দিনলিপি যখন যুদ্ধদলিল: জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’এবং ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’

গত শতকে বিশ্ব বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী হয়। এর মধ্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রের বুকে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কয়েক দশক পরেই জড়িয়ে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইতিহাসের ব্যাপক পটপরিবর্তন হয়, পরাজিত হয় হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি বাহিনী। কিন্তু যুদ্ধ তো কেবলই মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, নয় শাসকের স্থানচ্যুতি, যুদ্ধ জনমানসে তৈরি করে নানা ক্ষত, দগদগে ঘা, প্রাণ হারানো বা পালিয়ে বাঁচার করুণ গাথা। মানুষ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয় বোমার আঘাতে বা পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে। মানুষের এসব গল্প জানার ঐতিহাসিক উৎস হতে পারে যুদ্ধকালীন দিনলিপি, যা একই সাথে যুদ্ধদলিলও বটে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে সর্বাধিক পরিচিত একাত্তরের দিনগুলি শিরোনামে দিনলিপিটি লিখেছেন জাহানারা ইমাম। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে অন্যতম আলোচিত দিনলিপি The diary of a young girl, যা লিখেছেন আনা ফ্রাঙ্ক।
আদতে দুটি দিনলিপির মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। জাহানারা ইমাম তাঁর দিনলিপিতে শুধু নিজের পরিবারের বিষয়েই লেখেননি, পাশাপাশি তুলে এনেছেন তাঁর পরিচিত অন্য পরিবারগুলোরও যুদ্ধকালীন সংগ্রামের বিষয়গুলো। বিশদভাবে লিখেছেন নিজের পুত্র রুমী ও তাঁর বন্ধুদের যুদ্ধে জড়ানোর এবং গেরিলা মিশনে অংশ নেওয়ার কথা। সেদিক দিয়ে ১৩ বছরের আনা ফ্রাঙ্ক নিজের দিনলিপির গণ্ডি রেখেছেন নিজের পরিবার, নিজের স্কুলের বন্ধু এবং আনার পরিবারের সাথে যুদ্ধের সময় আনার বাবার অফিস ভবনে পালিয়ে থাকা ফন ডান পরিবার ও আরও কয়েকজন মানুষের মধ্যে। কিন্তু তারপরও এ দুটি দিনলিপির মধ্যে কিছু মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। যুদ্ধকালের দিনলিপি লেখা দুজন মানুষের অনুভূতি বোঝার জন্য এ মিলগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জন্মদিন
যুদ্ধের সময় পরিবারের খুব ছোটখাটো আমুদে বা উৎসবময় ঘটনাও দুজন লেখিকা লিখে রাখতে চেয়েছেন। সে রকমই ঘটনা হলো জন্মদিন। জাহানারা ইমাম লিখছেন, ২৯ মার্চ রুমীর জন্মদিনেও তিনি কিছু ভালো পদ রান্না করার কথা ভেবেছিলেন, কেননা তখনো ২৫ মার্চ কালরাত্রির ঘটনাগুলো তিনি জানতে পারেননি। এর পাঁচ সপ্তাহ পর যখন নিজের জন্মদিন এল, তখন যুদ্ধের প্রভাবে জীবন আর গতানুগতিক নেই। তারপরও রুমী এসে তাঁকে একটি পুরোনো বই উপহার দেন, যার কাহিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে পোলিশদের প্রতিরোধ নিয়ে। রুমীর মতো বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেরা তাহলে যুদ্ধের শুরুর দিকেই একাত্তরে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সাথে বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর আক্রমণের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আনা ফ্রাঙ্ক নিজের ডায়েরিটা উপহার পান বাবার থেকে নিজের জন্মদিনেই। পরবর্তী সময়ে সেই ডায়েরিতেই লিখেছেন নিজের বড় বোন মারগট ও তাঁর পরিবারের সাথে পালিয়ে থাকা অন্যদের জন্মদিনের কথা।

কবিতা
রুমী যখন জাহানারা ইমামের সাথে ব্যাপক তর্ক করে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি যুদ্ধে যাবেন, তখন জাহানারা ইমামের মনে পড়ে প্রফেট বইয়ে খালিল জিবরানের কবিতা ‘তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের নয়’; যার মূল বক্তব্য হলো, সন্তানেরা পিতা-মাতার ভালোবাসা নিলেও ভবিষ্যতের পথে যাওয়ার কালে পিতা-মাতার ধ্যানধারণা নিতে পারে না। আনা ফ্রাঙ্কের জন্মদিনে তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে যে বিশাল কবিতা লেখেন, এর পুরোটাই আনা তুলে দেন নিজের দিনলিপিতে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, নিজের পিতা–মাতার ধ্যানধারণার সাথে আনা নিজেকে মেলাতে পারছেন না। আনা হয়তো খালিল জিবরান পড়েননি, পড়লে নিশ্চিতভাবে তিনিও একই কবিতার দ্বারস্থ হতেন।

রেডিও
যুদ্ধকালে বোমা বা গুলির শব্দ শোনার পাশাপাশি মানুষের কান সজাগ থাকত রেডিও শোনার জন্য, যদিও তা নিয়ন্ত্রণে থাকত হানাদার বাহিনীরই। এই রেডিওতেই আনা শুনতে পান হিটলারের খসখসে কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠস্বর আহত সৈনিকদের আঘাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে আর সৈনিকেরা এমনভাবে যাঁর যাঁর দেহের আঘাতের বর্ণনা করেন, যেন আহত হওয়া তাঁদের জীবনের ভাগ্য। অন্যদিকে, ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞের পর রেডিওতে পাকিস্তান সরকার দেখাতে চায়, সবকিছু ঠিক আছে এবং মানুষকে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। দিনলিপির শেষ দিকে জাহানারা ইমাম উল্লেখ করেন এম আর আখতার মুকুলের কথা, যিনি তাঁর সরস ‘চরমপত্র’ দিয়ে যুদ্ধের মধ্যেও মানুষের আশা বাঁচিয়ে রাখেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপ এম আর আখতার মুকুলের মতো কোনো শিল্পীকে পায়নি, যুদ্ধে হতাশাগ্রস্ত মানুষের মাঝে আশার হাওয়া নিয়ে আসার জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পায়নি। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান।

বোম্বিং এবং ডগফাইট
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ঢাকায় শুরু হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোম্বিং। তখন জাহানারা ইমামের ছোট ছেলে জামি দেখতে পারেন ডগফাইট, যেখানে দুপক্ষের বিমান আকাশে একে অপরের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিমানের বোম্বিং ছিল নিয়মিত ঘটনা। এর মধ্যেই আনা একদিক দেখতে পারেন ডগফাইট এবং সেটা লেখেন দিনলিপিতে এমনভাবে, যেন মজাদার কিছু দেখেছেন। জাহানারা ইমামের কিশোর সন্তান জামি আর ১৩ বছর বয়সী ডাচ কিশোরী আনার ডগফাইটের বিবরণ অনেকটা একই রকম। হয়তো দুটি ভিন্ন সময়কালে থেকেও তাঁরা সমবয়সী বলে।

মনের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আঁকড়ে ধরার প্রচেষ্টা
যুদ্ধ কেবল বন্দুক বা বোমায় সীমাবদ্ধ থাকে না, যুদ্ধকালে মানুষের মনের মধ্যেও চলতে থাকে যুদ্ধ। জাহানারা ইমামের সেই যুদ্ধ শুরু হয়, যখন তাঁর ছেলে গেরিলাযোদ্ধা রুমী, তাঁর ছোট ছেলে জামি এবং তাঁর স্বামীকে পাকিস্তানি বাহিনী এসে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর স্বামী ও জামি ফিরে এলেও ফেরেননি রুমী। রুমী কোথায় আছেন, সেটা কেউ বলতেও পারে না। জাহানারা ইমাম খোঁজ পান পাগলা বাবার, যিনি আশ্বাস দেন রুমীকে ফিরিয়ে আনবেন। সেই আশ্বাস আঁকড়ে ধরে জাহানারা ইমাম পাগলা বাবাকে দিয়ে যান নজরানা। কিন্তু রুমী আর ফেরেন না।
নিজের পরিবারের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ আনা ফ্রাঙ্কের কিশোরী মন আঁকড়ে ধরে পিটারের সাথে নিজের বন্ধুত্বকে। ১৬ বছরের পিটার ও তাঁর পরিবারের আনা ফ্রাঙ্কের পরিবারের সাথেই যুদ্ধের সময় লুকিয়ে ছিল। পিটার আদৌ তাঁর বন্ধু, নাকি প্রেমিক, তা নিয়ে আনা ফ্রাঙ্কের মনের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে; যদিও আনার বাবা তাকে বোঝান এ বিষয়কে গুরুত্ব না দিতে। কেননা, যুদ্ধকালে তাঁরা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেই, যখন মানুষে মানুষে খুব একটা দেখা হয় না। একদিকে পিটারের সবকিছু আনার ভালো লাগে, অন্যদিকে তিনি নিজের ডায়েরিতে ধর্মকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য পিটারের সমালোচনাও করেন। আনার ভাষায়, তিনি নিজেও নিষ্ঠাবান নন, কিন্তু একটা ধর্ম, তা সে যে ধর্মই হোক, মানুষকে সঠিক পথে রাখে।

কাকতালীয় কিটি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরু হওয়ার আগে মার্চ মাসের দিনগুলোর বিবরণ থেকে জানা যায়, জাহানারা ইমামের ধানমন্ডির বাসায় একজন আমেরিকান অতিথি ছিলেন, যাঁর নাম কিটি; যদিও ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ার পর তিনি চলে যান। কিটি নামের এই মেয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভাষা নিয়ে নিজের গবেষণার কাজে এবং পাশাপাশি জাহানারা ইমামের পরিবারের সাথে থেকে বাংলা ভাষা শিখতে। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণে অতিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যখন চাইছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, তখন কিটি জাহানারা ইমামের কাছে চেয়ে বসেন পরিসংখ্যানগত প্রমাণ, যেখানে পরিষ্কার হবে পূর্ব পাকিস্তান শোষণের শিকার। কিটির জন্য সেই পরিসংখ্যান ঘাঁটতে গিয়ে জাহানারা ইমাম প্রশ্ন করেন, সবকিছুই পরিসংখ্যান মেনে হয় নাকি?
কাকতালীয়ভাবে আনা ফ্রাঙ্কের দিনলিপিতেও কিটি নামের একটি চরিত্র আছে। সেই চরিত্র আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি নিজেই। আনা নিজের ডায়েরির নাম দেন ‘কিটি’। তাঁর দিনলিপিতে প্রতিটি দিনের বিবরণ শুরু হয় ‘Dearest Kitty’ সম্বোধনে।
যুদ্ধে মানুষ ও মানবতা উভয়ের মৃত্যু হয়। নগরীর পর নগরী ধ্বংস হয়, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালানো হয়। এই নরককাণ্ডের মধ্যে দিয়ে জাহানারা ইমাম ও আনা ফ্রাঙ্কের দিনলিপি বেঁচে যায় যেন ইতিহাসের স্বার্থেই ইতিহাসের সাক্ষী হতে। রুমীকে যখন পাকিস্তানি বাহিনী তুলে নিতে আসে, তখন জাহানারা ইমামের পুরো বাসা সার্চ করতে গিয়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায়, কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর চোখে তাঁর দিনলিপিটি চোখে পড়েনি। আনা ফ্রাঙ্কের দিনলিপিতে শেষ দিনটি ছিল ১ আগস্ট ১৯৪৪। ৪ আগস্ট ফ্রাঙ্কের পালিয়ে থাকার স্থানে পুলিশ হানা দেয়। আনাসহ সব বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরবর্তী সময়ে আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক ছাড়া এই বাসিন্দাদের সবাই মারা যান। বিশ্বযুদ্ধে নিজের দেশ হল্যান্ড মুক্তির দুই মাস আগে বন্দিনিবাসে আনার মৃত্যু হয়। আনার বাবা আমস্টারডামে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাঁর অফিসের দুজন সেক্রেটারি আনার দিনলিপি উদ্ধার করেছেন। আনা ফ্রাঙ্কের নিজের ইচ্ছা ছিল একজন লেখিকা হবেন। সেই ইচ্ছা পূরণে আনার বাবার উদ্যোগে আনা ফ্রাঙ্কের দিনলিপি প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। অন্যদিকে, জাহানারা ইমামের দিনলিপি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৫ বছর পর, ১৯৮৬ সালে। যুদ্ধকালের প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি পুরো দিনলিপিতেই জ্বলজ্বল করছে তাঁর শহীদ সন্তান রুমীর বীরত্বগাথা। জাহানারা ইমাম ও আনা ফ্রাঙ্ক—দুজনের দিনলিপি প্রকাশের পেছনেই দিনশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা, যেখানে খালিল জিবরান যতই বলুক, ‘তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের নয়’। এ দুটি দিনলিপি প্রকাশের মাধ্যমে রুমী ও আনাও যাঁর যাঁর পরিবারের সন্তান হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাসেরও সন্তান হয়ে ওঠেন।

সাদরিল শাহজাহান : লেখক

আরও পড়ুন