কৃষ্ণপক্ষ: হুমায়ূন আহমেদের তুলিতে আঁকা এক টুকরো বিষাদ ও ভালোবাসা

সাহিত্যের আঙিনায় যে কজন মানুষ শব্দকে দিয়ে জাদুর খেলা দেখাতে পারেন, হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই ক্ষণজন্মা লেখক আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন এমন কিছু চরিত্র, যারা আজও আমাদের আশেপাশে শ্বাস নেয়। ১৯ জুলাই—হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস। এই শোকের দিনে তাঁর লেখা কৃষ্ণপক্ষ বইটির কথা মনে পড়াটা যেন এক অনিবার্য আবেগ। মাত্র ৮৪ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি কেবল বই নয়, যেন সম্পর্কের এক গভীর দর্পণ।
সুবর্ণ প্রকাশনী থেকে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই বইটি প্রচ্ছদে ধ্রুব এষ এবং সমর মজুমদারের শৈল্পিক ছাপ বহন করে। তৎকালীন ৬০ টাকা মূল্যের এই বইটি ৪ মার্চ ২০০৮ সালে যখন সংগ্রহ করি এবং এইদিনই একবসায় বইটি পড়ে ফেলি। তখন জানতাম না এটি আমার হৃদয়ের কতটা কাছে জায়গা করে নেবে। ৪৩ টাকায় কেনা এই বইটি পড়ার সেই মুহূর্তগুলো আজও যেন স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মূল শক্তি হলো তাঁর সংলাপ। তিনি খুব সাধারণ শব্দ ব্যবহার করে অসাধারণ সব সত্য উন্মোচন করেন। কৃষ্ণপক্ষ’ উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এখানে প্রেম, দাম্পত্য এবং মানুষের ভেতরের একাকিত্বের এমন এক সূক্ষ্ম মিশেল রয়েছে যা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে।
বইটি পড়ার সময় আপনার মনে হবে এটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং আপনারই জীবনের কোনো এক অধ্যায়। এখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, অভিভাবকত্ব এবং মানুষের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার যে জটিল সমীকরণ লেখক এঁকেছেন, তা আপনাকে এক নিমেষে আবেগপ্রবণ করে তুলবে। বিশেষ করে, বইটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকা উক্তিগুলো যেন জীবনের কঠিন সত্যের প্রতিফলন:
“বাস্তবে স্বামীরা যতটা না বন্ধু তার চেয়েও বেশি অভিভাবক।” (পৃষ্ঠা-১৩)
“বিয়ের রাতেই তুমি নিশ্চয়ই প্রেগনেন্ট হতে চাও না?” (পৃষ্ঠা-১৭)
“পৃথিবীর সবচে’ মজার গল্পগুলি হচ্ছে অশ্লীল গল্প।” (পৃষ্ঠা-২১)
“আপনি কিছু জানেন না। যেহেতু এটা মূর্খের দেশ সেহেতু করে খাচ্ছেন।” (পৃষ্ঠা-৩৫)
“আমি আমার সমগ্র জীবনের বিনিময়ে তোমাকে চেয়েছিলাম। তোমাকে পেয়েছি। পৃথিবীর কাছে আমার আর কিছুই চাইবার নাই।” (পৃষ্ঠা-৪৬)
“বুড়ো ধাড়ির আবার জন্মদিন কি?” (পৃষ্ঠা-৫৪)
“তোমার একটি বিষয়েই উৎসাহ- স্ত্রীকে নগ্ন করে তার দিকে তাকিয়ে থাকা।” (পৃষ্ঠা-৬৮)
“যা শেখার আমি নিজে নিজে শিখি। কারো কাছ থেকে আমি কিছু শিখি না।” (পৃষ্ঠা-৬৯)
এই বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথে আপনি অনুভব করবেন এক অদ্ভুত শূন্যতা এবং পূর্ণতার সহাবস্থান। এটি এমন এক উপন্যাস, যা পড়লে মনে হয় মানুষ হিসেবে আমরা কতটা একা এবং একই সাথে কতটা প্রিয়জনের ওপর নির্ভরশীল। হুমায়ূন আহমেদ এখানে দাম্পত্যের শীতলতা এবং উত্তাপ—উভয়ই খুব সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন। যারা জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘কৃষ্ণপক্ষ’ একটি পাঠ্যবইয়ের মতো।
আমি এই লেখাটি লিখেছি বইয়ের কোনো প্রচলিত রিভিউ দেওয়ার জন্য নয়। আমার উদ্দেশ্য, প্রিয় পাঠক, আপনাদের সাথে কিছু ভালো বইয়ের খোঁজ শেয়ার করা। যে বই আমাদের অন্ধকার সময়ে আলোর পথ দেখায়, একাকীত্বে সঙ্গ দেয়, সেই বইগুলোই হোক আমাদের আসল বন্ধু।
আজ এই মৃত্যুদিনে, লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি—বই কিনুন, বই পড়ুন এবং নিজের লাইব্রেরিতে এমন কিছু সৃষ্টি জমিয়ে রাখুন যা আপনাকে বারবার পড়তে বাধ্য করবে। হুমায়ূন আহমেদের মতো এমন জাদুকর লেখক আমাদের মাঝে বারবার আসেন না, কিন্তু তাঁর বইগুলোর মাধ্যমেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
বই: কৃষ্ণপক্ষ
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশনী: সুবর্ণ প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯২
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ ও সমর মজুমদার
মূল্য: ৬০ টাকা (প্রকাশকাল অনুযায়ী)
