স্বাধীনতার দ্রষ্টা ও স্রষ্টা মওলানা ভাসানী

মওলানা আবদুল হামিদ খান মারা গেছেন ১৯৭৬ সালে। আরো অনেকে মারা গেছেন। তাঁদের সম্পর্কে মানুষ মনে করে না যে তাঁরা বেঁচে থাকলে ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু মওলানা ভাসানী সম্পর্কে মানুষ মনে করে তিনি বেঁচে থাকলে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারতেন, তাঁর বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিল। এ একটা তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার যা মওলানা ভাসানীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।

মওলানা ভাসানী সিরাজগঞ্জ শহরের সন্নিকটে রহমতগঞ্জের (ফুলবাড়ী) সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবার শহরে জুতোর দোকান ছিল। তাঁর পরিবারে কেউ উচ্চশিক্ষাও লাভ করেননি। তিনি সাধারণ ছেলেদের মতো মক্তব ও স্কুলে লেখাপড়া করা অবস্থায় তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যু এবং আত্মীয়স্বজনের উদাসীনতা দুর্দান্ত বালকটিকে বাড়িছাড়া হতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু তাঁর বাবা ব্যবসায় উপলক্ষে কোলকাতায় অসুস্থ হয়ে এক হেকিমের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। এই হেকিম একবার সিরাজগঞ্জে ভাসানীদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত বালক ভাসানী তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি ভাসানীর বাবার কাছে সেই ছেলেটিকে লেখাপড়া করাবেন বলে চেয়েছিলেন। ভাসানীর পিতা সানন্দে তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিলেন। এর অল্প কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই খবর পাওয়ার কিছুদিন পর হেকিম সাহেব রহমতগঞ্জে গেলে জানতে পারেন যে পিতার মৃত্যুর দু-এক মাস পর ভাসানী (চেগা মিয়া) একটি যাত্রাদলে ভুক্ত হয়ে গৃহত্যাগ করেছে। হেকিম সাহেব ভাসানীকে খুঁজে আনার জন্য লোক পাঠালেন এবং নিজে ভাসানীর প্রতীক্ষায় রহমতগঞ্জে (ফুলবাড়ী) অবস্থান করতে থাকলেন। ভাসানী রহমতগঞ্জে ফিরে এলে তিনি তাঁকে তাঁর পিতার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভাসানীকে তাঁর সাথে কোলকাতা যাওয়ার কথা বললেন। বালক ভাসানী হেকিম সাহেবের সঙ্গে যেতে সম্মতি জানালেন।

হেকিম সাহেব নিজে ভাসানীর শিক্ষক হলেন। সুযোগ্য শিক্ষকের হাতে বুদ্ধিমান বালক আরবী ফার্সি ও উর্দুভাষা শিক্ষালাভ করে কোরান সমাপ্ত করলেন। লেখাপড়ায় সন্তুষ্ট শিক্ষক তাঁকে বিখ্যাত শাহ ওয়ালিউল্লাহর তফসিরে কোরান আয়ত্তের জন্য বিখ্যাত ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র দেওবন্দে দশ বছর লেখাপড়ার জন্য পাঠালেন। কৃষকের ছেলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরের পৃথিবীতে পা বাড়ালো। শাহ ওয়ালিউল্লাহর কোরানের তফসির আয়ত্ত করতে নির্ধারিত সময়কাল দশ বছর। অসাধারণ মেধাবী বাঙ্গালী কৃষক সন্তান তা সমাপ্ত করলেন সাত বছরে। এটা দেওবন্দ বিদ্যাপীঠের বিরল ঘটনা।

কোলকাতার হেকিম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মতাদর্শিক ঘরানার বাংলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা। তাঁর ও দেওবন্দের শিক্ষকদের এক দশকের সাহচর্য যুবক ভাসানীকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লবীতে পরিণত করেছিল। সেখানকার সকল পরীক্ষাত্তীর্ণ ভাসানীকে পাঠানো হলো খেলাফত আন্দোলনকারীদের সাথে কাজ করতে। কিন্তু খেলাফত আন্দোলন স্বল্পকাল স্থায়ী হওয়ায় ভাসানীকে পাঠানো হলো কংগ্রেসে কাজ করতে। খেলাফত আন্দোলনকালে ভাসানীর, যাঁকে এখন তাঁর বিদ্যার কারণে মওলানা বলতে হবে, অনেক জ্ঞানীগুণী সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল। কংগ্রেসে কাজের সময় তিনি যাঁদের কথা আমাদের অহরহ বলতেন সেই সব মহান নেতাদের সাথে কাজ করার ও পরিচিত হওয়ার অসাধারণ সৌভাগ্য ও সুযোগ হয়েছিল। তাঁরা ছিলেন- মহাত্মা গান্ধী, সীমান্ত গান্ধী, নেহেরু পিতা-পুত্র, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা সোবহানী, আচার্য কৃপালনী, বল্লবভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, সরোজিনী নাইডু, মওলানা হসরৎ মোহানী, রাজা গোপালাচারী, রফি আহমদ কিদওয়াই, জগজীবন রাম, চিত্ত রঞ্জন দাস প্রমুখরা। এইরকম সব রাজনৈতিক দিকপালদের সাহচর্যের কথা মওলানা ভাসানীর জীবিতকালে তাঁর মুখে শোনা।

কংগ্রেসে প্রায় এক দশক কাজ করার পর ওয়ালিউল্লাহ ঘরানা থেকে মওলানা ভাসানীর প্রতি নির্দেশ এলো মুসলিম লীগের আবরণে কৃষকদের মধ্যে কাজ করার। পশ্চিমের জাঁকজমক ও রোমাঞ্চকর পরিবেশ ও জগৎ ত্যাগ করে মওলানা ভাসানী পাড়ি জমালেন নিজ জন্মভূমি পূর্বাঞ্চলের বাংলাদেশে।

শুরু হল তরুণ যুবক মওলানা আবদুল হামিদের নতুন ও ভিন্ন জগতের কর্মকাণ্ড। এই সময় তিনি বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকতা করতে করতে কৃষকদের সাথে নানা বিষয়ে সম্পর্কিত হওয়া কালে পাঁচবিবির দোর্দণ্ডপ্রতাপ ক্ষুদে এক জমিদারকন্যা বর্তমানে আলেমা খাতুনের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু তাতে কৃষকশোষক জমিদার শ্বশুরের সাথে কৃষকনেতা মওলানার সাথে আপোষ হল না। শ্বশুর যখন জামাতাকে প্রাণে বধ করার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন তখন জামাতা বাবাজী দেশ ছেড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচালেন।

পলাতক হয়ে মওলানা আসামে এক পীরের আশ্রয় নিলেন। বিচিত্র ব্যাপার এই পীরও ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহর আসামে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক রাজনৈতিক শিষ্য। ইতিমধ্যে মওলানা বাঙ্গলা থেকে ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলের আসামে বসতকারী কৃষকদের তিনি নেতা হয়ে গেছেন। কৃষকদের সংগ্রাম পরিচালনার জন্য তিনি আসামের যমুনা নদীর এক চরে আস্তানা গড়ে তুললেন। এই ভাসানী চরের নাম অনুসারে যে নামকরণ হয় সেই ভাসানী নামে তিনি পরবর্তীতে পরিচিত হন। কৃষকনেতা মওলানা ভাসানীর কর্মক্ষেত্র অল্পকালের মধ্যে আসাম ও বাঙ্গলাব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের আহবানে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইল এসে বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারী পরগণার কৃষকের ত্রাস রাণী জাহ্নবীর সাথে বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু তখন মওলানার কর্মক্ষেত্র এত বিস্তৃত যে তাঁকে নাগালে পাওয়া কোনো জমিদারের জন্য সহজ ব্যাপার ছিল না। এই সময় মওলানা আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একজন অবিসম্বাদিত নেতাও। তিনি বাঙ্গলা থেকে আসামে বসবাসকারী কৃষকদের শিখিয়েছেন আল্লাহর আসমানের নীচে সকল জমির মালিক আল্লাহ এবং সেই জমির আবাদকারীরা তাঁর প্রতিভূ। বাঙ্গালী কৃষকদের আসাম থেকে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে যে বিশাল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিলে তার মূল ভিত্তি দিল উপরোক্ত আওয়াজ এবং মূল নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে মওলানা ভাসানী আইন পরিষদের সদস্য এবং আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি।

ইতিমধ্যে স্বাধীনতার ঝড় এবং ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের আওয়াজ উঠেছে এবং সে মুসলমানদের রাষ্ট্রে বাঙ্গলা ও আসাম মিলে হবে তার পূর্ব অঞ্চল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গণ তখন আসামের সীমারেখার মধ্যে এসে পড়েছে। যুদ্ধের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে উপমহাদেশের ভাগ্য। ঘটনা ঘটে চলেছে প্রচণ্ড গতিতে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে আসামের মুসলমানরা সকলেই মত জানিয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু দেড় বছরে যখন প্রকৃতই পাকিস্তান হল তখন সিলেট ছাড়া সমগ্র আসাম পড়ে গেল পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতে। মওলানা হলেন বহিষ্কৃত। তিনি চলে আসলেন তাঁর কর্মস্থল পূর্ববাংলায় অর্থাৎ পাকিস্তানে।

পূর্ব পাকিস্তান তখন (১৯৪৭) থেকে তাঁর মৃত্যু (১৯৭৬) পর্যন্ত দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী বিচিত্র কর্মকাণ্ডের চারণক্ষেত্র। বরং প্রকৃত অর্থে এই তিন দশকব্যাপী সমগ্র পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে মওলানা ভাসানী ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগের বিরোধী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন। স্বাধীন বৈদেশিক নীতি ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ আপোষ করলে ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ঐ বৎসরই পাকিস্তানের সকল গণতন্ত্রকামী নেতা ও দলসমূহের সমন্বয়ে গঠন করলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।

পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র করার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হলেন মওলানার পরিবর্তে তাঁরই হাতে গঠিত আওয়ামী লীগের তাঁর এককালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ যে পাকিস্তান অর্জনের নেতা মুসলিম লীগের মতো স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হবে সে কথা নিশ্চিতভাবে জেনেও মওলানা ভাসানী সহায়তা করলেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন হওয়ার সংগ্রামকে। এই ভাবে মওলানা ভাসানী পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার দ্রষ্টা ও স্রষ্টা। এই উভয় স্বাধীনতায় তথা রাষ্ট্র গঠনের আগে এবং পরে কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ছিলেন সর্বপ্রধান ব্যক্তি। ১৯২৭ থেকে ১৯৭৬ এই সুদীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীকাল মওলানা ভাসানী কৃষকদের সচেতন ও সংগঠিত করার জন্য বিরাম ও আপোষহীনভাবে সংগ্রাম করেছেন।

এ দেশ সমস্যামুক্ত হবে তখনই যখন কৃষিবিপ্লবের ভিত্তিতে দেশে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দেশে একটি জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সে দিন জনগণ যাঁদের সমাধিতে পুষ্প অর্পণ করবে তার মধ্যে প্রথম হবে কৃষকের সন্তান ও বন্ধু মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সমাধি।

কমরেড আব্দুল মতিন: বামপন্থী রাজনীতিক, লেখক, ভাষাসৈনিক-‘ভাষা মতিন’, ‘ছাত্র মতিন’ নামেও খ্যাত।

আরও পড়ুন