দিল সে: দ্য লাস্ট রোমান্টিক

অধ্যায় ১: পলট
(দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে দিন)
মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভ। রাত তখন এগারোটা। আরব সাগরের বুক চিরে একনাগারে ঝিরঝির বৃষ্টি নেমেছে।
আয়াতের হাতের নোটবুকের পাতাগুলো নোনা জল আর বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে একাকার। সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত কালো জলরাশি, আর ঠিক পিছনেই আলোয় ঝলমল করছে ‘মন্নত’। আয়াত এখানে এসেছে তার পিএইচডি গবেষণার কাজে—যার বিষয়বস্তু, “এসআরকে: এক সংশয়ী যুগের শেষ রোমান্টিক”।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“পলট।”
আয়াত চমকে পিছন ফিরল। সামনে দাঁড়িয়ে সাদা শার্টের হাতা গোটানো এক ভদ্রলোক। বয়স ষাটের কোঠায় হলে কী হবে, চোখের চাউনিতে আজও ঠিক পঁচিশ বছরের সেই চিরসবুজ ‘রাজ’!
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে আয়াত বলল, “আপনি… আপনি শাহরুখ খান?”
“হ্যাঁ। আর তুমি আয়াত। আমাকে নিয়ে পিএইচডি করছ, অথচ আমাকেই চেনো না।”
“মানে? ঠিক বুঝলাম না।”
“তুমি পঁচিশ বছর ধরে আমার সিনেমা দেখছ। কিন্তু কখনো ‘পলট’ শব্দটার আসল মানে তলিয়ে দেখনি।”
শাহরুখ হাতের ইশারায় উত্তাল সমুদ্রটা দেখালেন। “দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে-তে সিমরান যখন ট্রেনের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, রাজ বলেছিল ‘পলট’। ও পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। কেন বলো তো?”
আয়াত কিছুটা ভেবে বলল, “কারণ ও রাজকে ভালোবাসত?”
শাহরুখ মাথা নাড়লেন, “না। কারণ রাজ তাকে স্বাধীনতা দিয়েছিল… নিজেকে বেছে নেওয়ার। রোমান্স মানে কোনো অধিকার খাটানো বা দাবি করা নয়, রোমান্স হলো অনুমতি।”
তিনি একটা লাল ছাতা আয়াতের হাতের মুঠোয় গুঁজে দিলেন। “আজকের রাতটা তুমি মন্নতেই থাকবে। কাল সকালে তোমার প্রথম পাঠ শুরু। তবে একটা শর্ত আছে—”
“কী শর্ত?”
“আমি যখনই বলব ‘পলট’, তুমি কোনো প্রশ্ন ছাড়া পিছন ফিরে তাকাবে। কারণ রোমান্স কখনো প্রশ্ন করে না, সে শুধু বিশ্বাস চায়।”
সেদিন রাতে ডায়েরির পাতায় আয়াত লিখেছিল: “আমি শাহরুখ খানের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলাম। আর উনি আমাকে জীবনকে সাক্ষাৎকার করতে শেখাচ্ছেন।”
পাঠ ১: রোমান্স মানে দাবি নয়, অনুমতি। আর সেই অনুমতি চাওয়ার আগে… প্রথমবার পিছন ফিরে তাকাতে হয়।
অধ্যায় ২: ইন্তেজার ভি ইশক হ্যায়
(বীর-জারা দিন)
মন্নতের বিশাল গ্রন্থাগার ঘর। টেবিলের ওপর যত্নে রাখা বাইশ বছর পুরোনো ‘বীর-জারা’র মূল চিত্রনাট্য।
শাহরুখ চিত্রনাট্যটার ওপর হাত রেখে বললেন, “আজকের পাঠ হলো—প্রতীক্ষা।”
আয়াত হেসে ফেলে বলল, “প্রতীক্ষা? কিন্তু আমাদের প্রজন্ম তো অপেক্ষা করতে শেখেনি। আমরা সোয়াইপ করি আর এগিয়ে যাই।”
শাহরুখ ওর কথা শুনে মৃদু হাসলেন। “তোমাদের প্রজন্ম ভালোবাসার মধ্যেও ‘পরের দিন ডেলিভারি’ খোঁজে। কিন্তু আসল প্রেম… সে তো স্পিড পোস্টও নয়, সে হলো কবুতরের পিঠে পাঠানো চিঠি।”
তিনি জানালা গলে একটা খাম বাতাসের বুকে উড়িয়ে দিলেন। “বীর বাইশ বছর পাকিস্তানের জেলে বন্দি ছিল। জারাও বাইশ বছর ধরে তার পথ চেয়ে বসেছিল। কোনো বার্তা ছিল না, কোনো ফোন ছিল না। ছিল শুধু একটা অটুট বিশ্বাস।”
আয়াত তর্কের খাতিরে বলল, “কিন্তু এটা তো অবাস্তব!”
শাহরুখ বললেন, “বাস্তবতা আসলে কী আয়াত? দুই সপ্তাহ দেখা করার পর তৃতীয় সপ্তাহে ব্লক করে দেওয়া? ইশকের জন্য ধৈর্য লাগে, আয়াত।”
তিনি পকেট থেকে একটা সিলমোহর দেওয়া বন্ধ খাম আয়াতের হাতে দিলেন। “এটা এখন খুলবে না। ঠিক সাত দিন পর খুলবে। তত দিন শুধু অপেক্ষা করো।”
পাঠ ২: প্রতীক্ষাও ভালোবাসারই অংশ… আর ভালোবাসা কখনো চিৎকার করে নিজেকে জাহির করে না।
অধ্যায় ৩: আলবিদা সে পেহলে হাসি
(কাল হো না হো দিন)
টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের এক চিলতে ছাদ। শাহরুখের কাঁধে একটা গিটার ঝুলছে।
আয়াত চারপাশটা দেখে জিজ্ঞেস করল, “আমরা এখানে কেন এসেছি?”
শাহরুখ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারণ ‘কাল হো না হো’। আমান মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও হাসতে ভোলেনি।”
ছাদের এক কোণে একটা দশ বছরের বাচ্চা কেমোথেরাপির ধকল নিয়ে বসে আছে। শাহরুখ গিটার বাজালেন: “হার ঘড়ি বদল রহি হ্যায় রূপ জিন্দেগি…”
বাচ্চাটার মুখে হাসি। আয়াতের চোখে জল।
শাহরুখ আয়াতের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে একটা পোলারয়েড ছবি দিলেন — হাসপাতালের বাচ্চার পাশে আয়াত হাসছে। “আজ তুমি দীর্ঘ তিন বছর পর হাসলে। এই হাসিকে কখনো বিদায় বোলো না।”
পাঠ ৩: রোমান্স মানে বিদায়ের আগেও এক চিলতে হাসি। বিদায় মানেই সব শেষ নয়, বরং এক নতুন শুরু।
অধ্যায় ৪: খুদ সে ইশক
(পাঠান দিন)
মেহবুব স্টুডিওর অ্যাকশন সেট। আটান্ন বছর বয়সেও শাহরুখ দড়িতে ঝুলছেন।
“বয়স স্রেফ একটা সংখ্যা মাত্র। লোকে যখন বলেছিল আমার সব শেষ, আমি তখন বলেছিলাম—পিকচার অভি বাকি হ্যায়!”
তিনি আয়াতকে বক্সিং গ্লাভস দিয়ে বললেন, “নিজেকে মারো। তোমার ভেতরে যে বলে ‘তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না’, তাকে আঘাত করো।”
আয়াত কাঁদতে কাঁদতে ঘুষি মারল। শাহরুখ আয়নার সামনে দাঁড় করালেন, “তাকাও। এই হলো তোমার আসল নায়িকা।”
পাঠ ৪: আগে নিজেকে ভালোবাসতে শেখো। তারপর দেখবে, এই পুরো ব্রহ্মাণ্ড তোমার ভালোবাসার টানে ছুটে আসবে।
অধ্যায় ৫: ঘর লৌট কে আনা
(স্বদেশ দিন)
মুম্বাই বিমানবন্দর। শাহরুখের হাতে দুটো বোর্ডিং পাস।
“তুমি যাচ্ছ। আমি তোমাকে বিদায় জানাতে এসেছি।”
তিনি আয়াতের হাতে সিলেটের একমুঠো মাটি দিলেন। “তুমি গত পাঁচ বছর ধরে বাড়ি যাওনি। যেদিন মা থাকবে না, সেদিন শুধু আফসোস থাকবে।”
ভিডিও কলে আয়াতের মাকে বললেন, “আন্টি, আয়াতকে ফেরত পাঠাচ্ছি। একটু আদা চা বানিয়ে রাখবেন।”
পাঠ ৫: রোমান্স মানে শুধু ডানা মেলে উড়ে যাওয়া নয়। রোমান্স মানে বুক ভরা সাহস নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসা।
অধ্যায় ৬: সত্তর মিনিট
(চক দে দিন)
ফিল্মসিটির হকি মাঠ। শাহরুখ কোচ কবির খান।
“আজকের পাঠ—সত্তর মিনিট। এই সত্তর মিনিট তোমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়।”
আয়াত অধিনায়ক। প্রথমার্ধে ০-৩। ড্রেসিংরুমে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা: “আমি কারও কথা শুনব না।”
শেষ মিনিটে শট বারে লাগল। ম্যাচ ড্র। শাহরুখ বললেন, “তুমি হারোনি। এই জেদের আগুনটাই তোমার আসল জয়।”
কবজিতে রিস্টব্যান্ড: ৭০ মিনিটস।
পাঠ ৬: জীবনটা আসলে ওই সত্তর মিনিটের একটা খেলা। তফাতটা শুধু বিশ্বাসের।
অধ্যায় ৭: দিল সে… আলবিদা না
(যব তক হ্যায় জান দিন)
লন্ডনের এসওএস বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণা প্রতিরক্ষা।
আয়াত: “আমি সাত দিনের একটা প্রেমের চিঠি লিখে এনেছি।”
চিরকুট এলো: “খেলার শেষ মিনিট চলছে। ভয় পাবে না। কারণ ‘যব তক হ্যায় জান’… তব তক ইশক হ্যায়।”
ফল: ডক্টর আয়াত।
তিন মাস পর মেরিন ড্রাইভ। আবার বৃষ্টি। আবার সেই কণ্ঠ—“পলট।”
শাহরুখ প্যারাপেটে লিখলেন:
“দিল সে… বিদায় হয় না। কারণ দিল থেকে যাকে ভালোবাসে… সে সবসময় ফিরে আসে। গল্পে, স্মৃতিতে, আর কারও না কারও হাসিতে।”
আয়াত: “এটা বিদায়?”
শাহরুখ দু’হাত ছড়িয়ে: “কখনোই না। এটা তো স্রেফ একটা বিরতি!”
পাঠ ৭: যতদিন প্রাণ আছে, ততদিন প্রেম আছে। আর ভালোবাসার আসল মানে হলো… কারও জীবনে সামান্য একটুখানি আলো রেখে যাওয়া।
কিছু প্রেমের গল্প সিনেমায় শেষ হয়, কিছু শেষ হয় বইয়ের পাতায়। কিন্তু ‘দিল সে’ তৈরি হওয়া গল্পগুলো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। আর সেই গল্পের কোনো ‘শেষ’ হয় না।
ফারুক আহমেদ : সম্পাদক ও প্রকাশক, উদার আকাশ
