সমুদ্র সত্যিই অনেক বড়, ঠিক আখতার হুসেনের মতো

কিছু বই জীবনের কোনো এক বিশেষ সময়ের সঙ্গে মিশে যায়। শৈশবের দুপুর, মায়ের ডাক, ছুটির দিনের অলসতা, বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া কল্পনার জগৎ কিংবা বহু বছর পর পুরোনো একটি বই হাতে নিয়ে হঠাৎ ফিরে পাওয়া কৈশোর, হ্যাঁ, কিছু সাহিত্যকর্ম এভাবেই পাঠকের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। আখতার হোসেনের ‘সমুদ্র অনেক বড়’ তেমনই একটি বই।

বইটি কিশোরদের জন্য লেখা গল্পের সংকলন; কিন্তু একটু গভীরে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, বইটির পরিসর কেবল কিশোর-কিশোরীর কল্পনার জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গল্পগুলোতে যেমন আছে শৈশবের বিস্ময়, খেলা, কৌতুক ও কল্পনা, তেমনি আছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের অসহায়ত্ব, স্বপ্নভঙ্গ এবং কঠিন বাস্তবতার নির্মম অভিঘাত।

এই দ্বৈততাই ‘সমুদ্র অনেক বড়’-কে বিশেষ করে তোলে। বইটি একদিকে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া শৈশবে, অন্যদিকে সেই শৈশবের সরল চোখ দিয়েই দেখিয়ে দেয় বড় হয়ে ওঠা পৃথিবীর অনেক কঠিন সত্য। আর তাই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, এটি শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা নয়; বরং বড়দেরও নিজেদের শৈশব এবং সেই শৈশব থেকে দূরে সরে আসার গল্পটি নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো একটি বই।

‘সমুদ্র অনেক বড়’-এর প্রথম প্রকাশ ১৯৭০ সালে, তৎকালীন সময়ের অন্যতম পরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোং, ঢাকা থেকে। প্রকাশের পর বইটি পাঠকমহলে সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরবর্তী দীর্ঘ সময় বইটির নতুন কোনো সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৩ সালের একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এর ফলে বহুদিন পাঠকের নাগালের বাইরে থাকা বইটি আবার নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে আসে।

এই পুনঃপ্রকাশের গুরুত্ব শুধু একটি পুরোনো বইকে নতুন করে বাজারে আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে এক প্রজন্মের সাহিত্যিক স্মৃতিকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। আর এই বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো সেই সেতুটিকে আরও আবেগময় করে তোলে। যেমন—২০১৩ সালের ১৮ মে তারিখ আমার মেয়ে সুবাইতার জন্য লেখক আখতার হোসেন নিজ হাতে বইটিতে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সেই স্বাক্ষরিত বইটি যত্নে সংরক্ষিত থেকেছে। সময়ের পরিক্রমায় সুবাইতার ব্যক্তিগত স্মৃতির সীমানা পেরিয়ে বইটি পৌঁছে গেছে আমার ছেলে নিনাদের হাতেও। একটি বইয়ের জন্য এর চেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে?

একজন লেখক একটি বই লিখেছিলেন এক সময়ের কিশোরদের কথা ভেবে। কয়েক দশক পরে সেই বই পড়ছে আরেক প্রজন্মের কিশোর। মাঝখানে বদলে গেছে সময়, প্রযুক্তি, জীবনযাপন, সমাজ, কিন্তু বইটির প্রতি মানুষের আকর্ষণ রয়ে গেছে।

বইটির বর্তমান সংস্করণের একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো, প্রথম সংস্করণে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী হাশেম খানের করা অলংকরণগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে নতুন সংস্করণ হাতে নিয়েও পাঠক বইটির প্রাথমিক প্রকাশকালীন আবহের সঙ্গে একটি দৃশ্যমান যোগসূত্র অনুভব করতে পারেন।
ভাষার ক্ষেত্রে সামান্য পরিমার্জন করা হলেও বইটির মূল স্বর, গল্পের আবহ এবং শিল্পরূপকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

বইটির শুরুতেই রয়েছে একটি আবেগময় উৎসর্গ। নিজের জীবনের প্রথম প্রকাশিত এই বইটি লেখক উৎসর্গ করেছেন তাঁর মরহুম পিতা টিআইএম সিকান্দার এবং মা আয়শা খাতুনের করকমলে।

আর ‘দুটো কথা’ অংশে ফিরে আসে ১৯৭০ সালের স্মৃতি। দীর্ঘদিন পর বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশের পেছনে পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের আগ্রহের কথা লেখক স্মরণ করেছেন। বিশেষভাবে উঠে এসেছে কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের প্রসঙ্গ—যিনি কৈশোরে ‘সমুদ্র অনেক বড়’ এর পাঠক ছিলেন। এখানেই বইটির আরেকটি বিস্ময়কর যাত্রা চোখে পড়ে।
একজন লেখক তাঁর কৈশোরের পাঠককে বহু বছর পর স্মরণ করছেন; আর সেই পাঠক নিজেও পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক হয়ে উঠেছেন। অর্থাৎ একটি বই শুধু পাঠক তৈরি করে না, কখনো কখনো পরবর্তী সাহিত্য-প্রজন্মের মনন তৈরিরও অংশ হয়ে ওঠে।

‘সমুদ্র অনেক বড়’ মূলত ১৫টি গল্পের সংকলন। গল্পগুলোর নামেই বইটির বৈচিত্র্যের আভাস পাওয়া যায়—

১. সাদা ঘুড়ি, কালো ঘুড়ি
২. কাঁথামামা, শীতবুড়ি ও একটি মৃত্যু
৩. আতঙ্ক
৪. চাকরি
৫. তিতি
৬. দু’নম্বর ডাউন ট্রেন
৭. চাঁদমামার সঙ্গে আলাপ
৮. আমার চেয়ে সুখী
৯. খেলাঘর, তালপাতার সেপাই এবং পাগলাটে ষাঁড়
১০. মার জন্য
১১. কাঠ থেকে পুতুল
১২. শক্তি
১৩. হিংসুটে দুই শিল্পী
১৪. খেলনা পুতুল
১৫. সমুদ্র অনেক বড়

শিরোনামগুলো দেখলেই বোঝা যায়—লেখক একই ধরনের গল্পের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। কোথাও কল্পনা, কোথাও রূপকথার আবহ, কোথাও হাস্যরস, কোথাও বিষণ্নতা, কোথাও সামাজিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে গল্পগুলো একটি বিস্তৃত অনুভূতির জগৎ তৈরি করেছে।

‘সমুদ্র অনেক বড়’ এর অন্যতম শক্তি হলো এর দৃষ্টিভঙ্গি।শিশু-কিশোর সাহিত্যে প্রায়ই বড়দের পৃথিবীকে শিশুদের থেকে আলাদা করে দেখা হয়। কিন্তু আখতার হোসেনের গল্পে সেই বিভাজনটি এত স্পষ্ট নয়। বরং শিশুর সরল চোখ দিয়েই তিনি বড়দের সমাজকে দেখেছেন। ফলে একটি কোকিল শুধু কোকিল থাকে না, একটি পুতুল শুধু পুতুল থাকে না, একটি ট্রেন কিংবা একটি ঘুড়িও শুধু গল্পের উপকরণ হয়ে থাকে না। এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা, অসহায়ত্ব কিংবা সম্পর্কের প্রতীকে পরিণত হয়। এই কারণেই বইটি একদিকে শিশুর কল্পনাকে আনন্দ দেয়, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠককে থামিয়ে ভাবায়।

বইটির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ গল্প ‘চাকরি। গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি কোকিল। কোকিলের স্বাভাবিক পরিচয়—সে গান গায়। তার অস্তিত্বের আনন্দই যেন তার কণ্ঠের সুরে। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তাকে গান গাওয়ার আনন্দে থাকতে দেয় না। তাকে জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয়। সে কাজ খুঁজতে যায় এক চাষির কাছে। কিন্তু চাষি নিজেই বন্যায় সর্বস্বান্ত। তার নিজের জীবনই যখন অনিশ্চিত, তখন সে আর একজনের কর্মসংস্থানের দায় কীভাবে নেবে?
এরপর কোকিল যায় গ্রামের মোড়লের কাছে। কিন্তু মোড়লের পৃথিবীতে গান, শিল্প কিংবা সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মামলা-মোকদ্দমা, টাকা-পয়সা, জমিজমা ও ক্ষমতার হিসাব। শেষ পর্যন্ত কোকিল পৌঁছে যায় শহরের এক বিত্তবান মানুষের কাছে। সেখানেই গল্পটি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। কোকিল গান গাইতে চায়। কিন্তু তার গান কারও প্রয়োজন নেই। তাকে বরং এমন একটি কাজ দেওয়া হয়, যার সঙ্গে তার স্বাভাবিক সত্তার কোনো সম্পর্ক নেই—দোতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত সারাদিন সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা। কাজটি সে গ্রহণ করে। কারণ, তার সামনে তখন দুটি পথ—নিজের পছন্দের কাজ করে ক্ষুধার্ত থাকা, অথবা নিজের স্বাভাবিক সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে জীবিকার জন্য যান্ত্রিক কাজে নিজেকে নিঃশেষ করা। সে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়।

দীর্ঘদিন ধরে সিঁড়ি ওঠানামা করতে করতে কোকিলটির শরীর ও সত্তা ক্ষয়ে যেতে থাকে। একসময় তার পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। বন্ধু যখন তার গান শুনতে চায়, তখন কোকিল গান গাওয়ার জন্য ঠোঁট খোলে। কিন্তু যে কণ্ঠ একসময় সুর সৃষ্টি করত, সেই কণ্ঠ আর আগের মতো নেই। গল্পের এই পরিণতি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রূপক তৈরি করে। মানুষ যখন দীর্ঘদিন কেবল জীবিকার যন্ত্র হয়ে বেঁচে থাকে, তখন তার ভেতরের শিল্পী, স্বপ্নদ্রষ্টা কিংবা সৃষ্টিশীল সত্তাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। কোকিলের গান হারিয়ে যাওয়া তাই শুধু একটি পাখির কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি মানুষের নিজের স্বর হারিয়ে ফেলার প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা যায়। এখানে ‘চাকরি’শব্দটিও নতুন অর্থ পায়। চাকরি মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু যদি সেই জীবিকার কাঠামো মানুষের স্বাভাবিক সত্তা, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করে, তাহলে সেই জীবনের মূল্য কী?
গল্পটি এই প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর দেয় না। বরং পাঠকের সামনে প্রশ্নটি রেখে যায়। আর এটাই গল্পটির শক্তি।

আখতার হোসেনের লেখার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি জটিল কথাকে সহজ গল্পের মধ্যে নিয়ে আসতে পারেন। তাঁর গল্পে ভারী তত্ত্বের ভাষা নেই। কিন্তু সেই সহজ ভাষার আড়ালে এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যা পাঠককে গল্প শেষ করার পরও ভাবায়। এই বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বইটিকে দীর্ঘ সময় পরেও পাঠযোগ্য করে রেখেছে। কারণ, সময় বদলে যায়, কিন্তু মানুষের কিছু মৌলিক অভিজ্ঞতা বদলায় না—স্বপ্ন দেখা, ভালোবাসা, অভাব, আনন্দ, ভয়, বন্ধুত্ব, বঞ্চনা, নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা—এসবের আবেদন চিরন্তন।

আজ যখন আখতার হোসেন আমাদের শারীরিক উপস্থিতির বাইরে চলে গেছেন, তখন তাঁর লেখা বইটির দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই তার অর্থ আরও আবেগময় হয়ে ওঠে। একজন লেখক চলে যান, কিন্তু তাঁর লেখা থেকে যায়। সময়ের সঙ্গে লেখকের কণ্ঠ থেমে যেতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো পাঠকের কল্পনায় কথা বলতে থাকে। একটি বইয়ের পাতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই পাতায় জন্ম নেওয়া অনুভূতি অন্য একজন পাঠকের মনে নতুন করে জন্ম নিতে পারে। এই অর্থে মৃত্যু একজন লেখকের শারীরিক যাত্রার সমাপ্তি হলেও সাহিত্যের যাত্রার সমাপ্তি নয়। ‘সমুদ্র অনেক বড়’ সেই চলমান যাত্রারই একটি সাক্ষ্য।

লেখক চলে যান, সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, কিন্তু একটি সত্যিকারের বই তার পাঠকের হৃদয়ে থেকে যায়।
আখতার হোসেনের ‘সমুদ্র অনেক বড়’ তাই শুধু একটি কিশোর গল্পগ্রন্থ নয়; এটি শৈশবের স্মৃতি, মানুষের স্বপ্ন, জীবনের কঠিন বাস্তবতা এবং প্রজন্মান্তরে সাহিত্যের উত্তরাধিকার বহনকারী একটি আবেগময় সাহিত্য-দলিল।
সমুদ্র সত্যিই অনেক বড়।আর সেই সমুদ্রের মতোই বড় হয়ে থাকে মানুষের কল্পনা, স্মৃতি ও সাহিত্যের জীবন।

বইয়ের পরিচিতি ও প্রকাশনা তথ্য:

বই: সমুদ্র অনেক বড়
লেখক: আখতার হোসেন
প্রথম প্রকাশ: ১৯৭০, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোং, ঢাকা
প্রথমা সংস্করণ: পৌষ ১৪১৯ / জানুয়ারি ২০১৩
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: হাশেম খান
মূল্য: ১৭৫ টাকা

আরও পড়ুন