সমকালীন মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সামাজিক অবক্ষয়

গুরুত্ব তাদেরকেই দেওয়া উচিত যারা আপনাকে গুরুত্ব দেয়, যারা আপনার উপস্থিতির মূল্যায়ন করতে জানে। আমাদের সময়, সান্নিধ্য ও সহমর্মিতা অত্যন্ত অমূল্য কিছু সম্পদ; আর যারা আত্মসচেতন, তারা অন্যের এই আবেগগুলোর প্রতিও সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকে।

পিতা-মাতা হিসেবে আমাদের সন্তানদের এই আত্মমর্যাদার শিক্ষা দেওয়া জরুরি। সন্তানরা যদি শুরু থেকেই এই তফাতটুকু বুঝতে শেখে, তবে তারা এমন কোনো অকৃতজ্ঞ মানুষ বা সম্পর্কের পেছনে ছুটে নিজেদের জীবনের মূল্যবান সময় ও মানসিক শক্তি অপচয় করবে না, যা তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয় না; যারা তাদের সীমাবদ্ধতা কিংবা স্বপ্নগুলোকে সমান গুরুত্ব দেয় না।

অথচ, এই সহজ জীবনবোধের অভাবেই আমাদের চারপাশের বাস্তব চিত্রটি দিন দিন কী ভীষণ নির্মম হয়ে উঠছে! গত এক সপ্তাহ ধরে কতগুলো গলিত, অর্ধগলিত, ঝুলন্ত কিংবা পড়ে থাকা লাশের খবর আমাদের দেখতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত মধ্যবয়সী মানুষ, মেধাবী ছাত্রী বা শিক্ষিকা, সম্ভাবনাময় তরুণ, কিংবা সামাজিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় মানুষ—কারও জীবনগল্প নিজের ফ্ল্যাটে, কারও ভিনদেশের হোটেল রুমে, আবার কারও বা নিজের শহরেরই কোনো এক বদ্ধ ঘরে এসে এভাবে করুণভাবে থমকে যাবে, তা ভাবা যায় না।

সাফল্যের সুসময়ে নিশ্চয়ই কত মানুষের কোলাহল ছিল এদের চারপাশে! কিন্তু জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও চরম হতাশার মুহূর্তে তারা কাউকেই পাশে পায়নি, কেউ একটু খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। আপাতদৃষ্টিতে সফল এই মানুষগুলোর একাকী ও করুণ পরিণতি প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক চাকচিক্য ভেতরের চরম মানসিক শূন্যতাকে ঢাকতে পারছে না।

সমাজতাত্ত্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অনুঘটক স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

১. মানসিক সংযোগের অভাব এবং ‘শূন্যতার বৃত্ত’

আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। নিজেদের হতাশা, নিরাশা কিংবা উচ্চাশার সঙ্গে বাস্তব জীবনের অমিলের গল্পগুলো খোলামেলাভাবে বলার মতো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের অভাব আজ প্রকট। মানুষ যখন তার ভেতরের ঝড় অন্য কারও সাথে ভাগ করে নিতে পারে না, তখন এক চরম ‘এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস’ বা অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়, যা অনেক সময় আত্মহননের এমনকি হত‍্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করে; যে কারণে ফ্লোরিডার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ডক্টরেট ছাত্র লিমন আর লামিসাকে জীবন দিতে হয়েছে।

২. নতুন প্রজন্মের ‘বিশ্বাসের সংকট’ এবং অন্তর্মুখিতা (Introversion)

নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের গভীর ‘ট্রাস্ট ইস্যু’ বা মানুষকে বিশ্বাস করতে না পারার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল জগতের এই যুগে মানুষ যান্ত্রিকভাবে যুক্ত, কিন্তু মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। অনেকেই তীব্র অন্তর্মুখিতার কারণে নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকে কিংবা নিজেকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপন করে যা সে আসলে নয়। ফলে, চরম মানসিক সংকটের মুহূর্তেও তারা কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারে না। 

৩. পরিচয় এবং সেক্সুয়ালিটি নিয়ে সামাজিক ট্যাবু

আমাদের সমাজে এখনও নিজের জেন্ডার আইডেন্টিটি বা সেক্সুয়ালিটি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ তৈরি হয়নি। নিজের ভেতরের এই সহজাত সত্যটিকে প্রকাশ করতে না পারার গ্লানি, সমাজ বা পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় মানুষকে চরম বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয়। এই লুকোছাপা এবং ভেতরের দ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে একজন মানুষকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে ফেলে; শেষমেশ মানুষ বেছে নেয় নিজেকে মেরে ফেলার পথ। আমরা দেখেছি, মৃত্যুর পরও “সেক্সুয়ালিটি” নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত সন্তানের অপমৃত্যু” নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে জানাজায় আসা লোকজনকে সেই সন্তানের পিতা-মাতা; যা তারা বেঁচে থাকতে মেনে নিতে পারেনি, মৃত্যুতেও কি পেরেছে! ঠিক একই কারণে মৃত ছেলেটির নাম প্রকাশ করতে পারিনি। 

৪. অসুখী বৈবাহিক সম্পর্ক ও সামাজিক চাপ

সামাজিক বা পারিবারিক সম্মানের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর একটি মৃত বা অসুখী বৈবাহিক সম্পর্ককে টেনে নেওয়ার প্রবণতাও এই ট্র্যাজেডিগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ। বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বের হতে না পেরে মানুষ ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক কলহ এবং অসুখী দাম্পত্য জীবন মানুষকে চরম মানসিক অবসাদের দিকে নিয়ে যায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় আত্মহত্যা, অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। যার জ্বলন্ত প্রমাণ মিলল অস্ট্রেলিয়ার পার্থে, এক বাবার ঘটানো মর্মান্তিক তিন (স্ত্রীসহ দুই অবুঝ শিশু) হত্যাকাণ্ডে।

৫. সুসময়ের কোলাহল বনাম অসময়ের একাকীত্ব

জীবনের গ্রাফটা সবসময় সরলরেখায় চলে না; তা ওপরে ওঠে আবার এক সময়ে নেমে আসার জন্যই। সাফল্যের চূড়ায় বা সুসময়ে চারপাশে মানুষের অভাব হয় না, কিন্তু জীবনের সেই পড়ন্ত সময়েই চেনা যায় আসল মানুষ আর আত্মার বন্ধুদের। যখন এই পড়ন্ত সময়ে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করে, তখন সেই মানসিক শূন্যতা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজের শ্বশুরের লাইভে এসে নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাটি খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। সন্তান বেড়ে ওঠার সময়ে তাকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে, সে বড় হয়ে বাবা-মাকে সময় দেবে—এমনটা আশা করা নিতান্তই দুরাশা মাত্র! সন্তান জন্মের পর তাকে ফেলে রেখে তালাক দিয়ে অন্য সংসার শুরু করলে, সেই সন্তান যে তীব্র সামাজিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তা থেকে তার মনে সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমাজে আত্মহত্যার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলার পেছনে পারিবারিক বন্ধনের এই আলগা হয়ে যাওয়া এবং শৈশবের অবহেলা এক মস্ত বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

৬. প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অভিভাবকত্বের চরম ব্যর্থতা

আজকের সমাজে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের হাতেও স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে, যার মাধ্যমে খুব সহজেই অবাধ প্রবেশ ঘটছে পর্নোগ্রাফির নীল দুনিয়ায়। পাশাপাশি সহজলভ্য রসদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে সর্বনাশা মাদক। সন্তান বিপথগামী হচ্ছে জেনেও অনেক পরিবার আজ রহস্যজনকভাবে নীরব। সন্তানের গতিবিধি, মেলামেশা কিংবা তার অর্থব্যয়ের উৎস কোথায়—এসবের ন্যূনতম খোঁজ না রেখে, একসময় কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে ‘ত্যাজ্য সন্তান’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন পিতা-মাতা। অথচ, পরিবার ও সমাজের এই উদাসীনতায় অবাধ্য পশুর মতো বেড়ে ওঠা এমন কিছু মানুষের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হলো নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে! এখানে ধর্ষক সোহেল রানার বাবা-মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। সন্তানকে কেবল পৃথিবীতে জন্ম দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; তাকে একজন সুস্থ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়বদ্ধতাও পরিবারের।

আমাদের মূল শিক্ষণীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা:

অভিভাবক হিসেবে আমাদের সন্তানদের প্রথম থেকেই এই মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা দিতে হবে যে—ব্যর্থতা বা পতন জীবনের শেষ নয়। নিজের সময় ও সহমর্মিতা কেবল তাদের জন্যই তুলে রাখা উচিত যারা এর সঠিক মূল্য বোঝে। পরিবারকে হতে হবে এমন একটি ‘সেফ… স্পেস’ (Safe Space) বা নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে সন্তান তার যেকোনো জটিলতা—তা হোক হতাশা, সেক্সুয়ালিটি কিংবা অসুখী সম্পর্ক—সবকিছু যেন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর (Judged) ভয় ছাড়া দ্বিধাহীনভাবে শেয়ার করতে পারে।

আগামী প্রজন্মকে সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বা যুক্তির বেড়াজালে আটকে রাখলে চলবে না; বরং তাদের জন্য আমাদের নিজেদের প্রথমে হতে হবে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়াহীন (Non-reactive), বিচক্ষণ এবং মানবিক।

শাহনাজ রহমান
কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক, ওয়েস্ট চেস্টার, নিউ ইয়র্ক

আরও পড়ুন