গ্রামের নাম গোপালপুর

আমার গ্রামের নাম গোপালপুর। এই গ্রামেই আমি জন্মেছি সত্তরের দশকে।
গোপালপুর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার আড়াই মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি বৃহৎ গ্রাম। এই গ্রামটি মেঘনা, যমনাই এবং ভাটা নদীর তীরে অবস্থিত। গ্রামের মাঝে এঁকেবেকে বেশ কয়েকটি খালও ছিল। প্রধান গ্রাম থেকে, উত্তরে তিনটি পাড়া যথাক্রমে সাদেকপুর, আয়তলা এবং কান্দি। এই এলাকাগুলোও অনেকটা গ্রামের মতো। সুন্দর, সবুজ, অবিচ্ছিন্ন শ্যামল-ছায়াযুক্ত গ্রামটি এক কথায় দুর্দান্ত। স্বর্গীয় এই গ্রামটি যেন বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করে। এই গ্রামের সৌন্দর্য বর্ণনা করে কবি এ কে সরকার শাওন শিকড়-শিখর কাব্যগ্রন্থের শিকড়-শিখর কবিতায় লিখেছেন,

‘সমতটের রূপসী তন্বী
গোপালপুর তার নাম!
সারি সারি সুন্দর বাড়ি
শত গুণি মানীর ধাম!’

এই গ্রামের মধ্যমণি হিসাবে একটি বিশাল বাজার রয়েছে। এই বাজারের একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে নিরানব্বই শতাংশ ক্রেতা ও বিক্রেতা এই গ্রামের বাসিন্দা। স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গ্রামে শনিবার এবং মঙ্গলবার হাট বসে। গ্রামের চারপাশে চারটি বড় আকর্ষণীয় চক জমি রয়েছে। এই শস্যভূমিগুলো দিগন্তবিস্তৃত; ঋতু অনুসারে রঙ পরিবর্তন করে। কখনো ধূসর, কখনো সবুজ, কখনো হলুদ এবং কখনো সোনালি।

ছেলেরা বিকেলে গ্রামের মাঠে খেলাধূলা করে। প্রবীণরা সবুজ ঘাসের কার্পেটে বসে তাদের খেলা উপভোগ করেন। সুন্দর মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সরস আড্ডা জমে। অবশ্য আড্ডা প্রতিটি চায়ের দোকানেও জমে। কিন্তু মাঠে আড্ডার কথোপকথন উচ্চমানের। চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাবান শিক্ষার্থী এবং স্কুল শিক্ষকগণ এই আড্ডার প্রধান অংশগ্রহণকারী। সেখানে সমসাময়িক দেশের খবর, রাজনীতি, ভারত, বিশ্ব সংবাদ, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক খবর নিয়েও আলোচনা হয়। তর্কও হবে তবে তা শালীনতা বজায় রেখে।

আমার ছাত্রজীবনে (১৯৭৫-১৯৯০) দেখেছি বর্ষাকালে গ্রামের সমস্ত রাস্তা জলে ডুবে যেতে। এক একটি বাড়ি যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। প্রায় সবার বাড়িতেই ঘাট থাকত। তাতে বাঁধা থাকত নানা আকারের নৌকা। সকালের পালতোলা গয়না নৌকায় করে নবীনগর বা দূরের কোনো গ্রামে যাওয়ার মজাটাই ছিল আলাদা। আমরা কুড়ি থেকে পঁচিশজন ছেলের একটি দল একটি চুক্তিভিত্তিক নৌকা ভাড়া করে আড়াই মাইল দূরে নবীনগরে পড়াশোনা করতে যেতাম। কেউ কেউ হাইস্কুল কেউবা বা কলেজে পড়ত। এই দলটি বিভিন্ন খেলাধুলায় লিপ্ত হত যখন মাঠ থেকে বর্ষার জল নেমে যেত। শীতকালে নাটক ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠান অনুশীলন করা হত প্রতি বছর। এই গ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চমৎকার।

এখন সব খালগুলো মৃতপ্রায়। সবুজের বুক চিরে চারদিকে ছড়িয়ে আছে চকচকে রাস্তা। সবুজের সমারোহ থেকে কিছুটা সবুজের ঘাটতি পড়েছে। সংগত কারণেই কিছুটা সৌন্দর্যও হারিয়েছে।

মেঘনা ও যমনাই নদী গ্রামের পশ্চিম দিকে প্রবাহিত। গ্রামের উত্তরে ভাটা নদী এবং তারও উত্তরে গ্রেট গোপালপুর বিল রয়েছে। বর্ষাকালে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে জলাভূমির সৌন্দর্য দেখতে। তারা মুগ্ধ হয়ে কাজল কালো টলটলে জলে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। শাপলা কুড়ায়। কলমি তোলে। এই জলাভূমির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছি-

সৌন্দর্যে টুইটুম্বুর রূপে ভরপুর
নান্দনিক ছোঁয়া সর্বত্র নির্বিশেষ;
ছবির মত দেশ প্রিয় স্বদেশ
গোপালপুর যেন খন্ডিত বংলাদেশ!

আরও পড়ুন