নজরুলের দিনাজপুর ভ্রমণ: দলিল, স্মৃতি ও ইতিহাসের পুনর্বিচার

১.
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু একজন অসামান্য কবি নন; তিনি ছিলেন এক নিরন্তর পথিক। তাঁর জীবনের সঙ্গে ভ্রমণ, স্থানান্তর, সংগ্রাম, রাজনীতি ও সাহিত্য এমনভাবে মিশে আছে যে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। জীবনের প্রায় প্রতিটি বাঁকে তিনি নতুন মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন, নতুন ভূগোল আবিষ্কার করেছেন, নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকেই রূপ দিয়েছেন কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায়। তাই নজরুলের জীবনপথ অনুসরণ করলে দেখা যায়, তাঁর ভ্রমণ কেবল ব্যক্তিগত ছিল না; ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক জাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ভ্রমণ নিয়ে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা ময়মনসিংহে তাঁর অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বহু প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে তাঁর আগমনের বিষয়টি দীর্ঘদিন গবেষণার আড়ালে থেকে গেছে। অথচ বিচ্ছিন্ন দলিল, সমসাময়িক সংবাদপত্র এবং স্থানীয় স্মৃতিচর্চা একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দিনাজপুরও নজরুলের জীবন-পরিক্রমার একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত অধ্যায়।
নজরুলের জীবনকে বোঝার জন্য প্রথমেই উপলব্ধি করতে হয় তাঁর অস্থির শৈশব ও কৈশোরকে। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি কখনো দীর্ঘদিন এক জায়গায় স্থির থাকেননি। দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব এবং জীবিকার প্রয়োজনে অল্প বয়সেই তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা, লেটো দলে গান লেখা ও অভিনয়, বর্ধমান হাইস্কুলে অধ্যয়ন, আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ, ময়মনসিংহের দারিরামপুর স্কুলে পড়াশোনা এবং পরে সিয়ারশোল হাইস্কুলে প্রত্যাবর্তন—এই ধারাবাহিক স্থানান্তর তাঁর মানসগঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যজগতে যে বহুমাত্রিক মানবিকতা, লোকজ ঐতিহ্য, সাম্যচেতনা এবং বিদ্রোহী সত্তার বিকাশ ঘটে, তার বীজ নিহিত ছিল এই ভ্রমণময় জীবনেই।
১৯১৭ সালে তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগদান করেন। নওশেরা ও করাচিতে সৈনিকজীবন তাঁর সাহিত্যচর্চাকে নতুন গতি দেয়। করাচিতেই তিনি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে থাকেন। ১৯১৯ সালে তাঁর রচনা ‘সওগাত’ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-য় প্রকাশিত হলে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি শুরু হয়। ১৯২০ সালে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে কলকাতায় ফিরে তিনি একদিকে সাহিত্যচর্চা, অন্যদিকে সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কমরেড মুজাফফর আহমদের সান্নিধ্য তাঁকে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত করে। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের আর্থিক সহায়তায় প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় সম্পাদনার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সূচনা ঘটে।
এই সময়ে নজরুলের সাহিত্যিক খ্যাতি যেমন দ্রুত বিস্তৃত হয়, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯২২ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে আলোড়িত করেন। একই বছরে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। বিচারে তিনি এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কারাগারে তিনি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনা করেন, দীর্ঘ অনশন পালন করেন এবং অসংখ্য কবিতা ও গান সৃষ্টি করেন। এই সময়কার তাঁর কারাবাসের ইতিহাস সুপ্রতিষ্ঠিত এবং দলিলনির্ভর।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী নজরুলকে বিভিন্ন সময়ে হুগলি জেল, বহরমপুর (বেরহামপুর) জেল, আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগার এবং প্রেসিডেন্সি জেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। বিশেষত হুগলি জেলেই তাঁর দীর্ঘ অনশন, রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচনার ঘটনা সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। এসব তথ্য তাঁর সমসাময়িক সরকারি নথি, পত্রপত্রিকা, স্মৃতিকথা এবং পরবর্তী গবেষণাগ্রন্থে নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে কারাগারে বসে সাহিত্যচর্চা করা নজরুলের জীবনের একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য।
কারামুক্তির পর নজরুলের জীবন আরও বেশি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ১৯২৫ সালে তিনি কুতবুদ্দীন আহমদ, হেমন্ত কুমার সরকার ও শামসুদ্দীন হুসাইনের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবার স্বরাজ পার্টি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দলের প্রথম ইশতেহার তাঁর স্বাক্ষরে প্রকাশিত হয়। দলের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক লাঙল’-এর প্রধান পরিচালক ছিলেন তিনি। সম্পাদক ছিলেন মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়। ‘লাঙল’-এর প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় ‘সাম্যবাদী’ কবিতা। এই পত্রিকাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক আন্দোলনের সূচনা হয়, তা উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে নিয়মিত লিখতেন মুজাফফর আহমদ, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবব্রত বসু প্রমুখ; একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও সুভাষচন্দ্র বসুর চিঠিও প্রকাশিত হতো। ফলে ‘লাঙল’ কেবল একটি সাহিত্যপত্র ছিল না; এটি ছিল শ্রমিক-কৃষক রাজনীতি ও প্রগতিশীল চিন্তার অন্যতম মুখপত্র।
১৯২৬ সালে নজরুলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়। ওই বছর তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে ঢাকা বিভাগ থেকে প্রার্থী হন, যদিও নির্বাচিত হতে পারেননি। একই সময়ে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি হেমন্ত কুমার সরকারের সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে তাঁর উপস্থিতির বিষয়ে বিভিন্ন সমসাময়িক দলিল, স্মৃতিকথা এবং গবেষণাগ্রন্থে তথ্য পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে অবস্থানকালে তিনি ‘সিন্ধু’ কাব্যের একাধিক অংশ, ‘অনামিকা’, ‘গোপন প্রিয়া’, ‘বাংলার আজীজ’সহ বহু রচনা সৃষ্টি করেন। এসব তথ্য আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘নজরুল-রচনাবলী’সহ বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে।
কিন্তু একই সময়ে তাঁর দিনাজপুর সফরের বিষয়টি দীর্ঘদিন প্রায় অজানাই থেকে যায়। এর প্রধান কারণ, এই সফর নিয়ে বিস্তৃত স্মৃতিকথা বা সরকারি বিবরণ সংরক্ষিত হয়নি। অথচ তৎকালীন একটি সংবাদপত্র—‘দিনাজপুর পত্রিকা’—এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকার ১৯২৬ সালের জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয় যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং দেশসেবক হেমন্ত কুমার সরকার দিনাজপুরে আগমন করেন। সংবাদে বলা হয়, “…গত ৩রা আষাঢ় (১৭ জুন ১৯২৬)’বিদ্রোহী’ কবি কাজি নজরুল ইসলাম ও দেশসেবক শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার এখানে আগমন করেন। এ দিন সন্ধ্যা ৭টার সময় কাজি সাহেব ড্রামেটিক ক্লাবের(দিনাজপুর নাট্য সমিতি) সন্নিকটস্থ সুবিস্তৃত ময়দানে তাঁহার উদ্দীপনা সঙ্গীতাবলী দ্বারা সকলকে মুগ্ধ করেন। শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় শ্রমিক সংগঠন সম্বন্ধে কয়েকটা কথা বলেন।”
তৎকালীন একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই সংবাদ দিনাজপুরে নজরুলের উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
এই তথ্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে দিনাজপুরে নজরুলের আগমন ছিল কোনো ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়; বরং শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি এবং গণসচেতনতা সৃষ্টির বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। অর্থাৎ দিনাজপুর সফর তাঁর ১৯২৬ সালের রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের ধারাবাহিকতার মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল। ফলে দিনাজপুরকে নজরুলের রাজনৈতিক ভ্রমণপথের বাইরে রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বরং উপলব্ধ দলিলের আলোকে তাঁর ভ্রমণপঞ্জিতে দিনাজপুর সফরকে অন্তর্ভুক্ত করা ইতিহাসসম্মত বলেই প্রতীয়মান হয়।
তবে এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত—কাজী নজরুল ইসলাম কি কখনও দিনাজপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাহিত্য গবেষক ও ইতিহাসবিদকে দলিল, স্মৃতিকথা, সরকারি নথি এবং মৌখিক ঐতিহ্য—সবকিছুকে সমালোচনামূলকভাবে বিচার করতে হয়। কারণ ইতিহাসের প্রত্যেকটি দাবি একই ধরনের প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; কোনোটি প্রত্যক্ষ দলিলনির্ভর, কোনোটি স্মৃতিকথা-নির্ভর, আবার কোনোটি দীর্ঘদিনের লোকমুখে প্রচলিত স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল। দিনাজপুর জেল-সংক্রান্ত নজরুলের ঘটনাটি ঠিক এই তৃতীয় শ্রেণির একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন, যার মূল্যায়নে সতর্কতা ও পদ্ধতিগত নিরপেক্ষতা অপরিহার্য।
২.
দিনাজপুরে কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের প্রশ্নে আজ আর তেমন দ্বিধা নেই। ১৯২৬ সালের ‘দিনাজপুর পত্রিকা’-য় প্রকাশিত সংবাদ তাঁর ভ্রমণের একটি শক্তিশালী সমসাময়িক সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।সে সময় দিনাজপুর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শ্রীমাধবচন্দ্র শীকদার। সহ-সম্পাদক ছিলেন শেখ মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ভাগবী ও শ্রীক্ষিতিন্দ্রমোহন সেন।
কিন্তু এই ভ্রমণকে ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত—কবি কি দিনাজপুর কারাগারে কখনও বন্দি ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষককে ইতিহাসচর্চার একটি মৌলিক নীতি স্মরণে রাখতে হয়—প্রত্যেক ঐতিহাসিক দাবির মূল্য সমান নয়; কোনো দাবি প্রত্যক্ষ দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, কোনোটি স্মৃতিকথা-নির্ভর, আবার কোনোটি লোকমুখে প্রচলিত স্মৃতি বা জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সুতরাং ইতিহাসের বিচার করতে হলে প্রমাণের স্তরভেদ নির্ণয় করা অপরিহার্য।
দিনাজপুর জেলকে ঘিরে নজরুল-সংশ্লিষ্ট যে বর্ণনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, সেটি পাওয়া যায় সাহিত্যিক অজিত কুমার গুহের আত্মস্মৃতিমূলক রচনা ‘বুলু’-তে। এই রচনায় তিনি দিনাজপুর জেলে বন্দি অবস্থায় তাঁর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে গিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন বাংলো, তার সামনের উঠোন এবং ফুলে ভরা একটি বাতাবি লেবুর গাছের কথা উল্লেখ করেন। সেই গাছকে ঘিরে তিনি একটি প্রচলিত স্মৃতির কথা লিখেছেন। তাঁর ভাষায়, তিনি শুনেছিলেন যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম একসময় এই জেলে বন্দি ছিলেন এবং ওই বাতাবি লেবুর গাছের নিচে বসে কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম রচনা করতেন।
এই বিবরণটি পাঠ করলে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অজিত কুমার গুহ কোথাও বলেননি যে তিনি নিজে নজরুলকে সেখানে দেখেছেন, কিংবা সরকারি নথি বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তিনি এই তথ্য দিচ্ছেন। বরং তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে লিখেছেন—“শুনতে পেলাম” এবং “নাকি”। বাংলা ভাষায় এই শব্দদ্বয়ের ব্যবহার নিছক ভাষাশৈলী নয়; এগুলো ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে লেখক একটি লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি বা মৌখিক স্মৃতি লিপিবদ্ধ করছেন, কোনো যাচাইকৃত ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা করছেন না। একজন সৎ স্মৃতিকথাকার হিসেবে তিনি শোনা কথাকে শোনা কথা হিসেবেই তুলে ধরেছেন; সেটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
এই সতর্ক ভাষা ব্যবহারই তাঁর লেখার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। কারণ তিনি জনশ্রুতিকে ইতিহাস বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেননি; বরং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি সম্ভাব্য সূত্র সংরক্ষণ করেছেন। ইতিহাসচর্চায় এ ধরনের স্মৃতিকথার গুরুত্ব এখানেই—এগুলো কখনও কখনও এমন তথ্যের ইঙ্গিত দেয়, যা পরবর্তীকালে দলিলের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের কারাবাসের ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত অধ্যায়। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে। গ্রেপ্তার, বিচার এবং কারাদণ্ডের পর তিনি ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন কারাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। হুগলি জেলে তাঁর দীর্ঘ অনশন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত টেলিগ্রাম, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, কারাগারে রচিত অসংখ্য কবিতা ও গান—এসবই সমসাময়িক দলিল, সরকারি নথি, পত্রপত্রিকা, স্মৃতিকথা এবং গবেষণাগ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। একইভাবে বহরমপুর (বেরহামপুর) জেল, প্রেসিডেন্সি জেল এবং আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে তাঁর কারাজীবনের বিভিন্ন পর্ব সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
কিন্তু দিনাজপুর কারাগারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ জীবনী, যেমন আবদুল কাদির, কাজী সব্যসাচী, রফিকুল ইসলাম, গোলাম মুরশিদ, অরুণকুমার বসুসহ অন্যান্য গবেষকের গ্রন্থে দিনাজপুর জেলে তাঁর বন্দিত্বের কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। নজরুলের চিঠিপত্র, সমসাময়িক সংবাদপত্র, সরকারি বিচার-নথি কিংবা কারা-রেকর্ড থেকেও এ ধরনের তথ্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি তাঁর কারাজীবনের ধারাবাহিক বিবরণেও দিনাজপুর জেলের কোনো প্রত্যক্ষ উল্লেখ নেই। ফলে বর্তমান পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দিনাজপুর কারাগারে তাঁর বন্দিত্বকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
তবে এখানেই গবেষণার একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। কোনো ঘটনার পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া এবং ঘটনাটি কখনও ঘটেনি—এই দুটি বিষয় এক নয়। ইতিহাসবিদেরা সাধারণত বলেন, absence of evidence is not evidence of absence—অর্থাৎ প্রমাণের অনুপস্থিতি সবসময় ঘটনাটির অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক ভারতের বহু প্রশাসনিক নথি নষ্ট হয়েছে, অনেক স্থানীয় দলিল হারিয়ে গেছে, আবার বহু আঞ্চলিক সংবাদপত্র আজ আর সংরক্ষিত নেই। ফলে কোনো ঘটনার পক্ষে দলিল এখনো আবিষ্কৃত না হওয়া মানেই যে ঘটনাটি অসম্ভব, এমন সিদ্ধান্তও ইতিহাসসম্মত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে দলিল ছাড়া কোনো দাবিকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বলা যায় না। ইতিহাসচর্চার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এই দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী একটি সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করে।
এই কারণেই অজিত কুমার গুহের স্মৃতিকথায় বর্ণিত ঘটনাটিকে একদিকে যেমন অবজ্ঞা করা যায় না, অন্যদিকে তেমনি প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবেও গ্রহণ করা যায় না। এটি একটি মূল্যবান স্থানীয় স্মৃতি, যা গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে দিনাজপুর কারাগারের পুরোনো রেজিস্টার, জেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত নথি, ব্রিটিশ সরকারের কারা-বিভাগের দলিল, সমসাময়িক পত্রিকা এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্র নিয়ে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান ভবিষ্যতে এই বিষয়ে নতুন তথ্য দিতে পারে। ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই প্রথমে লোকমুখে প্রচলিত ছিল; পরে দলিল আবিষ্কারের মাধ্যমে সেগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার বহু জনশ্রুতিই পরবর্তী গবেষণায় অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলা সমীচীন নয়।
তবে দিনাজপুরের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা যায়। তিনি যে দিনাজপুরে এসেছিলেন, সে বিষয়ে সমসাময়িক সংবাদপত্রের সাক্ষ্য বিদ্যমান। তাঁর সফরের উদ্দেশ্যও ছিল রাজনৈতিক—শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের পক্ষে গণসচেতনতা সৃষ্টি, সাম্যবাদী আদর্শ প্রচার এবং জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলা। তিনি গান গেয়েছেন, জনসভায় অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর সহযাত্রী হেমন্ত কুমার সরকার শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে দিনাজপুর সফর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি স্বীকৃত অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।
কিন্তু দিনাজপুর কারাগারে তাঁর বন্দিত্বের প্রশ্নে বর্তমান তথ্যভান্ডার আমাদের আরও সংযত হতে শেখায়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রামাণ্য দলিলের আলোকে এই দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। অজিত কুমার গুহের স্মৃতিকথা আমাদের একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সূত্র দেয়, কিন্তু সেই সূত্রকে প্রমাণে রূপান্তরিত করার জন্য আরও দলিল-অনুসন্ধান প্রয়োজন। ইতিহাসের দায়িত্ব হলো সম্ভাবনা ও সত্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, দিনাজপুরে নজরুলের আগমন ইতিহাসসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু দিনাজপুর জেলে তাঁর বন্দিত্ব এখনো গবেষণাধীন একটি বিষয়, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ বর্তমান পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
অতএব, দিনাজপুরে কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে গবেষণার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ১৯২৬ সালের ‘দিনাজপুর পত্রিকা’ ইতোমধ্যে এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছে। এর পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের নথি, কারাগারের পুরোনো রেকর্ড, ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক দলিল, সমসাময়িক সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং স্থানীয় মৌখিক ঐতিহ্যকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে নজরুলের দিনাজপুর-অধ্যায় আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলতার দাবি হলো—যেখানে দলিল আছে সেখানে দৃঢ়ভাবে কথা বলা, আর যেখানে দলিল এখনো অসম্পূর্ণ সেখানে সম্ভাবনাকে সম্ভাবনা হিসেবেই স্বীকার করা। এই পদ্ধতিই একজন গবেষকের বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার পরিচয় বহন করে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন যতই নতুন করে অনুসন্ধান করা হচ্ছে, ততই আবিষ্কৃত হচ্ছে তাঁর বিচিত্র কর্মযাত্রার নতুন নতুন অধ্যায়। দিনাজপুরও তেমনি একটি অধ্যায়, যা দীর্ঘদিন বিস্মৃত ছিল। আজ প্রাপ্ত দলিলের আলোকে তাঁর দিনাজপুর সফরকে ইতিহাসে যথাযথ স্থান দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি দিনাজপুর কারাগার-সংক্রান্ত জনশ্রুতিকে প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং গবেষণাযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে মূল্যায়ন করাই হবে ইতিহাসচর্চার সৎ, নিরপেক্ষ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
মাসুদুল হক : লেখক, কবি, গবেষক ও শিক্ষক
গ্রন্থপঞ্জি:
১.শ্রীমাধবচন্দ্র শীকদার(সম্পাদক), দিনাজপুর পত্রিকা, দিনাজপুর, জুলাই,১৯২৬
২. অরুণকুমার বসু, নজরুল-জীবনী, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০০
৩.আবদুল কাদির, কবি নজরুল,হরফ প্রকাশনী, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৭০
৪.কাজি আবদুল ওদুদ, নজরুল প্রতিভা,বর্মন পাবলিশিং হাউস, কলকাতা,জানুয়ারি ১৯৪১
৫. রফিকুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবন ও সৃষ্টি , কে.পি. বাগচী, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৯১ আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, জানুয়ারি,২০০০
৬. গোলাম মুরশিদ, বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী, প্রথমা প্রকাশন,ঢাকা, চতুর্থ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০২৩
