মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদের ‘পথ চলাতেই আনন্দ’


ব্যাংকিং পেশাকে আমরা সাধারণত কাঠখোট্টা একটি জগৎ হিসেবেই দেখি, অর্থের ডেবিট–ক্রেডিট, হিসাব-নিকাশ আর নিয়ম-নীতির চাপে যেখানে সাহিত্যচর্চার জায়গা তুলনামূলক কম। তবে সবসময় যে তাই হয়, তা নয়। ব্যতিক্রমদের একজন হলেন মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ।যিনি শিক্ষাজীবনে গোল্ড মেডালিস্ট, এক্স ক্যাডেট, মেরিনার এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকার। এনসিসি ব্যাংকের সাবেক ম্যনেজিং ডিরেক্টর, বর্তমানে ইউসিবি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও।

তার লেখা বই পথ চলাতেই আনন্দ হাতে নিলে বোঝা যায় ব্যাংকারের হিসাবমুখী জগৎ পেরিয়েও কত গভীর অনুভব ও সাহিত্যপ্রবণতা তার ভেতরে কাজ করে।

বইটি আমি অল্প অল্প করে পড়েছি। কারণ, শেষ হয়ে যাওয়া মানেই যেন আনন্দেরও শেষ। করোনাকালীন দুঃসময়ে লেখকের একাকিত্ব, সময়কে উপভোগ করার ভঙ্গি এবং ছন্দময় বর্ণনা পাঠককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।

বইটিতে তিনি বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনির উদাহরণ টেনেছেন, আবার শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত এর কোয়ারেন্টিন প্রসঙ্গ সাজিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে।

সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ছিল লেখকের শিক্ষক প্রফেসর প্রসাদ কাইপাকে নিয়ে বলা গল্পটি যেখানে কল্পনাশক্তির শক্তি ও উদ্দীপনামূলক ঘটনা সত্যিই অনুপ্রেরণা দেয়।

ব্যাংকার হিসেবে তিনি গ্রাহককেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা নিয়ে সুন্দর বিশ্লেষণও দিয়েছেন। রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্টয়ের The Three Questions, সমারসেট মমের গল্প—এসবের উদাহরণ এনে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়েছেন চমৎকারভাবে।

বাংলা সিনেমা মেঘের অনেক রং নিয়ে তার স্মৃতিচারণা পাঠককে নস্টালজিয়ায় ভাসায়।
আমি আগে ধীরাজ ভট্টাচার্যের যখন পুলিশ ছিলাম বইটির কথা শুনলেও পড়া হয়নি। লেখকের বর্ণনা পড়ে প্রথমবারের মতো মাথিনের কূপ সম্পর্কে জানলাম, এটিও বইটির একটি নতুন শেখা।

কেনিয়ার মাসাইমারা সাফারি পার্কে তার অভিজ্ঞতা সত্যিই গল্পের ঝুড়িকে সমৃদ্ধ করেছে। মাসাইদের গ্রাম, তাঁবুর বর্ণনা, চোখের সামনে ধরা পড়া বন্যপ্রাণীর দৃশ্য ইত্যাদি সব মিলিয়ে পাঠকও যেন তার সাথে সাফারিতে ঘুরে আসে।

ছাত্রজীবনে কলকাতা ভ্রমণ, জাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আগ্রার তাজমহল ভ্রমণ সবকিছু এত জীবন্তভাবে বর্ণনা করেছেন যে আমরাও যেন তার সঙ্গে হাঁটছি, দেখছি, উপভোগ করছি।

কেজি পরোটার বর্ণনা পড়ে মনে হয়েছে,এখনই গিয়ে খেয়ে আসি!

লেখকের শ্রীনগর ভ্রমণ, বার্লিন ওয়াল, মিউজিয়াম আইল্যান্ড দেখা ও এসব জায়গার অভিজ্ঞতাও পাঠককে সমানভাবে টেনে নিয়ে যায় সেই ঐতিহ্যের কাছে।

বইয়ের একটি সুন্দর অংশ তার বাবা-মায়ের বর্ণনা। আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধা মিশে রয়েছে সেখানে।

এক জায়গায় তিনি রহস্যময়ভাবে হারিয়ে ফেলা এক সহপাঠীর গল্প বলেছেন যা মানুষের অজানা ও অচেনার প্রতি আকর্ষণকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

খালার অকালমৃত্যু, ছোটবেলার সাইকেল চালানোর স্মৃতি, সাম্প্রতিক ঢাকার সাইক্লিং অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে পাঠকও যেন তার সাথে সাইকেল চালাতে চালাতে চলে যায় শৈশবের সেই উচ্ছ্বাসে।

বন্ধুত্ব, রিইউনিয়ন, অনুপ্রেরণা, স্মৃতিচারণা—পুরো বইজুড়ে লেখক এক উষ্ণ ও মানবিক আবহ তৈরি করেছেন। ব্যাংকার হয়েও তার লেখনী এত প্রাঞ্জল, সহজ ও প্রাণবন্ত—এটাই বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

পথ চলাতেই আনন্দ” প্রকাশ করেছে রুটস প্রকাশন। চলতি পথের অভিজ্ঞতা, মানুষের গল্প, ভ্রমণ, স্মৃতি—সব মিলিয়ে বইটি যেন জীবনের এক চলমান ডায়েরি। এমন জীবন্ত অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে লেখকের আরেকটি বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।

আরও পড়ুন