পৃথিবীর স্বর্গ স‍্যানডিয়াহো শহর থেকে

আমাদের পতাকা, আমাদের মান সত‍্য , সুন্দর বিজয় নিশান নানা কারণে গত তিন বছর পর পর আমার লস অ্যাঞ্জেলেসের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিতে যেতে হয়েছে। স‍্যানডিয়াগো শহর থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস শহর আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে। দিনে গিয়ে দিনে কাজ করে ফিরে আসাটা একটা চ‍্যালেঞ্জ কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিবাসী এই চ‍্যালেঞ্জকে সহজ করে দিয়েছেন। প্রথমবার ২০২১ সালে কোভিড মহামারিকালে দেশে যাব, ছয় মাস আগে আমার ছুটির জন‍্য অনুরোধ করতে হয়। ছুটি মঞ্জুর হলো, টিকেট করেছি দেশে যাব, দেখি পাসপোর্ট রিনিউ করতে হবে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পাসপোর্ট হাতে এল দেশে রওনা হবার একদিন আগে। বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিকে ফোন করলাম, ওনারা জানালেন চলে আসুন, নো ভিসা রিকয়ার্ড স্টিকার লাগিয়ে দেয়া যাবে। অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করে, নতুন পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলে রওনা দিলাম। পথটা পাহাড়ি, মাঝে কিছু সময় সমুদ্রের পাশে পাশে পথ চলা, যেন বান্দরবনের পথে চলেছি অথচ মনে শঙ্কা। কাজটা হবে তো? রাস্তায় ভীড় অনেক তবু পৌঁছে গেলাম সকাল সাড়ে ১০টা লস অ্যাঞ্জেলেস । সাউথ ফেয়ারফেক্স রাস্তায় উৎসুক হয়ে খুঁজছি। এমন সময় দেখি আমাদের পতাকা উড়ছে, সবুজ রং প্রকৃতি আর তারুণ্যের প্রতীক আর মাঝে লাল রং ঊদীয়মান সূর্য়, স্বাধীনতা। কী অসম্ভব ভালোলাগা একটা সময়।

রাস্তার উপর অনেক পার্কিং, গাড়ি পার্ক করে গেলাম। ওনারা কাগজগুলো নিলেন। বলেন লাঞ্চের পরে এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন আপু। কর্মঠ সদালাপী বন্ধুসুলভ বাংলাদেশি মানুষ। জাতীয় পতাকা আমাদের অহংকার। এ পতাকার অবমাননা, আগরতলায় আমাদের অ্যাম্বাসিতে আক্রমণ কেমন প্রতিবেশি সুলভ আচরণ? আমরা ভীষণ পরোপকারী একটা জাতি। কিন্তু নিজেরা না খেয়ে ইলিশ দিয়ে দিব, নিজেদের গ‍্যাস সংকট থাকা সত্বেও গ্যাস দিয়ে দিব, ট্রানজিট দিয়ে দিব, ইচ্ছে না হলে বাঁধ দিয়ে খরা হয়ে যাবে সবুজ স্বদেশ, আমরা পানি পাব না, আবার ইচ্ছে হলে বাঁধ খুলে মধ‍্য রাতে বন‍্যা ঘটিয়ে দিবে বা আমাদের ফালানি কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকবে নিথর হয়ে এ কেমন আচরণ? ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা বাংলাদেশি। সুনামীর পরে সবকিছু স্থিতিশীল হতে গেলে একটু সময় লাগে না? দেশটা সুনামীর পরের অবস্থা আছে। সবকিছু স্থিতিশীল হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সেই ছোট বেলায় প্রদীপদের বাসায় স্কুল থেকে ফিরে যেমন থাকতে হতো আম্মি কলেজে থেকে ক্লাস নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত এবং আসার পর চাচিই বলে দিতেন হোম ওয়ার্ক না করে খেলেছি কিনা বা তপন স‍্যারের ভ্রুকুটি অঙ্ক অনুশীলন না করার কারণে যেমন জীবনের সঙ্গে আছে তেমনি নিবারনের স্কুলের পড়ার খরচ দেয়া বা রবি কাকুর নাতির চিকিৎসা ঠিক মতো হচ্ছে কিনা সে উৎকন্ঠায় রাত জেগে দোয়া করাও আমাদের জীবনেরই অংশ।

আমরা যে মানুষ হয়ে জন্মেছি। পরিশেষে আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। কোন দেশে চিকিৎসা সেবা নিতে গেলে আমরা ওঁদের হোটেলে থাকি, পয়সা দিয়ে চিকিৎসা করাই, ভ্রমণ করি বিনিময়ে পয়সা তাঁরা পান। সুতরাং বিনিময় সমান সমান হতে হবে। বেশি বা কম না। আর আমাদের সার্বভৌমত্বকে সন্মান জানানোর কোনো বিকল্প নেই। বিজয়ের মাসে বিজয় দিবসে থাকে নানা আয়োজন এ শহরে। বই, গান, নাটক, পিঠা, জামদানী, ঐতিহ‍্যসহ কত কী।

এত রক্তের বিনিময় এমন দেশ পৃথিবীতে আর কয়টাই আছে! এই দেশের পতাকার দাম কয়েকটা সূর্যের চেয়েও বেশি নয় কি?

ফারহানা আহমেদ লিসা: চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন