মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন

১৯৫০ সালের প্রথমদিকে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী সাহেব ঢাকায় আগমন করলে গণবিক্ষোভের আশঙ্কায় তৎকালীন পূর্ববাংলা সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ঐ সময় মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগ হতে বের হয়ে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ সবেমাত্র গঠন করেছেন। তিনি তাঁর প্রথম সভাপতি। তিনি তাঁর কতিপয় সহকর্মীকে নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিব, টাঙ্গাইলের শামসুল হক। তাঁরা এরেষ্ট হয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নীত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উপর নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা হয়। তাঁদেরকে ঢাকা জেলের নিউ টুয়েন্টি সেলে রাখা হয়। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে মওলানা সাহেবের বিদ্রোহের কারণ ছিল জনগণের সঙ্গে মুসলিম লীগ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে মুসলিম লীগ সরকারের ব্যর্থতা।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভারতের বুর্জোয়া কংগ্রেস সরকারের এবং পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা মুসলীম লীগ সরকারের ব্যর্থতা আঁচ করেই ১৯৪৮ সালের আগষ্ট মাসে আওয়াজ তুলে ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো এনছান ভুখা হ্যায়’। আর যায় কোথায়? দুই দেশের সরকারই আপন আপন দেশের কমিউনিস্টদের উপর শুরু করলেন কমিউনিস্ট হান্টিং। শত শত কমিউনিস্ট নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হলেন। আমিও এদের মধ্যে ছিলাম একজন। জেলের মধ্যেও চলল তাদের উপর অমানুষিক বর্বরোচিত ব্যবস্থা। কমিউনিস্টরা উভয় দেশে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। জেলে কমিউনিস্টরা আরম্ভ করল হাঙ্গার স্ট্রাইক, আইন অমান্য আন্দোলন এবং প্রতিরোধ সংগ্রাম। এসব সংগ্রামে উভয় দেশে বেশ কিছুসংখ্যক কমিউনিস্ট জেলখানাতেই পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। রাজশাহীতে জেলখানায় নিরস্ত্র বন্দীদের উপর যে টর্চার চলে তাতে ৭ জন নিহত হয়, অনেকে আহত হয়। বাইরে চলে উভয় দেশের এখানে-ওখানে পুলিশের সংগে কৃষক ও শ্রমিকদের সংঘর্ষ। বাংলাদেশের রাজশাহীর নাচোল থানায় পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষে কৃষকরা পুলিশের রাইফেল ছিনিয়ে নেয়। কিছু পুলিশ নিহতও হয়। তারপর গ্রামের কৃষকদের উপর নেমে আসে এক অত্যাচারের ষ্টীম রোলার।
দেশের মধ্যে এই সমস্ত ঘটনা বহু বিবেকসম্পন্ন মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিল। বহুজনের দৃষ্টি কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতি নিপতিত হয়েছিল। মৌলানা ভাসানীর ত বটেই। যে মওলানা নিপীড়িত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জমিদার ও বৃটিশ সরকারের কোপানলে পড়ে মাতৃভূমি ত্যাগ এবং আসামের জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তাঁর পক্ষে কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিকই ছিল।
আমি মওলানা সাহেবের এই পরিবর্তন লক্ষ্য করি ঢাকা জেলে নিউ টুয়েন্টি সেলে, ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে। যখন আমাকে রাজশাহী জেল হতে শাস্তিমূলকভাবে হঠাৎ ট্রান্সফার করা হয়। আমার এই হঠাৎ ট্রান্সফারের কারণ ছিল আমি জেল হাসপাতালে সেখানকার রোগী কয়েদিদের তাদের ন্যায্য প্রাপ্য ডাইট আদায় করে নেওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ করছিলাম ও জেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছিলাম। ঢাকা জেলেই মওলানা সাহেবের সঙ্গে জীবনে প্রথম দেখা।
ঢাকা জেলে পৌঁছলে ডিপুটি জেলার সাহেব যিনি নিরাপত্তা বন্দীদের চার্জে ছিলেন এবং যাঁকে ইসলামপন্থী বলে মনে হল। তিনি ইচ্ছা করে আমাকে কমিউনিস্টদের ওয়ার্ডে না দিয়ে পাঠালেন মওলানা সাহেবদের কাছে নিউ টুয়েন্টি সেলে। ডিপুটি জেলার সাহেব ভেবেছিলেন হিন্দুদের প্রভাবে পড়েই আমি কমিউনিস্ট বনেছি। কাজেই মওলানা সাহেবের সংস্পর্শে কিছুদিন থাকতে পারলে তাঁর প্রভাবে পড়ে আমি আবার মুসলমান বনে যাব। পরে বুঝলাম ডিপুটি জেলার সাহেব মওলানা সাহেবের বাইরের দিকটার সাথেই শুধু পরিচিত ছিলেন, মওলানার অন্তরের মধ্যে তিনি ঢুকতে পারেননি। মওলানা সাহেব অনেক আগে থেকেই আমার নাম জানতেন এবং আমি কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী সেটাও তাঁর অজানা ছিল না। আমাকে তাঁদের মধ্যে পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। খুশির কারণ ইতিমধ্যে তিনি কমিউনিস্ট ও কমিউনিজমের প্রতি ভয়ানক শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়েছিলেন। দেশ বিভাগের পর বাংলাদেশে চিরকালের জন্য হিজরত করে আসার আগে আসাম থাকাকালেই আসামের কমিউনিস্টদের সঙ্গে তাঁর ভালরূপ পরিচয় ঘটে। মওলানার কাছেই শুনলাম সেখানে তিনি কমিউনিস্টদের সততা, কষ্ট, সহিষ্ণতা, ধৈর্য্য, কর্তব্যপরায়ণতা, শৃংখলাবোধ, সাহস, নিঃস্বার্থ ত্যাগ, নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে একাত্মবোধ দেখে মুগ্ধ হন। বাংলাদেশে এসেও এখানকার কমিউনিস্টদের মধ্যে একই গুণগুলি দেখতে পান। এই সময় চীনের কমিউনিস্টরা কমরেড মাও সেতুং- এর নেতৃত্বে একটার পর একটা গ্রাম, শহর, বন্দর দখল করে চলেছিলেন। এইসব দেখে-শুনে মওলানা সাহেবের মনে এই বিশ্বাসই জন্মেছিল যে সারা বিশ্বে একদিন না একদিন কমিউনিজম আসবেই আসবে। দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষ মুক্তি পাবেই পাবে এবং সেদিন বেশি দূরে নয়। মওলানা সাহেবকে এই সময় কমরেড মাও সেতুং এরও একজন ভক্ত হতে দেখা যায়। মওলানা আমাকে বুঝাতেন কমিউনিস্টরা যে সব গুণের অধিকারী আল্লাহ তা পছন্দ করেন এবং তারা যেই হউক আল্লাহ তাদের জয়ী করবেনই।
মওলানা সাহেব অন্তরের সাথে চীনের কমিউনিস্টদের বিজয় কামনা করতেন। আমাদের দেশেও কমিউনিজম আসুক তিনি সেটা চাইতেন এবং আমার কাছে প্রকাশ করতেন। কোনও দিন তাঁর ভাবাবেগ দেখে আমি ঠাট্টা করে হাসতে হাসতে বলতাম, ‘মওলানা সাহেব আপনি যে কমিউনিস্ট কমিউনিস্ট আর কমিউনিজম কমিউনিজম করছেন তা এতে যে আপনার আর দাড়ি রাখা চলবে না, ইসলামও থাকবে না।’ এর উত্তরে তিনি বলতেন, ‘যাক আমার দাড়ি, কিন্তু লক্ষ লক্ষ ভূখা কাঙ্গাল মানুষ খেয়ে পরেতো মানুষের মতো বেঁচে থাকতে পারবে। আর ইসলাম যদি সত্যি ধর্ম হয় তা হলে শত লেনিন, স্ট্যালিন, শত শত মাও সেতুং চেষ্টা করলেও ইসলামকে ধ্বংস করতে পারবে না। আর ইসলাম যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে থাকে তবে আমার মতো লক্ষ লক্ষ মওলানা হাজার চেষ্টা করেও ইসলামকে রক্ষা করতে পারবে না। ইসলাম সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত সুতরাং তার ধ্বংস নেই।’ মওলানা সাহেব জেল হতে ছাড়া পেয়ে কমিউনিস্টদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করেন। কমিউনিস্টরাও এতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বেশ কিছুসংখ্যক কমিউনিস্ট মওলানা সাহেবের আওয়ামী মুসলিম লীগে ঢুকলেন। মওলানা সাহেব তাদেরকে নেতৃত্বের স্থানে বসালেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্ব মওলানার এই কার্য্যে বাধা প্রদান করলেও মওলানা সাহেব তাদের কথায় কর্ণপাত করেন নাই। মওলানা সাহেব এবং শেখ সাহেব আমাকেও আওয়ামী মুসলিম লীগে ঢুকার জন্য দাওয়াত দেন। কিন্তু সেই সময় পার্টির নির্দেশে আমি ও আরও কয়েকজন কমিউনিস্ট গণতন্ত্রী দলে কাজ করছিলাম বলে পার্টি আমাদেরকে আওয়ামী মুসলিম লীগে যেতে দেয় নাই।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক ইলেকশনে যুক্তফ্রন্টের নমিনেশনের ব্যাপারে মওলানা সাহেব কমিউনিস্টদেরকে যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। তিনি যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারী বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সেখানে তাঁকে নেজামে ইসলামের মওলানা আতাহার আলী, কৃষক শ্রমিক পার্টির ফজলুল হক সাহেব এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ঘোরতর বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এক সময় তাঁকে পার্লামেন্টারী বোর্ডের সদস্য পদ হতে ইস্তফা দেওয়ার হুমকিও দিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ২২ জন কমিউনিস্ট- এর নমিনেশন নিতে সক্ষম হন। অবশ্য এই কমিউনিস্টরা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সেই সংগঠনের, নামে ফ্যাকশন্যাল ওয়ার্ক করেছিলেন। ইলেকশনের পর কমিউনিস্টদের কাজের সুবিধার জন্য মওলানা জয়পুরহাট সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম বদলিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নাম দেন।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার শতকরা ৮০ জন মানুষ কৃষক। দেশের যে কোনও পরিবর্তন আনতে হলে এদের সংগঠিত করতেই হবে। তারাই ছিল মূলশক্তি। মওলানার উপলব্ধি ছিল ইহাই। এখানে কমিউনিস্টদের সাথে ছিল মওলানার মিল। দেশ ভাগবাটার আগে পর্যন্ত কমিউনিস্টরা কৃষক সংগঠন করেছে, বহু কৃষক আন্দেলনও করেছে। কিন্তু পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পাকিস্তান সরকারের ও মুসলিম জনসাধারণের তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করে কৃষক সংগঠনে যাওয়ার সাহস করতেন না। মওলানা সাহেব নিজে এ দেশে কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলনের প্রয়োজন মনে করা সত্ত্বেও পার্টির র্যাঙ্ক ও ফাইলের লোকজনকে নিয়ে ফুলছড়িতে এক কৃষক সম্মেলন ডেকে বসেন। সেখানে নূতনভাবে কৃষক সমিতি গঠিত হয়। অল্পদিনের মধ্যে জিলায় জিলায় মহকুমায় এমনকি থানা ও ইউনিয়ন লেভেলে কৃষক সমিতির শাখা বিস্তার লাভ করে। দুঃখের বিষয় কমিউনিস্ট নেতৃত্ব এই সংগঠনগুলিকে আন্দোলনমুখী করে তোলার চেষ্টা করেননি। সংগঠনগুলিও দুর্বলতা কেটে উঠতে পারেনি।
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দুটি ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকট হয়ে উঠে। একটি মত ছিল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, আইনসভার মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ। আর একটি মত ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েম। এই নিয়ে পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়। মওলানা সাহেব দ্বিতীয় পথ সমর্থন করেন। এই দ্বিতীয় পথ ছিল চীনা পার্টির পথ। বিপ্লবের পথ।
মওলানা সাহেব ১৯৬৯ সালে আয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। যশোরের কমরেড আব্দুল হকের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের একটা গ্রুপ প্রথমেই এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও আন্দোলন বহুদূর অগ্রসর হয়। কমিউনিস্টদের দোমনা ভাবের জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব শেষে আওয়ামী লীগের হাতে চলে যায়। এর পর মওলানা সাহেব ঘুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে “ঘেরাও আন্দোলন” শুরু করেন। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। তারপর মওলানা শুরু করেন “লাল টুপী আন্দোলন।” এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভীষণ জঙ্গীরূপ নেয়। কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনকে বিপ্লবের পথে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা করে নাই। তারা সকল দোষ মওলানার ঘাড়ে চাপায়। তাদের ধারণা ছিল মওলানাই বিপ্লব করে দেবেন। কিন্তু মওলানা বলতেন “আমিত মোল্লা মানুষ, আমি কমিউনিস্ট নই। তা ছাড়া আমার মতো বৃদ্ধের পক্ষে বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে লড়াইতে নামা কি সম্ভব? আমি কমিউনিস্টদের জন্য গ্রাউণ্ড তৈরী করে দিতে পারি। করছিও। তাতে ফসল লাগান কমিউনিস্টদের কাজ।” মওলানার এই বক্তব্য ছিল একেবারে সঠিক। আমরা কমিউনিস্টরা বিপ্লব করতে চাই কিন্তু নিজেরা বিপ্লবের নেতৃত্বে বিপ্লবের ঝুঁকি নিতে চাই না। এইত আমাদের অবস্থা।
১৯৭০ সালে ইলেকশন এলে আবার আমাদের চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। একদল ইলেকশন বয়কটের পক্ষে আর একদল ইলেকশনের পক্ষে। উভয় দল মওলানার উপর চাপ সৃষ্টি করে। মওলানা সাহেব দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েন। শেষে ইলেকশন করাই ঠিক হয়। কিন্তু ইলেকশন-বিরোধী দল মওলানা সাহেবকে ইলেকশন প্রচারে বের হতে দিলেন না। মওলানা সাহেব নিরুপায় হলেন। এরপর আসল কমিউনিস্টদের গণসংগঠন ছাড়ার পালা। এতসব সত্ত্বেও মওলানা সাহেব কমিউনিস্টদের উপর আস্থা রেখেই চলেছিলেন। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলতেন “আমার জীবনের সাধ ছিল দেশে সমাজতন্ত্র দেখেই মরব কিন্তু সেই সাধ বোধ হয় আর পূর্ণ হবে না।” মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আমাকে তিনি নছিহত করেছিলেন- “কৃষক সমিতি” গড়ে তোল, কৃষকদের দিয়েই এই দেশে বিপ্লব হবে।”
একথা সত্য মওলানা সাহেব কমিউনিস্ট ও কমিউনিজম সমর্থক হলেও নিজে তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার ইচ্ছাও তিনি কোনো দিন প্রকাশ করেন নাই। তিনি ডায়েলেকটিক্যাল মেটেরিয়ালিজমে বিশ্বাস করতেন না। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি কমিউনিস্ট ও কমিউনিজমকে অন্ধের মতো সমর্থন করে যেতেন এবং বিশ্বাস করতেন নিপীড়িত মানবজাতির মুক্তি কমিউনিস্টরাই আনতে পারবে। তাঁর ধর্ম, তাঁর রাজনীতি ছিল এই নিপীড়িত মানুষের জন্যই। তিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হলেও অন্যান্য মওলানাদের মতো তিনি সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকার করতেন না। তিনি বলতেন, “আসমানে জমিনে যাহা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর এবং প্রতিটি মানুষ আল্লাহর খলিফা, অতএব আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামতের উপর প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে। যারা শক্তি ও বুদ্ধির জোরে অন্যকে সেই নিয়ামত হতে বঞ্চিত করতে চায় তারা আল্লাহর নাফরমান। তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা মুসলিম হিসাবে অবশ্য কর্তব্য।”

ধর্মের মুখোশধারী বহু মওলানাকে বলতে শুনেছি শ্রেণীসংগঠন, শ্রেণীসংগ্রাম ইসলাম-বিরোধী। এই সেই দিন শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদে শিক্ষার লক্ষ্য শ্রেণীর সংগঠন ও শ্রেণীর সংগ্রাম সম্বন্ধে জ্ঞান সৃষ্টির কথা উঠলে দুই মওলানা ইসলাম গেল বলে চীৎকার করে উঠেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন এদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি শ্রেণীসংগঠন ও শ্রেণীসংগ্রামকে ধর্মের একটি অঙ্গ হিসাবে মনে করতেন। তিনি কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন: হজরত মুসা, হযরত সালেহর কথা। হযরত মুসা মিনারের নির্যাতিত দাসদের সংঘবদ্ধ করে ফেরাউনের বিরুদ্ধে লড়ে তাদেরকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিলেন। এই দাসরা ছিল বনি ইস্রাইল। হযরত সালেহ লড়েছিলেন তাঁর দেশের ফিউডালদের বিরুদ্ধে। যারা সাধারণ পশুচারণ ভূমি নিজস্ব করে নিয়ে সাধারণের পশুচারণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। হজরত সালেহ সেইসব নিষিদ্ধ এলাকাতে নিজের উটছেড়ে দিয়ে আইন অমান্য করেন। আমাদের রাসুলুল্লাহও কায়েমী স্বার্থবাদীদের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তৎকালীন মক্কার যুবকদের নিয়ে “হুলফুল ফজুল” গঠন করেন।
পাকিস্তানী যুগে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বলতেন: বিদেশী ইজম আনা এই দেশে সহ্য করা হবে না। এর দ্বারা তারা সোসিয়ালিজমকেই বুঝাত। মওলানা সাহেব তাদের উত্তর দিতেন রসুলের একটি হাদিছের উদ্ধৃতি দিয়ে। হাদিছে আছে, রসূলুল্লাহ (দঃ) জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যেতে বলেছেন। শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য অবশ্য নয়। তা মানুষের কাজে লাগানোর জন্য, মানুষের সম্মানের জন্য। কাজেই সমাজতন্ত্র বা সোসিয়ালিজম যদি বৃহত্তর মানবজাতির মঙ্গল নিয়ে আসে তবে তা গ্রহণ করা নিশ্চয় আমাদের ধর্মের একটি অঙ্গ।
জিয়া সরকার পাকিস্তান সরকারের সেই পুরানা গীত গাইতে শুরু করেছেন। বিদেশী ইজম নাকি বরদাস্ত করবেন না। এদিকে তিনি আবার মওলানার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চান। তিনি জানুক আর নাই জানুক আমরা যারা দীর্ঘ দিন ধরে তাঁর সাহচর্যে ছিলাম আমরা জানি তাঁর আদর্শ তাঁর স্বপ্ন কী ছিল। তিনি মনেপ্রাণে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেয়ে এসেছিলেন সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ শোষণহীন সমাজব্যবস্থা।
মওলানা কমিউনিস্টদের ভালবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন, সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য তাদের উপর নির্ভর করতেন। আমরা তাঁকে ভালবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম তাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শপথ নেব আমরা নিজেদের মধ্যে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার দ্বারা অতীতের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের পথে এগিয়ে যাব, মওলানার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে তুলব।
{লেখাটি পুনর্মুদ্রণ }
হাজী মোহাম্মদ দানেশ: কিংবদন্তি কম্যুনিস্ট কর্মী, রাজনীতিক, সমাজসংস্কারক।
