আত্মবিশ্বাসী এবং সফল মানুষ গড়ার কারিগর আত্মোন্নয়ন

‘দেখুন আমি যখন তাকে বিয়ে করেছি, তখন এই ভেবেই তো বিয়ে করেছি যে সারা জীবন আমরা একসঙ্গে থাকব, তার পাশে থাকব। সে এখন আমাকে চেনে না, এটা ঠিক, কিন্তু আমি তো তাকে চিনি। বিয়ে কোনো আবেগের ব্যাপার নয়, ফিলিংসের ব্যাপার নয়, বিয়ে হলো একটি সিদ্ধান্ত, কমিটমেন্ট, একটি বিশ্বস্ত চুক্তি, যা মানব বলেই স্বাক্ষর করেছি। বিয়ে গভীর অর্থবোধক একটি বিষয়, হালকা বিষয় নয়’ (রহমান, পৃ-৪৩)। আমার এই লেখাটি আমি আলোকপাত করছি বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমানের আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বই থেকে। মানুষ যদি বই পড়তে পারে, তাহলে তার মাঝে নানা মাত্রিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। জীবনে অনেক বই পড়েছি তবে আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইয়ের মতো বই আর পড়া হয়নি। আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইটি স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালের মে মাসে প্রকাশিত। বইটির লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমানকে ধন্যবাদ দিতে হয় এ কারণে যে, এমন চমৎকার একটি বই পাঠককে উপহার দেওয়ার জন্য। একই সাথে স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনীর প্রকাশক জনাব আবু সাঈদ সাহেবের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি এমন একটি বই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বই নিয়ে কথা বলার আগে আমি একটু আলোচনা করে নিতে চাই আত্মোন্নয়ন নিয়ে। আপনি এই বইটি পড়েন বা না পড়েন কোনো দোষের বিষয় নয়। তবে আত্মোন্নয়ন কী, এটা কীভাবে করা যায়, কত সময় লাগে, সে বিষয়টি নিয়ে জানতে সমস্যা হওয়ার কথা না।

‘আত্মোন্নয়ন’ বা Self Development হচ্ছে নিজের উন্নয়ন। আমি যদি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বলি, তাহলে বলা যায় যে ধরুন আপনি আমেরিকার শ্রেষ্ঠ একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এমআইটিতে শিক্ষার জন্য যাবেন। সে ক্ষেত্রে আপনার প্রথম আইএলটিএস স্কোর দরকার, আপনার একটি ভালো মোটিভেশন লেটার দরকার, আপনার কিছু এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ থাকা দরকার। আর এসব বিষয় ধীরে ধীরে আয়ত্ত করে নিলেন বা শিখে নিলেন। আর এই শিখে নেওয়া বা আয়ত্ত করাটাকেই বলা হয় আত্মোন্নয়ন। আর এই আত্মোন্নয়নের জন্য একটি একটি পরিকল্পনা তৈরি করে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দুর্বলতা এবং শক্তিশালী দিক চিহ্নিত করতে পারাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যে বই নিয়ে আলোচনা, ইতিমধ্যে সে বইয়ের নাম আপনারা জেনেছেন। বইটির নাম আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা। বইটি নিয়ে লেখক নিজে বইয়ের প্রসঙ্গ কথার মাঝে এই বইয়ের মূল নির্যাস তুলে ধরেছেন। আমরা যদি আত্মোন্নয়নের কথা বলি, তাহলে এই বইয়ের উৎসর্গ অংশের দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হব। বইটি তিনি তাঁর মা জোবেদা বেগমকে উৎসর্গ করেছেন। মাকে উৎসর্গ করার মধ্যে দিয়ে মায়ের প্রতি তাঁর মমতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার স্বাক্ষর রেখেছেন। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষকে সম্মান দেখায়, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, তার ফলে তার সম্মান আরও বেড়ে যায়।

লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমান তাঁর এই আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইয়ের ১০, ১৩, ২৪, ২৫ নম্বর অধ্যায়ে সুন্দর করে বর্ণনা দিয়েছেন। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বা Power of Respect এটি মানবদেহে কি পরিমাণ উপকার করে, সেটা যারা শ্রদ্ধা করে আর যারা শ্রদ্ধা করে না, সেটি সহজ দৃষ্টান্ত হতে পারে। তার পরেও বলি মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার তার ব্রেনের ভেতর একপ্রকার নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে। যার ফলে তার ভালো বোধ হয়। আর উত্তম গুণের ব্যক্তিদের ব্রেনে শ্রদ্ধার নিউরোপাথওয়ে তৈরি হয়ে যায়। ফলে তাদের মাঝে মানবিক বোধ তৈরি হয়। এমন ভিন্ন ভিন্ন অনেক চিন্তা আমাদের আত্মাকে উন্নয়ন করতে পারে।

লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ভালো ভালো গুণের ব্যবহার করে, খারাপ কিছু থেকে নিজেকে বিরত রেখে ঝগড়াবিবাদমুক্ত হয়ে সুন্দর সুখের স্মৃতির মাঝ দিয়ে আত্মোন্নয়ন করা সম্ভব। ঝগড়া করে কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে একটি সুন্দর পরিবেশে বিতর্কের মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে একটি চমৎকার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। একে অন্যকে বোঝার মধ্যে দিয়ে সমাজরে ঝগড়া-বিরোধ নির্মূল করা সম্ভব। অতীত নিয়ে মন খারাপ না করে হাসিমুখে মানুষের কল্যাণ করার মধ্যে দিয়ে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা পূরণ করে তাঁর নিয়ামত ভোগ করেও একটি মানুষ ভালো থাকতে পারে।

লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমান তাঁর আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে পজিটিভ থিংকিংয়ের মাধ্যমে একটি সুন্দর মন তৈরি করা যায়। আর সেই সুন্দর মন থেকে কীভাবে সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি হতে পারে, কীভাবে সুন্দর চিন্তার মাধ্যমে কষ্ট লাঘব করা যায়। একটি সুস্থ চিন্তা মানুষের ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। লেখক একাধিক উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কীভাবে পরিচ্ছন্ন মন, উষ্ণ হৃদয় দিয়ে অনন্ত সুখ-শান্তি একটি বিশ্বস্ত চুক্তি অটুট রাখা যায় সে বিষয়। আমরা বর্তমান সময়ে এই আকাশ সংস্কৃতির ফাঁদে পড়ে কত ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছি, তার ভালো-মন্দ দিকগুলো লেখক তুলে ধরেছেন। একই সাথে কীভাবে ভুল পথ থেকে নিজের একটি স্বচ্ছ চিন্তার মাধ্যমে একটি সুন্দর, সুখী, সফল মানুষ হিসেবে বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং আত্মবিশ্বাস মানুষকে যে কতটা সফলতার কাছে নিয়ে যায় সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

সব সময় পজিটিভ চিন্তা করার মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করুন। নিজে সৎ থাকুন, ধৈর্য ধরুন, আত্মবিশ্বাস রাখুন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। শারীরিক-মানসিক সুস্থতায় এবং জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য Positive thinking অত্যাবশ্যক। আমরা সৎ হব নাকি দুর্নীতিগ্রস্ত হব, হিংসুক হব নাকি সহমর্মিতা বোধের মানুষ হব, নির্মম হৃদয়ের হব নাকি দয়াবান হব, লোভী হব নাকি পরোপকারী হব সেটা নির্ভর করে কী চিন্তাভাবনায় আমরা নিজেকে গড়ে তুলব তার ওপর। গভীরভাবে ভাবতে পারলে হতাশা, রাগ, হিংসাসহ বিভিন্ন নেতিবাচক চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে।

এই বইয়ে লেখক একজন সৎ, জনপ্রিয় ও সেরা মানুষের ভেতরে থাকা গুণের কথা বলেই শেষ করেননি। কীভাবে সৎ হতে হয়, তার নির্দেশনাও তুলে ধরেছেন। একটি ভালো সম্পর্ক কীভাবে তৈরি করা যায়, কীভাবে কোনো সময় ভালো লাগার হরমোনগুলো বেশি সক্রিয় থাকে, সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। আপনি কীভাবে সফল বক্তা হবেন, তার বিষয়ে লেখক লিখেছেন, ভালো হৃদয়ের, অধিক জ্ঞান অর্জনের, মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ভাষাজ্ঞান এবং ইনবর্ন ট্যালেন্ট কথা। কোনো মানুষের মাঝে যদি এই বিষয়গুলো বিদ্যমান থাকে, তাহলে তিনি ভালো একজন বক্তা হতে পারবেন।

লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমান তাঁর আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইয়ে সফল ব্যক্তিদের জীবনে সফলতার পেছনের গল্পগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের উদ্যোক্তা হওয়া, তাদের মানসিকতা, পারিবারিক জীবনের কথা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আপনার জীবন আপনাকেই নির্বাহ করতে হবে। আপনি যদি সুন্দর হৃদয়ের, আর সফল মানুষ হতে চান, তাহলে এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কি জেদ অথবা গোঁয়ার্তুমি করে কাজ করবেন, না প্রতিজ্ঞা বা সংকল্প নিয়ে কাজ করে সফল হতে আগ্রহী।

লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমানের আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইটি ছোট হলেও তার প্রতিটা শব্দ, বাক্যে এবং তার অর্থ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয় বই পড়ার আগে ভাবতে পারিনি। আত্মোন্নয়ন করতে চাইলে কেউ যদি ভাবেন, কীভাবে শুরু করব, তাদের জন্য বলছি, এত ভাবার দরকার নেই। অর্থ নষ্ট করে বই কিনে, সময় নষ্ট করে লেখক ড. মো. আলমাসুর রহমান আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা বইটি সূচিপত্র ধরে শুরু থেকে ৭৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে যান। আপনার সফলতার জন্য হতে পারে আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা একটি নিয়ামক।

আত্মোন্নয়নের চিন্তাধারা
ড. মো.আলমাসুর রহমান
বইয়ের ধরন: উন্নয়নমূলক
প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশক: স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন
প্রকাশকাল: মে ২০২৩
মূল্য: ১৮০
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৮০

আরও পড়ুন