‘ক্ষীরের পুতুল’ শৈশবের ম্যাজিক আর এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া

ছোটবেলায় দাদি-নানিদের মুখে রূপকথার গল্প শোনেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু সেই চেনা রূপকথা যখন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাদুকরী লেখনীতে কাগজের পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল একটা গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত মায়াজাল। সম্প্রতি ‘ক্ষীরের পুতুল’ বইটি আবার নতুন করে পড়ার সুযোগ হলো। বড়ো বেলার সব ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে যখনই বইটার পাতায় ডুব দিলাম, মুহূর্তের মধ্যে যেন সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবে ফিরে গেলাম।

বইটি পড়ার পর একজন পাঠক হিসেবে আমার যে অনুভূতিগুলো জেগেছে, তা নিচে তুলে ধরলাম:

গল্পের শুরুতেই সেই চেনা চেনা আবহ—এক রাজার দুই রানি, সুয়ো আর দুয়ো। সুয়োরানির রাজকীয় জাঁকজমক, সাতমহল বাড়ি, আর অন্যপাশে দুয়োরানির ভাঙা ঘর, ছেঁড়া কাঁথার সেই করুণ ছবি আমাদের চট করে গল্পের ভেতরে টেনে নেয়। অবনীন্দ্রনাথ এত চমৎকারভাবে এই বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছেন যে, দুয়োরানির দুঃখটা পাঠক হিসেবে আমার বুকেও গিয়ে লাগে।

এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং মায়াবী চরিত্রটি হলো দুয়োরানির সেই পোষা বানরটি। সে কেবল একটা সাধারণ বানর নয়, সে যেন নিঃসঙ্গ এক মায়ের পরম আপন সন্তান, বিপদের কাণ্ডারি আর পরম সুহৃদ। তার চতুরতা, রাজাকে চমৎকার সব গল্পে ভুলিয়ে রাখা, আর মায়ের দুঃখ দূর করার জন্য একের পর এক ফন্দি আঁটা—সব মিলিয়ে চরিত্রটি পুরো গল্পকে একাই টেনে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ষষ্ঠীঠাকরুনের দেশ থেকে সেই রূপবান খোকাকে বুদ্ধি খাটিয়ে নিয়ে আসার দৃশ্যটি সত্যিই অনবদ্য!

বইটির দ্বিতীয়ার্ধে যখন বানর ক্ষীরের পুতুলকে বর সাজিয়ে বিয়ে দিতে বের হয় এবং দিনগরে দিঘির পাড়ে ষষ্ঠীঠাকরুনের মুখোমুখি হয়, সেখান থেকে গল্পের মোড় এক কল্পনাতীত রূপ নেয়। অবনীন্দ্রনাথ যেভাবে ষষ্ঠীতলার বর্ণনা দিয়েছেন—যেখানে কেবল শিশুদের রাজ্য, কোনো পাঠশালা নেই, গুরুমশাইয়ের বেতের বাড়ি নেই, শুধু খেলা আর আনন্দ—তা পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই মুখে একটা চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। নদী-নালা, টিয়ে পাখি, ভোঁদড়ের নাচ আর ছড়ার মতো মিষ্টি গদ্যের সেই মেলবন্ধন পাঠককে এক মায়াবী ঘোরে আটকে রাখে।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তাঁর গদ্য যেন এক একটি তুলির টান। ‘আকাশের মতো নীল, বাতাসের মতো ফুরফুরে, জলের মতো চিকন শাড়ি’—এই রকম উপমাগুলো পড়তে এত ভালো লাগে যে মনে হয় চোখের সামনে সত্যি বুঝি কোনো রাজকন্যা শাড়ি বুনছেন। পুরো বইটির ভাষা এত সহজ, সাবলীল অথচ কাব্যিক যে, ছোট-বড়ো যেকোনো বয়সী পাঠককেই তা মুগ্ধ করবে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন চারপাশের স্ক্রিন আর গ্যাজেটের ভিড়ে আমাদের ছোটরা ক্রমশ বইবিমুখ হয়ে পড়ছে, তখন ‘ক্ষীরের পুতুল’-এর মতো বইয়ের প্রয়োজনীয়তা যেন আরও বেশি করে অনুভুত হয়। শুধু ছোটরাই বা কেন, বড়দের মধ্যেও আজকাল বই পড়ার অভ্যাসটা ভীষণভাবে কমে গেছে; যান্ত্রিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের কল্পনাশক্তি। ছোটদের হাতে জোর করে কোনো গুরুগম্ভীর বই তুলে না দিয়ে, যদি এই রকম মিষ্টি রূপকথা আর ছান্দসিক ভাষার বই পড়তে দেওয়া যায়, তবে তারা নিজের অজান্তেই বইয়ের প্রেমে পড়বে। এটি তাদের কল্পনার জগৎকে যেমন রঙিন করবে, তেমনি মনের ভেতরের সারল্যকেও বাঁচিয়ে রাখবে। বড়দের জন্যও এই বইবিমুখতা কাটানোর দারুণ এক ‘মেডিসিন’ হতে পারে এই পুনরুত্থান। শৈশবের চেনা গল্পে ফিরে গিয়ে নতুন করে রিডিং হ্যাবিট তৈরি করার এর চেয়ে সহজ উপায় আর কী-ই বা হতে পারে!

পরিশেষে, ‘ক্ষীরের পুতুল’ শুধু ছোটদের রূপকথা নয়, এটি বড়োদের জন্যও এক টুকরো শান্তির আশ্রয়। জীবনের জটিলতার মাঝে একটুখানি সারল্য আর শৈশবের স্বাদ পেতে চাইলে এই বইটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। দুয়োরানির সেই ভাঙা ঘরে শেষ পর্যন্ত যে সুখের আলো জ্বলে উঠল, তা পাঠক হিসেবে আমার মনকেও এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দিল। এমন একটা ক্লাসিক বই যতবারই পড়া হোক না কেন, এর ভেতরের চিরন্তন আবেদন কখনোই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।

আরও পড়ুন