করিমপুরে কাজী নজরুল ইসলাম : দুই গ্রামের স্মৃতি, দুই মানুষের সম্পর্ক ও এক অনাবিষ্কৃত ইতিহাস

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন যেন এক বিস্তৃত ভৌগোলিক মানচিত্র। সেই মানচিত্রে যেমন রয়েছে তাঁর জন্মভূমি চুরুলিয়া, তেমনি রয়েছে করাচির সেনাজীবন, কুমিল্লার সাহিত্যসাধনা, কলকাতার কর্মব্যস্ততা কিংবা কৃষ্ণনগরের স্মৃতি। এই স্থানগুলির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজ দলিল, স্মৃতিকথা ও গবেষণার আলোয় সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু জনপদও রয়েছে, যেখানে নজরুলের উপস্থিতির কথা বহুদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকলেও ইতিহাস এখনও তার চূড়ান্ত রায় দেয়নি। নদিয়ার করিমপুর সেই ধরনেরই এক জনপদ—যেখানে প্রমাণিত ইতিহাস ও লোকঐতিহ্য পাশাপাশি চলেছে, কিন্তু কখনও একে অপরের স্থান দখল করেনি।

করিমপুরকে ঘিরে এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু দুটি গ্রাম—যমশেরপুর ও ধোড়াদহ। প্রথমটি বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রখ্যাত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির জন্মভূমি, দ্বিতীয়টি স্বাধীনতা সংগ্রামী, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ড. নলিনাক্ষ সান্যালের পৈতৃক নিবাস। দুই ব্যক্তিত্বের কর্মক্ষেত্র আলাদা হলেও তাঁদের জীবনকে একটি সুতোয় বেঁধেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যতীন্দ্রমোহনের সঙ্গে তাঁর ছিল সাহিত্যিক ও মানবিক সম্পর্ক; নলিনাক্ষের সঙ্গে ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও আদর্শগত ঘনিষ্ঠতা। এই দুই সম্পর্কই করিমপুরকে বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।

তাই প্রশ্নটি নিছক কৌতূহলের নয়—কাজী নজরুল ইসলাম কি সত্যিই কখনও করিমপুরে এসেছিলেন?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস—কোনোটিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমসাময়িক দলিল, চিঠিপত্র, স্মৃতিকথা, সংবাদপত্র, পারিবারিক নথি এবং মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা লোকঐতিহ্যের সম্মিলিত পাঠ। ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের সূচনা হয়েছে লোকস্মৃতি থেকে, কিন্তু তার সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রমাণের মাধ্যমে। সেই পথ ধরেই আমাদের যাত্রা শুরু হয় করিমপুরের যমশেরপুর থেকে।

যমশেরপুর বাংলা কাব্যসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম—কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির জন্মভূমি। ১৮৭৮ সালের ২৭ নভেম্বর এই গ্রামের বাগচি পরিবারে তাঁর জন্ম। উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা কবিতা যখন রবীন্দ্র-প্রভাবের মধ্যে দিয়ে নতুন পরিচয় খুঁজছিল, তখন যতীন্দ্রমোহন সম্পূর্ণ নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় ছিল গ্রামবাংলা, কৃষকের জীবন, প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্য এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ। তাঁর কাছে নদিয়া কোনো ভৌগোলিক সীমানা ছিল না; ছিল হৃদয়ের এক চিরন্তন ভূখণ্ড।

শৈশব কেটেছিল যমশেরপুরের মাঠ, নদী, পুকুর, গাছপালা আর গ্রামীণ সমাজের মধ্যে। পরবর্তী জীবনে কলকাতায় সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও তিনি কখনও নিজের জন্মভূমিকে ভুলে যাননি। বরং তাঁর কবিতার অসংখ্য চিত্রকল্পে ফিরে এসেছে এই গ্রামের প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং মাটির গন্ধ।

কর্মসূত্রে কলকাতায় এসে তিনি হিন্দুস্থান পার্কে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বাসভবনের নাম ছিল ‘ইলাবাস’। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আড্ডাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে নিয়মিত আসতেন কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, শিল্পী ও সমাজচিন্তকেরা। নতুন কবিতা পাঠ, পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা, সাহিত্যতর্ক, সমাজসংস্কার, জাতীয় রাজনীতি—সবই ছিল আলোচনার বিষয়। কলকাতার বৌদ্ধিক পরিবেশের ইতিহাসে ‘ইলাবাস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

এই সাহিত্যিক পরিবেশেই যতীন্দ্রমোহন বাগচির সঙ্গে পরিচয় ঘটে তরুণ কাজী নজরুল ইসলামের। ১৮৯৯ সালে চুরুলিয়ায় জন্ম নেওয়া নজরুল সেনাবাহিনীর চাকরি শেষে ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯২১ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারিতে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর লেখায় বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও স্বাধীনতার যে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছিল, তা বাংলা ভাষাকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল।

বয়সে প্রায় একুশ বছরের বড় হলেও যতীন্দ্রমোহন কখনও এই তরুণ কবিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেননি। বরং অকুণ্ঠ স্নেহ ও সম্মান দিয়েছিলেন। অন্যদিকে নজরুলও তাঁকে শুধু একজন প্রবীণ কবি হিসেবে নয়, একজন শুভানুধ্যায়ী ও নির্ভরযোগ্য অগ্রজ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁদের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সৌজন্য এবং মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই সম্পর্কের প্রকৃত গভীরতা প্রকাশ পায় ১৯২২-২৩ সালের ঘটনায়। ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুল সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হুগলি কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে তাঁর অনশন সমগ্র বাংলাকে আলোড়িত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনশন ভাঙার আহ্বান জানান। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময় যতীন্দ্রমোহন বাগচিও নীরব থাকেননি। একজন কবির স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, তাঁদের সম্পর্ক কেবল সাহিত্যিক পরিচয়ের ছিল না; ছিল আদর্শগত ও মানবিক।

১৯৪২ সালে কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলামের নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যতীন্দ্রমোহন বাগচি।  নাগরিক সংবর্ধনার ঘটনাটি যেন যতীন্দ্রমোহন বাগচি ও কাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘ সম্পর্কের এক প্রতীকী পরিণতি। একদিকে বাংলা কবিতার প্রতিষ্ঠিত অগ্রজ, অন্যদিকে বিদ্রোহী চেতনার অগ্নিকবি—দু’জনের এই মিলন বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে রয়েছে।

এই প্রমাণিত ঘটনাগুলিই করিমপুরের যমশেরপুরকে ঘিরে প্রচলিত একটি দীর্ঘস্থায়ী লোকঐতিহ্যের বাস্তব ভিত্তি নির্মাণ করেছে। কারণ যতীন্দ্রমোহন বাগচি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন করেননি। পারিবারিক অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজনের প্রয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত টানে তিনি নিয়মিত যমশেরপুরে ফিরতেন। বাগচিবাড়ি ছিল শুধু একটি পারিবারিক আবাস নয়; ছিল স্থানীয় সমাজজীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে গ্রামের মানুষের মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়—যাঁর সঙ্গে যতীন্দ্রমোহনের এত গভীর সম্পর্ক, সেই কাজী নজরুল ইসলাম কি কখনও তাঁর সঙ্গে যমশেরপুরে আসেননি?

আজও যমশেরপুরের বহু প্রবীণ মানুষের মুখে এই প্রসঙ্গ শোনা যায়। তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা স্মৃতিচারণে বিদ্রোহী কবির সম্ভাব্য আগমনের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। কেউ বলেন, কবি বাগচিবাড়িতে এসেছিলেন; কেউ বলেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন; আবার কেউ মনে করেন, তিনি যতীন্দ্রমোহনের আমন্ত্রণেই গ্রামটি দেখেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে এই স্মৃতির নানা রূপ তৈরি হলেও মূল বিশ্বাসটি একটিই—কাজী নজরুল ইসলামের পদচারণায় যমশেরপুর একদিন ধন্য হয়েছিল।

ইতিহাসের বিচার আবেগ দিয়ে হয় না। বর্তমান পর্যন্ত এমন কোনো সমসাময়িক প্রাথমিক দলিল—চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত ডায়েরি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, অতিথি-নিবন্ধন বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য নথি—আবিষ্কৃত হয়নি, যা যমশেরপুরে নজরুলের আগমনকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই ইতিহাসের বিচারে এই সফরকে প্রমাণিত ঘটনা বলা যায় না। আবার এটিও বলা যায় না যে এমন সফর কখনও ঘটেনি। গবেষণার বর্তমান অবস্থান হলো—যমশেরপুরে কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের একটি শক্তিশালী লোকঐতিহ্য রয়েছে, কিন্তু তার সমর্থনে প্রাথমিক দলিল এখনও অজানা।

ইতিহাসচর্চার সৌন্দর্য এখানেই যে, লোকঐতিহ্যকে সে অবজ্ঞা করে না; আবার প্রমাণ ছাড়া তাকে ইতিহাসও ঘোষণা করে না। বরং মানুষের স্মৃতিকেই ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানের সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করে। বাংলার ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেগুলি প্রথমে লোকমুখে প্রচলিত ছিল, পরে দলিল আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ফলে যমশেরপুরের এই জনশ্রুতিও ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যমশেরপুরের অনুসন্ধান শেষ হতে না হতেই করিমপুরের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় আর-একটি গ্রামের দিকে। খড়ে নদীর তীরে অবস্থিত শান্ত জনপদ ধোড়াদহ। যদি যতীন্দ্রমোহন বাগচি নজরুলের সাহিত্যজীবনের অগ্রজ ও শুভানুধ্যায়ী হন, তবে ড. নলিনাক্ষ সান্যাল ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু, চিন্তার সহযাত্রী এবং পারস্পরিক আস্থার মানুষ। করিমপুরে কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে যে ইতিহাসের অনুসন্ধান, তার দ্বিতীয় এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয় এই ধোড়াদহ থেকেই।

ধোড়াদহের ইতিহাস তাই কেবল একজন শিক্ষাবিদ বা স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবনকথা নয়; এটি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে করিমপুরের সম্ভাব্য সম্পর্কের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। যমশেরপুর যেমন সাহিত্যিক বন্ধুত্বের স্মৃতি বহন করে, তেমনি ধোড়াদহ বহন করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানবিক আস্থা এবং লোকঐতিহ্যের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। এই দুই সূত্র একত্রিত না করলে করিমপুরে নজরুল-অনুসন্ধানের পূর্ণ চিত্র কখনও সম্পূর্ণ হয় না।

খড়ে নদীর তীরে অবস্থিত ধোড়াদহ গ্রাম বহু শতাব্দীর ইতিহাস বহন করে চলেছে। বিশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাচিন্তার ইতিহাসে এই গ্রামের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। কারণ এখানেই ১৮৯৪ সালের ৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ড. নলিনাক্ষ সান্যাল—স্বাধীনতা সংগ্রামী, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং জাতীয় রাজনীতির একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।

নলিনাক্ষ সান্যালের শৈশব কেটেছিল ধোড়াদহের গ্রামীণ পরিবেশে। পরিবারে শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং সমাজজীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে অর্থনীতিতে অসামান্য মেধার পরিচয় দেন। উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হলেও তাঁর মন ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেই একটি জাতির মুক্তি সম্পূর্ণ হয় না; অর্থনৈতিক ন্যায়, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক উন্নয়নও সমান জরুরি।

এই বিশ্বাসই তাঁর কর্মজীবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে একাধিকবার ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। কারাবাসও করতে হয়েছে। কিন্তু সংগ্রাম তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। তিনি যেমন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তেমনি অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজচিন্তা নিয়েও নিরলসভাবে লিখেছেন এবং বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী সমাজে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।

এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তাঁর পরিচয় ঘটে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। প্রথম দর্শনে একজন অর্থনীতিবিদ ও একজন কবির মধ্যে বিশেষ মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হলেও বাস্তবে তাঁদের ভাবনার কেন্দ্রে ছিল একই বিষয়—মানুষ। নজরুল তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে সাম্য, স্বাধীনতা এবং মানবমুক্তির কথা বলেছেন; নলিনাক্ষ রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির আলোচনায় সেই একই আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সামাজিক বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে দু’জনেই ছিলেন সমান সোচ্চার। এই আদর্শগত মিলই তাঁদের বন্ধুত্বকে গভীর করে তুলেছিল।

সমসাময়িক স্মৃতিচারণ ও জীবনীগ্রন্থে নলিনাক্ষ সান্যাল ও কাজী নজরুল ইসলামের আন্তরিক সম্পর্কের একাধিক উল্লেখ পাওয়া যায়। সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত আস্থার। ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যেও তাঁরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এই বন্ধুত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ১৯২৪ সালের একটি ঘটনা।

সে বছর নলিনাক্ষ সান্যালের বিবাহে কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতির উল্লেখ নির্ভরযোগ্য জীবনীসূত্রে পাওয়া যায়। এই তথ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ এটি প্রমাণ করে, তাঁদের সম্পর্ক কেবল সামাজিক পরিচয় বা সাহিত্যিক সৌজন্যের ছিল না; তা পৌঁছে গিয়েছিল পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার স্তরে। তৎকালীন সমাজে বিবাহ ছিল একটি পারিবারিক ও সামাজিক আস্থার অনুষ্ঠান। সেখানে কাউকে আমন্ত্রণ জানানো মানে তাঁকে পরিবারের আপনজন হিসেবে গ্রহণ করা। সেই অর্থে নলিনাক্ষ সান্যালের বিবাহে নজরুলের উপস্থিতি তাঁদের বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।

কিন্তু এই প্রমাণিত ঘটনার পাশাপাশি ধোড়াদহে আর-একটি দীর্ঘস্থায়ী লোকঐতিহ্যও সমানভাবে বেঁচে আছে। সেই লোকঐতিহ্যই করিমপুরে কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে অনুসন্ধানকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

১৯২৪ সালের এই বিবাহকে কেন্দ্র করেই ধোড়াদহে একটি দীর্ঘস্থায়ী লোকঐতিহ্যের জন্ম হয়েছে। নির্ভরযোগ্য জীবনীসূত্র আমাদের জানায়, নলিনাক্ষ সান্যালের বিবাহে কাজী নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। করিমপুর অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে এই ঘটনাটি আরও বিস্তৃত রূপে বেঁচে আছে। প্রবীণদের মুখে মুখে শোনা যায়, নজরুল কেবল অতিথি হিসেবেই নন, বরযাত্রীদের অন্যতম সদস্য হিসেবেই ধোড়াদহে এসেছিলেন। বন্ধুর আনন্দের দিনে তিনি ছিলেন পরিবারেরই একজন মানুষ। এই কাহিনি বহু দশক ধরে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়েছে এবং আজও স্থানীয় লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।

লোকশ্রুতির আরও একটি বহুল প্রচলিত অংশ রয়েছে। বলা হয়, বহরমপুরে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতার এক পর্যায়ে সমাজের কিছু রক্ষণশীল ব্যক্তি নজরুলের মুসলিম পরিচয় নিয়ে আপত্তি তোলেন। তাঁদের আচরণে কবি অপমানিত হন। স্থানীয় মানুষের বর্ণনা অনুযায়ী, এই ঘটনার প্রতিবাদে নলিনাক্ষ সান্যাল দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁর আমন্ত্রিত অতিথির অসম্মান তিনি কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। বন্ধুত্ব, মানবিকতা এবং সামাজিক উদারতার প্রশ্নে তিনি আপস করেননি। ধোড়াদহের প্রবীণদের স্মৃতিতে এই ঘটনাটি দুই বন্ধুর সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও উচ্চারিত হয়।

এই লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আরও একটি বিশ্বাস যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের একাংশ মনে করেন, এই অভিজ্ঞতার অভিঘাত নজরুলের মনে জাতিভেদ ও সামাজিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। তাঁদের ধারণা, পরবর্তীকালে তাঁর বিখ্যাত ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ রচনার পেছনেও এই ঘটনার একটি মানসিক প্রভাব কাজ করেছিল। নজরুলের সমগ্র সাহিত্যজীবনে জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং মানুষের কৃত্রিম বিভাজনের বিরুদ্ধে যে প্রবল প্রতিবাদ দেখা যায়, তার সঙ্গে এই জনশ্রুতিকে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা স্থানীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

লোকঐতিহ্যের গুরুত্ব অবশ্য এখানেই শেষ নয়। অনেক সময় ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের প্রথম ইঙ্গিত মেলে মানুষের স্মৃতিতে। পরে সেই স্মৃতির সমর্থনে দলিলও আবিষ্কৃত হয়েছে—ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। তাই ধোড়াদহের এই কাহিনিকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এটিকে সংরক্ষণ করে আরও গভীর অনুসন্ধান চালানোই গবেষকের কাজ। কারণ একটি পুরোনো চিঠি, একটি আমন্ত্রণপত্র, একটি সংবাদ বা কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ভবিষ্যতে এই জনশ্রুতির নতুন মূল্যায়নের পথ খুলে দিতে পারে।

এই বিবাহের ঘটনাটি আর-একটি বিষয়ও স্পষ্ট করে। তা হলো, নলিনাক্ষ সান্যাল ও কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক নিছক সাহিত্যিক পরিচয়ের ছিল না; ছিল পারিবারিক আস্থা, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর সেই সম্পর্কই ধোড়াদহকে করিমপুরের নজরুল-অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

যমশেরপুর ও ধোড়াদহ—দুটি গ্রামের ইতিহাস পাশাপাশি রাখলে করিমপুরের একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি গ্রাম বাংলা কাব্যসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির জন্মভূমি; অন্যটি স্বাধীনতা সংগ্রামী, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. নলিনাক্ষ সান্যালের পৈতৃক নিবাস। দুই ব্যক্তিত্বের কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা হলেও একটি বিষয়ে তাঁদের গভীর মিল ছিল। দু’জনেই বিশ্বাস করতেন মুক্তচিন্তা, শিক্ষা, মানবিকতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শক্তিতে। আর এই মূল্যবোধই তাঁদের দু’জনকে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে একই মানসিক পরিসরে এনে দাঁড় করিয়েছিল।

যতীন্দ্রমোহন বাগচির সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক, কিন্তু তার ভিত ছিল গভীর মানবিকতায়। একজন প্রতিষ্ঠিত অগ্রজ কবি অকুণ্ঠভাবে গ্রহণ করেছিলেন এক তরুণ প্রতিভাকে। অন্যদিকে নলিনাক্ষ সান্যালের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আদর্শ, ব্যক্তিগত আস্থা এবং পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে। একজন ছিলেন কবির সাহিত্যজীবনের সহযাত্রী, অন্যজন তাঁর ব্যক্তিজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। করিমপুরের যমশেরপুর ও ধোড়াদহ এই দুই সম্পর্কের দুই জীবন্ত স্মারক।

বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলা বৌদ্ধিক সমাজকে বুঝতে না পারলে এই সম্পর্কগুলির গভীরতা উপলব্ধি করা কঠিন। তখন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক ও সমাজসংস্কারকেরা আলাদা জগতে বাস করতেন না। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তর, সাহিত্যসভা কিংবা ব্যক্তিগত আড্ডাঘর—সবই ছিল এক বৃহৎ চিন্তাজগতের অংশ। যতীন্দ্রমোহন বাগচির ‘ইলাবাস’ যেমন ছিল সাহিত্যিকদের মিলনকেন্দ্র, তেমনি নলিনাক্ষ সান্যালের মতো শিক্ষিত জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গেও সেই পরিমণ্ডলের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কাজী নজরুল ইসলামও এই বৃহত্তর বৌদ্ধিক সমাজেরই সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ফলে তাঁদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ছিল সময়ের স্বাভাবিক বাস্তবতা।

এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণেই করিমপুরকে ঘিরে প্রচলিত লোকঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মনে হয় না। কারণ এখানে জনশ্রুতি এমন দুই ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, যাঁদের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ইতিহাসে প্রমাণিত। যমশেরপুরের ক্ষেত্রে সেই ভিত্তি যতীন্দ্রমোহন বাগচির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক বন্ধুত্ব; ধোড়াদহের ক্ষেত্রে নলিনাক্ষ সান্যালের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ১৯২৪ সালের বিবাহে তাঁর উপস্থিতির উল্লেখ। এই দুই প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কই মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে—নজরুল হয়তো সত্যিই কোনো এক সময় করিমপুরে এসেছিলেন।

ইতিহাসের দায়িত্ব সম্ভাবনাকে সত্যে পরিণত করা নয়; সম্ভাবনাকে প্রমাণের আলোয় যাচাই করা। তাই একজন গবেষক যেমন লোকঐতিহ্যকে অবহেলা করেন না, তেমনি প্রাথমিক দলিল ছাড়া তাকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসও বলেন না। ইতিহাসের প্রতি এই সততাই গবেষণার সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ আবেগ ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে কেবল প্রমাণ।

করিমপুরের সঙ্গে নজরুলের সম্ভাব্য যোগাযোগের প্রশ্নে ভৌগোলিক বাস্তবতাটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আজকের করিমপুরকে দেখে যে দূরত্বের ধারণা তৈরি হয়, এক শতাব্দী আগে সেই যোগাযোগব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীপথ, নৌকা, ঘোড়ার গাড়ি, রেলপথের সংযোগ এবং স্থানীয় সড়ক—এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করেই মানুষের যাতায়াত চলত। কোনো সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি গ্রামে পৌঁছনো আজকের মতো সহজ ছিল না, কিন্তু একই সঙ্গে তা অসম্ভবও ছিল না। বিশেষত কলকাতার সঙ্গে যাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাঁদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠত। ফলে নজরুলের করিমপুরে সম্ভাব্য আগমন যাচাই করতে হলে শুধু তাঁর জীবনী নয়, সেই সময়ের যাতায়াতের পথ ও যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাসও অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

নজরুলের জীবনপঞ্জির দিকে তাকালেও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবন কখনও একটি শহর বা একটি সাহিত্যিক বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। কুমিল্লা থেকে কলকাতা, কৃষ্ণনগর থেকে ময়মনসিংহ, সাহিত্যসভা থেকে রাজনৈতিক সমাবেশ—বিভিন্ন মানুষের আমন্ত্রণ, বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তাঁকে বারবার নতুন নতুন স্থানে নিয়ে গিয়েছে। তাঁর বহু সফরের লিখিত বিবরণ আজও পাওয়া যায়, আবার কিছু সফরের স্মৃতি টিকে আছে ব্যক্তিগত চিঠি ও স্মৃতিকথায়। এই বৃহত্তর চলাচলের প্রেক্ষাপটে করিমপুরের সম্ভাব্য সফরকে একেবারে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সম্ভাবনার এই পরিসরই আবার গবেষণার প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দেয়—কারণ কোন সফর সত্যিই ঘটেছিল এবং কোনটি পরবর্তী স্মৃতির নির্মাণ, তা নির্ধারণের একমাত্র পথ দলিলের অনুসন্ধান।

করিমপুরের এই অনুসন্ধান তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। আঞ্চলিক ইতিহাস কেবল বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার ইতিহাস নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাহিত্যিক সম্পর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগেরও ইতিহাস। অনেক সময় জাতীয় ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে একটি গ্রামের পুরোনো বাড়িতে, একটি পরিবারের সিন্দুকে রাখা চিঠিতে কিংবা কোনো প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণে। তাই যমশেরপুর ও ধোড়াদহের ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে কেবল দুটি গ্রামের ইতিহাস রক্ষা করা নয়; বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি মূল্যবান উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা।

করিমপুরের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, এখানে আসলে তিনটি জীবনধারা এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। প্রথমটি কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির, যিনি যমশেরপুরের মাটির গন্ধ, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে বাংলা কবিতায় অমর করে তুলেছিলেন। দ্বিতীয়টি ড. নলিনাক্ষ সান্যালের, যিনি ধোড়াদহের মাটি থেকে উঠে এসে স্বাধীনতা আন্দোলন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও জাতীয় চিন্তায় এক স্বতন্ত্র উচ্চতা অর্জন করেছিলেন। তৃতীয়টি কাজী নজরুল ইসলামের, যিনি ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র বাংলার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। এই তিনটি জীবন একসময় কলকাতার সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছিল; সেই সম্পর্কের প্রতিধ্বনিই আজও করিমপুরের যমশেরপুর ও ধোড়াদহের লোকস্মৃতিতে বেঁচে আছে।

বর্তমান গবেষণার আলোকে কয়েকটি বিষয় নির্দ্বিধায় বলা যায়। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের আন্তরিক সাহিত্যিক সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত। ১৯২৩ সালে নজরুলের কারাবাস ও অনশনের সময় যতীন্দ্রমোহনের সহমর্মিতা এবং ১৯৪২ সালে নাগরিক সংবর্ধনায় তাঁর সভাপতিত্ব—এই দুই ঘটনাই সেই সম্পর্কের প্রামাণ্য সাক্ষ্য বহন করে। একইভাবে ড. নলিনাক্ষ সান্যালের সঙ্গে নজরুলের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব এবং ১৯২৪ সালের বিবাহে তাঁর উপস্থিতির উল্লেখও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ করিমপুরের এই দুই কৃতী সন্তানের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ইতিহাসের আলোয় স্পষ্ট।

অন্যদিকে যমশেরপুর ও ধোড়াদহে নজরুলের সম্ভাব্য আগমন নিয়ে যে জনশ্রুতি আজও প্রবাহিত, তার ঐতিহাসিক অবস্থান ভিন্ন। যমশেরপুরে যতীন্দ্রমোহনের সঙ্গে কিংবা ধোড়াদহে নলিনাক্ষ সান্যালের বিবাহ উপলক্ষে তাঁর আগমনের কাহিনি স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত থাকলেও, সেই ঘটনাগুলিকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করার মতো সমসাময়িক চিঠিপত্র, সংবাদপত্র, ডায়েরি, অতিথি-নিবন্ধন বা অন্য কোনো প্রাথমিক দলিল এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে ইতিহাসের বিচারে এগুলি সম্ভাবনাময় লোকঐতিহ্য—প্রমাণিত ইতিহাস নয়। এই দুই স্তরকে পৃথক রেখেই মূল্যায়ন করাই গবেষণার সততা।

এই অনুসন্ধানের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি নতুন গবেষণার দরজা খুলে দেয়। যমশেরপুরের বাগচি পরিবার কিংবা ধোড়াদহের সান্যাল পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহে যদি কোনো অপ্রকাশিত চিঠি, ডায়েরি, আলোকচিত্র, আমন্ত্রণপত্র বা পারিবারিক নথি সংরক্ষিত থাকে, তবে তা ভবিষ্যতের গবেষণায় অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে জাতীয় গ্রন্থাগার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ কিংবা সমসাময়িক সংবাদপত্রের ভাঁজেও হয়তো লুকিয়ে আছে এমন কোনো সূত্র, যা এই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের নতুন উত্তর দিতে পারে। আঞ্চলিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এমনভাবেই ঘটেছে।

করিমপুরের এই অনুসন্ধানের আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস সব সময় রাজধানী, বড় শহর বা বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি হয় না। কখনও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয় একটি গ্রামের উঠোনে, একটি বিবাহের আসরে, কোনো কবির বাড়ির বারান্দায় কিংবা নদীর ঘাটে। যতীন্দ্রমোহন বাগচির জন্মভূমি যমশেরপুর এবং নলিনাক্ষ সান্যালের পৈতৃক নিবাস ধোড়াদহ সেই অর্থে বৃহত্তর বাংলা ইতিহাসের প্রান্ত নয়; তারা সেই ইতিহাসেরই স্থানীয় অধ্যায়। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের সূত্র ধরে করিমপুরের এই দুই গ্রামকে নতুন করে পড়া মানে বাংলা সাহিত্য ও জাতীয় জীবনের ইতিহাসকে কলকাতার বাইরে নিয়ে যাওয়া।

করিমপুরের যমশেরপুর ও ধোড়াদহ তাই কেবল দুটি গ্রামের নাম নয়; তারা বাংলা সাহিত্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মানবিক সম্পর্কের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্মারক। এই দুই গ্রামের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের প্রমাণিত সম্পর্ক যেমন আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি তাঁকে ঘিরে প্রচলিত লোকঐতিহ্য ভবিষ্যতের গবেষণাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—সে কখনও সব উত্তর একসঙ্গে দেয় না। কিছু সত্য দলিলে লেখা থাকে, কিছু মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, আর কিছু অপেক্ষা করে ভবিষ্যতের অনুসন্ধানী চোখের জন্য। করিমপুরের যমশেরপুর ও ধোড়াদহ আজ সেই অপেক্ষারই দুটি নাম। হয়তো একদিন কোনো বিস্মৃত দলিল প্রমাণ করবে, বিদ্রোহী কবির পদচিহ্ন সত্যিই এই মাটিতে পড়েছিল। আর যদি সেই প্রমাণ কোনোদিন না-ও মেলে, তবু এই অনুসন্ধানের মূল্য কমে যাবে না। কারণ ইতিহাসের প্রকৃত শক্তি কেবল আবিষ্কৃত সত্যে নয়, সত্যকে খুঁজে যাওয়ার নিরন্তর সাধনায়। করিমপুরের এই অনাবিষ্কৃত অধ্যায় আমাদের সেই সাধনার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

নজরুল এসেছিলেন কি না—তার উত্তর ইতিহাস একদিন দেবে। আর সেই উত্তর না আসা পর্যন্ত করিমপুরের মাটিতে প্রশ্নটি বেঁচে থাকুক।

দীপক সাহা : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন