উদার আকাশ নিয়ে ফারুক আহমেদের উড়ান আকাশ ছুঁতে চলেছে

কিছু কিছু চোখে আগুন থাকে, পুড়িয়ে ছারখার করার নয়, আত্মপ্রকাশের, নিজেকে তাতিয়ে নেওয়ার। কিছু কিছু চোখে একগুচ্ছ কুঁড়ি ঠাসা থাকে, ফুটে ওঠার প্রত্যয়ে, যা গন্ধ বিলাবে বর্ণে মাতাবে। তার চোখে সেদিন আগুন ও কুঁড়ি—উভয়ই দেখেছিলাম। মন বলছিল৷ এই ছেলে লম্বা রেসের ঘোড়া। যতদূর মনে পড়ে সেটা ২০০২ সাল। এক সাপ্তাহিক পত্রিকার দফতরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করলেন এক তরুণ। একটা আর্জি নিয়ে। ততদিনে মুখ চেনা হয়ে গেছে। তার দু-একটা কবিতা দফতরে এসেছে, ভালো লেগেছে, ছেপেছিও। তার এলাকার কিছু সংবাদ দিয়ে আসতেন, ছেপে দিতাম। আজ তার আর্জি, তিনি একটি পত্রিকা করবেন, তার প্রচ্ছদ করে দিতে হবে। সেই পত্রিকার নাম ‘উদার আকাশ’। সাহিত্যজগতে যাদের গতায়াত, সেই সম্পাদক কে হতে পারেন, তারা আজ তা একবাক্যে বলে দিতে পারবেন। হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছেন, তিনি ফারুক আহমেদ। ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা ও প্রকশনা যাকে ব্যাপক পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। রাজ্যে তো বটেই, বাংলাদেশ-সহ বিদেশেও। সঙ্গে রয়েছে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড। সব মিলিয়ে ‘উদার আকাশ’ আজ এক সম্ভ্রম উদ্রেককারী প্রতিষ্ঠান।

সেই ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা আজ মননশীল বোদ্ধা মানুষদের টেবিলে শোভা পায়। নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়। গুণমানে পাল্লা দেয় প্রতিষ্ঠিত কৃত্তিবাস, অনুষ্টুপ, অনীক, একক মাত্রা, বোধশব্দ, শনিবারের চিঠি, এবং মুশায়েরা, গাঙচিল, হাওয়া ৪৯ ইত্যাদি জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর সঙ্গে। কেউ কেউ এও বলেন, গুণমানে বিদগ্ধজন-বন্দিত পাঠকপ্রিয় অধুনালুপ্ত ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার স্থান দখল করেছে ‘উদার আকাশ’। এই পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলো সেই দাবিকে মান্যতা দেয়। এটা ফারুক আহমেদের অর্জন। ‘উদার আকাশ’এর প্রতিটি সংখ্যা এতটাই সুচিন্তিত, সুনির্বাচিত যে, রচনাগুলো সমাজের সঙ্গে মানুষকে, বা মানুষের সঙ্গে সমাজকে সংপৃক্ততায় জুড়ে নেয়। সেদিনের সেই স্বপ্নভূক তরুণ, যার চোখজোড়া তখন ছিল মোমবাতির মতো, আজ তিনি ভাস্বরিত, জ্বলন্ত মোমবাতির মতো সাহিত্য পরিমণ্ডলকে আলোকিত করছেন। অবশ্যই এর জন্য তাকে কার্যত একাই পরিশ্রম করতে হয়েছে। আন্তরিকতার সঙ্গে পরিশ্রম করলে সাফল্য তো ধরা দেবেই। সেই সাফল্যের অধিকারী ফারুক আহমেদ আজ তৃপ্তির হাসি হাসতেই পারেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঘটকপুকুর ভাঙড় ১ ব্লকের অন্তর্গত একটি দ্রুত বিকাশমান ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ, যা কলকাতা শহরের কাছাকাছি হওয়ায় ইতিবাচক পরিচিতি লাভ করেছে। কলকাতার সায়েন্স সিটি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটারের মতো। কৃষি ও মৎস্যচাষে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। এখানে এখন স্থানীয় বাজার, স্কুল, ব্যাংক, এটিএম ও চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। এই ছবিটা সাম্প্রতিক কালের। তার আগের ঘটকপুকুর ছিল অপরাধের আখড়াস্থল। সঙ্গে ছিল মদ-জুয়ার রমরমা। সব রকমের দুষ্কর্মমূলক কাজকর্ম হত। শিক্ষার হার ছিল নগণ্য। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ছেলেরা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে নানান ছোটখাট কাজে নেমে পড়ত। মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যেত। জনচেতনা বলে কিছু ছিল না। মেয়েদের ঘটকপুকুরে বিয়ে দিত না।

এমন এক দুষ্কর্মময়তা ও ছন্নছাড়া সামাজিক দুরবস্থার ভিতর দিয়ে বড় হচ্ছেন ফারুক আহমেদ। বড় হচ্ছেন আর শপথ নিচ্ছেন, নিজেকে তৈরি করছেন—এই ভাঙড়কে বদলাতে হবেই। কুখ্যাতি মুছে, সামাজিক করে তুলতে হবে। এই ভাবনা তার বুকে বুনো ঘোড়ার মতো শ্বাস ফেলত। মনে মনে বলতেন, আমার যতটুকু সাধ্য, তা দিয়ে, দরকার হলে অন্যদের সাহায্য নিতে হবে। পরিস্থিতি বদলের চেষ্টা করতে হবে। সেই দিনের অপেক্ষায় থাকলেন ফারুক। এটা বুঝলেন, শিক্ষা ছাড়া চেতনা আনা সম্ভব নয়। শিক্ষায় সাজাতে হবে নতুন প্রজন্মকে। ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন, ছেলে ও মেয়েদের জন্য মাত্র একটি করে স্কুল ছিল তার এলাকায়। আশেপাশের এলাকা—যেমন ভাঙড়, পোলেরহাট, বারোলি, পাগলাহাট, জাগুলগাছি, গোবিন্দপুর ও নলমুড়ি থেকে ছেলেমেয়েরা সেখানে আসত। তা সত্ত্বেও, মেয়েদের স্কুলে অনেক আসনই খালি পড়ে থাকত। মেয়েরা যখন মা হন, তারাই তাদের ছেলে-মেয়েদের প্রথম শিক্ষক হন। তাই সেই আগামী দিনের মায়েদের শিক্ষা জরুরি। তাদের আরও বেশি করে শিক্ষাঙ্গনে আনতে হবে। তার আগে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হবে, নিজেকে শিক্ষিত হতে হবে।

ফারুকের আরও একটা প্রিয় স্বপ্ন ছিল, লেখালিখির জগতে প্রবেশের। সেই ইচ্ছায় বাতাস দিয়েছিলেন গ্রন্থাগারিক রফিকুল ইসলাম।

ঘটকপুকুরে বসে তিনিই প্রথম একটা পত্রিকা প্রকাশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অবশেষে ২০০০ সালে তিনি ‘ধানসিঁড়ি’ নামে একটি পত্রিকা চালুও করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র দুটি সংখ্যার পর আর চালানো সম্ভব হয়নি। ইতিহাস হয়তো সেই উদ্যোগ মনে রাখবে না, তবে ফারুক সেটাকে অস্বীকার করেন না। সেটা তার জীবনের আলোর ফুলকি। ওই দুই সংখ্যাই ফারুকের স্বপ্নে ডানা জুড়ে দেয়। ২০০২ সাল থেকে নিজেই প্রকাশ করতে শুরু করলেন ‘উদার আকাশ’।
তখন ভাঙড় থেকে পড়তে এসেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায়। সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। যোগাযোগ ক্রমশ বিস্তৃত হতে শুরু করল। সেদিনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাস করা ফারুক এখন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে একজন গবেষক।

২০০২ সাল থেকে ঘটকপুকুরের প্রথম ও একমাত্র পত্রিকা ‘উদার আকাশ’ প্রকাশ করে আসছেন, আজও। পত্রিকার আঙ্গিক বদল হয়েছে। বেড়েছে কাজের পরিধিও। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি যোগ করেছেন প্রকাশনা সংস্থা। সেই প্রকাশনা থেকে একের পর এক প্রকাশিত হয়েছে বহু সন্দর্ভ গ্রন্থ, যা সুধিজন ও সাহিত্যমনস্কদের ঋদ্ধ করেছে। সেই গ্রন্থসমূহ উদার আকাশ প্রকাশনা সংস্থার মান বাড়িয়েছে।

ফারুকের এই পথ পরিক্রমা সহজ ছিল না। যদিও কোনও উত্তরণই আপনা আপনি মুঠোয় এসে ধরা দেয় না। তার জন্যে দরকার হয় ঘাম ঝরানো, রক্ত জল করা, মেধার অনুশীলন, সর্বোপরি সুচিন্তিত পরিকল্পনার। সেই পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন বা পাচ্ছেন ফারুক। তার বাবা ছিলেন একজন গ্রাম্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। আয় অপ্রতুল। বাবার একার সেই স্বল্প আয়ে সংসার চালিয়ে, ফারুকের পড়াশোনার খরচ জোগানো কঠিন ছিল। পরিশ্রমের কোনও লঘু-গুরু হয় না, তেমনই কাজেরও। যার একটা নির্দিষ্ট ডেস্টিনেশন আছে, তাকে সেই মঞ্জিলে পৌঁছনোর জন্য তো হাঁটতেই হবে। ফারুক সেই হাঁটাতে পিছপা হননি। সেই এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে, নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাকে একসময় খেতমজুরের কাজ-সহ নানা ধরনের টুকটাক কাজ করতে হয়েছে। সেই অতীতকে কখনও অস্বীকার করেন না ফারুক। অগৌরবের বলেও মনে করেন না। বরং মনে করেন, ওই দিনগুলো সিঁড়ির এক-একটা সোনালি ধাপ। তা ভুলে যাওয়া পাপ। এইসব বিষয়ে তার বাবা তাকে সবসময় উৎসাহ দিতেন। হার না মানার জিদ বাড়িয়ে দিতেন।

ফারুক আহমেদ অনুভব করতেন, তার মধ্যে একটা একটা সাহিত্য-সত্তা আছে। সেই সত্তাকে মনে মনে লালন করতেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সেগুলো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হবে। একদিন নিজের পত্রিকায় ছাপবেন। তারপর তা নিজস্ব গ্রন্থে সন্নিবেশিত হবে। সেজন্য টিফিনের টাকাও আলাদা করে জমিয়ে রাখতেন। পত্রিকা করার একটা খরচ তো আছে।

শুরুর দিকে ‘উদার আকাশ’ পত্রিকায় সাহিত্যের পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদ, উন্নয়নের পক্ষে এলাকাবাসীর দাবিদাওয়াও স্থান পেত। এই উদ্যোগ দারুণভাবে সাড়া ফেলেছিল। অন্ধকারাচ্ছন্ন পিছিয়ে থাকা ভাঙড়ে, সেখানকার অবহেলিত মানুষদের কথা, তাদের চাওয়া-পাওয়া, তাদের ক্ষোভের কথা ছাপার অক্ষরে দশজনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এলাকারই ভূমিপুত্র—-ভাঙড়বাসী এমনটা আগে কখনও দেখেনি। ফলে এলাকাবাসীর কাছে ফারুকের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এটা ছিল এক ধরনের জাগরণের ডাক। মানুষ সানন্দে সাড়া দিল। প্রকাশিত হতে থাকল স্থানীয় সংবাদের পাশাপাশি কবিতা ও গদ্য। এই বিষয়ে পৃষ্ঠপোষকতা পান কবি লালমিয়া মোল্লা, ইকবাল আলম, সাবিনা বেগম, আলামারা খাতুন, আবদুর রাজ্জাকদের। বৃহত্তর মানুষের কাছে হয়তো নামগুলোর বিশেষ কোনও গুরুত্ব নেই, কিন্তু ঘটকপুকুরের মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তাঁদের অবদান পত্রিকাটির মর্যাদা ও পরিচিতি বৃদ্ধি করতে দারুণ সাহায্য করেছিল।
তখন ‘উদার আকাশ’ শুধু একটা পত্রিকা নয়, লেখক-পাঠক মিলে একটা টিম তৈরি হয়েছিল। মিডিয়ার একটা নিজস্ব শক্তি আছে। আওয়াজ তুললে, অন্যায়কারীরা শঙ্কিত হয়, প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ‘উদার আকাশ’কে খুঁটি করে লেখক-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের টিম মদের দোকান বন্ধ, মাদক বিক্রি বন্ধের দাবিতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিল। সাধারণ মানুষ এই শুভ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ফারুক আহমেদদের পাশে থেকে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল।

‘উদার আকাশ’-এর এই সফল উদ্যোগ এলাকায় সাড়া ফেলে। মানুষ আরও বেশি করে পাশে এসে দাঁড়ায়। এই সমাজ সংস্কারের উদ্যোগ এলাকায় আরও কিছু পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ে। গড়ে ওঠে আরও নতুন নতুন স্কুল।
মহিলারা পত্রিকার জন্য গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠাতে শুরু করেন। সম্পাদক ফারুক আহমেদ জুলেখা সুলতানার মতো তরুণীদের লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করেন। আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দেন। স্নাতক স্তরের ছাত্রী থাকাকালেই সুলতানার কবিতাগুলো প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সুলতানাদের কবিতা আজ বিভিন্ন পত্রিকায় সগৌরবে প্রকাশিত হয়। ‘উদার আকাশ’ই ছিল সেই শুরুর জানালা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটি আরও বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘উদার আকাশ’-এর জন্যে কলম ধরেছেন, তাঁদের মূল্যবান লেখা দিয়েছেন এই সময়ের খ্যাতনামা কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, কলামিস্টরা। এঁদের মধ্যে আছেন শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী, তিলোত্তমা মজুমদার, খাজিম আহমেদ, নলিনী বেরা প্রমুখ।

‘উদার আকাশ’ এখন আর কেবল একটি পত্রিকা নয়, তা হয়ে উঠেছে এক সাংস্কৃতিক মঞ্চ। সম্পাদক ফারুক আহমেদ স্থানীয় পাঠাগারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কুইজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক এবং দলীয় আলোচনার আয়োজন করেন। উদার আকাশ প্রকাশনা সংস্থার আয় থেকে তিনি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করেছেন। যেমন, সোনালি খাতুন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ওসনাই শেখ। উভয়েই এই সহায়তা থেকেই তাঁদের স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন।
যে কোনও বড় কাজে বাধা আসে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, আবার দৃঢ় মানসিকতা দিয়ে তার মোকাবিলাও করা যায়। ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশ ও প্রকশনা সংস্থাকে ঈর্ষণীয় জায়গায় তুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফারুক আহমেদ। দমে যাননি। দু’হাতে অন্ধকার সরিয়ে আলোর রেখা খুঁজেছেন। এই বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘সমালোচনা, ঈর্ষা, বিদ্রুপ এগুলো তো থাকবেই, আমি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি। আমি আমার লক্ষ্য কী তা জানি। তাই সেসব উপেক্ষা করে, নীরবে সম্পাদনাকর্ম চালিয়ে এসেছি। আমি তাদের কথায় যদি কান দিতাম, তাহলে হয়তো-বা আজকের এই ‘উদার আকাশ’ প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করতে পারতাম না। তবে তাদের বিশেষণ আমাকে পথ চলতে অনেকটা সচেতন করেছে। আজ বলতেই হচ্ছে, পিছিয়ে থাকা পশ্চিমবাংলার বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে এমন একটি পত্রিকা সম্পাদন করার একেবারে সহজ নয়। তারপরও প্রায় তিন দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে আমার সম্পাদনার কাজ। তার সুফল ও স্বীকৃতি পেয়েছি। বর্তমানে ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা আন্তর্জাতিক স্তরে (ISSN) রিসার্চ জার্নাল হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে। এমনকি ভাষা সাহিত্যের পিয়ার রিভিউড দ্বিভাষিক ষাণ্মাসিক রিসার্চ জার্নাল হিসেবে উভয় বাংলায় পরিচিতি পেয়েছে।
উদার আকাশ প্রকাশনা সংস্থা থেকে ইতিমধ্যে ১৭১টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উভয় বাংলার গবেষক ও পাঠক দরবারে সমাদৃত হয়েছে উদার আকাশ প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বেশ কিছু সাড়া জাগানো তথা সন্দর্ভ গ্রন্থ।’

ফারুক আহমেদের রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘বিশ্বপ্রেম’। তবে তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলো, যা তাকে প্রকাশনা জগতে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছে। তার সম্পাদিত প্রবন্ধ সংকলন ‘প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন’, ‘ফুরফুরা শরিফের পয়গাম’, ‘কংগ্রেস ও বামশাসনে মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক’, ‘পশ্চিমে সূর্যোদয় রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উলটপুরাণ’, ‘বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে কাজী নজরুল ইসলাম’ এবং ‘বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম’। ইংরেজিতে লেখা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর একটি গবেষণা গ্রন্থও সম্পাদনা করেছেন ফারুক আহমেদ। ইতিমধ্যেই ফারুক আহমেদ সম্পাদিত ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা ‘সংখ্যালঘু ও মুখ্যমন্ত্রী’, ‘মর্যাদার সন্ধানে’, ‘আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ’, ‘আত্মবিকাশের দর্পণ’, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনগ্রসর ও সংখ্যালঘু’, ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’, ‘ভূমিপুত্রদের জাগরণ’ এবং ‘কুৎসার জবাব উন্নয়ন’– সুধী পাঠকসমাজে নন্দিত হয়েছে। এগুলো পরে দলিল হিসেবে দুই মলাটের মধ্যে ধারিত হয়েছে। অনেকগুলো বেস্টসেলারও হয়েছে। তার সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য কাজ, শিক্ষানুরাগী মানবদরদি মোস্তাক হোসেনকে নিয়ে সংকলন গ্রন্থ ‘মোস্তাক হোসেন : জীবন ও ঐতিহ্য’।

ফারুক আহমেদ একাধারে কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং সমাজ সচেতন নাগরিক। সহজেই তিনি সব পরিস্থিতি হাসিমুখে মানিয়ে নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখতে জানেন। এর ফলেই কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, বাঁকুড়া থেকে বাদুড়িয়া– সর্বত্র তাঁর পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থায় পৃষ্ঠপোষকের অভাব বোধ করেন না। উভয় বঙ্গে এমনকী অসম-ত্রিপুরাতেও ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা আদরণীয় হয়ে উঠেছে।

তাঁর এই বিরল প্রতিভা এবং মূল্যবোধের সংমিশ্রণ আমাদের সমাজকে সমৃদ্ধ করবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ‘উদার আকাশ’ কেবল পত্রিকা নয়, আত্মমর্যাদার অভিজ্ঞান। ‘উদার আকাশ’ কেবল স্লোগান নয়, সুস্থ সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। বিভাগোত্তর পশ্চিমবাংলার বাঙালি মুসলমানদের সম্পর্কে বৃহদংশের যে অনীহা আর বীতরাগ তা বাস্তব সত্য। শৈল্পিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তা দূর করার প্রচেষ্টা বাঙালি মুসলমানকেই নিতে হবে। এখন সহাবস্থানবাদী বহু অমুসলিম গবেষক, ইতিহাসচর্চক এবং সত্যানুসন্ধানী স্কলাররা সামাজিক বিদ্বেষ নিরসনের কাজে ব্রতী হয়েছেন। তাহলেও মূল উদ্যোগ নিতে হবে বাঙালি মুসলমানকেই। এখন অনেকেই পত্রিকা করেন, কিন্তু মুখে বললেও, সেখানে প্রকৃত সমাজ উত্তরণের ভাবনা অনুপস্থিত। অভিযোগ ওঠে, তাদের অধিকাংশই নিজের আখের নিয়ে ব্যস্ত। ‘উদার আকাশ’ থেকে মুনাফা করা তার লক্ষ্য নয়, তাই ফারুক আহমেদ নিঃসন্দেহে অনেক ভিড়ের মধ্যেও ব্যতিক্রমী।

ফারুক আহমেদ পরম আন্তরিকতার সঙ্গে অবাঞ্ছনীয় আর গ্লানির প্রাচীর উচ্ছেদ করতে, সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে ‘উদার আকাশ’ পত্রিকা ও প্রকাশনাকে অবলম্বন করেছেন। গ্রহণীয় ও জনস্বীকৃত হয়েছেন। তার সেই প্রচেষ্টা পঁচিশ বছর ছুঁয়ে গেলেন। আগামীতে এই সন্ধান জারি থাকবেও নিশ্চয়।

২০০২ সালে বুকে স্বপ্ন ভরে মহানগরে পা রেখেছিলেন যে সদ্যযুবক, আজ তিনি অনেক পরিণত। তার স্বপ্নকে অনেকটাই বিকশিত করেছেন। এখনও অনেক কাজ আছে… অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমরা আশাবাদী, মানুষে মানুষে সহাবস্থানের, নিষ্কলুষ সামাজিক উন্নয়নের যে শপথ ফারুক আহমেদ বুকে জিইয়ে রেখেছেন, তা আরও পল্লবিত হবে। হবেই..

মুজতবা আল মামুন: লেখক

আরও পড়ুন