‘বাদশাহ নামদার’-ইতিহাসের রঙে মানবিক সম্রাট হুমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে বাদশাহ নামদার একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি কেবল সম্রাট হুমায়ূনের জীবনী নয়, বরং একজন শাসকের মানবিক দিক ও তার জীবনের ওঠাপড়ার এক চমৎকার আখ্যান।
বাদশাহ নামদার লিখতে হুমায়ূন আহমেদ কেন আগ্রহী হলেন, তা সম্পর্কে উপন্যাসটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “সব ঔপন্যাসিকই বিচিত্র চরিত্র নিয়ে কাজ করতে ভালবাসেন। এই অর্থে হুমায়ূন অতি বিচিত্র এক চরিত্র। যেখানে তিনি সাঁতারই জানেন না সেখানে সারাটা জীবন তাঁকে সাঁতরাতে হয়েছে স্রোতের বিপরীতে। তাঁর সময়টাও ছিল অদ্ভূত। বিচিত্র চরিত্র এবং বিচিত্র সময় ধরার লোভ থেকে ‘বাদশাহ নামদার’ লেখা হতে পারে। আমি নিশ্চিত না।”
উপন্যাসের সূচনা পর্বে সম্রাট বাবর তার অতি প্রিয় সন্তান হুমায়ূন অসুস্থ হলে তার জীবন রক্ষা করতে পুত্রের কালান্তক ব্যধি নিজের শরীরে ধারণ করে মৃত্যুবরণ করেন এবং হুমায়ূনকে পরবর্তী মুঘল সম্রাট হিসেবে নির্বাচিত করেন। সম্রাট হুমায়ূন ছিলেন বহু বর্ণের মানুষ। খামখেয়ালীপনা ও বিচিত্র বিষয়ে (জাদুবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রন্ধনশিল্প, চিত্রকলা) আগ্রহ তার চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। গতানুগতিক সম্রাটদের ন্যায় লোভ ও হিংস্রতা তার মাঝে না থাকায় বিভিন্ন সময়ে তার জীবনে দুর্বিষহ বেদনা নেমে আসে। সম্রাট হুমায়ূনের জীবনের বৈচিত্র্যময় এবং কৌতূহল উদ্দীপক গল্প নিয়েই এ অসামান্য আখ্যানটি রচিত হয়েছে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, বইটি আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। ২০১১ সালের বইমেলায় প্রচণ্ড ভিড় ও উত্তেজনার মাঝে বইটি সংগ্রহ করেছিলাম। প্রথম দিনেই এক বসায় অর্ধেকটা পড়ে ফেলেছিলাম, কারণ হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরী লেখনী আমাকে আটকে রেখেছিল। কিন্তু নিয়তির পরিহাস দেখুন, পরদিন এক কলিগ বইটি আমার হাত থেকে নিলেন, আর কোনোদিন ফেরত দিলেন না! তার ভাবটা এমন ছিল যেন বইটি আমি তাকে উপহার দিয়েছি। হা হা… সেই রাগে ও ক্ষোভে আমি আর বইটি কিনিনি, এমনকি এক দশক ধরে বইটি পড়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে পড়ে যেত কেবল পুরনো দিনের কথা।
অবশেষে আজ, এত বছর পর (২৭ নভেম্বর, ২০২১) জাকারিয়া জুয়েল জোর করে বইটি আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি প্রথমে ‘না না’ করলেও শেষ পর্যন্ত তার আবদার ফেলতে পারিনি। এবং সত্যিই, আজ বইটি এক বসায় শেষ করে আমি অভিভূত। আমার দীর্ঘদিনের জমে থাকা সব ক্ষোভ ও দুঃখ দূর হয়ে গেছে।
হুমায়ূন আহমেদের লেখার নিজস্ব একটি ধরণ বা ‘স্টাইল’ আছে। তিনি যতই ইতিহাসভিত্তিক রচনা লিখুন না কেন, তার সেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সব লেখাতেই বজায় থাকে। সব ধরণের লেখাই তিনি একই ছাচে ফেলে লিখে গেছেন, এবং তিনি সফলও। তাঁর প্রচুর ভক্ত ও পাঠক রয়েছে, এবং তাঁর বই দেদারসে বিক্রি হয়েছে, এখনও হচ্ছে। বাদশাহ নামদার বইটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
বইটি নিয়ে আলাদা করে রিভিউ বা বিস্তারিত লেখার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। যারা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পছন্দ করেন, যারা মোঘল সাম্রাজ্য নিয়ে, বিশেষ করে দিল্লির সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে জানতে আগ্রহী, তারা এই বইটি পড়ে নিশ্চয়ই মজা পাবেন। হুমায়ূন ছিলেন এমন একজন সম্রাট, যিনি শাষন করেছেন কেবল তাঁর বিবেক দিয়ে। আর এই বিবেকের শাসনই তাকে বহুবার বিপদে ফেলেছে, এমনকি রাজ্যহারাও করেছে।
সম্রাট হুমায়ূন মানুষ হিসেবেও ছিলেন বেশ মজার ও আমুদে। লেখক তাঁর সহজাত সহজিয়া ভঙ্গিতে সম্রাট হুমায়ূনকে এঁকেছেন, যা পাঠকদের বরাবরের মতোই ভালো লাগবে। বইটি মোটামুটি মোটা সাইজের হলেও, লেখকের সহজ করে লেখার ধরণের কারণে দ্রুতই পড়ে ফেলা গেছে।
তবে, পাঠক হিসেবে আমার একটি ছোট অভিযোগ আছে। লেখক অতিসংক্ষেপে ইতিহাসের একটা অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন। মনে হয়, যেন আরেকটু বিস্তৃত হলে বেশ হতো! অল্পতে মন ভরে না, এই আর কি!
পরিশেষে, বাদশাহ নামদার একটি সুখপাঠ্য উপন্যাস। যারা ইতিহাস ও মানবিক অনুভূতির সংমিশ্রণ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি আবশ্যকীয় পাঠ। বইটি হোক আত্মার আত্মীয়।
বইয়ের নাম: বাদশাহনামদার
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: একুশের বইমেলা ২০১১
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ
