শব্দ আর শিল্পের আলোকবর্তিকা: ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়ের ‘আবৃত্তি আমার ভালোবাসা’

ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘আবৃত্তি আমার ভালোবাসা’ (দ্বিতীয় ভাগ) কেবল একটি কবিতার সংকলন নয়, বরং এটি বাংলা আবৃত্তি জগতের এক অনন্য দলিল। ১৭ মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত এই গ্রন্থটি প্রথাগত আবৃত্তিযোগ্য কবিতার সংজ্ঞাকে বদলে দিয়ে শিল্পের এক নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে।
এই সংকলনটি সাধারণ সংকলন থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে। এর উপযোগিতা মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত:
এক. গভীর জীবনবোধ ও দৃশ্যময়তা: নির্বাচিত কবিতাগুলোতে রয়েছে জীবনের গভীর নির্যাস। প্রতিটি কবিতা পাঠের চেয়ে শ্রুতিরূপ দেওয়ার জন্য বেশি উপযোগী, যা শ্রোতার মনে এক জীবন্ত দৃশ্যপট তৈরি করে।
দুই. শিল্পীর নির্ভরযোগ্য সঙ্গী: নবীন বা অভিজ্ঞ—যে কোনও আবৃত্তিকারের জন্য এটি একটি ‘সৃজনশীল গাইডবুক’। নতুন কিছু নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ‘অমূল্য সংগ্রহ’ আবৃত্তিকর্মীদের পাথেয় হিসেবে কাজ করে।
তিন. স্বকীয়তা ও আধুনিকতা: প্রচলিত জনপ্রিয় কবিতার ভিড়ে না হারিয়ে এই সংকলনটি দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা ও গবেষণার ফসল। গদ্য ও পদ্যের মেলবন্ধনে এখানে আধুনিক প্রয়োগকলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায় নিজে একজন দক্ষ আবৃত্তিশিল্পী ও গবেষক হওয়ায় এই সংকলনে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ সুস্পষ্ট। তাঁর কৃতিত্বের প্রধান দিকগুলো হল:
প্রথমত, অপ্রথাগত নির্বাচন: তিনি প্রথাগত ‘আবৃত্তিযোগ্য’ কবিতার ছক ভেঙেছেন। তাঁর মতে, ‘‘সব কবিতাই আবৃত্তিযোগ্য, যদি তা কবিতা হয়।’’ এই সাহসিকতা সংকলনটিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, পাণ্ডিত্য ও প্রয়োগকলা: পূর্ববর্তী ‘আকর গ্রন্থ’গুলোর অভিজ্ঞতায় তিনি কবিতাকে ‘পারফর্মিং ইন্টারপ্রিটেশন’ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর হাতে পড়ে সাধারণ পদ্যও হয়ে উঠেছে শক্তিশালী নাট্য-মুহূর্ত।
তৃতীয়ত, শৈল্পিক বৈচিত্র্য: রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের ধ্রুপদী ধারার পাশাপাশি তিনি নবারুণ ভট্টাচার্য, জয় গোস্বামী কিংবা শ্রীজাতর মতো আধুনিক কবিদের স্থান দিয়ে সমকাল ও মহাকালের সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন।
এই সংকলনের বিশেষ কিছু কবিতা ও তাদের আবৃত্তিযোগ্যতা নজর কাড়ে:
’আমার নাম ভারতবর্ষ’ (অমিতাভ দাশগুপ্ত): দেশপ্রেম ও দ্রোহের বলিষ্ঠ উচ্চারণের জন্য।
’মাতাল সমগ্র’ (তারাপদ রায়): কণ্ঠের মড্যুলেশন ও অভিনয়ের সুযোগ সমৃদ্ধ এক নাটকীয় কবিতা।
’এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ (নবারুণ ভট্টাচার্য): তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদের সরাসরি বয়ান।
’রিকশাওয়ালা’ (অরুণ মিত্র): শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রণার এক দৃশ্যময় শান্ত কিন্তু গভীর অনুভব।
ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়ের এই সংকলনটি আবৃত্তি শিল্পকে সমৃদ্ধ করার এক সার্থক প্রয়াস। তাঁর আবৃত্তির প্রতি যে ‘বাউলিয়ানা’ এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা, এই গ্রন্থটি তারই শ্রেষ্ঠ প্রতিফলন। কবিতা ও আবৃত্তিপ্রেমীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে এটি একটি অনিবার্য সংযোজন।
তৈমুর খান: কবি
বইয়ের নাম: আবৃত্তি আমার ভালোবাসা (দ্বিতীয় ভাগ)
সম্পাদনা: ড. পিনাকী চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক: ফারুক আহমেদ, ‘উদার আকাশ’
প্রকাশকের ঠিকানা: ঘাটকপুকুর, পো: ভাঙড় গোবিন্দপুর-৭৪৩৫০২, থানা: ভাঙড়, জেলা: দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ।
যোগাযোগ: +৯১ ৯৭৩৩৫৭৪৪৪৮ / ৭০০৩৮২১২৯৮, ইমেল: udarakash143@gmail.com
মূল্য: ৩৫০ টাকা
