কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল ২২ বছর: একটি সাহিত্যপঞ্জি

অমিত প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তাঁর সক্রিয় সৃজনশীল জীবন মাত্র প্রায় ২২ বছর (১৯২০–১৯৪২) স্থায়ী হলেও এই স্বল্প সময়েই তিনি কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গজল, শ্যামাসঙ্গীত, ইসলামী সংগীত এবং চলচ্চিত্র সংগীতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্য স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি ও সৃজনক্ষমতা হারান, ফলে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতসাধনার আকস্মিক অবসান ঘটে। তবু তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। এই লেখায় তাঁর সৃজনশীল সময়কালের কিছু প্রধান কীর্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। লেখাটি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আমার সাম্প্রতিক আসানসোল ও চুরুলিয়া সফর, কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিমের সঙ্গে আলাপচারিতা, চুরুলিয়ার নজরুল জাদুঘর পরিদর্শন এবং কমরেড মুজফ্ফর আহমেদের কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা গ্রন্থ বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে।

মাত্র ২২ বছরে নজরুলের সৃজনসম্ভার:

সময়কালপ্রধান ধরন
১৯১৭-১৯২০কবিতা, গল্প, ইসলামি লেখা
১৯২০-১৯২২গদ্য, কবিতা, উপন্যাস
১৯২২–১৯২৩বিপ্লবী কবিতা, প্রবন্ধ
১৯২৪–১৯২৭প্রেম, বিদ্রোহ, গান
১৯২৮–১৯৩২গান, গজল, সংগীত
১৯৩০-এর দশকগান, চলচ্চিত্র সংগীত
১৯৪২লেখার ইতি

শুরু : কাজী নজরুল ইসলামের লেখালেখির যদি একটি পঞ্জি (ধরনভিত্তিক টাইমলাইন) করা হয় তাহলে আমরা দেখতে পাই করাচিতে 49th Bengal Regiment এ থাকার সময় তিনি প্রথমবারের মত খাবার ও বাসস্থানের নিরাপত্তা পেয়েছিলেন, যা তার লেখালেখি শুরু করতে ঢের সাহায্য করেছিল।

১৯১৭-১৯২০: সেনাবাহিনীতে অবস্থানকাল, বয়স

প্রেক্ষাপট: 49th Bengal Regiment-এ কর্মরত, করাচি কেন্দ্রে অবস্থান।

লেখার ধরন:  এসময় তার লেখা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কিছু কবিতা (প্রাথমিক পর্যায়), গান (সৈনিক জীবন ও ইসলামি আবহ) ও গল্প/উপন্যাসের খসড়া নিয়ে কাজ করেছিলেন।  এসময়ের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো ছিল উপন্যাস (অসম্পূর্ণ): বাঁধনহারা (পরবর্তীতে প্রকাশিত);  কবিতা: “মুক্তি” (প্রথমদিকের উল্লেখযোগ্য রচনা) ও সামরিক ও ইসলামি ভাবধারার গান ও কবিতা।  তাছাড়া এই সময় তাঁর লেখায় সামরিক অভিজ্ঞতা, বিদ্রোহী মনোভাবের সূচনা ও ইসলামী ঐতিহ্য ও পারস্য ঘরানার লেখার ছাপ দেখা যায়। 

১৯২০: তিনি সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসেন এবং কলকাতা পর্যায় শুরু করেন। 

এটি তার সাহিত্যিক জীবনের  একটি অন্যতম শুরুর সময়।  এসময় তার লেখায় গদ্য (প্রবন্ধ, গল্প), কবিতা, উপন্যাস এসব দেখা যায়।  তবে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এসময় তার সাংবাদিকতায় যোগ দেয়া।  এসময়ের প্রধান কাজ / লেখা হলো গল্প: “ব্যথার দান”; উপন্যাস: “বাঁধনহারা” (প্রকাশ শুরু); কবিতা: বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশ; বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লেখা।  আরও উল্লেখযোগ্য হলো এই সময় তিনি প্রতিষ্ঠিত হন একজন যুব সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল লেখক হিসেবে। 

১৯২২–১৯২৩ : বিদ্রোহী পর্যায় ও কারাবাস
১৯২২–২৩ সময়ে নজরুল শুধু একজন কবি নন, বরং এক সাহিত্যিক বিপ্লবী, যার লেখনী হয়ে ওঠে অন্যায় ও দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্র। এই সময়ে নজরুলের কলমে উচ্চারিত হয় তীব্র বিদ্রোহ ও মুক্তির আহ্বান—“বিদ্রোহী” সহ অসংখ্য প্রেরণাদায়ী কবিতা রচিত হয়। কারাবাসেও তিনি থামেননি; বরং “রাজবন্দীর জবানবন্দী”‑এর মতো লেখায় অন্যায় ও শাসনের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এছাড়া এসময় তিনি ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। 

১৯২৪: বিবাহ রাজনৈতিক চাপের সময়

১৯২৪ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মে প্রেম, বিদ্রোহ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। এ সময় প্রকাশিত বিষের বাঁশী-তে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গণজাগরণের আহ্বান করেন, যার ফলে গ্রন্থটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। একই সময়ে দোলনচাঁপা কাব্যে প্রেম, সৌন্দর্য ও রোমান্টিক অনুভূতির সুকোমল প্রকাশ ঘটে। পাশাপাশি তিনি প্রেম, ভক্তি ও বিপ্লবী চেতনার অসংখ্য গান রচনা করেন এবং বাংলা সাহিত্যে পারস্য-প্রভাবিত গজলধারার প্রবর্তন করেন। এই পর্যায়ের রচনাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেম ও বিদ্রোহের যুগপৎ প্রকাশ, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দৃঢ় আহ্বান।

১৯২৫–১৯২৭: বৈচিত্র্যের বিস্তার

১৯২৫–১৯২৭ সময়ে কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতা নতুন বৈচিত্র্য লাভ করে। এ সময় তিনি ছায়ানটচন্দ্রবিন্দু কাব্যগ্রন্থে প্রেম, মানবতা, ব্যঙ্গ এবং সমাজচেতনার বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তোলেন। পাশাপাশি নাটক, সংগীতনাট্য, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন। এই পর্যায়ে তিনি বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করে বিপুলসংখ্যক ইসলামী গান, হামদ-নাত, শ্যামাসঙ্গীত এবং ভক্তিমূলক সংগীত রচনা করেন, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলা সংগীতের ভাষা, সুর ও বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে অভিনবত্ব আনয়ন করে তিনি এক নতুন সংগীতধারার ভিত্তি স্থাপন করেন।

১৯২৮–১৯৩২: HMV ও সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ

১৯২৮–১৯৩২ সময়ে কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে সংগীত। এ সময় তিনি হাজার হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করেন, যা পরবর্তীকালে নজরুলগীতি নামে স্বতন্ত্র ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা সাহিত্যে ও সংগীতে গজলধারার প্রবর্তন তাঁর অন্যতম কীর্তি; “কে বিদেশী মন উদাসী” প্রভৃতি গানে পারস্যঘরানার সুর ও আবেগের সার্থক প্রকাশ ঘটে। একই সঙ্গে তিনি বিপুলসংখ্যক হামদ, নাত, ইসলামী গান, শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তনধর্মী ও ভক্তিমূলক গান রচনা করে বাংলা সংগীতকে এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য দান করেন। এই সময় তাঁর কবিতা রচনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও সংগীতসাধনার মাধ্যমে তিনি বাংলা গানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেন এবং নজরুলগীতিকে একটি স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সংগীতধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৩০-এর দশক: পরিণত সাহিত্যিক পর্যায়

১৯৩০-এর দশকে কাজী নজরুল ইসলামের সৃজনশীলতার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সংগীত। এ সময় তিনি কবিতা রচনা অব্যাহত রাখলেও তাঁর মনোযোগ ক্রমশ গান, নাটক, চলচ্চিত্র ও বেতারকেন্দ্রিক সৃষ্টির দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনা ও সুরারোপ করেন এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও (আকাশবাণী)-র জন্য নিয়মিত গান, নাটক ও সংগীতধর্মী অনুষ্ঠান তৈরি করেন। পাশাপাশি ইসলামী সংগীত, শ্যামাসঙ্গীত, ভক্তিগীতি এবং মানবতাবাদী গানের মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবকল্যাণের বার্তা প্রচার করেন। এই সময়ে তাঁর সৃজনশীলতা মূলত গানমুখী হয়ে ওঠে এবং তাঁর জনপ্রিয়তা বাংলা ভাষাভাষী সমাজে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, ফলে তিনি বাংলা সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

১৯৪২: অসুস্থতার সূচনা ও সৃজনশীল জীবনের অবসান

১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম এক দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন, যা পরবর্তীতে পিক্‌স ডিজিজ (Pick’s Disease) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই অসুস্থতার ফলে তিনি ধীরে ধীরে তাঁর বাকশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং সৃজনক্ষমতা হারাতে শুরু করেন। এ সময় কিছু বিচ্ছিন্ন ও অসম্পূর্ণ রচনার চেষ্টা দেখা গেলেও সাহিত্য ও সংগীতে তাঁর সক্রিয় অবদান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের এই মহীরুহের সৃজনশীল যাত্রার সমাপ্তি ঘটে। যদিও তাঁর কলম থেমে যায়, তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম, গান এবং মানবতাবাদী আদর্শ বাংলা সংস্কৃতিতে আজও সমানভাবে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

সংক্ষিপ্তসার

অমিত প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ২২ বছরের (১৯২০–১৯৪২) সক্রিয় সৃষ্টিশীল জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। সৈনিক জীবন থেকে শুরু করে বিদ্রোহী কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গীতিকার ও সুরকার—প্রতিটি পরিচয়ে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর কলমে যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি প্রেম, মানবতা, সাম্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মুক্তির বাণীও সমান শক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। ‘বিদ্রোহী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’র মতো কাব্যকীর্তির পাশাপাশি হাজার হাজার গান, বাংলা গজলের প্রবর্তন এবং নজরুলগীতির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্য স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তাঁর সৃজনশীল জীবন থেমে গেলেও, তাঁর সাহিত্য, সংগীত এবং মানবতাবাদী চেতনা আজও বাঙালির প্রেরণার চিরন্তন উৎস।

লেখক : অধ্যাপক তপন সরকার

আরও পড়ুন