একা দোকা—নিঃসঙ্গতার অরণ্যে এক টুকরো মায়া

বইয়ের দুনিয়ায় আজ যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ৩০০ বা ৪০০ পৃষ্ঠার ভারী ভারী সব বইয়ের নামে যখন অখাদ্য বাজার সয়লাব। বেস্টসেলারও নাকি ওগুলো!
আমি তো বলবো, দায়সারা লেখার ভিড়ে বাংলাসাহিত্যের আঙিনা ভরে উঠছে। এতে সাহিত্যের আসল প্রাণ-ই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাত্র ১০৪ পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট উপন্যাস—ওয়াসি আহমেদের ‘একা দোকা’ হাতে পাওয়া যেন তৃষ্ণার্ত তৃপ্তির জল।
বইটি পড়ে এক অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশে নিজের মাথায় নিজে গাট্টা মেরে বলতে ইচ্ছে হলো—‘মাসুম, ভুলেও কখনো ওইসব অখাদ্য পড়তে যেও না, সময় নষ্ট করা ছাড়া ওগুলো আর কিছুই নয়! তুমি তোমার রুচিতে এভাবে অটল থেকো।’
‘একা দোকা’ অনেকদিন ধরেই আমার বুকশেলফে রাখা ছিল। নানা ছুতোয় পড়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আজ চারপাশটা কেমন নির্জীব, নিরানন্দ; কোথাও কোনো রঙের ছোঁয়া নেই, বরফের মতো ঠাণ্ডা এক বিষণ্ণতা আমাকে গ্রাস করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হিমহিম চাদর মুড়ি দিয়ে ডুব দিলাম ‘একা দোকা’-র ভুবনে।
ক্রাউন সাইজের এই ছোট্ট বইটি হাতে নিতেই যে প্রশান্তি অনুভূত হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মনে মনে ভাবছিলাম, আমার আসন্ন ‘অতলান্তে’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি যদি এমন সুবিন্যস্ত একটা অবয়ব পায়, তবে সে এক অনন্য সুখ হবে!
সে-যাকগে, একা দোকার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মীনা। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে নিঃসঙ্গতার মহাকাব্য। ভাড়াবাড়ির এক চিলেকোঠায় তার একলা জীবন। কিন্তু সে একা নয়, তার একাকীত্বের অরণ্যে সঙ্গী হিসেবে আছে পিটার’ নামের এক হুলো বিড়াল।
এই দুই প্রাণের অদ্ভুত এক সহাবস্থান, তাদের নীরব চোখের ভাষা আর নিঃসঙ্গ জীবনের টানাপোড়েন লেখক যেভাবে এঁকেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। মীনার একাকীত্ব এখানে কোনো অভিশাপ নয়, বরং এক ধরনের দার্শনিক উপলব্ধির নাম। তার জীবনের এই নিভৃত যাপনকে লেখক মাত্র ১০৪ পৃষ্ঠার মধ্যে যে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন, তা অসাধারণ।
মীনা ছাড়াও গল্পে আরও যে চারটি চরিত্র আছে, তারাও মীনার জীবনের শূন্যতাকে পূর্ণতা দেওয়ার ক্ষেত্রে অদ্ভুত সব ভূমিকা রেখেছে।
অনেকেই হয়তো জানতে চাইবেন, পুরো গল্পটা কেন ফাঁস করিনি। তাদের প্রতি আমার বিনম্র নিবেদন—
রিভিউ মানেই গল্পের সারমর্ম বা শেষ পরিণতি বলে দেওয়া নয়। বই পড়ার যে আনন্দ, যে উত্তেজনার স্বাদ পাঠক নিজে পাবেন, তা আগেভাগে ফাঁস করা আমার নৈতিকতার বিরোধী। আমি কেবল আমার ভালো লাগা আর মন্দ লাগার জায়গাগুলো তুলে ধরি।
ওয়াসি আহমেদের লিখনশৈলী অতি আধুনিক ও চমৎকার। ‘কত কম কথায় কত গভীর সত্য প্রকাশ করা যায়’—‘একা দোকা’ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বাড়তি শব্দ নেই, কোনো বাহুল্য নেই; প্রতিটি বাক্য যেন একেকটি অণুগল্পের মতো জীবন্ত।
হে পাঠক, অনুরোধ একটাই—সস্তা আর চটকদার বইয়ের মোহে পড়ে সাহিত্যের অপচয় করবেন না। ভালো লেখার সন্ধান করুন, ভালো বই পড়ুন। তবেই বাংলাসাহিত্য তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং মাথা তুলে দাঁড়াবে।
প্রথমা প্রকাশনকে এমন একটি মানসম্মত বই উপহার দেওয়ার জন্য জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
বই হোক আত্মার আত্মীয়—এই মন্ত্রেই বিশ্বাসী আমি। কারণ একটি ভালো বই কেবল আমাদের অবসর কাটানোর সঙ্গী নয়, বরং জীবনের গহীনে বেঁচে থাকার নতুন কোনো মানে খুঁজে পাওয়ার আলোকবর্তিকাও বটে। আজকের মতো এখানেই ইতি টানছি, তবে খুব শীঘ্রই আবারও ফিরবো নতুন কোনো পাঠ-অনুভূতির ডালি সাজিয়ে। খুব দ্রুতই লিখতে বসবো প্রিয় লেখক মঈনুল আহসান সাবের-এর অনবদ্য উপন্যাস ‘এইসব কিছুই না’ নিয়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত বইয়ের মলাটের ভেতরেই কাটুক আপনাদের সুন্দর সময়। বইয়ের সাথেই থাকুন, ভালো থাকুন।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
উপন্যাস : একা দোকা
লেখক : ওয়াসি আহমেদ
প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল
প্রকাশন : প্রথমা
প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০১৭
পৃষ্ঠা : ১০৪
মূল্য : ১৮০ টাকা
