শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ

প্রকৃত একজন শিক্ষকই জানেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সবার শিক্ষক এবং আজও তিনি সেই আসনটি অলংকৃত করে রয়েছেন। শুধু বাংলা সাহিত্য বা সংস্কৃতি জগতের দিগগজই নন, তিনি একাধারে এক দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ও অনন্য শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাভাবনা ও শিক্ষকতার রূপটি প্রথাগত বিদ্যালয়ের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অত্যন্ত প্রগতিশীল ও মনস্তাত্ত্বিক। বাল্যকালে নিজের তিক্ত শিক্ষা লাভের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী মুখস্থনির্ভর শিক্ষা শিশুদের মনের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি একজন স্রষ্টা ও শিক্ষক হিসেবে এক নতুন শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলেন।
‘শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ’ ও তাঁর শিক্ষাদর্শনের বিভিন্ন পরিচয় আমাদের জানা দরকার। ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ মাত্র পাঁচজন ছাত্র (যার মধ্যে তাঁর নিজের বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথও ছিলেন) এবং পাঁচজন শিক্ষক নিয়ে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যা আশ্রম’ বা ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় যে কেরানি তৈরির শিক্ষা চালু ছিল, তার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এমন এক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা মানুষকে স্বাবলম্বী, মুক্তমনা ও প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

রবীন্দ্রনাথ শুধু প্রতিষ্ঠান গড়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি নিজে সরাসরি ক্লাসে অংশ নিতেন এবং শিক্ষক হিসেবে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত শিক্ষা চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। তাই শান্তিনিকেতনে গাছের ছায়ায়, মুক্ত আকাশের নিচে খোলামেলা পরিবেশে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ ও গন্ধের ভেতর দিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষা লাভ করতে পারে, সেদিকে তাঁর বিশেষ নজর ছিল। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার দূরত্ব মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন তিনি। গুরুগম্ভীর বা শাসনকঠিন শিক্ষক না হয়ে তিনি শিশুদের কাছে বন্ধু ও সহচর হয়ে উঠতেন। তাদের সঙ্গে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প করা, পুরাণ চর্চা করা এবং তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করতেন। শিশুদের ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আনন্দহীন শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা নয়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, নাটক অভিনয় এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে পাঠ্যক্রমের আবশ্যিক অঙ্গ করে তোলা হয়েছিল।

পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ পুনর্গঠনের ওপর শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। পরে ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি কৃষি কাজ, তাঁতবোনা, চামড়ার কাজ, ছুতোরের কাজ (কাঠের কাজ) ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেন।
ছাত্রদের আলাদা ছোট ছোট জমিও দেওয়া হতো, যেখানে তারা নিজেদের পছন্দমতো শাকসবজি ও বাদামের চাষ করত। এর মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শারীরিক শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।
রবীন্দ্রনাথের ক্লাসে বইয়ের পাতার বাইরেও জগৎকে দেখার চোখ তৈরি হতো। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু তথ্য মুখস্থ করা নয়, বরং সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা। শান্তিনিকেতনের দৈনন্দিন কার্যক্রমে গান, ছবি আঁকা, নৃত্য এবং নাট্যচর্চা অপরিহার্য ছিল। তিনি মনে করতেন, কান তৈরি হবে সংগীতের মাধ্যমে এবং চোখ তৈরি হবে চিত্রকলার মাধ্যমে—তবেই জগৎকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব।
শিক্ষক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরিধি কেবল ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর মূল মন্ত্র ছিল—যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্ (যেখানে সমস্ত বিশ্ব একটি নীড়ে এসে মিলিত হয়েছে)। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মিলন ঘটাতে এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে বিশ্বমৈত্রী ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার এক আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠ হিসেবে তিনি একে গড়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে কখনো সাধারণ অর্থে প্রথাগত শিক্ষক বা গুরু বলে দাবি করেননি, বরং তিনি নিজেকে বলতেন ‘বিচিত্রের দূত’। শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ শিশুদের আনন্দ ও স্বাধীনতার মধ্যে বড় করে তুলতে চেয়েছেন, যা আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানেও আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।
‘শিক্ষা’ গ্রন্থে তাঁর বেশ কিছু যুগান্তকারী শিক্ষা-প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে, যেগুলোতে তিনি তৎকালীন ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা এবং আদর্শ শিক্ষণপদ্ধতির রূপরেখা দিয়েছেন। যেমন শিক্ষার হেরফের (১৮৯২)–যেখানে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান এবং শিশুদের ওপর থেকে মুখস্থ বিদ্যার বোঝা কমানোর জোরাল দাবি করেছেন। আশ্রমের শিক্ষা–শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজ হাতে গড়া ব্রহ্মচর্যা আশ্রমের পরীক্ষামূলক শিক্ষাদান ও প্রকৃতির কোলে পাঠদানের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। শিক্ষার মিলন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’–যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে বিশ্বভারতী গঠনের রূপকল্প তুলে ধরেছেন। শিক্ষক রবীন্দ্রনাথের মহতী প্রয়াসের আজ সর্বত্রই প্রয়োগ হতে দেখা যাচ্ছে।
তৈমুর খান : কবি ও শিক্ষক
