নজরুল ইসলামের ‘লাঙল’: শতবর্ষ পরে এক নিবিড় পাঠ

‘ধূমকেতু’র পরে প্রকাশিত হলো ‘লাঙল’ – নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা। ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশের প্রারম্ভিক-কাল থেকেই নজরুলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন উগ্ৰ-জাতীয়তাবাদী একটি গোষ্ঠী। পরে ‘লাঙল’গোষ্ঠীর মধ্যে ঢুকে পড়েন মুজফ্ফর আহমদ সহ একদল তরুণকম্যুনিস্ট।
‘ লাঙল’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ২০২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পত্রিকাটির শতবর্ষ পূর্ণ হলো। ‘ধূমকেতু’ ছিল নজরুলের প্রথম স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত চিন্তা- চেতনায় লালিত পত্রিকা। কিন্তু দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ‘লাঙল’ ছিল একটি রাজনৈতিক দলের মুখপত্র – যেখানে ব্যক্তি নয়,সমষ্টিগত চিন্তা ও মতাদর্শকে মান্যতা দেওয়াই রীতি ; তাই পরিচালক হলেও এক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা তেমন থাকে না।
‘লাঙল’ পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল:
‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভ ।’ এই সংগঠনটি তৈরির উদ্যোক্তা স্বয়ং নজরুল ইসলাম। তখন তিনি থাকতেন গঙ্গা নদীর ওপারে, হুগলিতে। সেখান থেকেই যাতায়াত করতেন ৩৭নং হ্যারিসন রোডের, পার্টি ও পত্রিকা অফিসে। তীব্র আর্থিক-সংকটে আক্রান্ত, অসুস্থ নজরুলের ,অনেক সময় ঘরে ফিরে যাওয়ার বাসভাড়াটুকুও থাকতো না।
তখন নজরুলের সঙ্গে ছিলেন কুতবউদ্দীন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার, শামসুদ্দীন হোসয়ন, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত,অতুল গুপ্ত, আবদুল হালিম প্রমুখ। তাঁরা ছিলেন উগ্ৰ- জাতীয়তাবাদী এবং স্বরাজপন্থী স্বাধীনতাকামী।দলটি গঠিত হয় ১৯২৫ সালের ১লা নভেম্বর।১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে,রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তথা শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়। এর প্রভাবে দেশে দেশে স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ভারতেও তার প্রভাবের প্রতিফলন ঘটে । বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের পাশাপাশি তাই স্বল্প সংখ্যক হলেও কিছু নেতার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর, তাসখন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। পরে ১৯২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, ভারতের কানপুরে গঠিত হয় ‘Communist Party of India ’. ঘটনাটি কাকতালীয় মনে হলেও, লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রকাশ এবং কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়েছে ঐ একই দিনে।
‘লাঙল’-এ প্রকাশিত সংবাদ এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধ দেখে সহজেই অনুমিত হয় যে, পত্রিকায় একই সঙ্গে অবস্থান করছে উগ্ৰ জাতীয়তাবাদ এবং মার্কসীয় মতাদর্শগত রচনা। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: নজরুল ইসলাম হলেন পত্রিকার প্রধান পরিচালক ; সম্পাদক হিসেবে রাখা হয় নজরুলের ফৌজি বন্ধু ও গায়ক মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে। তবে সবাই জানতেন যে,এটা নজরুলেরই পত্রিকা এবং বকলমে তিনিই সম্পাদক।
প্রথম সংখ্যায়, পত্রিকার পরিচয় সম্বন্ধে বিশেষভাবে উল্লিখিত ছিল:
এটি ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ- সম্প্রদায়ের’ মুখপত্র । তবে উল্লেখযোগ্য যে,দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে সপ্তম সংখ্যা পর্যন্ত দেখা যায় ,‘সম্প্রদায়ের’ শব্দের পরিবর্তে সেখানে ‘দলের’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে। আবার অষ্টম থেকে দশম সংখ্যা পর্যন্ত দলের নামের অগ্ৰভাগে সংযোজিত হয়েছে ‘বঙ্গীয়’ শব্দটি । ১৯২৬ সালের ৬ এবং ৭ই ফেব্রুয়ারি, কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত ‘ নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনে’ দলের নামটি বদলে রাখা হয়: ‘The Bengal Peasants and Workers Party’ বা ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’ ; অতএব ‘লাঙল’ হয়ে যায় এই নবগঠিত দলের মুখপত্র ।
পত্রিকাটির মোট ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম সংখ্যা: ১৯৯২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ; আর শেষ মুদ্রিত সংখ্যার প্রকাশ-কাল ১৯২৬ সালের ১৫ই এপ্রিল। পত্রিকার নগদ মূল্য ছিল এক আনা ; বার্ষিক মূল্য: তিন টাকা। পত্রিকাটি ছিল ট্যাবলয়েড সাইজের– ১৬ পৃষ্ঠার। তবে দুটি সংখ্যা ছিল ২০ পৃষ্ঠার। প্রথম থেকে দ্বাদশ সংখ্যা পর্যন্ত, সম্পাদক হিসেবে নাম ছিল মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। কিন্তু ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ সংখ্যার সম্পাদক পরিচয়ে,মুদ্রিত হতে দেখা যায়, গঙ্গাধর বিশ্বাসের নাম। ১৫টি সংখ্যার মধ্যে, বিশেষ সংখ্যা রূপে চিহ্নিত ছিল ৩টি সংখ্যা:
১. প্রথম সংখ্যা : নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ ;
২. পঞ্চম সংখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু ; এবং
৩. ত্রয়োদশ সংখ্যা: মৎস্যজীবী সংখ্যা।
প্রথম সংখ্যা মুদ্রিত হয়েছিল ৫০০০(পাঁচ হাজার) কপি। বিপুলসংখ্যক পাঠক চাহিদার কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কপি নিঃশেষিত হয়ে যায়। ফলে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা পুস্তকাকারে প্রকাশ করে , তাৎক্ষণিকভাবে Damage Control করতে হয়। ব্যাপক-পাঠকচাহিদা অনুধাবন করে, বিশেষত মফস্বলবাসীর অপ্রাপ্তিমোচনের কথা মাথায় রেখে, ‘লাঙলের’ দ্বিতীয় সংখ্যাটি ছাপাতে হয়েছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি কপি। প্রত্যেক সংখ্যারই শুরুতে শিরোভাগে মুদ্রিত ছিল,
১.চণ্ডীদাসের মানবতার বাণী:
‘শুনহ মানুষ ভাই ,
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই’ ;
এবং ২. লাঙল কাঁধে কৃষক এবং লাঙল দিয়ে কৃষকের জমি চাষ করার দুটো লোগো(Logo)।
তবে ,Logo তে শুধু কৃষক থাকায়, অর্থাৎ শ্রমিক অনুপস্থিত থাকায়, পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যা থেকে এই লোগোটি তুলে দেওয়া হয় । শেষ সংখ্যায় দেখা যায়, পরিবর্তিত লোগোতে যুক্ত হয়েছে ‘কাস্তে ও হাতুড়ি’। এর মধ্য দিয়ে , ‘লাঙল’ পত্রিকায় মার্কসীয় মতাদর্শ ও দর্শনের সরাসরি প্রবেশ ঘটে । ততদিনে অবশ্য কম্যুনিস্ট মুজফ্ফর আহমদ এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নিষ্ঠরূপে নিজেদের সংযুক্ত করে নিয়েছেন। এবং একঝাঁক কমিউনিস্ট লেখক, পত্রিকায় প্রবন্ধ- নিবন্ধ-অনুবাদ – সংবাদভাষ্য ইত্যাদি প্রকাশ করে পত্রিকাটিতে ধীরে ধীরে বাম-রাজনীতির সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছেন। অধিকাংশ রচনাই সোভিয়েত রাশিয়ার কালজয়ী মার্কসীয় সাহিত্যের অনুবাদ এবং সোশালিজম ইত্যাদি বিষয়ক। নজরুল ইসলাম তখনও অসুস্থ অবস্থায়, সপরিবার হেমন্তকুমার সরকারের তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণনগরে বসবাস করছেন। পত্রিকার শেষ তিনটি সংখ্যার প্রথম পাতায় মুদ্রিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আশীর্ব্বচন’ :
‘জাগো,জাগো,বলরাম,ধরো তব মরুভাঙা হল,
বল দাও,ফল দাও,স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল।’
পাঠান্তরে : ‘বল দাও, ফল দাও’-এর স্থানে হয়েছে: ‘প্রাণ দাও , শক্তি দাও’ ।
‘লাঙল’এর বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের যাবতীয় লেখালিখির নামোল্লেখ-সূচক একটি পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে , যেখানে দেখা যাবে ১৫টি সংখ্যার মধ্যে নজরুলের অস্বাক্ষরিত গদ্য রচনা ছাপা হয়েছে ৪টি ; বাকিগুলো কবিতা।
যথা :
প্রথম সংখ্যা: ১. সম্পাদকীয়: ‘লাঙল’ ;
২. ‘সাম্যবাদী’ (কবিতা);
৩. ‘ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতির
‘শ্রমিক-প্রজা-সম্প্রদায়ের’
উদ্দেশ্য ও নিয়মাবলী’।
দ্বিতীয় সংখ্যা: ‘কৃষাণের গান’ (গান)
তৃতীয় সংখ্যা: ১. ‘সব্যসাচী’ (কবিতা)
২. ‘পোলিটিকাল তুবড়ি বাজি’
চতুর্থ সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
পঞ্চম সংখ্যা : ‘নজরুল ইসলামের পত্র’
ষষ্ঠ সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
সপ্তম সংখ্যা : ‘অশ্বিনীকুমার’ (কবিতা)
অষ্টম সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
নবম সংখ্যা : ‘শ্রমিকের গান’ (গান)
দশম সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
একাদশ সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
দ্বাদশ সংখ্যা : ‘জেলেদের গান’(পরে
পরিবর্তিত নাম:
‘ধীবরদের গান’)
ত্রয়োদশ সংখ্যা: কোনো লেখা নেই।
চতুর্দশ সংখ্যা : ‘সর্ব্বহারা’ (কবিতা)
পঞ্চদশ সংখ্যা : কোনো লেখা নেই।
দেখা যাচ্ছে, ‘লাঙল’ পত্রিকার চতুর্দশ সংখ্যায়(১৫ই এপ্রিল ১৯২৬) মুদ্রিত ‘সর্ব্বহারা’ কবিতাটিই, ‘লাঙলের’ সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের শেষ সংযোগ । তারপর আর তাঁর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক-সংযোগ চোখে পড়েনি। উপরন্তু বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো: ‘সর্ব্বহারা’ কবিতাটিই কবির বিদ্রোহাত্মক কবিতা সিরিজের শেষ রচনা। কবির, কোমল হৃদয়ের গভীরে এমন কোনো ব্যথার প্রতিক্রিয়া কি ঘটেছিল, যে কারণে তিনি এধরনের শানিত-পাঠক উজ্জীবিত কবিতা রচনার দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে, সরাসরি রোমান্টিক কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করলেন ! একজন নিবিষ্ট নজরুল-অনুসন্ধিসু গবেষক হিসেবে এই জিজ্ঞাসা মনে উঁকি দেয় বৈকি ! নজরুল কি অন্তরের গভীরে অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর উগ্ৰ জাতীয়তাবাদী মানসিকতার কারণে তাঁকে ‘লাঙল’ থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ! কিংবা তাঁর অসুস্থতা ও দারিদ্র্যই কি তাঁর সচেষ্ট- নিমগ্ন- বহুকাঙ্ক্ষিত ‘লাঙল’ থেকে, তাঁর ত্রস্থ-হৃদয় তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে !! উহ্যই রয়ে গেল এর উত্তর।
‘লাঙল’– পঞ্চদশ সংখ্যার পরে, পত্রিকা ছাপার নানাবিধ সমস্যা হেতু এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯২৬ সালের ১২ই অক্টোবর, মুজফ্ফর আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘গণ-বাণী’ পত্রিকা। ‘গণ-বাণী’র প্রথম সংখ্যায় ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে সম্পাদক জানিয়ে দিয়েছেন বটে,যে : ‘ বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল ‘গণ-বাণী’র প্রকাশ ভার গ্ৰহণ করেছেন। এই দলের পূর্ব্ব-প্রকাশিত ‘লাঙল’ ‘গণ-বাণী’র সহিত একীভূত হয়ে গেছে।’ তবে একথাও অস্বীকারের উপায় নেই যে, গণবাণী প্রকাশের মধ্যে দিয়েই ‘লাঙল’ , একপ্রকার নিঃশব্দে নীরবে সমাহিত হয়ে গেল।
এবার, ‘লাঙল’-এর শতবর্ষ পরে, তার ১৫টি সংখ্যার সংক্ষিপ্ত নিবিড়-নিমগ্ন পাঠের মধ্য দিয়ে ‘লাঙলের’ প্রাসঙ্গিকতা ও তার ‘অন্তর বাহির’-এর স্বরূপ বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।
–
নিবিড় পাঠ : ১
‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ’ সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপত্র রূপে ‘লাঙল’ পত্রিকা , ‘বিশেষ সংখ্যা’ হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, বুধবার (১লা পৌষ,১৩৩২)। ‘লাঙল’এর সামগ্ৰিক দায়-দায়িত্ব বর্তায় কাজী নজরুল ইসলামের উপর। তাঁকে বলা হতো পত্রিকার প্রধান পরিচালক ; কিন্তু সম্পাদক হিসেবে মুদ্রিত হতো নজরুলের ফৌজী বন্ধু এবং গায়ক, মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নাম।
তবে সম্পাদক হিসেবে বাহ্যত তাঁর নিজের নাম ব্যবহৃত বা উচ্চারিত না হলেও, নজরুল ইসলাম স্বয়ং-ই যে এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তার একটি অকাট্য প্রমাণ মেলে, হুগলি থেকে ১৯২৫ সালের ২৫শে নভেম্বর মুরলীধর বসুকে তাঁর লেখা এক পত্র থেকে। তাতে তিনি লিখেছেন:
১. ‘লাঙলের’ ফাল আমার হাতে– ‘লাঙল’ এর
শুধু বা কাঠেরটাই বেরোয় প্রথমবার। শুধু
‘কৃষাণের গান’ দিয়েছি ।’
২. জ্বরে চিত। অফিসটা বোধহয় চিৎপুরে
উঠিয়ে নিয়ে যেতে হবে । অফিসের দোরে
একটা আস্ত লাঙল টাঙিয়ে দিতে বলেছি।
ওই হবে সাইনবোর্ড।’
৩. তোমাকে লিখতে হবে কিন্তু ‘লাঙল’-এ।
প্রথমবারই দিতে হবে।সকলে মিলে কাঁধ
দেওয়া যাক।.শৈলজা,প্রেমেন,অচিন্ত্যকে
তাড়া দিও লেখার জন্য।’
গোলাকৃতির ফ্রেমে, কাঠের ব্লকে ছিল, লাঙল কাঁধে এক কৃষকের প্রতিকৃতি। ‘লাঙলে’ যেসব লেখা থাকবে ,তার একটা সম্ভাব্য বিষয়-নির্দেশ মুদ্রিত ছিল প্রথম পৃষ্ঠাতেই। তাতে বলা হয় : ‘লাঙলে কি কি থাকিবে’–
১.বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কবিতা;
২. ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত রোমাঞ্চকর উপন্যাস ‘মা’-র ধারাবাহিক অনুবাদ ;
৩.কার্ল মার্ক্সের জীবনী ;
৪. প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা ;
৫. গণ-আন্দোলন সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা ও সংকলন ;
৬. ‘প্রতি সংখ্যায় একখানি করিয়া ছবি ।’
এই নির্দেশিকা দেখে অনুধাবন করা যায় যে, ‘লাঙলের’ মধ্য দিয়ে বঙ্গীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে মার্কসীয় দর্শনের অনুশীলন সূচিত হতে যাচ্ছে। প্রথম পৃষ্ঠায় জানানো হয়: ‘এই সংখ্যায় লাঙলের সর্বপ্রধান সম্পদ কবি নজরুল ইসলামের কবিতা ‘সাম্যবাদী।’ছিল দুটি বিজ্ঞাপন :
১. দি কোহিনুর ডেকোরেটিং এণ্ড পেন্টিং ওয়ার্কস।এখানে ‘সস্তায় সুন্দর নূতন আর্ট ধরনের থিয়েটারের স্টেজ, ড্রেস,চুল ইত্যাদি ভাড়া পাওয়া যায় এবং তৈয়ারী করা ও বিক্রয় করা হয়।’ ঠিকানা: লাঙল পত্রিকা এবং ‘শ্রমিক- প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের অফিস, ৩৭নং হ্যারিসন রোড, দুইতলার উপরেই।’
২. বিশ্বভারতীর গ্ৰন্থাগারিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘ভারতে জাতীয় আন্দোলন’। পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের বরদা এজেন্সীতে।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে তিনটি বিজ্ঞাপন:
১. সস্তায় লোহার বীম ও বরগা বিষয়ে ;
২. কে.সি.বিশ্বাস এণ্ড কোং-এর প্রসিদ্ধ বন্দুক, রিভলবার, রাইফেল,টোটা বারুদ ক্যাপ এবং ছররা ইত্যাদি বিক্রির বিজ্ঞাপন ; এবং
৩. ‘লাঙল’-এর পুস্তক বিভাগ থেকে মুদ্রিত (৩৭নং হ্যারিসন রোড) হেমন্তবাবুর (হেমন্ত কুমার সরকার) বইয়ের বিজ্ঞাপন ; কয়েকটি বিশিষ্ট গ্ৰন্থ :
ক. বন্দীর ডায়েরী :
‘অসহযোগ আন্দোলনের ফলে নেতাগণের কারাগারে গমন, তাঁহাদের জীবনযাত্রা ও ভলেন্টিয়ার আন্দোলনের ইতিহাস যদি উপন্যাসের মত চিত্তাকর্ষক ভাষায় জানিতে চান, তবে ১ টাকা দিয়া বইখানি কিনুন।’
খ. স্বাধীনতার সপ্তসূর্য :
(সান-ইয়াত-সেন, জগলুল, ডি. ভেলেরা, লেনিন প্রভৃতির জীবনী)।
গ. বিপ্লবের পদধ্বনি :
(কার্ল মার্কস, রুসো, ম্যাটসিনি, বাকুনিন, টলস্টয়ের জীবনকথা ও উপদেশ)। সঙ্গে আছে একটি নতুন বইয়ের বিজ্ঞাপন :
‘নতুন বই Young Bengal’
বিজ্ঞাপনে বলা হয় : ‘ বারীন ঘোষ,উপেন বাঁড়ুয্যে, শৈলেন ঘোষ,মানবেন্দ্র রায়, সুভাষ বোস, নজরুল ইসলামের সচিত্র সংক্ষিপ্ত জীবনী ও কার্য্য প্রচেষ্টার বিবরণ। মূল্য ১ টাকা মাত্র, শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।এখনই নাম রেজিস্ট্রী করিয়া রাখুন।’
এইসব বিজ্ঞাপন থেকে ঐ সময়ের(১৯২৫) বঙ্গদেশের রাজনৈতিক প্রতিবেশ সম্বন্ধে একটা ধারণা মেলে। অসহযোগ আন্দোলন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতার লড়াই, বিপ্লবের অভিমুখ, মার্ক্সবাদের অঙ্কুরোদ্গম ইত্যাদি মিলিয়ে সমকালীন বঙ্গদেশের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে।
তৃতীয় পৃষ্ঠায়, ‘লাঙল’ শীর্ষক সম্পাদকীয়’র উপরে ব্যবহৃত হয়েছে : গোলাকৃতি এক ফ্রেমের মধ্যে, জোড়া বলদ নিয়ে , টোকা মাথায় একজন চাষীর জমি চাষের কাঠের ব্লক। তারই নীচে রয়েছে চণ্ডীদাসের মানবতাবাদের অবিস্মরণীয় মহার্ঘ বাণী :
‘শুনহ মানুষ ভাই ,
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।’
মানবতাবাদের স্বরূপ-সন্ধানে, মানুষে মানুষে এই সম্প্রীতির বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে ‘লাঙল’ পত্রিকা ।তিনের পৃষ্ঠায়, নজরুল ইসলামের অস্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় ‘লাঙল’-এর মধ্য দিয়ে, লাঙল পত্রিকার উদ্দেশ্য ও বিধেয় প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। লাঙলের উদ্দেশ্য রূপকাশ্রিত; (লেখাটিতে নজর কাড়ে হিন্দু- মিথোলোজির প্রাচুর্য ) : ‘ যেখানে দিন দুপুরে ফেরিওয়ালী মাথায় করে মাটি বিক্রী করে, সেই আজব শহর কলিকাতায় ‘লাঙল’ চালাইবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা ‘লাঙল’ নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই। ব্রহ্মপুত্র স্রোত হিমালয়ে আটকে গেলে,হরধর লাঙলের আঘাতে পাহাড় চিরে সেই স্রোতকে ধরায় নামিয়ে ছিলেন। সেই জল কত প্রান্তর শ্যামল ক’রে কত তৃষিত কণ্ঠের পিপাসা মিটিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ‘লাঙলবন্ধ’ আজ বাংলার তীর্থ । মহাত্মাগণের আন্দোলন আজ নেতাদের পাষাণ-পারি-পার্শ্বিকে আট্কে গেছে – তাই আজ আবার হলধরের ডাক পড়েছে।’
দেশের নিঃস্ব-দরিদ্র-মানুষের অবস্থা শোচনীয়: ‘নায়েব গোমস্তার অত্যাচারে প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মহাজনের হাতে জমির স্বত্ত্ব চ’লে যাচ্ছে। গৃহহীন ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ লোক সমাজের অভিশাপ নিয়ে শহরের দিকে ছুটছে ,কলকারখানায় কতক ঢুকে নিজেদের সর্বনাশ করছে — আর কতক নানা হীন উপায়ে জীবিকা নির্ব্বাহের চেষ্টা করছে। দেশে চুরি ডাকাতি ও বলাৎকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।’ যখন ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’ গঠিত হয় ; যখন ‘লাঙল’ আত্মপ্রকাশ করে, তখন বাংলার অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর। ‘শহরে বেকার বাঙালীর’ ভীড়। ‘নিরুপায় তাদের অবস্থা।’ জমিদারেরা ‘শহরে এসে বাস করে মদ-মাংস-মেয়েমানুষ-মোটর-মামলা এই পঞ্চ-মকারের সাধনায় নিযুক্ত আছেন।’ জিনিসপত্রের দাম বাড়-বাড়ন্ত । ‘জমিতে চাষীর স্বত্ত্ব নাই। যত্নের অভাবে ভূমির উৎপাদিকা শক্তি নষ্ট হয়েছে।’ স্বরাজের মাধ্যমেই আসতে পারে নিরন্ন মানুষের মুক্তি। এই বিষয়টি তাই জনগণকে নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। প্রসঙ্গটি এখানে বোঝানো হয়েছে মিথের উপমায় :
‘মথুরার লীলা ঢের দেখেছি – আমাদের দেবতা যিনি তাঁকে বৃন্দাবনের শ্যামল মাঠে ফিরিয়ে আনতে চলেছি , তিনি রাখাল-গণের সখা, তিনি গোধন চরাতে ভালবাসেন। তিনি বেণু বাজিয়ে সকলকে পাগল করেন। যদি সেই দেবতার আহ্বানে কেউ বাধা দেন, তবে আমাদের হলধর ঠাকুর তাকে রাখবেন না – লাঙলের আঘাতে তাকে মরতেই হবে।’ প্রাসঙ্গিকভাবে আরো বলা হয়েছে : ‘লাঙল চালিয়ে যিনি সীতাকে লাভ করেছিলেন, সেই জনক আমাদের গুরু। যিনি Producer(জনক) , তিনিই ঋষি।তিনিই সমাজের শ্রেষ্ঠ।’ এভাবেই লাঙলের ফালের উৎকর্ষ বিশ্লেষিত হয়েছে। সম্পাদকীয়’র একেবারে শেষাংশে – বর্ণাশ্রম শাসিত সমাজের আগ্ৰাসনে, সর্বশেষধাপের দরিদ্র-নিঃস্ব- নিরন্ন- বঞ্চিত-নিপীড়িত সর্বহারাদের হাতেই যে ভবিষ্যতে ‘লাঙল’ চালাবার ভার অর্পিত হবে, সেই স্বপ্নের কথাই পরিব্যক্ত হয়েছে : ‘ব্রাহ্মণ- পাদ্রীর রাজত্ব গিয়েছে।গুরু-পুরোহিত, খলিফা, পোপ, নির্ব্বংশ প্রায়। ক্ষাত্র সম্রাট-সাম্রাজ্য সব ধ্বসে পড়েছে। রাজা আছেন নামমাত্র। আমেরিকা ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব। এবার শূদ্রের পালা। এবার সমাজের প্রয়োজনে শূদ্র নয় –শূদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, ব্রাহ্মণ- অব্রাহ্মণ সমস্যা সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে।তাই আমরা লাঙলের জয়গান আরম্ভ করলাম। লাঙল নবযুগের নব দেবতা।’
এর মধ্য দিয়ে কৃষকশ্রেণির হাতে ক্ষমতা ন্যস্তের কথা বলা হয়েছে ; শ্রমিকের কথা এখানে নেই। কৃষক ও শ্রমিকের যৌথ সংগ্ৰামের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি শোষণহীন বঞ্চনাহীন সমাজব্যবস্থা।
চতুর্থ পৃষ্ঠার প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে রয়েছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কিছু চিন্তা ভাবনা। এখানেও বাংলার নিরন্ন চাষীদের মুক্তির কথা বলা হয়েছে: ‘ মুসলমান হউক ,শূদ্র হউক, চণ্ডাল হউক, উহারা প্রত্যেকেই সাক্ষাৎ নারায়ণ।’
পঞ্চম পৃষ্ঠা থেকে দশম পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুদ্রিত হয়েছে বিজ্ঞাপন অনুযায়ী, নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ নামের ,এগারোটি উপ-শিরোনামে বিভক্ত একটি দীর্ঘ কবিতা।
এরমধ্যে আছে : ১.‘সাম্যবাদী ; ২. ঈশ্বর; ৩.মানুষ ; ৪. পাপ ; ৫.চোর ডাকাত ;৬.বারাঙ্গনা ; ৭.মিথ্যাবাদী ; ৮.নারী ; ৯. রাজা-প্রজা ; ১০.সাম্য ; ১১.কুলি-মজুর। ‘ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতির শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’ শীর্ষক দলের গঠনতন্ত্রও লিখেছিলেন স্বয়ং নজরুল ইসলাম ; তা তাঁর স্বাক্ষরেই প্রচারিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়: ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজলাভই এই দলের উদ্দেশ্য।’ কোন্ পথে আসবে সেই স্বরাজ ? উপায় সম্বন্ধে বলা হয়েছে: ‘নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের সমবেত শক্তি প্রয়োগ উপরি-উক্ত উদ্দেশ্য সাধনের মুখ্য উপায় হইবে।’ কোন্ কর্মনীতি ও সংকল্পের অবতারণা করবে এই দল – সেই সম্পর্কে গঠনতন্ত্রে কতগুলো কর্মপদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। যথা :
১. ‘এই দল শ্রমিক ও কৃষকগণের স্বার্থের জন্য যুঝিবেক।’
২. ‘জাতীয় কার্য্যে নিযুক্ত অন্যান্য দলের সহিত এই দল যতটা সম্ভব সহযোগিতা করিবেন।’
৩. ‘শ্রমিক ও কৃষকগণের’ স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ‘যুঝিবেন’ , তাঁরাও ‘এই দলের প্রতিনিধি বলিয়া গণ্য হইবেন।’
দাবিগুলির মধ্য থেকে কয়েকটি বিশেষ দাবির উল্লেখ করা যেতে পারে :
১. ‘যতদিন না শ্রমিক ও কৃষকগণের অধিকার- সমূহ স্বীকার করিয়া শাসন-প্রণালী পরিবর্তিত না হয়, ততদিন টাকা মঞ্জুরি বাজেট না দেওয়া।’
২. ‘আমলা-তন্ত্র শাসন-প্রণালীর শক্তি ও প্রভাব করে এমন সমস্ত প্রস্তাবের বিরোধী হওয়া।’
৩. ‘জাতীয় জীবনের শক্তির বৃদ্ধির অনুকূল এবং সে কারণে আমলা-তন্ত্রের শক্তিবৃদ্ধির প্রতিকূল এমন সমস্ত প্রস্তাব আইনের প্রবর্ত্তক করা ও সমর্থন করা।’
৪. ব্যবস্থা পরিষদে নির্ব্বাচিত প্রতিনিধিগণের
সম্মিলিত সম্মতি বিনা গবর্মেন্টের অধীনে কোনও প্রতিনিধি কোনও চাকরী গ্ৰহণ করিতে পারিবেন না।’
তবে এইসঙ্গে দুটি চরম দাবিও জুড়ে দেওয়া হয়:
ক. ‘আধুনিক কলকারখানা,খনি, রেলওয়ে,টেলিগ্ৰাফ, ট্র্যামওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতৎ সংক্রান্ত কর্ম্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তি রূপে পরিচালিত হইবে।’
খ. ‘ভূমির চরম স্বত্ত্ব আত্ম-অভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্ত-শাসন-বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্ত্তিবে–
এই পল্লী-তন্ত্র ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’
সামগ্ৰিকভাবে কৃষক শ্রমিক এবং সকল শ্রেণির প্রজাদের জন্য সাধারণ দাবি দাওয়ার কথা বলা হলেও , শ্রমিক ও কৃষকগণের জন্য তাৎক্ষণিক দাবিসমূহ এই গঠনতন্ত্রে সূত্রাকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে , যার মধ্য দিয়ে নবগঠিত দলের কর্মসূচি এবং নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তাধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দাবিসমূহ নিম্নরূপ :
শ্রমিক
১. ‘জীবন-যাত্রার পক্ষে যথোপযুক্ত মজুরির একটা নিম্নতম হার আইনের দ্বারা বাঁধিয়া দেওয়া।’
২. ‘প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শ্রমিকের পক্ষে সপ্তাহে সাড়ে পাঁচদিন খাটুনি চরম বলিয়া আইন করা ;
নারী এবং অল্পবয়স্ক ছেলে-পিলের জন্য বিশেষ শর্ত্ত নির্ধারণ করা।’
৩. ‘শ্রমিকগণের আবাস, কাজের শর্ত্ত, চিকিৎসার বন্দোবস্ত প্রভৃতি বিষয়ে কতকগুলি দাবী মালিকগণকে আইন দ্বারা বাধ্য করিয়া পূরণ করানো ।’
৪. ‘অসুখ, বিসুখ, দুর্ঘটনা,বেকার অবস্থা এবং বৃদ্ধ অবস্থায় শ্রমিকগণকে রক্ষা করিবার জন্য আইন প্রণয়ন।’
৫. ‘সমস্ত বড় কলকারখানায় লাভের ভাগে শ্রমিকগণকে অধিকারী করা।’
৬. ‘মালিকগণের খরচায় শ্রমজীবীগণের বাধ্যতামূলক শিক্ষা।’
৭. ‘কলকারখানার নিকট হইতে বেশ্যালয়, নেশার দোকান উঠাইয়া দেওয়া।’
৮. ‘শ্রমিকগণের আর্থিক উন্নতির জন্য কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা।’
৯. ‘শ্রমিক-সংঘ-গুলিকে আইনত মানিয়া লওয়া এবং শ্রমিকদের দাবী পূরণের জন্য ধর্ম্মঘট করিবার অধিকার স্বীকার করা।’
ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিক আবাস, কাজের শর্ত, চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, অসুখ বিসুখ, দুর্ঘটনা, বেকার এবং বৃদ্ধাবস্থায় শ্রমিকদের জন্য আইনি সুরক্ষার বন্দোবস্ত, শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা, কো-অপারেটিভ ব্যবস্থার প্রচলন, কলকারখানায় লাভ্যাংশের ভাগ শ্রমিকদের মধ্যে বন্টন করা, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক-ধর্মঘটের দাবি অন্যতম ।
এবার উল্লেখ করছি, কৃষকের জন্য দাবিসমূহের তালিকা :
১ . ‘ভূমিকর সম্বন্ধে একটা উর্ধ্বতম হার বাঁধিয়া দেওয়া এবং বাকী খাজনার সুদ ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্কের হারের সহিত সমান নির্দ্ধারণ করা’ ;
২ . ক) ‘জমিতে কায়েমী স্বত্ত্ব’ ; খ) ‘উচ্ছেদ নিরোধ’ ; গ) ‘অন্যায় এবং বেআইনী বাজে আদায় বন্ধ’ ; ঘ) ‘স্বেচ্ছায় বিনা সেলামিতে হস্তান্তর করার অধিকার’; ঙ) ‘গাছ কাটা,কুয়ো খোঁড়া, পুকুর কাটা, পাকা বাড়ী করার বিনা সেলামিতে অধিকার।’
৩. ‘জল-করে মাছ ধরিবার নির্দ্ধারিত শর্ত্ত।’
৪. ‘মহাজনের সুদের চরম হার নির্দ্ধারণ।’
৫. ‘কো-অপারেটিভ কৃষি-ব্যাংক স্থাপনের দ্বারা কৃষককে ঋণদান এবং মহাজন ও লোভী ব্যবসাদারগণের হাত হইতে কৃষককে উদ্ধার।’
৬. ‘চাষের জন্য যন্ত্রপাতি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের মারফৎ কৃষকের নিকট বিক্রয় অথবা ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া। মূল্য অথবা ভাড়ার টাকা কিস্তীবন্দী হিসাবে অল্প করিয়া লওয়ার বন্দোবস্ত।’
৭. ‘পাটের চাষের কৃষকের উপযুক্ত লাভের বন্দোবস্ত।’
কৃষকদের জমির ঊর্ধ্ব কর -সীমা নির্ধারণ, জমিতে কায়েমী স্বত্ত্ব, উচ্ছেদ নিরোধ,সেলামি বন্ধ,জলকর নির্ধারণ,ব্যাঙ্কের সুদের সমহারে মহাজনী ও অন্যান্য সুদের হার নির্ধারণ, কো- অপারেটিভ ব্যাঙ্ক স্থাপন এবং ঋণ দানের ব্যবস্থা এবং সহজ কিস্তিতে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দাবি, ইত্যাদি রয়েছে এই দাবিসত্রে।
দাবিসমূহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বঙ্গীয় রাজনীতিতে সাম্যবাদী দর্শনের প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছায়ার ইঙ্গিত শুরু হয়েছে। শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থে এই নতুন দল তাদের কর্মসূচি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর।
এই নতুন দলে যোগ দেওয়ার জন্য, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে :
‘ নজরুল ইসলাম, ৩৭নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতা।’ ত্রয়োদশ পৃষ্ঠায় এসে শেষ হয়েছে গঠনতন্ত্র। গঠনতন্ত্রের (পৃ.১১) উপরে একটি কার্টুন রয়েছে, যেখানে একজন মোটাতাজা শক্তিশালী ধনীব্যক্তি একজন রোগা-পটকা শ্রমিককে হাতের মুঠোয় ধরে টিপে মারছে।
এরসঙ্গে রয়েছে চার পংক্তির একটি কবিতা:
‘ পেট-পোরা তার রাক্ষসী ক্ষুধা
ধনিক সে নির্ম্মম,
দীনের রক্ত নিঙাড়িয়া করে
উদর ভূধর -সম।’
এই পৃষ্ঠার বাকি অর্ধাংশে রয়েছে ‘খবরদারী’ শিরোনাম পর্যায়ে, সমকালীন বঙ্গের টুকরো সংবাদ।
চতুর্দশ পৃষ্ঠায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশিত, নৃপেন্দ্রচন্দ্র দত্ত লিখিত প্রবন্ধ : মনিব ও কর্ম্মচারী/বিদেশী কোম্পানীর নির্ম্মর ব্যবস্থা।’
পঞ্চদশ ও ষোড়শ পৃষ্ঠা বিজ্ঞাপনে ঠাসা। ১৫নং পৃষ্ঠায় আছে বহুবাজারের ‘মেসার্স ঘোষ দত্ত এণ্ড সন্স’-এর শীতবস্ত্রের বিজ্ঞাপন। ‘দেশবন্ধু হোমিওপ্যাথিক ফার্ম্মেসী’ ; কলেজ স্কোয়ারের ‘মোহনতোষ ব্রাদার্স ‘-এর ‘ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন’ বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। এছাড়া আছে, ডাকযোগে হোমিওপ্যাথী ডিগ্ৰির জন্য ‘ কলেজঅব ফিজিসিয়ান্স এণ্ড সার্জ্জন্স অব কলিকাতা’র এ্যাড। আপার সার্কুলার রোডের চাল বিক্রেতা, মহেন্দ্র ঘোষ-এর বিজ্ঞাপনে রয়েছে : ‘সস্তা দরে ধান্য ও চাউল’ কেনার হদিস । বিজ্ঞাপনের বক্তব্য থেকে জানা যায় : ১৯২৫সালে ‘অগ্ৰিমদাদনে প্রতিমণ ধানের দাম ৩ টাকা এবং
চাউল ৬ টাকা।’ আরেকটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়: লাঙল অফিসে রাত ৯টা পর্যন্ত বসেন এম.এল.ঘোষ – যিনি বিজ্ঞাপন দিয়ে জানাচ্ছেন : ‘ Wanted some live partners for a broker’s,1850 sure income on a sum of Rs.500/.’
১৬নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ‘লাঙল’ ও বইয়ের বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় : ‘লাঙল পত্রিকার বার্ষিক মূল্য ৩ টাকা ; ভিপি যোগে ৩ টাকা চার আনা। প্রতি সংখ্যা: এক আনা। ঠিকানা : লাঙলের কর্মক্ষেত্র, ৩৭নং হ্যারিসন রোড।’ রয়েছে ‘লাঙল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন ‘লাঙল বুক এজেন্সী’র বিজ্ঞাপন। ঠিকানা: ৩৭নং হ্যারিসন রোড। এখানে বলা হয়েছে : ‘ নতুন যুগের নবীন মন্ত্রের নবীন তন্ত্রের নব পুস্তকালয়। আমরা আমাদের লাঙল কেন্দ্র হইতে ‘লাঙল বুক এজেন্সী’ নাম দিয়া একটি পুস্তকালয়ও চালাইব।বর্ত্তমান যুগে যাঁহারা দেশে নব অভ্যুত্থানের বাণী বহন করিয়া আনিয়াছেন; দেশ,জাতি,রাষ্ট্র ও সমাজকে নূতন ছাঁচে গড়িয়া তুলিতেছেন – সেই সব নবীন শক্তিধরের জাগরণ-মন্ত্রে ঘরে ঘরে প্রাণের সাড়া জাগাইয়া তোলাই এই পুস্তকালয়ের শ্রেষ্ঠতম উদ্দেশ্য।….নজরুল ইসলামের সকল পুস্তক এখান হইতে পাওয়া যাইবে। যাঁহারা নজরুল ইসলামের পুস্তকের জন্য অন্য লাইব্রেরীতে অর্ডার দিয়া পান না, অর্ডার দিয়া এখান হইতে তাহা পাইতে পারেন। তাঁহার বাজেয়াপ্ত পুস্তক তিনখানা ছাড়া আর সব পুস্তকই ছাপা আছে। এই পুস্তকালয়ের যাহা লাভ হইবে, তাহার কতকাংশ দু্ঃস্থ সাহিত্যিকগণের সাহায্যের জন্য ব্যয়িত হইবে।’
এইসব ছাড়াও, এই বুক এজেন্সী থেকে ‘নবযুগের লেখকগণের সকল পুস্তক’ এবং ‘স্কুলপাঠ্য পুস্তকসমূহ’ও সরবরাহ করা হতো। নীচের দীর্ঘ বিজ্ঞাপনটিতে নজরুল ইসলামের পুস্তকসমূহের বিজ্ঞাপনই প্রাধান্য পেয়েছিল :
‘ কাজী নজরুল ইসলামের নূতন কবিতার বই
ক্রন্দন নীরতা ভারতমাতার ত্রিবর্ণ-রঞ্জিত অতুলনীয় প্রচ্ছদপট, ৺দেশবন্ধুর সর্ব্বাঙ্গসুন্দর ফটো ও কবির নিজের ফটোসহ’
‘চিত্তনামা’ ১ টাকা
পাঠক ইহারই মধ্যে অমর কবিতা ‘ ইন্দ্রপতন ’ ও ‘ সান্ত্বনা’ পাইবেন।অন্যপরিচয় অনাবশ্যক।’
‘পূবের হাওয়া’ ১টাকা চারআনা
(কবির সুন্দর ছবিসহ বাঁধাই)’
‘অগ্নিবীণা: ১টাকা চারআনা
(তৃতীয় সংস্করণ, সংস্কৃত,পরিবর্দ্ধিত এবং কবির বর্ত্তমান ফটোসহ)’
‘রিক্তের বেদন’ (গদ্য কাব্য)
১টাকা চারআনা’
‘ব্যথার দান’ (দ্বিতীয় সংস্করণ) ঐ
১টাকা চারআনা
(সৈনিকবেশী ফটোসহ)’
‘দোলনচাঁপা’ ১টাকা চারআনা
(যাহার পূজারিণী কবিতারাজ্যে চিরপূজ্য)
ইহা পাঠে পাঠক কবির নির্ভীকতার যথার্থ পরিচয় পাইবেন।’
বিজ্ঞাপন থেকে আরো জানা যায় যে, অচিরেই প্রকাশিত হচ্ছে কবির গ্ৰন্থত্রয় :
‘ঝিঙে ফুল’
‘বাঁধন-হারা’
‘ফণী মনসা’
সর্বশেষে লেখা প্রিন্টার্স লাই :
‘১৫নং নয়ানচাঁদ দত্ত স্ট্রীট – মেটকাফ প্রেসে মুদ্রিত এবং ৩৭নং হ্যারিসন রোড হইতে প্রকাশিত। মুদ্রাকর ও প্রকাশক: শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়।’
আর একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হয়েছে, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীটের, গুপ্ত ব্রাদার্সের পক্ষ থেকে, নজরুল-বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের
‘ নীল পাখী ’ নামের শিশুতোষ গ্ৰন্থ । মূল্য আট আনা।
নজরুল ইসলামের, ৪৮৬ পংক্তি বিশিষ্ট দীর্ঘ
‘সাম্যবাদী’ কবিতা (বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত) নিয়েই মূলত ‘লাঙল’এর এই প্রথম বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। এই প্রথম সংখ্যার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। সংখ্যাটির জনপ্রিয়তা এতোটাই তুঙ্গে উঠেছিল যে, পাঁচ হাজার কপি নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। অনেকেই কিনতে ব্যর্থ হওয়ায় সংখ্যাটির পুনর্মুদ্রণের দাবি ওঠে।
পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যার ‘খড়কুটো’ শিরোনামের টুকরো খবর থেকে এপ্রসঙ্গে জানা যায় : ‘ গতবার আমরা ৫ হাজার ‘লাঙল’ ছেপেছিলাম – কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কাগজ ফুরিয়ে যাওয়াতে কলিকাতায় অনেকে কাগজ পাননি এবং মফস্বলে একেবারেই কাগজ পাঠানো হয়নি। ঐ সংখ্যার প্রধান সম্পদ কবি নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ গ্ৰাহকগণের আগ্ৰহাতিশয্যে পুস্তিকাকারে বের করা হ’ল , দাম করা হয়েছে মাত্র দু’আনা ।’
পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর (১৯২৫), আর এর মাত্র ৯দিন পরেই অর্থাৎ ২৫ডিসেম্বর (১৯২৫) পুস্তিকাকারে সেটি মুদ্রণ করতে হয়। প্রকাশক :মৌলভী শামসুদ্দীন হুসেন, বেঙ্গল পাবলিশিং হোম।৫ নং নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা। ১৫ নং নয়ানচাঁদ স্ট্রীট, কলিকাতা; মেটকাফ প্রেসে শ্রী মণিভূষণ মুখার্জী কর্তৃক মুদ্রিত। পৃষ্ঠা: ৩২ , মূল্য: দুই আনা। ‘সাম্যবাদী’
কবিতাটি কবির ‘সর্ব্বহারা’ কাব্যগ্রন্থভুক্ত হয়। এই পুস্তকের সপ্তম কবিতা ‘সাম্যবাদী’ । প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন -১৩৩৩)। প্রকাশক : ব্রজবিহারী বর্মণ রায় , বর্ম্মণ পাবলিশিং হাউস, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকালে নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যে এবং রাজনৈতিক জীবনে যে মতাদর্শের প্রবক্তা রূপে খ্যাত হন, তার নাম: গণতান্ত্রিক সমাজবাদ বা ডেমোক্রেটিক সোশালিজম। তাঁর এই মতাদর্শ কর্ষণের চারণভূমি হয়ে ওঠে ‘লাঙল’ পত্রিকা ।
নজরুল রচিত, দলের ইশতেহারেই এই মতাদর্শের বিভিন্ন ‘উদ্দেশ্য’ , ‘সংকল্প’ ও ‘দাবী’র কথা বলা হয়েছে।
প্রথমা রায়মণ্ডল: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষকব
