আসামে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

উপমহাদেশের মানুষের শোষণমুক্তির অগ্রদূত হয়ে কাজ করেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ১৯৩৭ সালে প্রথম আসাম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী আসাম ভ্যালি ইউনাইটেড প্রগ্রোসিভ মুসলিম গ্রুপ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। তিনি আসামের দক্ষিণ ধুবড়ী নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। মজলুম জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আসামের পার্লামেন্টে তিনি বাংলায় ভাষণ দিতেন। সেকেলের রেওয়াজ অনুযায়ী সদস্যরা ইংরেজিতে বক্ততা দিতেন। ভাসানী বলতেন বাংলায়। তাঁর পোশাকেরও কোনো পরিবর্তন ছিল না। লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পড়ে প্রাদেশিক পরিষদের যোগ দিতেন তিনি। সংসদ সদস্য হয়েও তিনি জীবন-যাপনে কোনো পরিবর্তন আনেন নি। হতদরিদ্র মানুষদের নিয়েই তিনি চলতেন। আসামে তাঁর অবস্থা যথেষ্ট সচ্ছল ছিল, সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতেন। জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে তিনি মজলুম জননেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এ পথ সহজ ছিল না। বহু কন্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল তাঁকে।
উপমহাদেশে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই তাঁর জন্ম সাল, জন্মভূমি, শৈশবে বেড়ে ওঠা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে কীভাবে তিনি প্রতিকুল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনমানের পরিবর্তন এনেছিলেন তার সামক্য বিবেচনায় আনতে হবে। নতুবা পাঠকের কাছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন খাপছাড়া মনে হবে।
আবদুল হামিদের জন্ম সাল নিয়ে বিতর্ক আছে। রাজনৈতিক জীবনে কয়েকবার তাঁকে পাসপোর্ট করতে হয়েছে। ১৯৫৪, ১৯৬৩ ও ১৯৭৬ সালে। ১৯৫৪ সালের চীনে যাওয়ার সময়ে পাসপোর্টে তাঁর জন্মসাল ছিল ১৮৮৩। ১৯৬৩ সালে হাভানা যাওয়ার পাসপোর্টে ছিল ১৮৮৫। আইয়ুব খান তাঁর ফেন্ডস নট মাস্টার বইতে রাজনৈতিক নেতাদের সরকারি কাগজপত্র ঘেঁটে যে জন্মসাল ব্যবহার করেছেন, সেখানে ভাসানীর জন্মসাল ১৮৮৫ সাল উল্লেখ করেন। ১৯৭০ সালে এক লেখায় ভাসানী তাঁর জন্মসাল উল্লেখ করে বলেন, ১৩০৪ সালে এক মহাপ্রলয়ংকারী ভূমিকম্প হয়, তখন আমার বয়স পনের। এ হিসেবে তাঁর জন্ম ১৮৮৪-৮৫ সালে। ভারত সরকারের কাগজপত্রে তাঁর জন্ম সাল ১৮৮৩ উল্লেখ আছে।
সে যাই হোক, ভাসানী উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে জন্মে ছিলেন এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা যদি তাঁর জন্ম সাল ১৮৮৫ ধরি, তবে তিনি ১৮৮৫ থেকে ১৯৭৬ সাল প্রায় ৯১ বছর বেঁচেছিলেন। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি প্রায় ৬৫ বছর প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন শুধুমাত্র মজলুম মানুষের দু’বেলার রুটি-রোজী ও জীবন-মানের উন্নয়নে।১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে মওলানা ভাসানীর জন্ম।

ভাসানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস লিখলে এক হাজার ছাপা পৃষ্ঠায়ও হবে না। তাই এ প্রবন্ধে শুধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গোড়াপত্তন যেখানে হয় সেই আসামের ধুবরী জেলার রাজনীতি নিয়েই লিখব। সিরাজগঞ্জের ধানগড়া নিবাসী হাজী শরাফত আলী ছিলেন ভাসানীর পিতা। মা ছিলেন মজিরন বিবি। তাঁদের কয়েক বিঘার একটি বসত বাড়ি এবং ৮-১০ বিঘার ফসলি জমি ছিলে। সিরাজগঞ্জ বাজারে একটি মুদি দোকান ছিল। ঐ দোকানে ৫-৬ জন কর্মচারী কাজ করতেন।
ভাসানীর পিতা হজ্বব্রত পালন করেছিলেন। তৎকালে হজব্রত পালন সহজ ছিল না। একমাত্র জ্ঞানীগুণী ও স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরাই হজ পালন করতে মক্কা যেতেন। আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পরিবার স্বচ্ছল ছিলেন। তবে শিশু বয়সে পিতাকে হারান তিনি। পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় সময়ের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ বাজারের দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। এর মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর জীবনে আবারও নেমে আসে চরম দুর্যোগ।
তখন আট-নয় বছরের বালক তিনি। ১৮৯৪-’৯৫ সাল, কার্তিক-অগ্রাহণ মাস ওলাওঠা আঘাত হানে সিরাজগঞ্জের নানা এলাকায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বহুসংখ্যক লোক মারা যায়। সেই মহামারিতেই ভাসানীর পরিবারের সব সদস্য–তাঁর মা মজিরন বিবি, পিতামহি, তাঁর দুই ভাই ও বোনটি মারা যায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ভাসানী। এক জ্ঞাতি ইব্রাহিম খাঁ, কিছুকাল তাঁর দেখা শোনার ভার গ্রহণ করেন।
মা-বাবার জীবিতকালেই আবদুল হামিদ নিন্ম প্রাথমিক পাস করেছিলেন। মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষাও নিয়েছিলেন। কিন্তু মাধ্যমিকের আগেই পারিবারিক বিপর্যয় নেমে আসে তাঁর জীবনে। জ্ঞাতি চাচার তত্বাবধানে ৩-৪ বছর থাকার পর তের কিংবা চৌদ্দ বছর বয়সে পৈতৃক ভিটেমাটি ছাড়েন তিনি। বাড়ি ছেড়ে তিনি বাউন্ডেলে জীবনে অভ্যস্থ হয়ে পড়েন। কয়েক বছর তিনি মাঠের কৃষক, বিল-বাঁওড়, নদ-নদীর মৎস্যজীবী, তাঁতী-কারিগর, কামার-কুমার প্রভৃতি শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কাটান। তাঁদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে অনুভব করেন। অন্যদিকে দেখতে পান শোষক-নিপীড়ক, জমিদার-জোতদার-মহাজনদের দৌরাত্ম। গৃহহীন অভিমানী বালক কৃষকের বাড়িতে থাকেন, জেলে নৌকায় ঘুরে বেড়ান, তাদের সঙ্গে মাছ ধরেন, মসজিদ-মাদ্রাসায় ঘুমান। আবার কোথাও বা মসজিদ, মক্তবে শিশুদের তালিম দেন। জ্ঞাতি বা আত্মীয় স্বজনের অনাদর অবহেলায় তিনি আর গৃহে ফেরেননি।
তিনি নিজের ভরণ পোষনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। সিরাজগঞ্জের পূর্ব পারে টাঙ্গাইলের কাগমারী গ্রামে এসে এক মক্তবে শিশুদের আরবি ও বাংলা পড়ানোর কাজ পান। থাকতেন মক্তবে, পেতেন দু’চার টাকা। সন্তোষের জমিদারদের কাছাকাছি ছিল মক্তবটি। তাঁর বয়স তখন উনিশ বা বিশ হবে। এ সময় শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সন্ধ্যার পর কৃষকদের বাড়ি বাড়ি যেতেন, সেখানে বৈঠক করতেন, কোরান হাদিস নিয়ে আলোচনা করতেন। ইসলামের শিক্ষা, অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ না করে চুপ থাকা পাপ– এসব কথা বলতেন। পাশাপাশি ধনিক, বণিক ও জমিদার শ্রেণির শোষণ নির্যাতনের কথা তুলে ধরতেন। ফলে সাধারণ কৃষক শ্রেণির মাঝে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সেই সময়ে জামালপুরে কৃষক বিদ্রোহ হয়। কৃষকদের সংঘবদ্ধ শক্তি দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। প্রবল ক্ষমতার অধিকারী জমিদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তিনি তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এখান থেকেই তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ ঘটে ছিল।
এক সাংবাদিক মওলানা ভাসানীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শৈশবের কোন স্মৃতি তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল? জবাবে তিনি বলেন, দুঃভিক্ষ। দশ-বারো বছর বয়সে দেখা সেই দুর্ভিক্ষের কথা স্পষ্ট মনে ছিল তাঁর। দুই টাকা মনের চাল চার টাকা হয়ে গেল। মানুষ ভাতের অভাবে কচু, ঘেচু খেয়েও বাঁচতে পারল না। সালটি ছিল ১৮৯৭, শীতকাল। অকালের কী ভয়াভহ রূপ, সহপাঠী, খেলার সাথি তাদের তিনি দেখলেন খাদ্যের অভাবে অথবা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে।
বাউন্ডেলে জীবনের এক পর্যয়ে তিনি নাসিরুদ্দিন বোগদাদী নামে এক আধ্যাত্মিক গুরুর সন্ধান পান। আসাম থেকে কোন প্রয়োজনে বাংলায় এসেছিলেন তিনি। আবদুল হামিদ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নাসিরুদ্দিন বোগদাদী আবদুল হামিদের প্রতিভায় মুগ্ধ হন এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী হন। তিনি ইসলামী ধর্মশাস্ত্র শেখানোর জন্য নিজের কাছে নিয়ে যান তাঁকে। পরে তিনি দেওবন্দ শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের কাছে পাঠান। ১৯০৭ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত আবদুল হামিদ দেওবন্দে ছিলেন। সেখানে কোরান হাদিস সম্পর্কে তালিম নেন। দেওবন্দের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আবহাওয়া তাঁকে প্রবভাবিত করে। ধর্মের বিষয় পাঠের চেয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। সেখানেই তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনায় দীক্ষালাভ হয়– যা ছিল তাঁর পরবতী জীবনের পাথেয়।
১৯১২ সালে তিনি স্বদেশী আন্দোলনে যোগদেন। পূর্ববঙ্গর স্বদেশী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। এই প্রথম তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। আব্দুল হামিদ খানের সাহস ও শারিরীক শক্তি দেখে স্বদেশী নেতারা তাঁকে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত করেন। সেই সময়ে স্বদেশী টেরোররা জমিদার বা বণিক শ্রেণির বাণিজ্যিক নৌকা ডাকাতি করে সম্পদ লুট করতো। লুটের সেই অর্থ ইউরোপ থেকে অস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় হতো। আধুনিক অস্ত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইতে ব্যবহৃত হত। এ সময় আব্দুল হামিদ কিশোরগঞ্জ-ব্রাম্মণবাড়িয়া অঞ্চলে স্বদেশী ডাকাতিতেও অংশ নেন। স্বদেশীদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু, তাই বেশি দিন তাদের সঙ্গে কাজ করেননি তিনি। ডাকাতি ছেড়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
কবি ও উপন্যাসিক ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। সিরাজী ছিলেন কংগ্রেস নেতা ও অনলবর্ষী বক্তা। উপমহাদেশের অধ:পতিত মুসলমানদের জাগরণ আনতে চেয়েছিলেন তিনি। সিরাজী সভা-সমাবেশে ছিল স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে, জমিদার- জোরদারের বিপক্ষে। আব্দুল হামিদকে সিরাজী জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।
জীবনের এক পর্যায়ে টাঙ্গাইলের ধনী ব্যবসায়ী শামসুদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে জায়গির থেকেছেন তিনি। ব্যবসা ও জমিজমার ব্যাপারে আব্দুল হামিদের বুদ্ধি বিবেচনা দেখে মুগ্ধ হন তিনি। তাঁর বড় মেয়েকে আবদুল হামিদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সংসারী করার চেষ্টা করেন।

ধনি এ ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় হজ্ব পালন করতে যান। মক্কা থেকে ফিরে এলে তাঁকে সবাই ‘মওলানা’ উপাধিতে ভূষিত করে। এ সময় আবার শামসুদ্দিন চৌধুরী জমির মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। একটি মামলার ব্যাপারে ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে আব্দুল হামিদকে যোগাযোগ করে দেন তিনি। ব্যারিস্টার সি. আর দত্ত তখন কংগ্রেসের বড় নেতা এবং কোলকাতা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।
শ্বশুরের মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যারিস্টার সি.আর দাসের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় মূগ্ধ হন মওলানা আব্দুল হামিদ। তিনি ১৯১৭ সালে কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং একনিষ্ঠ কংগ্রেস কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯২১ সালে কংগ্রেসের মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধি ও মওলানা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি সেই আন্দোলনে যোগদান করেন। আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করলে তিনি গ্রেফতার হন। একমাস জেল খাটেন তিনি। অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করা হলে, রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন বড়লোকদের রাজনীতি তাঁর জন্যে নয়। তিনি চলে যান কৃষক সমাজের মধ্যে।
কংগ্রেস দল ছাড়ার মূল কারণ ছিল, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কংগ্রেস, জমিদার, মহাজনদের বিরুদ্ধে নীরব। তাঁদের সম্পর্ক কংগ্রেস কোনো সমালোচনা করেন না। এই দলের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আসতে পারে কিন্তু তাতে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের মুক্তি আসবে না। কংগ্রেস থেকে সরে গিয়ে তিনি মুসলিমলীগেও যোগ দেননি। তিনি লক্ষ্য করেন মুসলিমলীগ নেতারা শোষক, জমিদার, জোতদারদের রিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার কথা বললেও তা তাদের কথার কথামাত্র। লীগের সামন্তবাদী নেতাদের দিয়ে মুসলমান কৃষকদের উপকার হবে না। এরপর তিনি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না থেকে স্বাধীনভাবে কৃষক-মজুর-কামার-কুমারের মুক্তির লক্ষ্যে নিজস্ব পদ্ধতিতে গ্রামে গ্রামে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে উপমহাদেশের কৃষক মুক্তি সংগ্রামে যোগ হয় নতুন মাত্রা।
কংগ্রেস ও মুসলিমলীগ নেতারা ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে যখন ক্ষমতা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় আন্দোলনে মগ্ন তখন ভাসানী পূর্ব ভারতের অপেক্ষাকৃত কম অস্থির আসামে সৃষ্টি করেন এক ইতিহাস।
ছোটবেলা থেকে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। অনাদর, অবহেলা,মানুষের রুষ্ট আচরণ ইত্যাদি ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। তাই সাধারণ মানুষের মুক্তি কামনায় তিনি ছিলেন সোচ্ছার। যেখানেই অবিচার অন্যায় দেখেছেন সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। আসামে বাঙালিরা অত্যাচারিত হচ্ছেন এ সংবাদে তিনি আসামে ছুটে আসেন। সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান তিনি।
উল্লেখ্য যে, ১৯০০ সাল থেকে আসামে কালাজ্বর, ডেঙ্গু জ্বর, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও বন্যপ্রাণীর আগ্রাসনের কারণে লোকসংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। অনেক আবাদী ও অনাবাদী জমি বছরের পর বছর পতিত পরে থাকে জঙ্গলে পরিণত হয়। পূর্ব বাংলার রংপুর, কুচবিহার, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও সিলেটের লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক আসামের এসব জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে বসবাস করতে শুরু করে। প্রথম প্রথম আসাম সরকার এদের স্বাগত জানায়। পরিশ্রমী এই কৃষকদের কারণে আসামে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আসাম প্রদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে।
কয়েক বছর পরে অসমিয়দের সঙ্গে বাঙালিদের জমিজামা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। জমি নিয়ে বিরোধ থেকে একে অপরের সঙ্গে সংর্ঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আসামে বাঙালি কৃষকদের অধিকার রক্ষায় মওলানা আবদুল হামিদ আসামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন।
আবার এই কৃষকদের নব্বই শতাংশের বেশি ছিলো হতদরিদ্র ও নিরক্ষর। তাদের রক্ষা করা ও শিক্ষিত করে তুলতে তিনি আসামে চলে আসেন। ১৯২৮-২৯ সালে মওলানা ভাসানী আসামের গোয়ালপাড়া জেলার ধুবড়ী মহকুমার অন্তর্গত ঘাগমারিতে মাত্র ১ টাকা ১৪ আনা ব্যয়ে একখানা কুঁরেঘড় তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন। দুর্দান্ত ম্যালেরিয়ার জন্য ঘাগমারী কুখ্যাত ছিল। চারদিকে গহীন জঙ্গল। অজগর, বন্যহাতি, বাঘ, ভাল্লুক প্রভৃতি নানাপ্রকার হিংস্র জন্তুর আনাগোনা তাঁর চারদিকে। এই ভয়াবহ বিপদসংকুল স্থানে তিনি স্ত্রী ও পুত্র নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
মওলানা ভাসানী আসামে এসে নিপীড়িত কৃষক কুলকে একত্রিত করেন। তাঁদের উন্নয়নে দিন-রাত কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেন। এসময় তাঁর পুত্র কালা জ্বরে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা করাতে পারেননি ব্যস্ততার কারণে।
টাঙ্গাইলের পাঁচবিবিতে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিলেন এই বলে, আমার নিরন্ন, নিরস্ত্র বাঙালি চাষীদের একটা সুরহা যতদিন না হবে, ততদিন আমি বাংলায় ফিরে যাব না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক, মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ হোক–তিনি সবসময় অসহায়, দুর্বল,বিপন্ন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। তা থেকেই তাঁর অভিধা মজলুম জননেতা।
আসামে একবার ভীষণ বন্যা হয়। সারা আসাম জুড়ে মওলানা ভাসানীর কী অবিরাম ছুটোছুটি বন্যাপীড়িতদের সাহায্যের জন্য। এ সময় তিনি কংগ্রেস নেতা বাবু বসন্ত কুমার দাসের সঙ্গে কাজ করেন। বন্যার ধ্বংলীলায় উৎসারিত মানবতার করুন আর্তনাদ ব্যথিত-বিচলিত ভাসানীকে সেদিন আসামের মানুষ দেখেছে বন্যার্তদের দ্বারে দ্বারে তাদের দুঃখ-দুর্দশা সাথি হিসাবে।
ভাসানীর আশ্রয়স্থল ঘাগমারিতে পরবর্তীতে তিনি গড়ে তুলেন ইসলামীয়া কলেজ, হাইস্কুল, প্রাথমিক স্কুল ও পশু চিকিৎসালয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় মওলানা ভাসানীর অদম্য উৎসাহ ও কর্মক্ষমতা এবং শিক্ষাবিস্তারে তাঁর অনন্য সাধারণ আন্তরিকতার পরিচয় পেয়েছিল আসামের জনসাধারণ। মওলানা ভাসানী দেখেছেন, শিক্ষা দীক্ষাহীন মানুষ সহজেই শাসক-শোষকশ্রেণির দ্বারা প্রতারণার স্বীকার হয়। সেজন্য শিক্ষাকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাঙালি কৃষকরা আসামের আদিবাসীদের চেয়ে ছিল দক্ষ ও কর্মক্ষম। আদিবাসীরা অনেকটাই সহজ-সরল ও অলস প্রকৃতির। তাই জমি-জমা নিয়ে তাদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং বাঙালি কৃষকদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এই সংর্ঘষ নিবারনের জন্য আসাম সরকার লাইন প্রথা প্রবর্তন করে। এর ফলে মাইগ্রেট বাঙালি কৃষকরা অধিকৃত নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গিয়ে জমি-জমা চাষাবাদ করতে পারত না, এমন কী জমির পত্তনও পেত না। বাঙালি কৃষকদের জমির উপর একটা বিশেষ লাইন টেনে দিয়ে একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করা হত।
আসামের তৎকালীন কোনো কংগ্রেস বা মুসলিমলীগ নেতা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় নি। ভাসানী তখনো মূলধারার রাজনীতির বাহিরে একজন আঞ্চলিক কৃষকনেতা। তিনি ব্রিটিশদের লাইন প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক দেন। ভাসানী অসমিয়া কায়েমি স্বার্থ ও আসাম সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে বহিরাগত বাঙালি হিন্দু-মুসলমান কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে গড়ে তোলেন ‘আসাম চাষী মজুর সমিতি’। এই সমিতির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক নূরুল হক। বহিরাগতদের নেতা হিসেবে মওলানা ভাসানী এই প্রথা বিলোপে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলেছিলেন। এ সময় আসামের ভাসান চরের মানুষ মওলানা আবদুল হামিদ খানকে তাঁদের মানুষ বলে নামের শেষে ‘ভাসানী’ যুক্ত করে তাঁর নামকরণ করেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আজও ভাসানচর আছে আব্দুল হামিদের নাম ‘ভাসান চরে’র সঙ্গে যুক্ত থাকবে অনন্তকাল।
ব্রিটিশের ভারত শাসন আইন ১৯৩৫, উপমহাদেশের মানুষকে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ওই আইনের ভিত্তিতে ১৯৩৭ এর এপ্রিলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে সদস্য সংখ্যা ছিল ১০৮। মওলানা ভাসানী আসাম ভ্যালী ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ মুসলিম গ্রুপ থেকে নির্বচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। তিনি দক্ষিণ ধুবড়ী নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
১৯৩৫ সালের ১৫ সেপ্টম্বর পার্লামেন্টের দ্বিতীয় অধিবেশনে লাইনপ্রথা বাতিলের জন্য মওলানা ভাসানী ও তাঁর দল সুরমা ভ্যালি ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির উদ্যোগে সংসদে এক প্রস্তাব পেশ করা হয়। এতে বলা হয়, লাইন প্রথা ব্যবস্থা স্বেচ্ছাচারি এবং জাতিগঠনের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মুসলিমলীগ নেতা আব্দুল মতিন চৌধুরী এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। বলা হয় এই ব্যবস্থা বর্ণবাদী এবং এর লক্ষ্য অর্থনৈতিক শোষণ, যা ভারতের কোথাও নেই। ভাসানীর নেতৃত্বে সেদিন পার্লামেন্টে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
মওলানা ভাসানীর প্রতিবাদের মুখে তখন আইন হলো – একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আগত বাঙালিদের অধিকার স্বীকার করা হবে। যারা এরপরে এসেছে তাদের উৎখাত করতে হবে।
১৯৩৭ সালে জিন্নার সাথে ভাসানীর লক্ষ্মৌতে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ভাসানী জিন্নাহকে অনুরোধ করেন আসামে সফরে আসতে। জিন্নাহ ভারতের অনেক প্রদেশে গেলেও আসামে যাননি। ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ ও মির্জা ইস্পাহানি শিলং শফরে গেলে সার্কিট হাউজে তাঁদের সঙ্গে ভাসানীর সাক্ষাৎ হয়। আসামের বাঙালিদের উপর সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন। ভাসানীর কান্না জিন্নাহর কঠিন হৃদয়ে করুণার সৃষ্টি না করে বিরক্তির সৃষ্টি করে। তিনি ইস্পাহানিকে বলেন, এই ব্যক্তি তো আবেগপ্রবণ। পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার পর একে দিয়ে আমার চলবে না। সারা ভারতের সব লীগ নেতার মধ্যে ভাসানীকে নিয়েই জিন্নাহ সবচেয়ে অস্বস্থিতে ছিলেন। জিন্নাহকে সবাই যেমন তোয়াজ ও সমীহ করতেন, ভাসানী তা করতেন না।

১৯৪৪-’৪৫ সাল থেকে মওলানা ভাসানী পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। লাইন প্রথা বাতিল এবং পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি করেন। ১৯৪৭ সালের ১০ মার্চ তিনি আসাম দিবসের ডাক দেন। নেতারা ঘোষণা দেন ওই দিন গোয়াল পাড়া স্বাধীন হবে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে আসাম মুক্ত হবে। ফলে কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আসাম দিবস পালনের জন্য অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলন উদ্বোধন করার জন্য দরং জেলায় এক সমাবেশের করেন। ঐ সমাবেশ তিনি বলেন, দাবি আদায়ের জন্য তোমরা জেলে যাও এবং বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে মৃত্যুবরণ কর। সরকারি নির্দেশ মতো তোমরা বাড়িঘর ছাড়বে না। সমাবেশ শেষে নিরাপত্তা আইনে ভাসানীকে গ্রেফতার করা হয়। সরকারি দমননীতি ও গণগ্রেফতারের ফলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পরে। ভাসানীর আন্দোলনের ফলে ইংরেজ সরকার মুসলিম প্রধান সিলেট জেলায় গণভোট দিতে বাধ্য হন। ১৯৪৭ সালের ২১ জুন মওলানা ভাসানীকে গুয়াহাটি জেল থেকে মুক্তি দেন। এর আগেই ঘোষিত হয়েছিল যে, মুসলিম প্রধান সিলেট জেলা ভারতের সঙ্গে থাকবে না পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে–সে ব্যাপারে গণভোট হবে। কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি গণভোটের প্রশ্নে প্রচারণায় নেমে পড়েন। তিনি হিন্দু মুসলমান সবার কাছে ভোট প্রার্থনা করেন। ভাসানী বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, তাহারা পাকিস্তানে সর্বপ্রকার সুবিধা ভোগ করিতে পারিবেন।’ সিলেটের গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে পড়েছিল দুই লাখ উনচল্লিশ হাজার ছয়শত উনিশ আর ভারতের পক্ষে পড়েছিল এক লাখ চৌরাশি হাজার একচল্লিশ ভোট।
রঞ্জন মল্লিক: গবেষক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
