নজরুল: বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবমুক্তির কবি

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের জীবন ও সৃষ্টিকে কেবল সাহিত্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের অন্যতম। তিনি কবিতা লিখেছেন, গান রচনা করেছেন, সংবাদপত্র সম্পাদনা করেছেন, রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, অনশন করেছেন; আবার একই সঙ্গে মানুষের প্রেম, ধর্ম, সাম্য, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিয়ে এমন এক কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন, যা আজও বাংলা সমাজের গভীরে প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁর সাহিত্য তাই শুধু নন্দনের বিষয় নয়; তা ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষারও দলিল।

তিনি এমন একটি সময়ে লিখছিলেন যখন উপনিবেশিক রাজনীতি ক্রমশ ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। বঙ্গভঙ্গের অভিজ্ঞতা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক দর-কষাকষি—সব মিলিয়ে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের বাংলা ছিল অস্থির এক পরীক্ষাগার।

নজরুল এই পরীক্ষাগারে কোনো একটি ধর্মীয় শিবিরের কবি হয়ে ওঠেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন, একজন মুসলমান কবি একই সঙ্গে শ্যামাসংগীত লিখতে পারেন, হামদ-নাত লিখতে পারেন, কৃষ্ণকে নিয়ে গান লিখতে পারেন, আবার সাম্যবাদী চেতনার কবিতাও লিখতে পারেন। এই বহুত্ব তাঁর কাছে আত্মপরিচয়ের সংকট ছিল না; ছিল স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক জীবন।

এ কারণেই তাঁর ‘মুসলমানি বাংলা’ আসলে বাংলা ভাষাকে সংকুচিত করেনি; বরং প্রসারিত করেছে। আরবি-ফারসি-উর্দু উৎসের শব্দ তাঁর হাতে বাংলার ছন্দে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে শব্দের ধর্মীয় উৎসের চেয়ে তার কাব্যিক শক্তিই বড় হয়ে উঠেছে। একই কবির কলমে ‘মসজিদ’, ‘আজান’, ‘কারবালা’ যেমন এসেছে, তেমনি ‘কালী’, ‘দুর্গা’, ‘শ্যামা’, ‘কৃষ্ণ’ও এসেছে। এই সহাবস্থানকে নিছক ‘মিশ্রণ’ বললে কম বলা হয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক নাগরিকত্বের এক বিকল্প ধারণা।

এই কারণেই নজরুলকে নিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের রক্ষণশীল অংশের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। তিনি এমন একটি পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন যা কোনো একক ধর্মীয় কর্তৃত্বের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর মুসলমানত্ব ছিল আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়; তাঁর বাঙালিত্ব ছিল গভীর, কিন্তু অন্য ধর্মকে বাদ দিয়ে নয়; তাঁর মানবতাবাদ ছিল ধর্মবিরোধী নয়, বরং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধী।

মূলত নজরুলের আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত সদ্য অতিক্রান্ত, স্বাধীনতার আন্দোলন ক্রমে তীব্রতর এবং বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক বিভাজনে অস্থির। এই অস্থির সময়ের ভেতর থেকেই তাঁর কণ্ঠ উঠে আসে। ফলে তাঁর বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক কাব্যিক বিস্ফোরণ নয়; তার পেছনে ছিল ইতিহাসের চাপ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের মুক্তির গভীর আকাঙ্ক্ষা।

১৮৯৯ সালে জন্ম নেওয়া নজরুল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে ৩৮ বছরের ছোট। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাবের পর তাঁকে রবীন্দ্রনাথের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি। তিনি বাংলা কবিতায় এমন এক স্বর নিয়ে এসেছিলেন, যা একই সঙ্গে ঝড়ো, সংগীতময়, প্রেমময়, রাজনৈতিক এবং বিদ্রোহী। তাঁর আগে বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথের অসামান্য প্রভাবের মধ্যে দিয়ে একটি পরিণত আধুনিকতা অর্জন করেছিল; নজরুল সেই আধুনিকতার পরিসরকে ভেঙে না দিয়ে তার ভেতর নতুন শক্তি সঞ্চার করেন।

তাঁর সাহিত্যিক আবির্ভাবও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা দিয়ে শুরু হয়নি। ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘আগমনী’, ‘কোরবানি’, ‘মোহররম’ প্রভৃতি রচনায় তাঁর স্বাতন্ত্র্যের লক্ষণ আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ ও ইসলামী ইতিহাসের অনুষঙ্গকে তিনি বাংলা কবিতায় এমন স্বাভাবিকতায় নিয়ে এলেন যে বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক পরিসরই যেন হঠাৎ প্রশস্ত হয়ে উঠল। একই সঙ্গে হিন্দু পুরাণ, শাক্ত ঐতিহ্য, বৈষ্ণব ভাবধারা, লোকসংস্কৃতি ও বাঙালির জীবনও তাঁর সৃষ্টিতে সমান স্বাভাবিকতায় স্থান পেল।

এই বহুত্বই নজরুলের আধুনিকতার অন্যতম ভিত্তি। তিনি সংস্কৃতিকে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেননি। তাঁর কাছে ভাষা ছিল সেতু, প্রাচীর নয়। তাই তাঁর কবিতায় ‘কারবালা’ ও ‘কালী’, ‘আজান’ ও ‘শ্যামা’, ‘মদিনা’ ও ‘বৃন্দাবন’ একই সাংস্কৃতিক ভূগোলে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। এটি নিছক শব্দের সমাবেশ নয়; এর মধ্যে নিহিত ছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রত্যয়—বাংলা সংস্কৃতি বহুস্রোতস্বিনী, তার কোনো একটি উৎসকে বাদ দিলে তাকে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।

নজরুলের দেশপ্রেমও এই বিস্তৃত মানবিকতার ভেতরেই গড়ে উঠেছিল। দেশ তাঁর কাছে কেবল ভূখণ্ড নয়; দেশ মানে মানুষ। তাই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ যেমন তীব্র, তেমনি দেশের কৃষক-শ্রমিকের দারিদ্র্য, শোষিত মানুষের বঞ্চনা এবং সামাজিক বৈষম্যও তাঁর বিবেককে তাড়িত করেছে। স্বাধীনতা তাঁর কাছে কেবল বিদেশি শাসকের বিদায় নয়; মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক মুক্তি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সেনাবাহিনীতে তাঁর কর্মজীবন, ভারতীয় রাজনীতির অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিকে দ্রুত পরিণত করে। ১৯২১ সালের শেষদিকে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘ভাঙার গান’-এর মতো রচনায় যে বিস্ফোরক শক্তির প্রকাশ ঘটে, তা বাংলা কবিতার ভাষা ও রাজনৈতিক কল্পনাকে বদলে দেয়। একই সময়ে ‘কামাল পাশা’ কবিতায় সমকালীন তুরস্কের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মুস্তফা কামাল পাশার আধুনিকতাবাদী ভূমিকার প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রকাশ পায়। তিনি বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা শুধু শাসকের পরিবর্তন নয়; সমাজের মানসিক কাঠামোর পরিবর্তনও তার অংশ।

 ‘কামাল পাশা’ কবিতায় তুরস্কের রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি পরবর্তী লেখায় সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিও ক্রমে স্পষ্ট হয়। তাঁর দেশপ্রেম তাই সংকীর্ণ ভূখণ্ডবাদে আবদ্ধ ছিল না; বরং স্বাধীনতার প্রশ্নকে তিনি বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

১৯২১-২২ সালে তাঁর কাব্যিক শক্তি এক নতুন বিস্ফোরণ ঘটায়। ‘বিদ্রোহী’ শুধু একটি কবিতা নয়; বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক আত্মসচেতনতার এক নতুন উচ্চারণ। সেখানে ব্যক্তিমানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠা যেমন আছে, তেমনি আছে শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ক্রোধ। তাঁর ‘ভাঙার গান’ কিংবা ‘প্রলয় শিখা’র মতো রচনায়ও একই প্রবণতা—অন্যায়ের কাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু নজরুলের বিশেষত্ব এই যে তিনি কবিতায় বিদ্রোহের কথা বলে থেমে থাকেননি। তিনি বাস্তব রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেছিলেন। সংবাদপত্রকে তিনি পরিণত করেছিলেন জনমত গঠনের অস্ত্রে। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’। এটি সাহিত্যপত্রের প্রচলিত সীমা অতিক্রম করে সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্যের মঞ্চ হয়ে ওঠে। পত্রিকার ভাষায় ছিল স্বরাজের দাবি, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং জনসাধারণকে রাজনৈতিকভাবে জাগিয়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার ‘ধূমকেতু’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। নজরুল গ্রেপ্তার হন এবং ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু তাঁর কাছে কারাগারও প্রতিবাদের শেষ স্থান ছিল না। তিনি আদালতে যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ দেন, তা কেবল আত্মপক্ষসমর্থন নয়; ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্ন করার এক ঐতিহাসিক দলিল।

কারাগারে রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি আচরণের প্রতিবাদে ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি অনশন শুরু করেন। দীর্ঘ ৪০ দিনের সেই অনশন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক অসাধারণ অধ্যায়। এই ঘটনা দেখায়, নজরুলের কাছে স্বাধীনতা ছিল না কেবল কবিতার বিষয়; তা ছিল জীবন দিয়ে ধারণ করার মতো নৈতিক বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনশন ভাঙার জন্য টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন, যদিও সেই বার্তা নজরুলের কাছে পৌঁছায়নি।শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপ এবং জেল-পরিদর্শক ড. আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর হস্তক্ষেপের পর ৪০ দিনের অনশন শেষে নজরুল অনশন ভাঙেন।ঘটনাটি দুই কবির সম্পর্কের মানবিক দিকটিও উন্মোচিত করে।

এর কিছু আগে, নজরুল কারাবন্দি থাকা অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। একজন প্রতিষ্ঠিত অগ্রজ কবির পক্ষ থেকে ঔপনিবেশিক সরকারের হাতে বন্দি এক তরুণ কবির প্রতি এই প্রকাশ্য সমর্থন নিছক সৌজন্য ছিল না। এর মধ্যে ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি এবং অন্যায়ের মুখে একজন শিল্পীর পাশে দাঁড়ানোর সাহস।

তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে একই রাজনৈতিক দর্শনের মানুষ ভাবলে ভুল হবে। তাঁদের পথ ছিল আলাদা। রবীন্দ্রনাথ ক্রমে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদ সম্পর্কে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন; নজরুল ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রামী। রবীন্দ্রনাথ মানুষের অন্তর্জগতের স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন; নজরুল সেই স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কিন্তু এই পার্থক্য তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে নষ্ট করেনি। বরং এখানেই তাঁদের সম্পর্কের মহত্ত্ব—একজন অন্যজনকে নিজের মতো করে তুলতে চাননি।

নজরুলের রাজনৈতিক জীবন ১৯২২-২৩-এর কারাবাসেই শেষ হয়ে যায়নি। ১৯২৫ সালে তিনি শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলের সঙ্গে যুক্ত হন এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে আনেন। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় ‘লাঙল’। এই পত্রিকার মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষকের জীবন, শ্রেণিবৈষম্য এবং সাম্যবাদী চেতনা তাঁর লেখায় আরও প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছ বাংলা কবিতার বিষয়বস্তুকেই যেন বদলে দেয়।

এখানে নজরুলের দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়। যে দেশের কৃষক ক্ষুধার্ত, শ্রমিক শোষিত, নারী অবদমিত এবং দরিদ্র মানুষ সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত—সেই দেশের স্বাধীনতা তাঁর কাছে পূর্ণ স্বাধীনতা নয়। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর কাছে স্বরাজ মানে শুধু শাসকের হাত বদল নয়; মানুষের জীবনের কাঠামো বদল।

এই কারণে তাঁর সাম্যবাদী চেতনা কোনো আমদানি করা রাজনৈতিক মতবাদের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি ছিল না। আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাব তাঁর ওপর ছিল, কিন্তু তাঁর সাম্যের ভিত্তি ছিল মানুষের মর্যাদা। শ্রমিক, কৃষক, মজুর, নারী কিংবা বঞ্চিত মানুষ—যে পরিচয়েই হোক, প্রত্যেকের জীবন তাঁর কাছে সমান মূল্যবান। তাঁর কবিতার ভাষায় এই মানুষগুলো আর প্রান্তিক চরিত্র নয়; তারা ইতিহাসের কেন্দ্রীয় মানুষ।

নজরুলের ‘নারী’ কবিতার মধ্যেও এই সামাজিক মুক্তির ধারণা প্রবল। তিনি নারীকে পুরুষের অধীন কোনো সহায়ক সত্তা হিসেবে দেখেননি; সভ্যতার নির্মাণে নারী ও পুরুষের সমান অবদানকে স্বীকার করেছেন। ফলে তাঁর সাম্যের ধারণা শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা লিঙ্গ ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নেও বিস্তৃত।

এই রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার পাশে তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে রাখলে নজরুলের ভূমিকার ব্যাপ্তি আরও পরিষ্কার হয়। বাংলা গানকে তিনি এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য দিয়েছেন। ইসলামী গান, গজল, শ্যামাসংগীত, প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক গান, ভক্তিগীতি—বিভিন্ন ধারাকে তিনি একই সৃষ্টিশীল প্রবাহে যুক্ত করেছেন। এর ফলে বাংলা সংগীতের শ্রোতা ও স্রষ্টা উভয়ের সাংস্কৃতিক পরিসর বিস্তৃত হয়েছে।

এখানেই তাঁর সাংস্কৃতিক মুক্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য। যে সমাজে একটি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে ‘মূলধারা’ এবং অন্য সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে ‘বহিরাগত’ ভাবা হয়, সেখানে নজরুলের সৃষ্টিকর্ম একটি সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তিনি দেখিয়েছেন, বাঙালির সংস্কৃতি একক উৎসের নয়। তার মধ্যে ইসলামি ঐতিহ্য যেমন আছে, তেমনি শাক্ত, বৈষ্ণব, লোক ও শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যও আছে। এই বহুত্বকে স্বীকার করাই সংস্কৃতির প্রকৃত স্বাধীনতা।

নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। তিনি ধর্মকে মানুষের জীবন থেকে মুছে দিতে চাননি; তিনি ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল আত্মপরিচয়ের গভীর অংশ, কিন্তু সেই পরিচয় অন্যের প্রতি বিদ্বেষের অনুমতি দেয়নি। একইভাবে হিন্দু পুরাণ ও শাক্ত ঐতিহ্য তাঁর সৃষ্টিতে প্রবেশ করলেও তা কোনো ধর্মীয় পরিচয় বদলের অভিনয় ছিল না। তিনি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপর মানুষের স্বাভাবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এই অবস্থান তাঁর সময়ে মোটেই নিরাপদ ছিল না। একদিকে মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশ তাঁর হিন্দু প্রতীক ও শ্যামাসংগীত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে; অন্যদিকে হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল অংশ তাঁকে ‘মুসলমান কবি’ হিসেবে আলাদা করে দেখেছে। কিন্তু নজরুল কোনো পক্ষের অনুমোদনের জন্য নিজের সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা বিসর্জন দেননি। দুই দিকের সংকীর্ণতাকেই তিনি অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন। সেই অস্বস্তিই তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার শক্তির প্রমাণ।

তাঁর কাছে বাঙালিত্ব কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের বিকল্প নয়; বরং বহু পরিচয়ের সহাবস্থানের একটি বৃহত্তর ক্ষেত্র। একজন মানুষ একই সঙ্গে মুসলমান, বাঙালি, ভারতীয় এবং সর্বোপরি মানুষ হতে পারে—নজরুলের জীবন ও সাহিত্য এই বহুস্তরীয় পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তাঁর মানবতাবাদও তাই কোনো বিমূর্ত উদারতা নয়। ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শ্রমিকের অধিকার স্বীকার করা, কৃষকের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে আনা, নারীর সমতা দাবি করা, জাতপাতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা—এসব তাঁর মানবতাবাদের বাস্তব রূপ। তিনি মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন—কোন সামাজিক শক্তি মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়?

এই প্রশ্নটিই তাঁর বিদ্রোহকে গভীরতা দিয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ যেমন ছিল, তেমনি ছিল শোষণ, গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তাঁর বিদ্রোহ কোনো একটি রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের ওপর অন্যায় ক্ষমতার প্রতিটি রূপের বিরুদ্ধেই তার বিস্তার।

আজকের বাংলাদেশে নজরুলের এই দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা বোঝার জন্য জনমিতিক বাস্তবতার দিকে একবার তাকানো যথেষ্ট। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যার ৯১.০৪ শতাংশ মুসলিম, ৭.৯৫ শতাংশ হিন্দু, ০.৬১ শতাংশ বৌদ্ধ, ০.৩০ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ০.১২ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। অর্থাৎ মুসলিম ও হিন্দু—এই দুই বৃহৎ জনগোষ্ঠী মিলেই দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৮.৯৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরল ব্যাখ্যা নয়; জনসংখ্যার পরিবর্তনের পেছনে জন্মহার, মৃত্যুহার, অভিবাসনসহ নানা কারণ থাকে। এই পরিসংখ্যানকে কোনো সরল সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে দেখায় যে পারস্পরিক আস্থা, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং নাগরিক সমতা বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। এটি স্পষ্ট করে যে ধর্মীয় সহাবস্থান বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার কেন্দ্রে অবস্থিত।

এই বাস্তবতায় নজরুলের মানবতাবাদ নতুন তাৎপর্য লাভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু—এই দুই পরিচয়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা থাকবেই; কিন্তু নাগরিক মর্যাদা সংখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে না। এই বাস্তবতায় নজরুলের শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি জনমিতিক সত্য, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়। সংখ্যালঘু হওয়া কোনো নাগরিকের অধিকারকে খর্ব করার কারণ হতে পারে না। রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের মর্যাদা তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না—এই নীতিই নজরুলের মানবতাবাদকে আজকের নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।

তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা তাই শুধু হিন্দু-মুসলমানের মিলনের কবিতা নয়; এটি নাগরিক সমতার একটি নৈতিক দর্শন। ধর্ম থাকবে, বিশ্বাস থাকবে, স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকবে—কিন্তু সেগুলো অন্য মানুষের অধিকার অস্বীকার করার অস্ত্র হবে না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল ধর্মহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেননি; তিনি এমন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে ধর্ম মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি হতে পারে, কিন্তু ঘৃণা ও আধিপত্যের অস্ত্র হতে পারে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমকালীন রাজনীতির বহু প্রচলিত বিভাজন অতিক্রম করতে সাহায্য করেছিল। তিনি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করেছেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু কোনো এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকার মেনে নেননি। তিনি ভারতীয় স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতাকে কেবল মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকল্প হিসেবে দেখেননি; শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকেও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছেন।

এইখানেই তাঁর দেশপ্রেমের সঙ্গে মানবতাবাদের গভীর মিলন। দেশ তাঁর কাছে মানুষ ছাড়া অর্থহীন। তাই দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মানুষের অধিকারকে ভালোবাসা। যে কৃষক দেশের খাদ্য উৎপাদন করে, যে শ্রমিক শহর ও শিল্প গড়ে তোলে, যে নারী সংসার ও সমাজের অদৃশ্য শ্রম বহন করে—তাদের জীবন যদি অবমানিত থাকে, তবে স্বাধীনতার গৌরবও অসম্পূর্ণ।

নজরুলের সাহিত্য এই অসম্পূর্ণতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রশ্ন তোলে। তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম ব্যক্তিগত আবেগে থেমে নেই; আছে মানুষের প্রতি গভীর আকর্ষণ। তাঁর ধর্মীয় গান আছে, কিন্তু তা ধর্মীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ নয়। তাঁর বিদ্রোহ আছে, কিন্তু তা নিছক ধ্বংসের উল্লাস নয়। তাঁর সাম্যবাদ আছে, কিন্তু তা শুধু অর্থনৈতিক সমীকরণ নয়। সবকিছুর কেন্দ্রে আছে মানুষের মর্যাদা।

এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে নতুন করে দেখা যায়। নজরুলের সাহিত্যিক উত্থানের সময় রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠিত নাম। কিন্তু নজরুলের আবির্ভাবকে তিনি নিজের প্রভাবের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেননি। বরং তরুণ কবির স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’র সূচনায় তাঁর আশীর্বাণী এবং ১৯২৩ সালে কারাবন্দি নজরুলকে ‘বসন্ত’ উৎসর্গ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এই সম্পর্কের তাৎপর্য শুধু ব্যক্তিগত স্নেহে নয়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে রাজনৈতিক ও নন্দনগত পার্থক্য ছিল যথেষ্ট। কিন্তু তাঁরা একে অন্যের স্বাধীনতাকে স্বীকার করেছিলেন। নজরুল রবীন্দ্রনাথের গান ও সাহিত্য ভালোবাসতেন, তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন, কিন্তু অনুকরণ করেননি। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে নিজের সাহিত্যিক ছাঁচে ঢালতে চাননি।

এখানে একজন অগ্রজের মহত্ত্ব এবং একজন অনুজের আত্মমর্যাদা একই সঙ্গে দৃশ্যমান। ৩৮ বছরের বয়সের ব্যবধান তাঁদের সম্পর্ককে কর্তৃত্বের সম্পর্কে পরিণত করেনি। বরং রবীন্দ্রনাথ তাঁর অগ্রজত্ব ব্যবহার করেছেন উৎসাহ দেওয়ার জন্য, আর নজরুল তাঁর অনুজত্বকে আত্মসমর্পণের কারণ হতে দেননি। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এর চেয়ে সুন্দর আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্কের উদাহরণ খুব বেশি নেই।

তাঁদের পার্থক্যও তাই গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ মানুষের অন্তর্জগতের মুক্তি, বিশ্বমানবতা ও সংকীর্ণ জাতীয়তার সমালোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নজরুল সেই মুক্তিকে নিয়ে গেছেন রাজপথে, কারাগারে, সংবাদপত্রে, শ্রমিকের সভায়, কৃষকের জীবনে। একজন চেতনার আকাশ প্রসারিত করেছেন; অন্যজন শিকল ভাঙার জন্য হাতুড়ি তুলেছেন। তাঁদের কণ্ঠের স্বর আলাদা, কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় একটি গভীর সেতু রয়েছে।

এই সেতুকে অস্বীকার করে নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের ‘বিপরীতে’ দাঁড় করানো যেমন ভুল, তেমনি তাঁকে রবীন্দ্রনাথের ‘অনুসারী’ বানানোও অন্যায়। নজরুলের সাহিত্যিক পরিচয় তাঁর নিজের। তিনি রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতাকে শুধু নতুন ছন্দ দেননি; নতুন সামাজিক বাস্তবতাও দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় অভিজাত মানুষের পাশাপাশি উঠে এসেছে শ্রমিক, কৃষক, বন্দি, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মুখ।

সেই অর্থে নজরুলের সাহিত্য ছিল সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রেরও এক রূপ। তিনি বাংলা ভাষার কাব্যভাণ্ডারকে সম্প্রসারিত করেছেন এবং বাংলা গানের শ্রোতৃসমাজকে বহুমাত্রিক করেছেন। তাঁর ইসলামী গান মুসলমানের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে মর্যাদা দিয়েছে; তাঁর শ্যামাসংগীত ও হিন্দু পুরাণভিত্তিক গান হিন্দু ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ধারণ করেছে; তাঁর সাম্যবাদী ও দেশাত্মবোধক গান রাজনৈতিক চেতনার ভাষা তৈরি করেছে। একই স্রষ্টার ভেতরে এই বহুত্বের সহাবস্থান বাংলা সংস্কৃতির শক্তিকে নতুনভাবে প্রকাশ করেছে।

নজরুলের জীবন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ যদি নিজের ভাষায় নিজের ইতিহাস বলতে না পারে, নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করতে না পারে, অন্যের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার স্বাধীনতা না পায়, তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ। নজরুল এই দুই মুক্তিকে একসূত্রে বেঁধেছেন।

তাঁর উত্তরাধিকার আজ তাই শুধু সাহিত্যিক নয়; নাগরিকও। তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে দায়িত্ব আসে; সংখ্যালঘুর অধিকার কোনো দয়া নয়; ধর্মীয় পরিচয় ব্যক্তিমানুষের মর্যাদাকে অতিক্রম করতে পারে না; এবং দেশপ্রেম মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত আবেগ নয়।

আজকের পৃথিবীতে যখন পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি বানানোর প্রবণতা বাড়ছে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের ভিন্নতাকে সহজেই শত্রুতায় রূপান্তরিত করতে পারে, তখন নজরুলের সাহিত্য আমাদের অন্য এক পথ দেখায়। পরিচয় মুছে ফেলতে হবে না; বরং পরিচয়ের মধ্যে সেতু তৈরি করতে হবে। মানুষকে এক করে ফেলতে হবে না; বরং ভিন্ন মানুষকে সমান মর্যাদায় পাশাপাশি দাঁড় করাতে হবে।

এই কারণেই নজরুলের মানবতাবাদ কোনো কোমল, অলংকারময় মানবপ্রেম নয়। এর মধ্যে আছে প্রতিবাদের শক্তি। তিনি শুধু বলেননি মানুষকে ভালোবাসতে; তিনি প্রশ্ন করেছেন কেন একজন মানুষ অন্য মানুষের ওপর আধিপত্য করবে। তিনি শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান লেখেননি; তিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন সংস্কৃতি কোনো সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। তিনি শুধু স্বাধীনতার কবিতা লেখেননি; স্বাধীনতার জন্য রাষ্ট্রের কারাগারে গিয়েছেন।

তাঁর বিদ্রোহ তাই ধ্বংসের নয়, পুনর্গঠনের বিদ্রোহ। তাঁর দেশপ্রেম ভূখণ্ডের নয়, মানুষের। তাঁর সাম্য অর্থের নয়, মর্যাদারও। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ধর্মহীনতার নয়, ধর্মীয় সহাবস্থানের। তাঁর মানবতাবাদ বিমূর্ত আদর্শের নয়, বাস্তব মানুষের মুক্তির।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করে। একজন অগ্রজ কবি নতুন কণ্ঠকে স্বাগত জানিয়েছেন, আর অনুজ কবি শ্রদ্ধা ও স্বাধীনতাকে পাশাপাশি রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে মতভেদ ছিল, কিন্তু পরস্পরকে অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল না। এই সম্পর্ক আমাদের শেখায়—একটি সংস্কৃতির শক্তি তার একমাত্রিকতায় নয়, তার বহুস্বরতায়।

রবীন্দ্রনাথের পাশে নজরুলকে দাঁড় করালে তাই দুই কবির শ্রেষ্ঠত্বের তুলনা করার দরকার হয় না। বরং দেখা যায় বাংলা আধুনিকতার দুটি অপরিহার্য প্রবাহ। রবীন্দ্রনাথ মানুষের চিত্তকে মুক্তির দিকে আহ্বান করেছেন; নজরুল সেই মুক্তির পথে দাঁড়িয়ে থাকা শৃঙ্খলকে আঘাত করেছেন। একজন বলেছেন ভয়হীন চিত্তের কথা, অন্যজন নিজেকে ঘোষণা করেছেন চিরবিদ্রোহী হিসেবে। একজন অন্তরের জানালা খুলেছেন, অন্যজন বাইরে জমে থাকা দেয়ালে আঘাত করেছেন।

তাঁদের উত্তরাধিকার তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, সহাবস্থানের।

আর নজরুলের নিজস্ব উত্তরাধিকার—তা আরও বিস্তৃত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রের নয়, মানুষেরও; দেশপ্রেম কেবল পতাকার নয়, মানুষের অধিকার রক্ষারও; ধর্ম কেবল পরিচয়ের নয়, নৈতিকতারও; সংস্কৃতি কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণের নয়, বিনিময় ও সৃষ্টিরও; সাম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, মর্যাদারও।

শেষ পর্যন্ত নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে ডাকলেই চলবে না। তাঁকে দেখতে হবে সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, কারাবন্দি কবি হিসেবে, অনশনরত মানুষ হিসেবে, শ্রমিক-কৃষকের সহযাত্রী হিসেবে, বহুধর্মীয় সংস্কৃতির নির্মাতা হিসেবে এবং মানুষের মর্যাদার অবিচল কণ্ঠ হিসেবে।

তাঁর জীবনের দিকে তাকালে একটি সত্য স্পষ্ট হয়—তিনি যে বিদ্রোহের কথা বলেছিলেন, তা তাঁর জীবন থেকেই উৎসারিত। যে সাম্যের কথা লিখেছিলেন, তা সমাজের বঞ্চিত মানুষের বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছে। যে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছিলেন, তা তাঁর নিজের সৃষ্টিশীল জীবনেই প্রতিফলিত। আর যে মানুষের কথা বলেছেন, সেই মানুষ তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত প্রতীক নয়; রক্তমাংসের ক্ষুধার্ত, শ্রমজীবী, প্রেমময়, স্বপ্নবান এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জ্বল মানুষ।তাই এক শতাব্দী পেরিয়েও নজরুলের কণ্ঠ পুরোনো হয়ে যায় না। কারণ অন্যায়ের রূপ বদলাতে পারে, শোষণের ভাষা বদলাতে পারে, রাজনীতির পোশাক বদলাতে পারে; কিন্তু মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন বদলায় না।

পরিসংখ্যান আমাদের বলে একটি সমাজে কার সংখ্যা কত। নজরুল আমাদের জিজ্ঞাসা করেন—সেই সমাজে মানুষে মানুষে মর্যাদার সম্পর্ক কেমন। ইতিহাস আমাদের বলে কে কখন ক্ষমতায় ছিল। নজরুল জিজ্ঞাসা করেন—ক্ষমতা মানুষের জন্য, না মানুষ ক্ষমতার জন্য।

এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই তাঁর স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতা।

নজরুলের উত্তরাধিকার তাই কেবল তাঁর কবিতায় নয়; আমাদের সামাজিক বিবেকেও। যতদিন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থাকবে, যতদিন মানুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যতদিন ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মানবিক মর্যাদার দাবি উচ্চারিত হবে, যতদিন সংস্কৃতি বিভেদের বদলে মিলনের পথ খুঁজবে—ততদিন নজরুল আমাদের সমকালীনই থাকবেন।

তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন। তিনি মুক্তির কবি। শুধু সাম্যের কবি নন। তিনি মর্যাদার কবি। শুধু অসাম্প্রদায়িকতার কবি নন। তিনি বহুত্বের কবি। আর তাঁর পাশে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একক কণ্ঠে নয়, বহু স্বাধীন কণ্ঠের সহাবস্থানে।সেখানেই নজরুলের সত্যিকারের উত্তরাধিকার—মানুষকে বিভক্ত পরিচয়ের খাঁচা থেকে বের করে মুক্ত, মর্যাদাসম্পন্ন ও সহাবস্থানশীল এক বৃহত্তর মানবসমাজের দিকে আহ্বান।

মাসুদুল হক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন