তারুণ্যের দ্রোহ, স্বপ্নভঙ্গ এবং এক চরম বাস্তবতা: ফিরে দেখা ‘গর্ভধারিণী’

সমরেশ মজুমদার বাংলা সাহিত্যের এমন একজন কথাসাহিত্যিক, যিনি নিখুঁত তুলির টানে মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব আর রাজনৈতিক দোলাচলকে কাগজে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস গর্ভধারিণী তেমনই একটি সৃষ্টি, যা পাঠককে কেবল গল্পে বুঁদ করে রাখে না, বরং সমাজব্যবস্থার নগ্ন রূপটার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সম্প্রতি বইটি পড়ার পর মনে হলো, নব্বইয়ের দশকের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি আজকের দিনে দাঁড়িয়েও কতটা প্রাসঙ্গিক।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে চার তরুণের গল্প- জয়িতা, সুদীপ, কল্যাণ এবং সন্তু। তারা তথাকথিত অপরাধী নয়, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা অন্যায়, দুর্নীতি আর শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ একদল স্বপ্নচারী। এই চার তরুণের ক্ষোভ ও বিদ্রোহের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে জয়িতা। জয়িতা চরিত্রটি চেনা ছকের চেয়ে একদম আলাদা। সে প্রথাগত নারীত্বের সীমানা ভেঙে এক শক্তিশালী নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়, যে বাকি তিন যুবককে এক সুতোয় বাঁধে। সমরেশ মজুমদার এখানে কোনো কাল্পনিক সুপারহিরোর গল্প বলেননি। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র রক্তমাংসের। তাদের স্বপ্নগুলো যেমন সত্য, তাদের ভেতরের ভয়, সংশয় এবং পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলোও ঠিক ততটাই বাস্তবসম্মত।

গর্ভধারিণী মূলত সমাজ পরিবর্তনের এক চরম ও নিষ্ঠুর লড়াইয়ের দলিল। জয়িতা ও তার বন্ধুরা সমাজকে শুদ্ধ করতে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিতে চায় নিজেদের মতো করে। কিন্তু তারা দ্রুতই বুঝতে পারে, শত্রু কেবল গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ মানুষ নয়; শত্রু আসলে পুরো সমাজকাঠামো। লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দেখিয়েছেন যে, আদর্শের পথে হাঁটা কতটা কঠিন। রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতাশালী চক্র কীভাবে অবলীলায় তরুণদের পবিত্র স্বপ্নগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তা উপন্যাসের পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে। কোনো চটকদার রোমান্টিকতা নয়, বরং এক কঠোর ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে লেখক গল্প শেষ করেছেন।

যেকোনো সময়ের তরুণ প্রজন্মের ভেতরের ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে এই বইটিতে নিখুঁতভাবে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি জয়িতা চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, নারীরা কেবল পুরুষের সহযোগী নয়, বরং প্রয়োজনে পরিবর্তনের মূল কান্ডারি হতে পারে। সমরেশ মজুমদারের স্বভাবসুলভ সহজ অথচ ধারালো ভাষা পাঠককে এক বসায় পুরো বইটি শেষ করতে বাধ্য করে।

গর্ভধারিণী কেবল একটি political বা thriller ঘরানার উপন্যাস নয়, এটি একটি চিরন্তন প্রশ্ন। বইটি পড়ার পর পাঠক হিসেবে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, যে সমাজের পচন এত গভীরে, সেখানে ব্যক্তিগত সততা বা কয়েকজন তরুণের বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ কি আসলেই কোনো পরিবর্তন আনতে পারে? নাকি এই সমাজকে নতুন করে জন্ম দেওয়ার জন্য এক মহীয়সী গর্ভধারিণীর প্রয়োজন? যাঁরা সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের মনস্তত্ত্বকে একটু গভীরভাবে বুঝতে চান, তাঁদের জন্য এই উপন্যাসটি একটি অবশ্য পাঠ্য মাস্টারপিস।

লেখক: আনিকা তাসনিম

আরও পড়ুন