আলেক্সান্দর রাস্কিনের কালজয়ী সৃষ্টি ‘বাবা যখন ছোট’ যেন শৈশবের রঙিন অ্যালবাম

আলেক্সান্দর রাস্কিনের লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিশ্বসাহিত্য ক্লাসিক হলো বাবা যখন ছোট। এটি মূলত বাবা-মেয়ের ভালোবাসার এক অনবদ্য গল্পমালা।
লেখক আলেক্সান্দর রাস্কিন তাঁর ছোট্ট অসুস্থ মেয়ে ‘সাশা’-কে ঘুমানোর আগে নিজের ছেলেবেলার মজার সব দুষ্টুমি ও কান্ডের গল্প শোনাতেন। বাবার মুখ থেকে নিজের ছোটবেলার কথা শুনে মেয়ে যেমন আনন্দ পেত, তেমনি তার সব কষ্ট বা কান ব্যথাও দূর হয়ে যেত।
বইটিতে প্রায় ২৮টি ছোট ছোট মজার গল্প রয়েছে। একজন দুরন্ত ও সাধারণ শিশুর চোখে পৃথিবী কেমন হয়, সে কীভাবে বড়দের নানান প্রশ্নের মুখে পড়ত, এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সে কী কী মজার ভুল বা দুষ্টুমি করত—তার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে।
বাংলায় এই বইটির অসাধারণ অনুবাদ করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও অনুবাদক ননী ভৌমিক।
বইটি আপনাকে আপনার শৈশবের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং আপনার পরিবারের ছোট সদস্যদের জন্যও এটি দারুণ উপভোগ্য। আপনি চাইলে দিব্যপ্রকাশ থেকে খুব সহজেই বইটির কপি সংগ্রহ করতে পারবেন। আমি বরিশাল বিভাগীয় বইমেলায় বিদ্যপ্রকাশের স্টল থেকে বইটা কিনেছিলাম। বইমেলা থেকে খুলনায় ফেরার পথে বাসের ভেতর বসেই বইটা পড়ে নিয়েছিলাম। এরপর অনেকদিন বইটা বইয়ের তাকে পড়েছিল। কদিন আগে আমার পুত্রধন নিনাদকে বইটা পড়তে দিলাম। নিনাদ তিন বৈঠলে বইটা পড়ে নিয়েছে। পড়া শেষে বলল, বাবা, তোমার ছোটবেলাও এমন ছিল? আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলি।
আলেক্সান্দর রাস্কিনের ‘বাবা যখন ছোট’ বইটি পড়লে মনে হয়, এটি কেবল এক অন্য দেশের বাবার গল্প নয়, এটি যেন পৃথিবীর সব শিশুরই চিরচেনা শৈশবের প্রতিচ্ছবি। ২৮টি ছোট ছোট গল্পের সংকলনে সাজানো এই বইটিতে ফুটে উঠেছে ছোটবেলার দুরন্তপনা, না পাওয়ার বেদনা, ভুল করার ভয় এবং বড় হওয়ার অদ্ভুত সব স্বপ্ন। মূলত লেখকের নিজের মেয়ে সাশার অসুস্থতার দিনগুলোতে তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তিনি যখন নিজের ছোটবেলার গল্প বলা শুরু করেছিলেন, তখনই এর জন্ম। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশ বা কাল যাই হোক না কেন, শৈশবের আনন্দ, আবেগ আর সরলতা পৃথিবীর সব প্রান্তে একই সুতোয় গাঁথা।
বইটি পড়ার সময় আমি যেমন বারবার নিজের ছোটবেলার রঙিন দিনগুলোতে হারিয়ে গিয়েছি, ঠিক তেমনি নিনাদকে যখন এটি পড়তে দিলাম, দেখলাম সেও নিজের সাথে গল্পের চরিত্রগুলোকে মেলাতে পারছে। আমি নিজেও ছোটবেলায় অনেক অদ্ভুত পেশার স্বপ্ন দেখতাম, যেমনটি বইয়ের বাবা দেখেছেন—কখনো রাতের চৌকিদার, কখনো আইসক্রিমওয়ালা হতে চেয়েছেন। এই বইটি পড়ার সময় আমি নিজের ফেলে আসা সেই ছেলেবেলাকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছি, যা আমাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগার আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আর নিনাদ, ও এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে, ও যখন পড়ছে যে তার বাবার মতো একজন গম্ভীর মানুষও একসময় পুঁচকে ছিলেন, দুষ্টুমি করতেন এবং শাস্তি পেতেন—তখন সে বইটির সাথে এক অদৃশ্য বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। সে বুঝতে পারছে যে, ভুল করা জীবনেরই অংশ এবং বড় হওয়ার পথে এটিই স্বাভাবিক।
বইটির অনুবাদ অসাধারণ, যা মূল গল্পের রসকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। ভাষা এতই সাবলীল যে, বানান বা ভাষার জটিলতা ছাড়াই শিশু অনায়াসেই পুরো বইটিতে ডুবে যেতে পারে।
এই বইয়ের বড় গুণ হলো, এতে কোনো সরাসরি শাসন বা ভারী কোনো উপদেশ নেই। প্রতিটি গল্পের শেষে খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে জীবনের ছোট ছোট সত্য ও প্রবাদগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা শিশুরা নিজে থেকেই অনুভব করতে শেখে। যেমন—বাজে কাজে ১ঘণ্টা, আসল কাজে গোটা মনটা বা কাজ আঁতকায় ওস্তাদ দেখে, আর আলসে আঁতকায় কাজ দেখে—এর মতো প্রবাদগুলো ছোটদের জীবনবোধকে ঋদ্ধ করে।
এটি বাবা এবং সন্তানের মধ্যে এক অনন্য মানসিক সংযোগ স্থাপন করে। যখন একটি শিশু তার বাবার ছোটবেলার গল্প শোনে বা পড়ে, তখন বাবার প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
সব মিলিয়ে ‘বাবা যখন ছোট’ একটি অমূল্য সম্পদ। বাচ্চাদের পড়ে শোনানোর জন্য এটি যেমন দারুণ, তেমনি কিশোর-কিশোরীদের জন্য এটি পাঠ্যতালিকায় অবশ্যই রাখার মতো বই।
এটি কেবল শিশুদের আনন্দই দেয় না, বরং বড়দের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা সবাই একসময় ছোট ছিলাম। আমাদের সবারই সেই ছোটবেলার অটুট সারল্যকে মনে রাখা প্রয়োজন। আমার ও নিনাদের কাছে এই বইটি কেবল পাতায় লেখা শব্দের সমষ্টি নয়, বরং শৈশবের সেই হারানো সুরের এক অবিস্মরণীয় আনন্দ।
মাসুম বিল্লাহ : ইনসাইট কন্ট্রিবিউটর, বইচারিতা
বই : বাবা যখন ছোট
লেখক : আলেক্সান্দার রাস্কিন
অনুবাদ : ননী ভৌমিক
প্রকাশন : দিব্যপ্রকাশ
প্রথম সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ২০০৪
মূল্য : ১৩৫ টাকা।
