ইব্রাহীম সাকীর কবিতাগুচ্ছ

মৃত্যুর বাজারদর
এখানে পাওয়া যাইতেছে মৃত্যুর বাজারদর। এই শহরে
হয় মৃত্যুরও দরদাম। হেডলাইনে আসলে ঠিকঠাক দাম
পাওয়া যায়। প্রেমিকের লাশের মূল্য খবরের কাগজে
উঠে না বলে অর্ধেকের কম। রাজপথে গুলি—খাওয়া
কিশোরের মৃত্যু চলে যায় স্লোগানে, পতাকায়, মিছিলে,
দাম দেয় রাজনীতি। হাসপাতালের করিডরে—থাকা
শিশুর মৃত্যুর বর্তমান বাজারদর বকেয়া বিল। অচেনা
গলিতে যে লাশটা পড়ে আছে এর কোন বাজারদর নাই,
কাফনই মূলত এখন এই বেওয়ারিশ মৃত্যুর বাজারদর।
মাটির কফিন
আমি মরে গেলে আমার লাশটা পৃথিবীকে দিয়ে দিয়ো।
আমার হাড়গোড় দিয়ো গাছের ডালপালাকে,
মাংস দিয়ো মাটিকে,
আর রক্ত? রক্ত দিয়ো নদীকে।
আমার হৃৎপিণ্ড দিয়ে বানিয়ো আরেকটি
প্রেমের তাজমহল।
মস্তিষ্ক সংরক্ষণে রেখো পৃথিবীর প্রাচীন
জাদুঘর হার্মিটেজে।
আমি মরে গেলে আমার দেহটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়ো।
শেষে পৃথিবীকে বন্দি করো মাটির কফিনে,
আর,কফিনে গায়ে লিখে দিয়ো;’আমি প্রেমিক ছিলাম।
দলচ্যুত জল
সেইবার গ্রামে—
যখন বন্যার জল হজম করল তল্লাট,
ডুইবা গেল হামাগুড়ি দেওয়া আঙিনা,
খড়ের চালা ঘর, বাঁশঝাড়ের প্রাচীন কবর।
ভাইসা গেল গাই গরুর বাছুর,
হাটবার থেইকা কেনা স্যান্ডেল জোড়া।
শহুরে মেট্রোপলিটনে—
এই ভরা বর্ষায় তুমি বৃষ্টি চেয়ো না, গুলরুখ।
কেননা, তোমার জানালায় বৃষ্টির ছটা মানে—
জল উঠে যাওয়া কারও কারও হৃদয়ের চৌকাঠে।
দলচ্যুত জলেরা বোঝে না অশ্রুর কদর,
তবুও আমাদের চোখে
অগণিত বৃষ্টি জমে আছে।
গৃহপালিত পায়রা
একজনম ঘুড়ির মতো কইরা কাটাইয়া দিলাম—
উড়লাম ঠিকই, কিন্তু আছিলাম গেরস্তের পায়রা।
নাটাই নাড়ল আরেকজন—
সে আইল দানার লোভে, আমি গেলাম সুতার টানে…
যৌবন আমার খরচ হইয়া গেল না-পাওয়ারে
চাইতে চাইতে…
চাইছিলাম শুধু—
কানসাটের আমের আচারে এট্টু মুখ ভিজানো,
তালপাতার বাতাসে ঘুমানো,
আর ঘোমটা টাইনা পাতে ভাত তুইলা দেওনের মমতা…
কিন্তু কী দিলা তুমি?
আমার মতো কইরা না—
গেরস্তের বাড়ির গতর খাটা কামলার মতো দিলা!
হায়াত আমার এমনেই কাইটা গেল…
আহা আফসোসও নাই,
শুধু মউতের আগে চাই একটুখানি—
তোমার গন্ধ লাগা অঞ্চলে
খড়কুটোর মতো জড়ায়া ধরবার!
