শিশুমনের দরজায় কবি আজও কড়া নাড়েন

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাধারণত ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবেই চিনি। তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্যের আহ্বান, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব যেন এক ঝড়ের মতো। কিন্তু এই ঝড়ের কবির ভিতরে যে এক আশ্চর্য কোমল, দুরন্ত এবং শিশুমন লুকিয়ে ছিল, সেই নজরুলকে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। অথচ শিশুদের জন্য তাঁর লেখা কবিতা, ছড়া ও গান বাংলা শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল সম্পদ। বাচ্চাদের কাছে নজরুল কোনও দূরের, গম্ভীর কবি নন; তিনি যেন তাদেরই বন্ধু—যিনি গল্প করেন, ছড়া কাটেন, দুষ্টুমি করেন, প্রকৃতির সঙ্গে খেলেন এবং ছোট্ট মনকে কল্পনার ডানা মেলে উড়তে শেখান।
নজরুলের শিশুসাহিত্য পড়লে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল তাঁর শিশুমন বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি শিশুদের সামনে বড়দের মতো করে নীতিকথা সাজিয়ে বসেননি। শিশুকে বোঝাতে গিয়ে শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ, কৌতূহল, দুষ্টুমি ও কল্পনাকে নষ্ট করেননি। বরং সেই মনটিকেই গ্রহণ করেছেন। তাই তাঁর কবিতায় কখনও কাঠবিড়ালি হয়ে ওঠে শিশুর বন্ধু, কখনও পুতুলের বিয়ে বসে, কখনও বাগানের লিচু ছোট্ট ছেলেটির চোখে হয়ে ওঠে দুর্নিবার আকর্ষণ, কখনও ভোরের প্রকৃতি শিশুর চোখে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়।
‘লিচুচোর’ কবিতার সেই দুরন্ত ছেলেটির কথা মনে পড়লেই বোঝা যায় নজরুল কী অসাধারণভাবে শিশুমনের দুষ্টুমিকে কবিতায় ধরেছিলেন। বাগানের লিচু দেখে লোভ হওয়া, সুযোগ বুঝে লিচু পাড়তে যাওয়া, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়—এসবই তো শৈশবের চেনা অভিজ্ঞতা। কিন্তু নজরুল সেখানে শিশুটিকে অপরাধী করে তোলেননি। তার দুষ্টুমির মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের নির্মল আনন্দ। এই কারণেই ‘লিচুচোর’ কেবল একটি মজার কবিতা হয়ে থাকেনি; প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশু নিজেদের ছায়া খুঁজে পেয়েছে সেই দুরন্ত চরিত্রটির মধ্যে।
‘খুকু ও কাঠবিড়ালি’তেও নজরুলের শিশুমনের আর-একটি অপূর্ব পরিচয় পাওয়া যায়। একটি ছোট্ট শিশুর সঙ্গে একটি কাঠবিড়ালির কথোপকথন—বাস্তব পৃথিবীতে যা অসম্ভব, শিশুর কল্পনার জগতে সেটিই স্বাভাবিক। শিশু তো পাখির সঙ্গে কথা বলে, পুতুলকে খাওয়ায়, চাঁদকে মামা বলে ডাকে, মেঘকে দেখে গল্প বানায়। নজরুল সেই কল্পনার জগতকে কোনওভাবেই অস্বীকার করেননি। বরং তাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে সেই জগতকে আরও সুন্দর করে তুলেছেন। এটাই তাঁর শিশুসাহিত্যের অন্যতম বড় শক্তি।
নজরুলের ছন্দের মধ্যেও রয়েছে শিশুর স্বভাবসিদ্ধ চঞ্চলতা। তাঁর শব্দ যেন বসে থাকতে চায় না। তারা দৌড়ায়, লাফায়, নাচে, কখনও হঠাৎ থেমে যায়, আবার ছুটে চলে। শিশুর মনও তো ঠিক এমনই। এক মুহূর্তে সে খেলছে, পরের মুহূর্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে পাখি দেখছে; একটু পরেই হয়তো নতুন কোনও প্রশ্ন নিয়ে হাজির। নজরুলের ছড়া ও কবিতার ছন্দ সেই অস্থির, প্রাণবন্ত শিশুমনকে খুব সহজেই নিজের মধ্যে টেনে নেয়। তাই তাঁর শিশু-কবিতা শুধু পড়ার জন্য নয়, বলার জন্যও। মুখে উচ্চারণ করলেই তার মধ্যে খেলার একটা ছন্দ তৈরি হয়।
শিশুসাহিত্যে নজরুলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রকৃতির উপস্থিতি। ভোরের আলো, পাখির ডাক, ফুল, গাছ, নদী, মাঠ—প্রকৃতি তাঁর কবিতায় কোনও দূরের দৃশ্য নয়। শিশুর জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ। ‘প্রভাতী’-র মতো কবিতায় ভোরের পৃথিবী শিশুর বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে যায়। প্রকৃতিকে তিনি শিশুর কাছে পাঠ্যবইয়ের কোনও অধ্যায় করে দেননি; বরং প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর বন্ধুত্ব তৈরি করেছেন। একটি পাখির ডাক, একটি ফুলের গন্ধ, সকালের আলো—এসবের মধ্যেই শিশুর কাছে পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করার আনন্দ রয়েছে।
এই জায়গাতেই নজরুল আজকের দিনেও বিশেষ প্রাসঙ্গিক। আজকের শিশুর চারপাশ বদলে গেছে। অনেক শিশুর শৈশব এখন মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার গেম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনে ঘেরা। মাঠে খেলাধুলার সময় কমেছে, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমেছে। কিন্তু শিশুমনের মৌলিক কৌতূহল বদলায়নি। সে এখনও গল্প শুনতে চায়, ছড়া শুনে আনন্দ পায়, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায়, পাখি দেখে থমকে দাঁড়ায়, বৃষ্টিতে ভিজতে চায়। তাই নজরুলের শিশু-কবিতা আজও পুরোনো হয়নি। বরং প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে শিশুকে কল্পনার জগতে ফিরিয়ে আনার জন্য এই কবিতাগুলির প্রয়োজন আরও বেড়েছে।
তবে নজরুলের শিশুদের জন্য লেখা সাহিত্যকে শুধু হাসি-দুষ্টুমি আর প্রকৃতির কবিতা হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তাঁর সমগ্র সাহিত্যেই স্বাধীনতার চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নটি গভীরভাবে উপস্থিত। শিশুদের জন্য লেখা রচনাতেও সেই মুক্তচেতনা নানা ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল এমন শিশু কল্পনা করেননি যে শুধু বড়দের কথা শুনবে এবং প্রশ্নহীনভাবে সবকিছু মেনে নেবে। তাঁর শিশুমনের ভিতরে রয়েছে প্রশ্ন, সাহস এবং স্বাধীনভাবে ভাবার আকাঙ্ক্ষা।
নজরুলের নিজের জীবনও ছিল এক দুরন্ত অভিযাত্রার মতো। দরিদ্র পরিবারে জন্ম, অল্প বয়সে নানা কাজ, লেটোর দলে যোগদান, গান ও নাটকের সঙ্গে পরিচয়, সৈনিক জীবন, সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা—জীবনের প্রতিটি বাঁক তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে। সেই জীবনে ছিল অভাব, সংগ্রাম, বিদ্রোহ, প্রেম, আনন্দ এবং অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয়। সম্ভবত এই বহুমাত্রিক জীবনই তাঁর ভিতরের শিশুমনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তিনি জীবনকে কেবল গুরুগম্ভীর চোখে দেখেননি; বিস্ময় নিয়েও দেখেছেন।
এই কারণেই তাঁর শিশুসাহিত্যে এক ধরনের মুক্ত বাতাস পাওয়া যায়। সেখানে শিশুকে ছোট করে দেখা নেই। শিশুর কল্পনাকে তুচ্ছ করা নেই। বরং শিশুকে একটি পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। নজরুল যেন বলতে চান, শিশুর পৃথিবীকে শুধু শাসন দিয়ে তৈরি করা যায় না। তাকে ভালোবাসতে হয়, তার কথা শুনতে হয়, তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং তার কল্পনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের এই অবদান তাই বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি শিশুদের জন্য শুধু কিছু কবিতা লেখেননি; তিনি শিশুর নিজস্ব একটি জগৎকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছেন। সেখানে বড়দের পৃথিবীর নিয়মকানুন সবসময় কার্যকর নয়। সেখানে একটি কাঠবিড়ালি কথা বলতে পারে, পুতুলের বিয়ে হতে পারে, একটি লিচু হয়ে উঠতে পারে অভিযানের কারণ, আর ভোরের সূর্য হয়ে উঠতে পারে বিস্ময়ের দরজা।
আজ যখন শিশুদের সাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের আরও বেশি করে নজরুলের কাছে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি কবিতা মুখস্থ করিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। শিশুদের নজরুলকে পড়াতে হবে আনন্দের সঙ্গে। বাবা-মা সন্তানকে ‘লিচুচোর’ পড়ে শোনাতে পারেন। শিক্ষক ক্লাসে ‘খুকু ও কাঠবিড়ালি’ নিয়ে শিশুদের সঙ্গে গল্প করতে পারেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর ছড়া অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা যেতে পারে। শিশুকে শুধু কবিতার অর্থ লিখতে বলা নয়, কবিতাটিকে অনুভব করতে শেখানো দরকার।
কারণ শিশুর কাছে সাহিত্য প্রথমে পরীক্ষার বিষয় নয়, আনন্দের বিষয়। যে কবিতা তাকে হাসায়, বিস্মিত করে, ভাবায় এবং নিজের সঙ্গে মিল খুঁজে নিতে সাহায্য করে, সেই কবিতাই তার মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। নজরুলের শিশু-কবিতার সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। তিনি শিশুকে উপদেশ দিয়ে জয় করতে চাননি; তিনি শিশুর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
নজরুলকে আমরা যতই ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে স্মরণ করি, তাঁর ভিতরে থাকা এই শিশুটিকেও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। যে কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন, তিনিই আবার শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন ছন্দের খেলনা। যে কবি সাম্যের কথা বলেছেন, তিনিই শিশুর কল্পনাকে দিয়েছেন অবাধ আকাশ। যে কবি মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন, তিনিই শিশুকে ভয়হীনভাবে পৃথিবীকে দেখতে শিখিয়েছেন।
নজরুলের শিশুসাহিত্যের সৌন্দর্য তাই শুধু তার শব্দে বা ছন্দে নয়, তার দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি শিশুকে ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে দেখেছেন ঠিকই, কিন্তু তার আগে তাকে বর্তমানের আনন্দময় মানুষ হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। শিশুর হাসি তাঁর কাছে তুচ্ছ নয়, দুষ্টুমি অপরাধ নয়, কল্পনা অবাস্তব নয়। এগুলিই শিশুর পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতাময় পৃথিবীতে সেই কথাটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে রাখা দরকার। শিশুকে শুধু ভালো নম্বরের জন্য তৈরি করলে সে সফল হতে পারে, কিন্তু সুন্দর মানুষ হয়ে উঠবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। তার ভিতরের কল্পনা, প্রশ্ন, আনন্দ ও স্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখাও জরুরি। নজরুলের শিশু-কবিতা সেই কাজটিই করতে পারে।
নজরুল বিদ্রোহী কবি নন, শুধু প্রেম ও সাম্যের কবিও নন। তিনি শিশুর হাসির কবি, দুষ্টুমির কবি, কল্পনার কবি। তাঁর কবিতার পাতায় আজও ছোট্ট ছেলেমেয়েরা নিজেদের পৃথিবী খুঁজে পায়। সেখানে কোনও কঠিন দরজা নেই, কোনও নিষেধের তালিকা নেই—আছে খেলার মাঠ, ভোরের আলো, কাঠবিড়ালি, পুতুল, লিচু আর অসীম কল্পনার আকাশ। সেই আকাশের নিচে নজরুল আজও দাঁড়িয়ে আছেন—একজন বড় কবি হয়ে নয়, একজন বড়দের পৃথিবীতে হারিয়ে না-যাওয়া ছোট্ট শিশুমন নিয়ে। শিশুদের নজরুলকে নতুন করে পড়া মানে শুধু একজন কবিকে পড়া নয়; নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সেই নির্মল, কৌতূহলী শিশুটিকেও আবার একটু খুঁজে পাওয়া।
নজরুলের জীবন থেমে গেছে, তাঁর কণ্ঠ একদিন নীরব হয়ে গেছে, কিন্তু শিশুমনের কাছে তাঁর সেই ডাক আজও থামেনি। কোনও ছোট্ট শিশু যখন ‘লিচুচোর’ পড়ে হেসে ওঠে, ‘খুকু ও কাঠবিড়ালি’ পড়ে নিজের মতো করে এক পৃথিবী বানিয়ে নেয়, কিংবা ‘প্রভাতী’র ভোরে জানলার বাইরে তাকিয়ে নতুন দিনের আলো দেখে—তখন মনে হয়, কবি এখনও আমাদের মাঝেই আছেন। তাঁর শরীর নেই, কিন্তু তাঁর শব্দের ভিতর দিয়ে তিনি এখনও শিশুদের হাত ধরে হাঁটছেন। কবির মৃত্যু হয় শরীরে; শিশুর মুখে উচ্চারিত একটি কবিতায় তিনি আবার জন্ম নেন।
সেই জন্মের কোনও মহাপ্রয়াণ নেই।
দীপক সাহা (পশ্চিমবঙ্গ) : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক
