আসলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। আমাদের দেশে প্রকাশনার দিকে যদি একটু ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব ১৯৪৭ সালে দেশভাগ, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি জাতির বড় একটি বিপ্লব হয়ে যায়। তখন আমরা দেখলাম এখানে প্রকাশনাগুলো একটু একটু করে পাখা মেলে দাঁড়াচ্ছে। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে ৩ ডিসেম্বর। এরপর কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। এরসঙ্গে ঢাকায় যেসব সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা: নওরোজ কিতাবিস্তান, মাওলা ব্রাদার্স, আহমেদ পাবলিকেশন হাউস এই রকম আরও অনেক প্রতিষ্ঠান হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আজও টিকে আছে। ব্যবসা করতে গেলে যে কাঠামোগত পদ্ধতি লাগে তা আমাদের ছিল না। ব্যবসা শুধু সোশ্যাল মোটিভ অবজেক্টিভ নিয়ে চলে হয় না। লাভ ক্ষতির বিশ্লেষণ করে টিকতে হয়। সেই বিচারটা ছিল না বলে আমরা সেখানে পেশাগত ছিলাম না। এই পেশাগত হওয়ার জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা বিশ্বায়ন যা- বলেন এতে কিন্তু মানুষের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
আমরা প্রতিবেশি রাষ্ট্রদের দেখতে পাই, বিশেষ করে এশিয়ার সিঙ্গাপুর, হংকং এসব জায়গায় কিন্তু প্রকাশনা শিল্পটা অনেক বড় হয়ে ওঠেছে। সেখানে রীতিমতো এটা নিয়ে গবেষণা করা হয়। পড়াশোনা করে এই সেক্টরে মানুষ কাজ করে।

কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনাবিষয়ক পাঠদানের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে আমরা পাঠদানের জন্য চেষ্টা করলাম। এতে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা সেটাকে ভালোভাবে গ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় এটি বাস্তবায়নের জন্য যাবতীয় কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়।
আমাদের প্রকাশনা যাঁরা করেন, তাঁরা আসলে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে করেন, তা আবেগ দিয়ে বাস্তবায়ন করেন, অনেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই পেশায় আসেন। তাঁদের যথার্থ তাত্ত্বিক জ্ঞান তুলনামূলক কম থাকে। আমরা যদি তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাকে সম্মিলিত করি, তাহলে প্রকাশনার পেশাগত উন্নতি হবে। আমরা যে সমস্যাটা এখন পড়েছি, আমাদের প্রকাশনা পেশায় আশানুরূপভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। আমরা অনেকেই মনে করি, এককভাবে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যাবে, এই ধারণাটি আসলে পেশাগতভাবে সঠিক নয়।
এককভাবে কোনো পেশায় দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য একটি পরম্পরা প্রয়োজন। এমন একটি রাস্তা তৈরি করতে হবে, তার জন্য প্রকাশনাবিষয়ক পড়াশোনা জরুরি। এই ভাবনা থেকে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশনাবিষয়ক বিভাগ চালু করি।

প্রকাশনায় মোটাদাগে দেখতে পাই, তিন ধরনের কাজ। যথা: প্রিপ্রেস, প্রেস এবং পোস্ট প্রেস।
লেখা মস্তিষ্কে থাকলে সেটা পাণ্ডুলিপি হয় না। তা হাতে বা কম্পিউটারে কম্পাজ করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হয়। আমরা দেখি, কবি জীবনানন্দ দাশের পাণ্ডুলিপিগুলো মস্তিষ্কে থাকত, তাহলে কি আমরা তাঁর কোনো লেখা পেতাম? যখন বুদ্ধদেব বসু কলকাতা থেকে বরিশালে জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে আসেন তখন তিনি দেখতে পান ট্রাঙ্ক ভরা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। কবি জীবনানন্দ দাশ যদি পাণ্ডুলিপিগুলো এভাবে রেখে না যেতেন তাহলে আমরা জীবনানন্দ দাশের এত লেখা পেতাম না।
মূলত, পাণ্ডুলিপি প্রকাশনার মাধ্যমে দ্যুতি ছড়ায়। দ্যুতি ছড়ানোর ক্ষেত্রে আরও অনেকগুলো বিষয় জড়িত, অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘আমার পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার মাধ্যমে উন্নত হয়।’এমন ধরনের উন্নত ব্যবস্থার ফলে পাণ্ডুলিপিকে পাঠকের কাছে পঠনযোগ্য করা হয়, সেটা আবেগ দিয়ে নয়, তা হতে হয় একটি কাঠামো বা পদ্ধতির মাধ্যমে।
উন্নত পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার পর সেটি বই আকারের প্রকাশিত হয়। তারপর সেই বই বাজারজাতকরণ করা হয়। এই বিষয়টিকে একীভূত করার জন্য তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞান জানার প্রয়োজন।
২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং স্টাডিজ (মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন) বিভাগে দুই বছরের মাস্টার্সকোর্স চালু হয়। এর কিছুদিন পর শুরু হয় অনার্স। এটি সমাজবিজ্ঞান অনুষদভুক্ত।

প্র: যারা পাস করে বের হয়েছে, তারা এই বিষয়ে কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত আছে কিনা?
উ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে শিক্ষার্থীদের সাধারণত কর্মক্ষেত্রে যায় না, শিক্ষার্থীরা অনেকেই মাস্টার্সে ভর্তি হয়। এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সাধারণ প্রচলন। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে যায়। আবার কেউ কেউ চাকরিতে যুক্ত হয়। এই বিষয়টি যেহেতু নতুন, আমাদের দেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনায় যথাযথ কর্মক্ষেত্র এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে কিছু কিছু প্রকাশনীতে বিষয়টি গুরুত্ব বাড়ছে। সেখানে এখন অনেকেই কাজ করছেন।
প্র: প্রকাশনা ও শিক্ষাকতায় এই দুয়ের অভিজ্ঞতা বলবেন?
উ: প্রকাশনাতে যুক্ত হওয়ার জন্য বেশ কিছু বিষয় কাজ করেছে। আমার নিজ জেলা টাঙ্গাইল। সেখানে আমি যখন জিলা স্কুলে পড়তাম, তখন অনেক সংস্কৃতি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নানা ধরনের সামাজিক সংগঠনে কাজ করি। আমাদের স্কুলের স্মরণিকা মুকুলিকা ও ক্লাব নবারুণ, অভিযাত্রী, অগ্রদূতগুলোতে সক্রিয় ছিলাম। মুকুলিকায় লেখা প্রকাশের মাধ্যমে নিজের ভেতরে লেখকসত্তা জেগে ওঠে। লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বির্তক, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। জেলা শহর, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যাযে অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে পুরস্কৃত হই। এসব কর্মযজ্ঞের কারণে পরবর্তীকালে প্রকাশনায় আসার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
প্রকাশনা থেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো তখন আরও ভালো লাগে। মানুষের জীবনে কিছু বিষয় থাকার দরকার, যা আনন্দ দিবে, আনন্দের মাধ্যমে সৃজনশীল কাজ করতে পারবে। কাজের সঙ্গে যদি মানুষের একাগ্রহ করতে না পারে কিংবা কাজটাকে যদি অনুভব করতে না পারে, তবে সৃজনও হবে না। আর কাজ করতে গেলে অনেক সময় ভুল হবে, ভুল কাজের একটি অংশ। শিক্ষকতা একটি স্বাধীন পেশা। ক্লাসে যখন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ায়, তখন এক ধরনের প্রশান্তি আসে। সেই হিসেবে চেষ্টা করি, বিভাগে প্রকাশনাবিষয়ক বিভিন্নজনকে এনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটা যোগসুত্র তৈরি করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি রেওয়াজ আছে, কোনো বিভাগে বা নতুন বিভাগ চালু হলে সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক না থাকলে জাতীয়তাভাবে যাঁরা স্বীকৃত, সেই বিভাগের যোগ্য মনে করেন, তাঁদেরকে একজান্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে যুক্ত করা হয়। সেভাবে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে আমাকেসহ আর ২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

প্র: আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে শিক্ষকতা করেন, নিজের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে, বইপড়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেন—এতে কি আপনি দেখতে পান সামাজিক মাধ্যমের কারণে বইপড়া থেকে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে?
উ: এই কথাটির উত্তর আসলে এক বাক্যে বলা খুব কঠিন, তবে এতটুকু বলা যায়, এটার একটা পরিবর্তন এসেছে। এটার ইতিবাচক দিক হলো আপনি যদি ষাটের দশকে তাকান, দেখতে পারবেন বাঙালি মধ্যবিত্তের বসার ঘরের বইগুলো ছিল তাদের আভিজাত্যের অংশ। মধ্যবিত্ত বাড়িতে যেমন একাংশ বাগান ছিল। জুঁই, জবা, কামিনী, কেয়া যেমন ছিল, তেমনি বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন পাখির কলবর। এগুলো এখন হারিয়ে গেছে। সংস্কৃতির বন্ধনটাও তেমন চোখে পড়ে না। আপনি জেনে অবাক হবেন, গত শতকের পরিবর্তনগুলো মাত্র একদশকে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন বস্তুবাদী হচ্ছে। মানুষের ভেতরে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা কাজ করছে। নগরের ফ্ল্যাটসংস্কৃতি মানুষের মধ্যে হৃদয়ের উষ্ণতা ও যোগাযোগ একেবারে কমে গেছে। আগের জেলা শহরগুলোতে যেভাবে বিভিন্ন সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত এখন আর সেইভাবে দেখা যায় না।
মানুষ এত বেশি বস্তুবাদী হয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা থেকে সরে যাচ্ছে। আমাদের স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার হাফক্লাস হতো, বাকি সময়টা আমাদের সৃজনশীল কাজের জন্য দেওয়া হতো। এখন আর সেই সময়গুলো আর নেই। এখন শুধু ছেলে মেয়েদের দেওয়া হয় পাঠ্যবইয়ের বোঝা আর সারাক্ষণ কোচিং।
প্র: এর জন্য কে কতটুকু দায়ী?
উ: দুটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে দায়ী। এক, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। কারণ আমাদের বোঝানো হয় উন্নয়ন মানে ইট, বালু, পাথর রাস্তাঘাট ইত্যাদি। আপনি যদি দেখেন, আমাদের দেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট ০.৯% অর্থাৎ যেটা ১%-এরও কম। আর এত কম বাজেট প্রায় ১৮টি দপ্তর চলে। বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থগার কেন্দ্রসহ এমন ১৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে সরকারিভাবে পাঁচ কোটি টাকার বই ক্রয় করা হয় না। অথচ, ট্রাস্টেড খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট থাকে। দেশে বড় বড় শপিং মল হচ্ছে, সেগুলো কি কোনো বইয়ের কর্নার রাখা হয়? এর ফলে প্রতিযোগিতায় বই বাজার পিছিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়টি পরিবারকে দায়ী করব। পরিবার থেকে বইপড়ার সংস্কৃতি সরে যাচ্ছে। এখনকার পরিবারগুলোতে শিক্ষা দেওয়া হয়, জিপিএ-৫ পাওয়া, ভালো ফলাফল করা। কিন্তু আমরা তাদের শেখাই না ভালো একজন মানবিক মানুষ হওয়ার। এর কারণ আমরা চিন্তা করি সামাজিক নিরাপত্তার কথা। তাই আমরা এখনো কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণায় যেতে পারিনি। আমাদের রাষ্ট্র এখনও সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়নি। তাই আমাদের চিন্তার করতে হয় আর্থিক উন্নয়নের জন্য, তখন মনের খোরাকের কথা ভাবনা সুযোগ থাকে না।

প্র: আমরা আগে দেখতাম বাসায় অনেকগুলো বই থাকত, আমরা অনায়াসে একটি বই ধরে পড়তাম কিন্তু এখনকার যে ছেলে-মেয়েরা তারা প্রথমে মোবাইল ধরে, গেম খেলতে শুরু করে। তারা কিন্তু বইয়ের যে জায়গাটা ধরতে পারছে না। জিপিএ-৫ পাওয়া বা বিসিএস করার জন্য লাইব্রেরিগুলোতে ভিড় জমছে, সেখানে মুখস্থবিদ্যা ছাড়া সৃজনশীল বই পড়ার জায়গাটা খুব দুর্বল—এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
উ: গত তিন বছরে বেশ কিছু লাইব্রেরি প্রদর্শন করেছি, সেখানকার দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাদের অভিযোগ হলো—বিসিএসের গাইড বই কেন পাঠাগারে পাওয়া যায় না। কিন্তু তাদের বোঝাতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি যে পাঠাগার হলো গণবিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্কৃতির আশ্রয়স্থল। ওখানে যোগাযোগ হবে মানুষের সঙ্গে মানুষের ও বিভিন্ন বইয়ের সঙ্গে। কোনো ধরনের গাইড বা পরীক্ষায় পাস করার জন্য বা চাকরির পরীক্ষায় এগিয়ে থাকার জন্য এই পাঠাগারগুলো গড়ে ওঠেনি।
প্র: আপনি তো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক বইমেলা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুদ্রণ বা প্রকাশনা বিষয়ে যেভাবে পড়ানো হয়, সেই কারিকুলামের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের কারিকুলাম কতটুকু সম্পৃক্ততা আছে?
উ: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয় সম্পৃক্ততা আছে, তবে দুরত্বও আছে। কারণ আমরা ব্যবহারিক দিক থেকে পিছিয়ে। যেমন আমরা এখন থ্রিডি প্রিন্টিংয়ে বিষয়ে জানি! থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে দুবাইয়ে পৌরভবন, মসজিদ নির্মাণ হয়েছে। আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে তাদের ২৫% অবকাঠামো থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যেমে হবে। কাজেই আমরা সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে পিছিয়ে।

উন্নত বিশ্বে বইমেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয় বই বিক্রির জন্য নয়, মূলত সারা বছরের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে তারা সেটাকে বেছে নেয়। কারণ বইমেলার মাধ্যমে যোগাযোগের স্থাপন করে। যার ফলে সারা বছর বইয়ের প্রচার হয়। মোটকথা, বলতে পারি—উন্নত বিশ্বে বইমেলায় বিক্রি ও প্রদর্শনী দুইটাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আর আমাদের অমর একুশে বইমেলা দেখি কতগুলো বই বিক্রি হলো। কত টাকার ব্যবসা হলো। গুণগত বিবেচনা না করে মূল দৃষ্টি থাকে ব্যবসার দিকে। আমরা ফ্রাঙ্কফুট বইমেলায় দেখি সেখানে লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের যোগাযোগ এবং কপিরাইট হস্তান্তর করতে। ওখানে কিন্তু বই বিক্রি হয় না। আর আমাদের দেশে উল্টোটা, আমরা বই উৎপাদন করি, মেলার মধ্যে সিংহভাগ বিক্রির জন্য। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আমাদের মধ্যে বড় পার্থক্য।
প্র: আপনি তো বইপড়া, প্রকাশনার অনেক সমস্যার কথা বলেন, আপনাকে যদি বলি, এর সমাধানের উপায় বের করেন, তখন আপনি কী করবেন?
উ: এই সমস্যা তো আর প্রেসক্রিপশনে দেওয়ার মতো না। ‘ইটস্ ইজি টু সে হার্ড টু ডু’। একটা জিনিস তাত্ত্বিকভাবে যত বলা সহজ, বাস্তবে করে দেখানো ততই কঠিন। তবে আমি মনে করি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা সবার আগে বদলাতে হবে। যেটা আমি সব সময়ে বলে এসেছি, ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, সমাজ বদলে যাবে।’ আমি আসলে আমার এবং আমার চারপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চাই। আমি চাই, যাঁরা বই নিয়ে কাজ করেন, বই পড়ে তাদেরকে মানুষ একটু হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে দেখুক, আত্মীয়তার বন্ধনে অনুভব করুক।
একটা মানুষ পড়াশোনা জানে, তাঁকে যেন তাঁর প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া হয়। এই যে এখনকার ছেলে-মেয়েরা জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য মরিয়া। অভিভাবকেরা আউট বই পেলে ছুঁড়ে মেরে বলে ‘কী পড়ছো তুমি এটা’ এখনকার একজন লেখকের চেয়ে একজন বিসিএস ক্যাডারের অনেক দাম। আমাদের স্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে এখন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। এরমধ্যে থিতু হলে চলবে না। মানুষের বহুমাত্রিক সৃজনশীল চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ উন্নত ও ভেদহীন ব্যবস্থা গড়ে ওঠবে। এটা আমাদের আরধ্য হওয়া উচিত। আমিও সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
