আমার চোখে ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’

‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’—নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে কৌতূহলের একটি দরজা। সেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে পাওয়া যায় হাসি, মজা, বিস্ময়, তথ্য, ইতিহাস এবং সর্বোপরি খ্যাতিমান মানুষদের এক অন্যরকম মানবিক মুখ।

কথাপ্রকাশ প্রকাশিত এবং অশোক বিশ্বাসের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা বইটি আমার হাতে পৌঁছয় ৯ মে ২০২৬। অশোক বিশ্বাসের লেখা আমি আগে থেকেই সমাজমাধ্যমে পড়ি। তাঁর লেখা আমার ভালো লাগে। তাই তাঁর সম্পাদিত এই বইটি হাতে পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে প্রথমে যখন ৪৫৬ পৃষ্ঠার বইটি হাতে নিয়ে পাতাগুলো উল্টে দেখছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—এত বড় বই শেষ পর্যন্ত পড়তে পারব তো?

আমি নিজেকে খুব ভালো পাঠক বলে দাবি করি না। পড়তে আমার সময় লাগে, আর ধৈর্যও খুব বেশি নয়। তাই বইটি হাতে নিয়ে প্রথমে একটু দ্বিধাই হয়েছিল। কিন্তু কৌতূহলটা ক্রমশ বাড়তে থাকল। একটি লেখা পড়ি, তার পরেরটি পড়ার ইচ্ছা হয়। এইভাবেই অল্প অল্প করে এগোতে এগোতে শেষ পর্যন্ত বইটি পড়ে ফেললাম। অবশ্যই সময় লেগেছে অনেকটা। কিন্তু বইটি শেষ করার পর মনে হয়েছে—সময়টা মোটেই নষ্ট হয়নি। বরং একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার কাছে এটি একটি আনন্দদায়ক পাঠ-অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।

একটি বই হাতে নেওয়ার পর প্রথমেই যে বিষয়টি পাঠকের নজর কাড়ে, তা হলো তার বিষয় নির্বাচন। খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা নামটিই যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। আমরা সাধারণত খ্যাতিমান মানুষদের তাঁদের কাজ, কৃতিত্ব ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে চিনি। সাহিত্যিক মানেই তাঁর সাহিত্য, বিজ্ঞানী মানেই তাঁর আবিষ্কার, রাজনীতিবিদ মানেই তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, শিল্পী মানেই তাঁর শিল্প, খেলোয়াড় মানেই তাঁর মাঠের সাফল্য। কিন্তু একজন বড় মানুষও যে আমাদের মতোই হাসেন, মজা করেন, কখনও পরিস্থিতিকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যে হালকা করে দেন—সেই মানুষটিকে আমরা কতটা চিনি?

এই বইটি সেই অচেনা মানুষটির সঙ্গেই আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। এখানেই বইটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা। খ্যাতিমানদের জীবনের যে দিকটি তাঁদের জীবনী, কর্মজীবন বা ইতিহাসের পাতায় অনেক সময় জায়গা পায় না, অশোক বিশ্বাস সেই দিকটিই সামনে এনেছেন। ফলে বইটি পড়তে গিয়ে অনেক পরিচিত মানুষকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ হয়। কোথাও তাঁদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, কোথাও আত্মরসিকতা, কোথাও পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা, কোথাও আবার নিছক স্বাভাবিক হাস্যরস—সব মিলিয়ে তাঁরা আমাদের কাছে আরও কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। রসিকতা এখানে শুধু হাসির বিষয় নয়। এই উপলব্ধিটি বইটি পড়তে পড়তে আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে। ভালো রসিকতার মধ্যে মানুষের চিন্তাশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা প্রকাশ পায়। অনেক সময় একটি ছোট্ট রসিক মন্তব্য এমন একটি সত্যকে প্রকাশ করে দেয়, যা দীর্ঘ বক্তৃতাতেও সম্ভব হয় না।

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরিতেও রসবোধের ভূমিকা কম নয়। কঠিন পরিস্থিতিকে সহজ করা, অস্বস্তিকর মুহূর্তকে স্বাভাবিক করে তোলা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমানো কিংবা মানসিক চাপের মধ্যে নিজেকে সামলে রাখা—সব ক্ষেত্রেই হাসির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সেই জায়গা থেকে দেখলে ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’ কেবল হাসির বই নয়; এটি মানুষের মন ও ব্যক্তিত্বকে বোঝারও একটি আনন্দময় উপায়। একজন পাঠক হিসেবে এই দিকটিই আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে।

অশোক বিশ্বাসের সংগ্রহ ও সম্পাদনার শ্রমও আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। এ ধরনের একটি সংকলন তৈরি করা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে নিশ্চয়ই ততটা সহজ নয়। নানা মানুষের নানা সময়ের ঘটনা, মন্তব্য, স্মৃতি, রসিকতা এবং কথোপকথনের মধ্যে থেকে উপযুক্ত উপাদান খুঁজে বের করা, যাচাই করা, নির্বাচন করা এবং পাঠকের সামনে সাজিয়ে দেওয়া—এর জন্য যথেষ্ট সময়, ধৈর্য ও অনুসন্ধিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ করে খ্যাতিমান ব্যক্তিদের রসিকতার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আরও বেশি থাকে। একটি ঘটনা অনেক সময় মুখে মুখে প্রচারিত হতে হতে তার উৎস হারিয়ে ফেলে। কোথাও চরিত্র বদলে যায়, কোথাও সময় বা স্থান বদলে যায়, কোথাও আবার একই রসিকতা অন্য কারও নামে চালু হয়ে যায়। সেই জায়গায় উৎসের প্রতি সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বইটিতে বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্রপত্রিকা ও পূর্বপ্রকাশিত রচনার সাহায্য নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করা হয়েছে। একজন পাঠক হিসেবে এই বিষয়টি আমার কাছে প্রশংসনীয়। কারণ একটি রসিকতার বই হলেও এর পেছনে যে তথ্যসংগ্রহ ও অনুসন্ধানের কাজ রয়েছে, সেটিকে অবহেলা করা হয়নি। ফলে বইটির প্রতি পাঠকের আস্থাও বাড়ে।

বইটির আর একটি বড় শক্তি হল বৈচিত্র্য। বিভিন্ন ক্ষেত্রের খ্যাতিমান মানুষ এই সংকলনে উপস্থিত। তাঁদের সময় আলাদা, কর্মক্ষেত্র আলাদা, চিন্তার জগৎ আলাদা, ব্যক্তিত্ব আলাদা। কিন্তু হাসি ও রসিকতার জায়গায় এসে তাঁদের মধ্যে একটি আশ্চর্য মানবিক সেতু তৈরি হয়েছে। এখানেই বইটি একঘেয়ে হয়ে ওঠেনি।

একজন পাঠক হিসেবে একটি বিষয় আমার বেশ ভালো লেগেছে—বইটি আমাকে শুধু হাসায়নি, কৌতূহলীও করেছে। কোনও পরিচিত ব্যক্তির নাম দেখলে তাঁর সম্পর্কে আরও পড়তে ইচ্ছে হয়েছে। কোনও ঘটনা পড়ে মনে হয়েছে, এই মানুষটির জীবনের অন্য দিকটাও জানতে হবে। অর্থাৎ একটি রসিকতা অনেক সময় অন্য একটি অনুসন্ধানের দরজা খুলে দিয়েছে।

এই বইয়ের সাফল্য এখানেও। আজকের ব্যস্ত সময়ে আমরা যেন ধীরে ধীরে হাসতে ভুলে যাচ্ছি। চারপাশে প্রতিযোগিতা, উদ্বেগ, উত্তেজনা, সামাজিক চাপ এবং নানা ধরনের টানাপোড়েন। মানুষের হাতে সময় কম, অথচ চিন্তার বোঝা বেশি। এই পরিস্থিতিতে একটি ভালো বই যদি পাঠককে কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি দেয়, মুখে হাসি আনে এবং একই সঙ্গে চিন্তার খোরাক জোগায়, তবে সেই বইয়ের প্রয়োজন নিঃসন্দেহে আছে। ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’ সেই প্রয়োজনটুকু পূরণ করে।

তবে বইটিকে শুধু ‘মন ভালো করার বই’ বললে তার প্রতি অবিচার হবে। কারণ এর মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক মূল্যও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের বিশিষ্ট মানুষের রসবোধ, তাঁদের কথাবার্তার ধরন, সামাজিক পরিস্থিতির প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আসলে একটি সময়ের সংস্কৃতির অংশ। সেই অর্থে এই ধরনের সংকলন ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে একটি মূল্যবান দলিল হয়ে উঠতে পারে।

আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল—এই বই খ্যাতিমানদের মঞ্চ থেকে নামিয়ে আমাদের পরিচিত মানুষের জগতে নিয়ে আসে। যাঁদের আমরা দূর থেকে দেখি, শ্রদ্ধা করি, তাঁদের কৃতিত্বের কথা জানি, তাঁদের জীবনের সাফল্যের কথা পড়ি—এই বইয়ে তাঁদেরই কখনও হাসতে দেখি, কখনও ঠাট্টা করতে দেখি, কখনও নিজের পরিস্থিতি নিয়ে রসিকতা করতে দেখি। তখন তাঁরা আর কেবল ‘খ্যাতিমান’ থাকেন না; হয়ে ওঠেন আরও স্বাভাবিক, আরও মানবিক। আর সম্ভবত মানুষের এই স্বাভাবিক মুখটিই সবচেয়ে সুন্দর।

প্রচ্ছদ নিয়েও দু’টি কথা বইটির প্রচ্ছদও বেশ নজরকাড়া। মোস্তাফিজ কারিগরের প্রচ্ছদ-নকশা বইটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে সুন্দরভাবে সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। নানা রঙের সরল মানব-আকৃতি, তাদের অঙ্গভঙ্গি ও গতিশীলতা যেন রসিকতা, কথোপকথন এবং মানুষের সামাজিক মেলামেশার একটি দৃশ্য তৈরি করেছে। প্রচ্ছদটি খুব বেশি ভারী নয়, আবার একেবারেই সাদামাটাও নয়। বইটির মেজাজ সম্পর্কে প্রথম দেখাতেই একটি ধারণা তৈরি করে।

প্রকাশক জসিম উদ্দিনের আন্তরিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত এই বইটি কলকাতার পাঠকের হাতেও পৌঁছেছে—এটিও আনন্দের বিষয়। বাংলা ভাষার দুই বাংলার পাঠকের মধ্যে বই যে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে কাজ করতে পারে, এমন একটি গ্রন্থ তারও একটি ছোট উদাহরণ।

সবশেষে আবার অশোক বিশ্বাসের কথাই বলতে হয়। একটি বড় সংকলন তৈরি করার কাজ কেবল তথ্য জোগাড় করার কাজ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে রুচিবোধ, নির্বাচনক্ষমতা, সম্পাদনার দক্ষতা এবং পাঠকের মন বোঝার ক্ষমতা। ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এই চারটি বিষয়ই বইটির নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

আমি জানি, আমার মতো ধৈর্য কম এমন পাঠকের কাছে ৪৫৬ পৃষ্ঠার একটি বই প্রথমে খানিকটা ভীতিকর মনে হতে পারে। কিন্তু বইটি হাতে নিয়ে কয়েকটি পাতা পড়তে শুরু করলে সেই ভয় অনেকটাই কেটে যায়। কারণ প্রতিটি নতুন নাম, নতুন ঘটনা, নতুন রসিকতা পাঠককে পরের পাতায় নিয়ে যায়। আমার কাছে বইটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই একটাই—খ্যাতিমান মানুষদের আমরা সাধারণত তাঁদের কীর্তির জন্য স্মরণ করি; ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’ তাঁদের একটু হাসিমুখে চিনতে শেখায়। আর একজন মানুষকে তাঁর হাসির মধ্য দিয়ে চিনলে হয়তো তাঁকে আরও গভীরভাবে চেনা যায়।

অশোক বিশ্বাসের এই শ্রমসাধ্য সংগ্রহ ও সম্পাদনার জন্য তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন। ‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’ নিছক রঙ্গরসের সংকলন নয়; এটি খ্যাতিমান মানুষদের ব্যক্তিত্বের এক অনালোচিত, মানবিক ও আনন্দময় জানালা। হাসতে হাসতে সেই জানালা দিয়ে তাকালে কখনও বিস্মিত হতে হয়, কখনও নতুন কিছু জানতে হয়, আবার কখনও নিজের জীবনকেও একটু অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছে করে।

একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে তাই বইটির প্রতি আমার আন্তরিক প্রশংসা রইল। যারা তথ্য, ইতিহাস, মানুষের জীবন এবং নির্মল রসবোধ—এই চারটির একটি সুন্দর মেলবন্ধন খুঁজছেন, তাঁদের কাছে বইটি নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে। বইটি সংগ্রহ করার মতো। পড়ার মতো। এবং পড়ে অন্যকে পড়তে বলার মতোও।

‘খ্যাতিমানদের রঙ্গরসিকতা’
সংগ্রহ ও সম্পাদনা: অশোক বিশ্বাস
প্রকাশনা: কথাপ্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশক: জসিম উদ্দিন 
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৬

দীপক সাহা : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক
করিমপুর। নদিয়া। পশ্চিমবঙ্গ

আরও পড়ুন