অন্ধকারের উপকথা থেকে ভদ্রাসন : আদিচেতনার প্রবাহ চারণা

‘অণুগল্প’ ছোট করে লেখা গল্পের রূপ নয়। অণুগল্প স্বতন্ত্র একটি সাহিত্য ধারা—যার আদি-মধ্য-অন্ত থাকা, কিংবা ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ পরিণতিতে পৌঁছানোর বিষয়টিও ততটা জরুরি নয়। এর ঝটতি উত্থান এবং ঝটতি পতন, কতগুলি রেখাঙ্কিত শব্দচিত্র, যার মধ্যে জীবনদর্শন, অস্পষ্টতা বা রহস্যময়তা বা অধরা ও না-বলা বিরাজ করে। এরকমই দুটি বই নিয়ে এই লেখার আয়োজন।

মানুষের সাইকোলজি বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান মনস্তত্ত্ববিদ সিগমণ্ড ফ্রয়েড মানবজীবন সম্পর্কে বলেছেন:

“We are what we are because we have been what we have been, and what is needed for solving the problems of human life and motives is not moral estimates but more knowledge.”

অর্থাৎ আমরা যা রয়েছি কারণ আমরা যা ছিলাম তাই আমরা ছিলাম, এবং মানুষের জীবন এবং উদ্দেশ্যগুলির সমস্যা সমাধানের জন্য যা প্রয়োজন তা নৈতিক অনুমান নয় বরং আরও জ্ঞান। অর্থাৎ মানুষ যে আদিমতা নিয়ে তার প্রবৃত্তিযাপনের অভিমুখ উন্মোচিত করে তার পরিবর্তন করা যায় না। জীবন জীবনের দাবি নিয়েই চলতে বাধ্য। কথাগুলি মনে পড়ল ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের অণুগল্পের বই ‘অন্ধকারের উপকথা’ (২০১৭) পাঠ করতে গিয়ে। মানবজীবনের এই অন্ধকার যা যৌনতা, সহিংসতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, হিংস্রতা, কঠোরতা এবং অসহিষ্ণুতা ও অসামাজিকতার মধ্যে কেন্দ্রীভূত। মোট ৬৪টি অণুগল্পের ভেতর দিয়ে লেখক জীবনের পাঠ দিতে চেয়েছেন। যে পাঠের মধ্যে আছে রহস্য, অর্ধস্ফুটতা, ছায়াছন্নতা, না-কথা ও শূন্যতা। তবে পারিপার্শ্বিক মানবজীবনের নানা অন্তরায় কিভাবে ঘনীভূত হয়েছে, জীবনের ছেঁড়াখোঁড়া মালিন্য, হতাশা, বিপন্নতা, মনুষ্যেতর জীবন, রাজনৈতিক চক্রান্ত খুনজখমের ইঙ্গিতময় কাহিনিও তিনি সংকেতবদ্ধ করেছেন।

গ্রন্থের দুটি অংশ—’বেহুলামঙ্গল’ এবং ‘মহাকাহিনিপাঠ’। দুটি অংশ জুড়েই আছে অন্ধকারযাপনের জীবন অন্বেষণ। নেশাখোর পুরুষের সাপিনী রূপ নারীর যৌনছোবলের বিষ নামানোর কাহিনি থেকে নারীর প্রেমিকা রূপ এবং স্ত্রী-রূপের আসক্তির পরিচয়। স্বামী ও প্রেমিক দুয়েরই অভাবে তার বিরহ চেতনা। শরীর বিক্রি করে জীবনধারণের পরিচয়। তেমনি শরীরও ভিক্ষার ঝুলি। অল্প টাকাতেই তা ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। মনস্তাত্ত্বিকভাবেই তার সন্তানের মধ্যেও চারিত হয় এই আচরণ। বোষ্টুমির ভালবাসার আসক্তি কখনো কান্নার রূপ পায়। প্রেমিকের চোখে সেখানে শরীরী রূপটিই প্রকট হয়ে ওঠে। রাজাবাদশার মতো রূপকথার গল্পেও পুত্রসন্তান জন্ম দিতে অক্ষম রানি রাজার অনুমতিতেই পুত্রসন্তান লাভের আশায় সন্ন্যাসীর আশ্রমে কামক্রীড়ার সুখ পায়। তখন রাজঐশ্বর্যও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। তেমনি কাজের মেয়ের মধ্যেও এই যৌনতার আবির্ভাব ঘটে। অসম ব্যাপার হলেও তা স্বাভাবিক। কখনো গুরুজি ছাত্রীর মায়ের শরীরও ভোগ করে। স্বামী জানতে পেরে বলে “তন্দ্রার পিরিয়ড হয়েছে। চান্স নেই এবার।”

অধ্যাপিকা হলেও অনেক পুরুষ সঙ্গী দরকার হয় বাণীদির। বৃষ্টির দিনে কেউ না থাকলে হাবুকেই জড়িয়ে ধরে। সঙ্গমের অনুভূতি পাপ মনে হলেও আবার তা কেটে যায়। পুরনো প্রেম নতুন করে জেগে ওঠে। মননশীল যৌনতার মোচড় যা তির্যক গতিময় অন্ধকারের সংলাপ। পরকীয়ায় সিক্ত, দাম্পত্যে বিচ্ছেদ, ব্যবহারে বৈপরীত্যের প্রকাশ, সেখানে কান্নার মধ্যেও যৌনতার উদ্ভব ঘটে। আত্মচেতনার মধ্যেও যৌনতার কাল্পিক দেহ নির্মাণ চলতে থাকে। রেন্ডি নারীর বহু পুরুষের সংস্পর্শ, প্রেমকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য সমলিঙ্গ হওয়া এবং প্রকৃতির মধ্যেও জৈবনিক সংলাপ গল্পগুলিকে তীব্র ও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। কবিতার শরীরে লেপ্টে গেছে মায়াময় জীবনচক্রের আধার।

    ‘মহাকাহিনিপাঠ’ অংশেও সময়ের গতিনির্ধারক নদীপ্রবাহে ভেসে উঠেছে অজস্র ঘটনার ঘনঘটা। মহাভারতের মহারণকে উল্লেখ করেই এই গল্পচক্রের প্রজ্ঞাবিন্যাস। এখানে সব গল্পই ‘দুঃখে সেলাই করা’। বস্তিবাসী, প্ল্যাটফর্মবাসী, উদ্বাস্তু মানুষের জীবনচক্রের বেশি প্রতিফলন ঘটেছে। শ্রমিকের মৃত্যু, রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু, জয় শ্রীরাম ধ্বনি,মবলিঞ্চিং, গৃহযুদ্ধ, মাওবাদী কিষানজির কথা, অসহায় জীবনের কথা সবই উঠে এসেছে। আর এসব নিয়েই অন্ধকারের রূপকথা। একটি সংলাপ উল্লেখ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে:

“—ওই যে কে একজন না খেয়ে মরে গেল…

—বাচ্চা মেয়ের হাতের আঙুল পুলিশ এসে কেটে ফেলল…

—একটা মেয়ে স্কুল থেকে ফিরছে, তাকে পাঁচ-সাত জন মিলে…

—তারপর ওই চাপাতি, পেট্রোলবোমায় জ্বলছে যাওয়া মুখ, বাপের সামনে খুন হয়ে গেল ছেলে….”

এইসব সময়ের অবক্ষয়, মূল্যবোধহীন চিত্রগুলি গল্পের বিষয়। লেখক এখানেই জীবনকে খুঁজেছেন। কিন্তু জীবন সেই আদিম অভ্যাসেই ক্রিয়াময় বন্যসভ্যতা নিয়ে বিরাজ করছে।

দুই.

মানুষের অবচেতন মনের ক্রিয়া সম্পর্কে সিগমুন্ড ফ্রয়েড আরও বলেছেন:

 “There is a powerful force within us, an unilluminated part of the mind— separate from the conscious mind that is constantly at work molding our thought, feelings, and actions.” 

অর্থাৎ আমাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী শক্তি আছে, মনের একটি অপ্রকাশিত অংশ—সচেতন মন থেকে আলাদা যা আমাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং ক্রিয়াকে ঢালাই করে নিরন্তর কাজ করে।ব্রতী মুখোপাধ্যায় তাঁর আরেকটি অণুগল্পের বই ‘ভদ্রাসন'(২০১৭)-এও মানবমনের গহনগভীর অবচেতনের ক্রিয়াগুলিকে তুলে এনেছেন, যা চিরন্তন জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে। তাই গল্পগুলিতে বাল্য-কৈশোর-বয়ঃসন্ধি-যৌবন এবং বিগত যৌবন ও বার্ধক্যের নানা ক্রিয়া, উপলব্ধি ও ভাবনার প্রকাশ আছে। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনের অন্তরালে মানুষ কিভাবে আদিম প্রবাহে অবগাহন করে চলেছে তা অকপটভাবে দেখিয়েছেন। ‘ভদ্রাসনে’ মোট ৫৩ টি গল্প আছে।গল্পগুলিকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে: ‘স্নাতক’, ‘রূপকথার দেশে’ ও ‘যুদ্ধ’। গুরু-শিষ্যের অস্ত্রবিদ্যা-পরীক্ষার সংলাপের ভূমিকা দিয়ে গল্পের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছে। পক্ষীর চক্ষুতে তিরবিদ্ধ করতে গিয়ে শিষ্য অস্ত্র ত্যাগ করতে চেয়েছে। স্নাতক হতে পারেনি। গল্পের রহস্যের মধ্যে লেখক পাঠককে ছেড়ে দিয়েছেন। কেন, কিভাবে, কোথায়, কে বা কারা তার কোনো স্পষ্ট সদুত্তর বা কারণ পাওয়া যাবে না। বাড়ির ঝির বুকে হাত, চুমু খাওয়া; কুকুর পাহারা দিলেও বোবা মেয়ের পেটে বাচ্চা আসে; রিক্সাওয়ালা মার্ডারার তা স্বীকার করে; কাশি, কোমরের হাড় ভাঙা, জ্বর, পালানো মেয়েকে ফিরিয়ে আনা, বউকে বশে রাখা, চাকরিপ্রাপ্তি প্রভৃতির জন্য মন্দিরে পূজা দান; সবজি বাগানে ফুল নেই কিন্তু নবম শ্রেণির মেয়েই ফুল প্রভৃতি বিষয়গুলি গল্প হয়ে ওঠে। যৌবনের পড়াশুনা, বই সংগ্রহ,কত-কী জানার আগ্রহ কিন্তু জীবন সায়াহ্নে উদাসী মন সেসবে আর কৌতূহল নেই। শিশুমনস্তত্ত্বের প্রভাবে মান-অভিমান, বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গতা বারবার ফিরে এসেছে। 

    গল্পের দ্বিতীয় পর্বে পুরাণপ্রসঙ্গেই রোমান্টিক আবহ; সেখানে প্রিয়ংবদার নিতম্বের মায়াদোলন এবং ভ্রূ-যুগলে রহস্যসাপ আদিমচেতনার প্রজ্ঞাকেই ইঙ্গিত করেছে। এই পর্ব শুরু হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর সংলাপে রাতে বিছানায় ঘাম ঝরানোর কামক্রীড়ায়। তারপর এক কবির সঙ্গে অন্যের বউ পালানোর প্রসঙ্গ। সুন্দর মার্জিত শিক্ষিত পুরুষের প্রেমে পড়ে দেখা গেছে সেও সমকামী। আবার সদ্য বিবাহিত পুরুষেরও অত্যাধিক কামুক পরিচয়। শিশু বয়সে ফুলের সৌন্দর্য মায়ের কাছে বর্ণনা করলেও যৌবনে মেয়েদের বুকে ফুটে ওঠা স্থলপদ্মের বর্ণনা করতে পারে না। শ্বশুর-বৌমার দৈহিক সম্পর্ক এবং মায়ের স্বর্ণালংকার হারানো প্রসঙ্গও খুব মনস্তাত্ত্বিক। অধ্যাপকের পরকীয়ায় পাপ-পুণ্যের ধারণারও নস্যাৎ হওয়া সবই আদিম চেতনার প্রবাহের শামিল।

তৃতীয় পর্বে  আছে যুদ্ধপ্রসঙ্গ। এই যুদ্ধ একদিকে ইতিহাসখ্যাত বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আতঙ্কের স্মৃতি, অন্যদিকে জীবনযুদ্ধ, বেঁচে থাকার আয়োজন। কিন্তু লেখক সুকৌশলে মনস্তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন, যার ফলে যুদ্ধ ব্যক্তিজীবন এবং সমাজজীবনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই পর্বের ভূমিকায় স্ত্রী সঙ্গমে অকৃতকার্য স্বামীর হতাশা ফুটে উঠেছে । অর্থাৎ যৌনযুদ্ধে সে পরাজিত। গল্পগুলিতে ফিরে এসেছে ধর্ষণ, পুড়িয়ে মারা, প্রতিবাদী মিছিল, যুবকদের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করা ইত্যাদি নানা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। প্রেমিকার বিয়ে ঠিক হলেও, প্রেমিক বামপন্থী রাজনীতিতে দেওয়াল লিখনে ব্যস্ত।বিপ্লবস্পন্দিত পৃথিবী আনবে সে। রাজনৈতিক পোস্টার দেওয়ালে সাঁটার জন্য ঘুঁটেগুলো ফেলে দেয়। বোমা বাঁধতে গিয়ে হাত উড়ে যায়।’ছাই ছাই গন্ধ রাত্রির বাতাসে’। ব্যর্থ কবিও পত্রিকার সম্পাদক হয়ে বসে।নারী কবির প্রতি তার দুর্বলতাও প্রকাশিত হয়।এভাবেই ‘ভদ্রাসন’ রচিত হয়।

 দুটি গল্পগ্রন্থেই বাস্তবতার নিরিখে লেখক অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করেছেন। বিশেষ করে প্রচলিত সংলাপ, জীবনের দ্বান্দ্বিক পর্যবেক্ষণ, হতাশা-ক্লান্তি, যৌনতা, পাশবিকতা এবং আদিমতাকে লিখতে গিয়ে কোথাও কার্পণ্য করেননি। ক্ষুদ্রপরিসরে মানবতরঙ্গের অতিসূক্ষ্ম এবং অনপনেয় ভাবকে সংকেতবদ্ধ করেছেন। রূপকাশ্রয়ে মূল বিষয়টির প্রতিই পাঠকের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন।কোথাও সমাধানে যেতে চাননি। সুতরাং গল্পগুলিত লেখকের নিজস্বতা ক্ষুন্ন হয়নি। 

১) অন্ধকারের উপকথা: ব্রতী মুখোপাধ্যায়, ২৪ বাই ৭ পাবলিশিং কম, ১৩ নিউ রোড, কলকাতা ৭০০০৫১, প্রচ্ছদ:অঙ্কন মাইতি, মূল্য ১৭৫ টাকা।
২) ভদ্রাসন: ব্রতী মুখোপাধ্যায়,কথা ও কাহিনি প্রাইভেট লিমিটেড, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩, প্রচ্ছদ: অঙ্কন মাইতি, মূল্য ১০০ টাকা।(ছবি: ব্রতী মুখোপাধ্যায়)

আরও পড়ুন