কুমারনদের আখ্যান

দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্গত বাংলাদেশ নদীমাতৃক একটি দেশ। ‘নদীমাতৃক’ শব্দটিকে ভাঙালে হয় ‘নদী মাতা যাহার’। ছোট, মাঝারি ও বড় নদীর গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বাংলার জনপদ। এসব নদীই বাংলাদেশের প্রাণ। নদীগুলো জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এ দেশজুড়ে। নদীর দু-পাশেই গড়ে উঠেছে নগর ও বন্দর; প্রতিনিয়ত চলছে হাটবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য। নদীবিধৌত বাংলাদেশের জনজীবন ওই গতিপথে পরিচালিত। তেমনই একটি নদী ‘কুমার নদী’। যা আজ লোকমুখে ‘কুমার নদ’।
কুমার বলেই কী সে নদ! লোকবিশ্বাস, লোকাচার, জারি-সারি, পুঁথি-পালা গান- এই নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত। সে-সব সমাজ-সংস্কৃতির কথা নিয়ে কবি ও ছোটকাগজ সম্পাদক মাহফুজ রিপন প্রকাশ করেছেন তাঁর ব্যাটিংজোন-এর সাম্প্রতিক সংখ্যা ‘কুমার নদ সংখ্যা’।
সম্পাদকীয় ভাষ্যে মাহফুজ রিপন বলেছেন যে, এ নদীকে ঘিরে বহু লোককথন, লোককাহিনি এবং মিথ প্রচলিত রয়েছে এবং সেগুলোই এই জনপদের হীরকখণ্ড। মুক্তগদ্য, স্মৃতিকথা, গল্প ও কবিতার ভেতর দিয়ে সম্পাদক সেগুলোকে ছুঁতে চেয়েছেন। বেশ কিছু গদ্যে আমরা তার উজ্জ্বল প্রমাণ পাই। যেমন- প্রথম লেখা গৌতম কুমার রায়ের ‘কুমার নদ: যার জলে বিস্ময়’ লেখাটি কুমার নদের উৎপত্তি ও এর প্রাকৃতিক স্বভাব, পরিবেশ-প্রতিবেশ; একে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদের লোকাচার, সংস্কৃতি, হাটবাজার-বাণিজ্য; নদী দখলের রাজনীতি, নগরায়ণের বিষবাষ্পে এর যে নাভিশ্বাস সে-সব সংক্ষিপ্ত পরিসরে উঠে এসেছে পাঠকের সামনে।
আবার কুমার নদ কেন চিরকুমার? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন এতদাঞ্চলে প্রচলিত একটি মীথকে আশ্রয় করে লেখক-অধ্যাপক মোসায়েদ হোসেন ঢালী তাঁর ‘কুমার নদের জন্মকথা’ গদ্যে। আর ‘আমার দেখা কুমার নদ’-এ অমল কৃষ্ণ দাস মূলত এই নদীর মাধ্যমে একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন দিকে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গূঢ় ছিল, সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। খুলনা-গোপালগঞ্জের যোগাযোগে এ নদের ভূমিকা ছিল। ঢাকার সঙ্গে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের যোগাযোগ ছিল এ নদীর মাধ্যমে। সে-সময় পাট বোঝাই গয়না নৌকা এসে ভিড়ত মুকসুদপুরের দলিল লিখন অফিস ও পোস্ট অফিসের নিকটবর্তী পাড়ের লঞ্চঘাটে। ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুর থেকে মুকসুদপুর ব্যবসা কেন্দ্রগুলোর যাবতীয় যোগাযোগ মাধ্যম ছিল একমাত্র এই কুমার নদই।
তবে ব্যাটিংজোন-এর ‘কুমার নদ সংখ্যা’-র দুটি গুরুত্বপূর্ণ গদ্য হচ্ছে বঙ্গ রাখালের ‘কুমার নদ: প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ ও লালনের আখড়া’ এবং মুকসুদপুর অঞ্চলের লোকসাহিত্য নিয়ে সনোজ কুণ্ডুর লেখা ‘কুমার পাড়ের লোকসাহিত্য। তরুণ গবেষক বঙ্গ রাখাল লোকসংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন। আবার তার নিজের বাড়িও এই কুমার নদের কোল ঘেঁষে। ফলে তিনি তাঁর শৈশবে দেখা কুমার নদের স্মৃতিচারণে যে লোকাচার, সে বিষয়টির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও লালন শাহের সম্পর্ক নির্ণয় করেছেন। তিনি লিখেছেন, “লালন সাঁইয়ের অনেকগুলো আখড়া বাড়ি থাকলেও উল্লেখযোগ্য আখড়ার একটি ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানাধীন আলমডাঙা বাজারের নিকট চরচড়িয়া গ্রামে। এখানে তাঁর শিষ্য ছিলেন শুকুর শাহ। প্রচলিত আছে, হরিশপুর থেকে লালন নৌকাযোগে কুমার নদ হয়েই এই চরচড়িয়ার আখড়ায় আসতেন। এখানে তিনি তত্ত্বগান করেছেন, এর বিশ্লেষণ করে শিষ্যদের শিক্ষা দিয়েছেন তত্ত্বের কঠিন তথ্য। আবার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমার নদ পাড়ি দিয়েই পাকসেনারা বাজুখালীতে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সে-সব শহিদদের মাটিচাপা দেয়া হয় এই কুমারের তীরেই। এ নিবন্ধে একটি অন্যরকম সংবাদও রাখাল পাঠকদের উদ্দেশে দিয়েছেন, তা হলো- মুক্তিযযোদ্ধারা কুমার নদের ওপর দাঁড়ানো ব্রিজটিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। পাকসেনারা কুষ্টিয়া থেকে যশোরে যাওয়ার সময় দ্রুতগতির কারণে কুমার নদের মধ্যে আছড়ে পড়ে। তখন তারা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের গ্রামগুলোতে। এই সুযোগে গ্রামবাসী অনেক পাকসেনাদেরও পিটিয়ে হত্যা করেছিল। সংক্ষিপ্ত পরিসরে বঙ্গ রাখালের এই গদ্যটি থেকে আমাদের লোকসংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পাঠক অবহিত হতে পারবেন। অন্যদিকে যশস্বী লেখক সনোজ কুণ্ডু কুমার নদের তীরবর্তী গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার লোকসাহিত্য তুলে ধরেছেন। এবং এ কাজটি করতে গিয়ে তিনি এ নদের উৎপত্তিকথা, মুকসুদপুর থানার নামকরণের ইতিহাসও এখানে যোগ করেছেন। ফলে তাঁর এ লেখাটি পেয়েছে অন্যমাত্রা। এ কারণে যে, এর মাধ্যমে পাঠক এই জনপদের সঙ্গে এর লোকাচার ও লোকসংস্কৃতির যোগসূত্র নির্ণয়ে সক্ষম হবেন। লেখক তাঁর এ গদ্যে ছোটো ছোটো ভাবে বিষয়গুলোকে পৃথকীকরণ করে এক নিমিষে পাঠকের বুঝার সুবিধা করে দিয়েছেন। লোকসাহিত্যকে তিনি বিভাজন করেছেন- লোকপ্রবাদ, লোকধাঁধা, লোকছন্দ, লোকপুঁথি, লোকছড়া, সামাজিক উৎসবের ছড়া, ধর্মীয় উৎসবের ছড়া, লোকক্রীড়ার ছড়া, লোকগান ও লোককাহিনি- এই দশ ভাগে। আবার কাশাদ্বার ঘাটের গল্পে এখানকার জনশ্রুতির ব্যাখ্যায় ভক্তি ও প্রতারণার যে আখ্যান উঠে এসেছে, সেখানেই গড়ে উঠেছে এই জনপদের লোকনাট্য, যাত্রাগান, রামায়ণ গান প্রভৃতি। আমার বিশ্বাস লেখক সনোজ কুণ্ডুর এই গদ্যের মাধ্যমে আগামীর তরুণ গবেষক অনেক তথ্য-উপাত্ত খুঁজে পাবেন।
এছাড়াও মুক্ত ও স্মৃতিগদ্য লিখেছেন প্রবীর কান্তি বালা, সুমন্ত রায়, মোহাম্মদ এমদাদুল হক, শুক্লা গাঙ্গুলী, মাহমুদা হোসেন, শরিফুল রোমান ও এমডি কামাল হোসেন। এসব স্মৃতিগদ্যে কুমার নদের সঙ্গে লেখকদের সম্পর্কস্মৃতি, কুমার নদের উত্তাল যৌবন, তার ভগ্নদশা, হাটবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, দখল-দূষণ- সবকিছু উঠে এসেছে।
কুমার নদকে নিয়ে কবিতায় আছেন কামরুল বাহার আরিফ, রবীন্দ্র নাথ অধিকারী, কামরুন নাহার, ফরিদুজ্জামান ও মাহফুজ রিপনসহ মোট পঁচিশ জন। গল্প লিখেছেন দীলতাজ রহমান, রেখা আক্তার ও অমৃত বিশ্বাস। শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে কুমার নদে নৌকা বাইচের খবরের পাশাপাশি কুমার নদকে দূষণ মুক্ত করতে কচুরিপনা অপসারণের সংবাদ দিয়েছেন মেহের মামুন ও সিকদার সজল যথাক্রমে মুকসুদপুর সংবাদ ও সময় নিউজে। আর ব্যাটিংজোন-এর গতবারের ‘মাঝি সংখ্যা’ নিয়ে ‘লিটলম্যাগ আলোচনা’ পর্বে লিখেছেন শাশ্বত জামান। সবথেকে ভালো লেগেছে আমাদের লিটলম্যাগ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কবি ও ছোটকাগজ দূর্বার সম্পাদক গাজী লতিফের স্মৃতির প্রতি ‘কুমার নদ সংখ্যা’ উৎসর্গ করায়।
শুক্লা গাঙ্গুলী তাঁর স্মৃতিগদ্য ‘বিসর্জনের ভাঙা মেলায়’ যেমনটি বলেছেন- ‘‘এবার আবার বৈঠা বাওয়া, ঘরে ফেরার পালা।…” লেখকের মতো পাঠকদেরও মনোগহনে কুমার নদের শান্ত বয়ে চলা স্রোতের ঘরের দোরে এসে লাগা ছপাৎ ছপাৎ শব্দ আজও অনুরণন সৃষ্টি করে। নতুনের উত্তর-আধুনিক বিপ্লবের ভেতরে তার বিসর্জনের ঢেউ। একে আমি পরা-আধুনিক বলি। একসময় স্থানীয়ভাবে এ নদীকে বলা হতো কালোবিল। আজ সে যথার্থই কালোবিল। জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালে তাঁর অঙ্কিত মানচিত্রে কুমার নদের উল্লেখ করেছেন। তখন এ নদী বিশেষ কার্যক্ষম ছিল না। বর্ষা মৌসুমে পানিতে পূর্ণ থাকলেও শুকনা মৌসুমে নদীটি শুকিয়ে যেত। আশেপাশের বহু বিল থেকে পানি বয়ে আনত বলে এ নদীর পানির রঙ ছিল অনেকটা কালো। তাই সে কালোবিল। ফলে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, নগরকান্দা, আলমডাঙ্গা, হরিণাকুন্ডু, শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা প্রভৃতি কুমার নদীর তীরবর্তী উল্লেখযোগ্য স্থান।
কুমার একসময় প্রবাহ পথে কালীগঙ্গা, ছাকু, হানু, মুচিখালী ইত্যাদি থেকে তার অধিকাংশ প্রবাহ পেত। উল্লিখিত সবকটি নদীই গড়াই-এর শাখা। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জি-কে প্রজেক্ট) বাস্তবায়নের ফলে মাথাভাঙ্গা থেকে কুমারের উৎসমুখ এবং অন্যান্য নদীনালাগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উৎসমুখগুলি বন্ধ করে দেওয়ায় কুমার এখন ক্ষীণকায় একটি নদীতে পরিণত হয়েছে। কেবল গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি এবং স্থানীয় বৃষ্টিপাতই এখন এ নদীর জলপ্রবাহের প্রধান উৎস। নিজস্ব কোনো পানির উৎস না থাকায় নদীটি নাব্য নয়; কেবল বর্ষা মৌসুমে তিন-চার মাস নৌ চলাচল সম্ভব। কুমার নদী তার সমগ্র গতিপথে এঁকেবেঁকে চলেছে।
এঁকেবেঁকে চলা কুমার নদের মতো এতদাঞ্চলের মানুষেরও জীবনাচারণ উত্থানপতনময়। তারপরও নদীবিধৌত বাংলার এই জনজীবনে ছোট-বড়ো, মাঝারি- কোনো নদীই উপেক্ষিত নয়। উপেক্ষিত নয় নদীবর্তী মানুষের কথাকহন। আর তাই একসময় লিখিত হয়েছে হুমায়ুন কবিরের ‘নদী ও নারী’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্ম মেঘনা যমুনা’, সাম্প্রতিক সময়ে দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’। আমরা আশা রাখি, মাহফুজ রিপনের মতো তরুণ লেখক, গবেষকদের অন্তর্দৃষ্টির প্রখরতায় একদিন লিখিত হবে কুমার নদের আখ্যান। ছোটকাগজ ‘ব্যাটিংজোন’ এর জন্য শুভকামনা রইলো।
কুমার নদ সংখ্যা, ছোটকাগজ : ব্যাটিংজোন,
বর্ষ ৮, সংখ্যা- ৬, প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর,
মূল্য- ২০০ টাকা। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৫।
মামুন মুস্তাফা : কবি ও সম্পাদক
