রোকেয়া ইসলামের কবিতাগুচ্ছ

রেল লাইনে বিকেল

কালীগঞ্জ রেললাইনে দাঁড়িয়ে আছে
আস্ত এক বিকেল
উল্টোমুখী ট্রেন ঝিক ঝিক শব্দে
চলে যায় ভ্রুক্ষেপহীন
রোদেলা দুপুরের টিকেট কাটা ছিল অনলাইনে
যাত্রার সময় হেরফের হয়নি।
গুছিয়ে নিয়েছে যাপনের যাবতীয়
কিছু কি ফেলে গেল
কিছু কি রইল বাকি?

যা কিছু রইল পড়ে।
ফিরে পাবার সাধ্য নেই
বিব্রত বিকেল থমকে দাঁড়ায়।
ট্রেনের বগিতে ফিরে গেছে
ঝাঁঝালো দুপুর তার নিজস্ব নিয়মে
একাকী বিকেল কী করবে এখন

গন্তব্যর ঘর যে অস্পষ্ট
বিকেল কী নিশ্চিত তার ট্রেন আসবে
সঠিক সময়ে।
অনলাইনে কাটা টিকেট রয়েছে সযতনে।
অগ্রহায়ণের বিকেল আর কতদূর যাবে?

বসন্ত শুধু আমারই

কোথাও নেই কেউ, ছিল কি কখনো?
নির্জন চরাচরে আমি একাকী
নিঃসঙ্গ রেল লাইনে দীর্ঘশ্বাস
কেউ কী ডাকে, কেন ডাকে
এই অগ্নি স্রোতে?
জ্বলুক আগুন এই ভর বসন্তে
ফুলে পল্লবে গান লাগুক প্রাণে
মাতাল বাতাসে উড়ুক ঝরাপাতা
নবপল্লবে আঁকুক সুখ আগামী
বর্ণিল দিনে উদ্বেলিত প্রেমটুকু ছেঁকে
রাতের বিশ্বস্ত হাতে রাখে প্রথম সূর্যের হাত।
ভেসে যাই তবুও ভেসে যাই
এই প্রবল অগ্নিস্রোতে,
বুকের ভেতর প্রখর চৈত্র দহন
আসবে কি জোছনার প্লাবন।
এই বসন্তে একবার বলতে চাই,
বসন্ত শুধু আমারই

শরতের দিনযাপন

ভাদ্রের ভর দুপুরটা ঠিক ভাদ্রের নয়
কখনও বর্ষার জল ঝরানো প্যাচপ্যচ সময়

কখনো মেঘ ফুঁড়ে ঝাঁঝালো রোদের দিন
আকাশটাকে টেনে নেয় মহা বাদল
ছাড় দেয় না সদ্য শরত ছিনিয়ে এনে
ছড়িয়ে দেয় নীল বরণে শিমুল তুলো
নগরে কাশবন কোথায় ছড়ালো মায়া
আফতাবনগর না দিয়াবাড়ি
নাকি বালুনদীর পাড়।
তুরাগ পাড়েও কি আছে ছিটে ছিটে কাশবন।
শরত বা কাশফুল প্রেমী না হলেও কাশবনে
ছবি তো লাগবেই নাগরিকদের।
নীল শাড়ি সাদা ব্লাউজ নীল পাঞ্জাবি
আউটলেটে মূল্যহ্রাস বা বাহারি নকশার
প্রদর্শনী টেনে নেয় দৃষ্টি।
আমিই বা বাদ যাব কেন,
খুঁজি কোথায় ফুটেছে গন্ধহীন অপরুপ কাশ
শাড়িও আছে আনকোড়া।
তখ্খুনি কাচের জানায় এসে দাঁড়ায়
অনন্য অসাধারণ এক নাগরিক সন্ধ্যা
না আছে মেঘ না বর্ষা।
শুধু শরতের ঝকঝকে আকাশে এক নিবিড় সন্ধ্যা,
অপরুপ সন্ধ্যা জানায় কাশবন ছাড়াও
আকাশেও থাকে বর্ণিল শরতের কিছু কথা
বাতাসও বয়ে আনে,
অরুণ আলোয় শিউলি ফোটা ভোর
পলি ফেলা উর্বর মাটির কোমল পরশে
সবুজ ধানের ক্ষেতে ফড়িংয়ের নাচন
থাকে বহুরুপের আহবান….

শরতের গল্প অন্য শরতে

অন্যমনস্ক বিস্মৃত প্রায় শরতের পুনরাবৃত্তি হয়
ধুলো ঝেড়ে যত্ন করে ফিরে আসে অচেনা কিশোরী
যখন নিরালা একা ও আমি শিউলি ঝরা ভোরে
ভেবে নেই -বয়স এক সংখ্যা মাত্র
ভেতরের সব প্রেম জড় করি সারাটা দুপুর জুড়ে…

হাঁটাছি সব চেনা পথ হারিয়ে একাকি
ঐ দূরে সমুদ্রের মতো কাশবন
শ্বেত সখ্য ফুলের সাথে বাতাসের মাখামাখি
যেন কত বছরের ভালবাসাবাসির ঘর সংসার ; যাপন….
হাঁটছি. নিরেট প্রেমটুকু সম্বল
সবুজ বিকেল ছুঁয়ে ফেলে ধুসর সন্ধ্যা
সমুদ্রের বুকে আলবাট্রসের ছায়া নেই
দূরের কাশবন কাছ এলে বড্ড ফাঁকা
ম্লান হয়ে চেনা পোট্রের্ট ম্লান এই লোটাকম্বল

উত্তরা পেরিয়ে মিরপুর ছাড়িয়ে দিয়াবাড়ির আমন্ত্রণে
পুরোটা শরত জুড়ে দুঃসহ প্রতীক্ষায় ছিলাম
আসোনি
তোমার না আসা শরত মুখ লুকিয়েছে অন্য শরতে
বুঝতেই পারিনি ভালোবাসনি

নন্দনালোকে সে এক অসমাপ্ত অপেক্ষা
তোমার আসার কথা ছিল বিকেলে আকাশের এক মুঠো নীল শার্টে
আমার খোঁপায় সাদা মেঘ রঙা রোদ্দুরের ফুল
আমাদের সে টার্ম পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক
ভুলে যাওয়া ডাক নীলা
সে পথ হারিয়ে বহুদূর, সিলগালা

অতঃপর
খুলে দেয়া ঈশ্বরের দ্বার ছুঁয়ে নেমে আসে অরফিয়াস।
না আমার স্বপ্ন দেখা মিথ্যে আমার ভাঙা ঘর।
অরফিয়াস সত্য অঙ্গিকারের বাহনে তুলে নেয় প্রেম হারানো আমাকে।

বসন্তের অভিমানী গাতক

বসন্তের মধ্য দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলে
ঠিক তখুনি বারবাড়ির গাছের নিচে
এলো এক অবিনাশী গাতক,
গলায় অনিঃশেষ সুর, হাতে প্রেমিক বাঁশি
তখন ভর বসন্ত, কুহু রবে কোকিল
প্রজাপতি উড়ে চলে ফুলে ফুলে
বাতাসে ফুলেল সুবাস
ঘর গেরস্তালি ছানা পোনার দানাপানি
স্বামীর নিত্য আহার্য পদে পদে সাজাই
গান আমাকে উতালা করে না
সুরও বিভোর করে না অবুঝ সবুজে

হঠাৎ নীল বাতাস কি কথা বলে মনে
কার সুর তোলে শুদ্ধ পূরবীতে
কার বাঁশিতে ঝাঁপ দিতে আকুল হৃদয়
আনচান করে

কে সে গতকাল না আগামী
কাকে খুঁজি এই বহমান নিরেট সময়ে।
কাজ শেষে একটু অবসরে
নিরালায় দাঁড়াই দখিনের জানালায়
সুরহারা ছিন্ন বাঁশি পড়ে আছে ঝরাপাতায়

তুমি তবে এলে এই বসন্তে
আমি তখনও দাঁড়িয়ে জৈষ্ঠ্যের চৌচির চরাচরে।

আরও পড়ুন