আমার স্বামী ওয়ালী: একটি অসাধারণ স্মৃতিগ্রন্থ

আমার স্বামী ওয়ালী আন মারির লেখা একটি মজাদার স্মৃতিগ্রন্থ। লেখক একজন ফরাসি নারী। বাঙালি কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ফরাসি স্ত্রী। গ্রন্থটির মূল শিরোনাম মাই হাজব্যান্ড ওয়ালী। বাংলা অনুবাদ করেছেন শিবব্রত বর্মন। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ডিসেম্বর ২০১২। মোট পৃষ্ঠা ৭২। প্রচ্ছদ করেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। মূল্য ১৪০ টাকা। মূল গ্রন্থে কোনো ভূমিকা লেখা হয়নি। কিন্তু অনুবাদ গ্রন্থে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা লিখেছেন শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান।

পাঠকের কৌতূহল নিবারণের জন্য ফরাসি লেখিকার সম্বন্ধে খানিকটা বয়ান প্রদান করছি। আন মারি তাঁর নাম। বাঙালি লেখক ওয়ালীউল্লাহকে বিয়ে করে নাম দেন আন মারি ওয়ালীউল্লাহ। প্রথমে এক পলকের দেখা। ঘটনাটি পঞ্চাশের দশকের আগভাগে। তারপর দীর্ঘ সময় মন দেওয়া-নেওয়া ও প্রেম। তারপর যথাসময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। আধুনিক শিক্ষিতা আন মারি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। যদিও ফরাসিরা ইংরেজি বলতে, শিখতে চায় না। এ তাদের জাত্যভিমান। কিন্তু আন মারি ইংরেজি পড়েননি শুধু। ইংরেজি সাহিত্য চর্চাও করেছেন। আন মারির জন্ম দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের গ্রেনেবলে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ফরাসি দূতাবাসে চাকরি শুরু করেন। প্রেস অ্যাটাশে। সেই সময়টায় তরুণ পাকিস্তানি অফিসার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। সিডনিতে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত। তাঁর অফিসের পাশেই আন মারির কর্মক্ষেত্র। ঠিক উল্টো দিকে ফরাসি দূতাবাস। অস্ট্রেলিয়ান এক দামি স্থপতির দেওয়া পার্টিতে আমন্ত্রিত হয়ে দুজন সেখানে হাজির। সে মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁদের চোখ চাওয়াচাওয়ি। মারির বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁর বয়স তখন ২৩, ওয়ালীউল্লাহর ৩১। তারপর মাঝে তিন বছর তাঁরা একে ওপরের সঙ্গে মিশেছেন, বুঝতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৫৫ সালে চূড়ান্তভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মারা যান। মুক্তিযুদ্ধের সময়। ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন। আন মারি বিদায় নেন বেশ পরে। ১৯৯৬ সালে। এই বিদেশি নারী মারির সঙ্গে বাঙালি সাহিত্যিকের বোঝাপড়া কতটা গভীর ছিল, তা এ গ্রন্থে উপজীব্য হয়ে আছে। মারি বাংলাদেশকে, এখানকার মানুষকে ভীষণ ভালোবেসেছিলেন। এ সবকিছুই আবেগের বিষয় ছিল মারির কাছে।

কী আছে আমার স্বামী ওয়ালী গ্রন্থে। মূলত, গ্রন্থটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। স্মৃতিকথাও বলা যায়। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা। লালসালুখ্যাত ওয়ালী। মাই হাজব্যান্ড ওয়ালী স্মৃতিগ্রন্থে মারি অনবদ্য ভাষায় উভয়ের মধুর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। গ্রন্থটি ক্ষুদ্র, কিন্তু ছবি এঁকেছেন বৃহৎ। টান টান উত্তেজনা নিয়ে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির কথা, বাঙালির আচার-ব্যবহারের কথা এসেছে একজন বিদেশি বধূর কলমের টানে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালুর কথা বাঙালি পাঠক মানেই জানে। কিন্তু ব্যক্তি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে কমজন জানে। দীর্ঘ সময় তিনি পার করেছেন বিদেশে। বিদেশে বসে লিখেছেন লালসালু। আমার স্বামী ওয়ালীর গুরুত্ব এখানেই। এ গ্রন্থে ব্যক্তি ওয়ালী কেমন ছিলেন, এর একটি চিত্র এঁকেছেন আন মারি। ওয়ালীউল্লাহর উচ্চ রুচি ও সংবেদনশীল মন সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। মারি জানান, ওয়ালীউল্লাহ বিশ্বের সব সাহিত্যকেই মানুষের অভিন্ন উত্তরাধিকার বলে বিশ্বাস করতেন। ৭২ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে তাঁর নিজের কথাই সত্য বলে মনে হবে, ‘আমি একজন মুক্ত মানুষ। জগৎ আমাকে গ্রহণ করুক আর নাই করুক, পুরো জগৎটিই আমার।’

আমার স্বামী ওয়ালী বইটি চার পাতার একটি ভূমিকা দিয়েছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আনিসুজ্জামানের সঙ্গে ওয়ালিউল্লাহর ভালো সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে আন মারির সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়েছে আনিসুজ্জামানের। তিনি যখন এই ভূমিকা লেখেন, তখন মারি পরলোকগত। এ কারণে গ্রন্থের ভূমিকাটি হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী। গ্রন্থের শেষে একটি পরিশিষ্ট যুক্ত হয়েছে। পরিশিষ্টটি মূলত প্রথম আলোর খ্যাতিমান সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফের একটি ভূমিকা। এ গ্রন্থের পরিশিষ্টে ‘পটভূমি’ বলে লেখা রচনাটির আদি ইতিবৃত্ত।

আনিসুজ্জামান দীর্ঘ ভূমিকায় গ্রন্থটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে আন মারির স্মৃতিকথা এক অসাধারণ রচনা। এটি তাঁদের ষোলো বছরের দাম্পত্য জীবনের কিংবা আঠারো বছরের পারস্পরিক সান্নিধ্যের ধারাবাহিক বর্ণনা নয়, এটি তাঁর স্বামীর সাহিত্যিক জীবনের রীতিনিষ্ঠ পরিচিতিও নয়। এটি ওয়ালীউল্লাহর এমন এক প্রতিকৃতি, যা দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যকর্মের ওপর ভর করে। এর উপকরণ আন মারির অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ; তাঁকে লেখা ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম, যার কিছু কিছু অনুবাদ আন মারি নিজেই করেছিলেন ফরাসি ভাষায়।

আন মারি লিখেন, ওয়ালীউল্লাহ বাঙালি মুসলমানের যে সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে লালিত হয়েছেন, তা তিনি অনেক কিছুই ধরে রেখেছিলেন। যদিও তাঁর পুরো জীবনটাই কেটেছে বিদেশি সংস্কৃতির বলয়ে। মারি জানান, ওয়ালীউল্লাহ মুরব্বিদের পায়ে ধরে সালাম করার রেওয়াজ বজায় রাখেন। বিদেশে সযত্নে লুঙ্গি পরতেন,

আন মারি শাড়ি পরলে ফ্যালফেলিয়ে চেয়ে দেখতেন। হাতের আঙুল দিয়ে দেশি খাবার খেতে পছন্দ করতেন।

আন মারি বইটি শুরু করেন এক আফসোস ও আবেগ নিয়ে। শুরুটা এমন, ‘তার কথা যখন ভাবি, মনের মধ্যে কী ছবি ভেসে ওঠে? মনে পড়ে তাকে প্রথম দেখেছিলাম ঘরের সবচেয়ে দূরবর্তী একটি কোণে ডিভানে বসে থাকতে, দেখে মনে হয় কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। নিজেকে দূরের রাখার এই স্বভাবের কারণেই কি ঘরের ওপাশে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে আমার মন টানছিল? সত্যি কথা বলতে, ওখানে আমিও কাউকে চিনতাম না। তা ছাড়া ওর মধ্যে আমি এক পরদেশি আবহ পেলাম। কাজেই আমার সঙ্গী মনে হলো তাকে।’ এভাবেই সিডনিতে তাঁদের কাছে আসার গল্প শুরু।

তারপর মারি স্মৃতিচারণায় ভাবেন, ‘তার কোন জিনিসটা আকর্ষণ করেছিল আমাকে? ওর চোখের কোমলতা, ওর হাসি? ওর অপূর্ব হাতে ধরে রাখা ৫০টি সিগারেটের গোলাকার টিন, যা সে কখনোই হাতছাড়া করেনি। ওর মার্জিত ভঙ্গিমা? ওর চৌকস ভাব? নম্রতা? জানি না। হয়তো এর সবই।’

শুরুতে বলেছি, তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সিডনিতে। অস্ট্রেলিয়ান এক স্থপতির দেওয়া ভোজন পার্টিতে। দুজনই সাহিত্যপ্রেমিক। একজন ফরাসি, আরেকজন বাঙালি। অনেক দূরের জগৎ। সাহিত্যের রসের টানেই উভয়ের কাছাকাছি আসতে দেরি হয়নি। হৃদয়ের টান তো ছিলই। মাঝেমধ্যে বদলি কারণে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। কিন্তু যোগাযোগ ছিল, পত্রালাপ ছিল। সে সুন্দর, মধুময় পত্রাবলির চমৎকার উদ্ধৃতি রয়েছে ঘটনা বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে।

স্মৃতিকথা যখন মারি লিখতে বসেন, ওয়ালী তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অসীমে বিলীন। আন মারি একা। পত্রালাপ ছাড়াও নানান গল্পের কথা মনে করেন আন মারি। এমনই একটি গল্পের কথা দিয়ে শেষ করব এ গ্রন্থের সমাচার।

‘মনে পড়ে, আমাকে ও দেশভাগ এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছিল। জানিয়েছিল কলকাতার সেন্ট পল কলেজে তার ছাত্রজীবনের কথা। ও বর্ণনা করেছিল, একবার পিকনিকে গিয়ে দু’জন মুসলমান ছাত্রকে আলাদা খেতে হয়েছিল। ও বলেছিল, রেলস্টেশনে পানির কল থাকত দুটি। একটি হিন্দুদের একটি মুসলমানের।’ একটি ঘটনার বিবরণ শুনে আন মারি খুব আমোদ পেয়েছিল। নয়াদিল্লিতে প্রেস অ্যাটাশের দায়িত্ব পালনকালে ওয়ালী একবার ট্রেনে ভ্রমণ করেছিলেন। ট্রেনের কামরায় দুজন বাঙালি নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। অন্তরঙ্গতার সুবাদে দুই নারী তাঁকে বাসায় আমন্ত্রণ জানান। ওয়ালী আগ্রহ নিয়ে তাঁদের বাসায় গেলেন। কিন্তু মুশকিল হলো, অন্ন গ্রহণের প্রাক্কালে তাঁরা জানতে চাইলেন ওয়ালীর জাতপাত কী। বিপদ আঁচ করে ওয়ালী কৌশলের আশ্রয় নেয়। জানান তিনি ব্রাহ্মণ। তাঁরা ক্ষত্রিয়। কিছুটা রক্ষা। এবার বামনের সঙ্গে একাসনে বসা না গেলেও তাঁকে খাওয়ানো যায়। এবার ওয়ালী একাই খেতে বসলেন। এমন সুন্দর অথচ ইতিহাসের খোরাক হয়-এমন ঘটনাবলি রয়েছে এই স্মৃতিগ্রন্থে।

অতএব, এভাবেই ওয়ালীউল্লাহর মানবিকতা ও সদাশয়ের পরিচয় রয়েছে আন মারির গ্রন্থে। বাংলা সাহিত্যের এক বড় স্রষ্টাকে জানতে, তাঁর কালকে বুঝতে বড় সহায়ক হবে আমার স্বামী ওয়ালী বইটি।

ড. এমরান জাহান, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আরও পড়ুন