ছোট প্রাণে ছোট ব্যথা: সরল কথা

ব্যথার অনেক রূপ। ব্যথার মালিক না বললে ব্যথা দেখা যায় না । মনের ব্যথা দেখা যায় না কারণ ক্ষত দেখা যায় না। শরীরের ব্যথাও দেখা যায় না ক্ষতচিহ্ন না দেখা গেলে, না দেখালে বা না বললে। শরীরের ক্ষতের ব্যথার মলম আছে। ট্যানজিবল মলম। সেই মলম ক্ষতস্থানে দিয়ে ব্যথা কমানো যায়। মনের ক্ষত যেমন দৃশ্যমান নয় তেমন মলমও দৃশ্যমান নয়। তাই মনের ব্যথা প্রশমনের পন্থা ভিন্ন। একেক জনের জন্য একেক রকম। খুব জরুরি নয় যে প্রত্যেকটি মানুষের একজন করে থেরাপিস্ট থাকবে। অথচ কোনো মানুষই ব্যথার ঊর্ধ্বে নয়।
অসুখবিসুখ হলে এক দৌড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। মনের অসুখ হলেও তেমন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় বইকি। তবে যথাযথ হেল্থ ইনস্যুরেন্স না থাকলে কিংবা রেফারেল না থাকলে থেরাপিস্টের খরচ নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। মনে ব্যথায় তীব্র কাতর লোকের আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলে পারিবারিক ডাক্তার জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা করে দেয়। রেফারেন্স ছাড়া এই দেশে কোনোকিছু সহজে জোগাড় হয় না। দেশীয় স্টাইলে “অমুক মন্ত্রী আমার মামু, তমুক সেক্রেটারি আমার চাচু”—এই রকম পন্থায় কাজ হয় না; কাগজে লেখা প্রমাণিত দলিল লাগে।
যাহোক, ব্যথার কথায় আসি। সব মানসিক ব্যথার মলম হয় না। যারা থেরাপিস্ট এফোর্ড করতে সমর্থ নয় তারা কী করে? তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা অবশ্যই আছে। স্কুলের টিনএজার বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সার্বক্ষণিক কাউন্সেলিঙের ব্যবস্থা আছে। এই বিষয়টি স্কুল ডিস্ট্রিক্টের আওতাধীন এবং ফান্ডেড। এখানকার শ্বেতাঙ্গ বা কৃষ্ণাঙ্গ সকল বয়সি নাগরিকের কিংবা বয়স্কদেরও থাকে নানান রকম সাপোর্টিং গ্রুপ। এটিকে সামাজিক গ্রুপ বললে ভুল হবে না।
প্রতি রবিবার ধর্মপ্রেমী খ্রিস্টানরা চার্চে যায়। তাদের জন্য থাকে চার্চগ্রুপ। নিয়মিত চার্চে যায় এমন কিছু লোক একত্রিত হয়ে একে অপরের দুঃসময়ে সাপোর্ট করে। ব্যথার সময় পাশে দাঁড়ায়। নিজেদের ব্যস্ততম সময়ে শিডিউল করে একেকজন পাশে থাকে। কাউন্সেলিং পরিষেবা বিনামূল্যে চার্চের বন্ধুরাও দেয়। হিন্দু মুসলিম প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যারা নিয়মিত প্রার্থনার জন্য যায় তাদের এরকম সামাজিক সাপোর্টের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
ইন্ট্রোভার্ট চরিত্রের লোক যারা নিজেদের ব্যথার কথা বলতে জানে না বা অথবা সময় পায় না তারা অনলাইনে বিভিন্ন রিসোর্স খুঁজে নেয়। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে বহু অ্যাপ্লিকেশন এবং ফোরাম রয়েছে, যারা চ্যালেঞ্জিং সময়গুলো মোকাবিলার কৌশল শেখায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে হটলাইনে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে। সংকটের সময়ে তাৎক্ষণিক সহায়তা এবং রেফারেল সরবরাহ করতে পারে। সাপোর্টিং গ্রুপে নিজের ব্যথার অনুভূতি জানানো বা ব্যথা ভাগ করে নিলে গ্রুপের অন্যদের জীবনগল্প অভিজ্ঞতা প্রদান করতে পারে। নিজের আবেগকে গুরুত্ব দিতে শেখায় বা সঠিক পথে এগিয়ে নিতে শেখায়। একই রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে এমন লোকের মধ্যে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে মানুষের দ্বিধা থাকে না কারণ সমমনারা একসঙ্গে একটি নন-জাজমেন্টাল আবহ তৈরি করে।
সেলফ হেল্প বা স্ব-সহায়ক হরেক রকম বই এবং উপকরণও আজকাল বাজারে পাওয়া যায় যা মানসিক স্বাস্থ্য পরিচালনার জন্য যথেষ্ট উপযোগী কৌশলের কথা শেখায়। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট উদ্বেগ থাকলে নিজের এলাকার জিপকোড ধরে খুঁজলে উপরে উল্লেখিত সাহায্যগুলো কিংবা কোনো না কোনো সমাধান পাওয়া যায়।
স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক লোকদের কাছে ব্যথা দূর করার উপায় হলো ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা। এই দলের লোক প্রায়শই তাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং অনুশীলনকে একীভূত করে নিজেদের আবেগ এবং মানসিক ব্যথা পরিচালনা করে। আধ্যাত্মিকরা মানসিক ব্যথা পরিচালনা করে তাদের ধারণা অনুযায়ী হায়ার পাওয়ারের (higher power) সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে; এই উচ্চ শক্তি বা ঐশ্বরিক সংযোগে তারা সান্ত্বনা এবং শক্তি খুঁজে পান। অনেক সময়ই এরা ধ্যান বা একান্তে প্রার্থনার মাধ্যমে নিজের আবেগ ও মানসিক চাপ রোধ করে। মানসিক অশান্তি হলে স্বপ্রতিভ লোক ব্যথার কারণগুলো খুঁজে নেয়। বুঝতে চায় জীবনের অর্থ এবং উদ্দেশ্য। একই রকম চিন্তাধারার ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের ব্যথাটুকু ভাগ করে নেয় এবং সমর্থন খুঁজে নেয় যারা তার ব্যথার গুরুত্ব দেয়। অতি সামাজিক বন্ধুবৎসলরা ব্যথা ভাগ করে নিতে জানে এমন বন্ধুদের সান্নিধ্যে তার ব্যথা কমিয়ে নেয়।
তবু কিছু কিছু ব্যথা থাকে মানুষ আজীবন স্বেচ্ছায় পোষে। ভুলতে চায় না। কারণ সেই ব্যথা তাকে সামনের পথ চলতে উদ্দীপ্ত করে। কিছু ব্যথা থাকে যা মানুষ ভুলতেই পারে না। কারণ জানে না, কী করে ভুলতে হয়। প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট, মনের মানুষ হারানোর বা সে পাশে না থাকার কষ্ট, ঘনিষ্ঠজনকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা, পিতৃ/মাতৃ, স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান অথবা দীর্ঘদিনের পোষা পশুপাখী বিয়োগের কষ্ট মানুষ বহুদিন-মাস-বছর চেষ্টা করেও ভুলতে পারে না। হারিয়ে ফেলা জিনিসপত্রের মতো প্রিয় মানুষের রিপ্লেসমেন্ট হয় না জেনেও দুঃখ জিইয়ে রাখে। নিজেকে একা করে ফেলে। এমনও দেখেছি, কেউ কেউ এক জীবন পার করে ফেলে, ব্যথার কথা মনেও করে না; ব্যস্ততম জীবনে অভ্যস্ত করে নেয় নিজেকে। বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেলে ব্যথাগুলো বিলীন হয়ে যায়।
অনেক সময় দেখেছি লোকে ডায়েরি লেখে। বালিশের পাশে কিংবা বেডসাইড টেবিলে প্রিয় কলম আর সুদৃশ্য নোটবুক রাখে। তাতে লিখে রাখে দৈনন্দিন ব্যথার কথা গুলো। নিজের কথাগুলো প্রকাশ করলে ব্যথাগুলো ফিকে হয়ে আসে। একেক মানুষের একেক রকমভাবে ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করে।
মাইগ্রেনের ব্যথা একজনের কাছে যতটা অন্যজনের হয়তো প্রসববেদনা ততটা লাগেনি। একজনের হার্ভার্ডে পড়তে না পারা যতটা ব্যথার অন্যজনের বাবা-মাকে ছেড়ে অন্য শহরে একাকী থাকার ব্যথা ততোধিক। ব্যথার গল্প একেক জনের কাছে একেক রকম। স্পর্শকাতর লোকে সহজে ব্যথা পায়। ব্যথিত হয়। এদের বন্ধু হতে ভয় পায় লোকে; আর হলে এদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা চাই। আপনার চরিত্রে সংবেদনশীলতার অভাব থাকলে এদেরকে এড়িয়ে চলা ভাল। অযথা দুঃখ দিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করার চেয়ে দূরত্বই ভালো। ব্যথা নেই এমন মানুষ নেই দুনিয়ার বুকে। ব্যথা পাচ্ছেন মানে বুঝবেন অনুভূতির নার্ভগুলো এখনো সচল আছে, মানসিক স্বাস্থ্যও ঠিক আছে।
নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে লোকে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়, মানুষের সঙ্গে সামাজিকতার সম্পর্ক রাখে। অনেক সময় বাগান করে। ফুলের বাগান করে। গাছপালার যত্ন নেয়। কুকুর বিড়াল পোষে। জীবিত প্রাণী আশেপাশে সব সময় থাকলে নিঃসঙ্গতা বিরাজ করতে পারে না জীবনে। মানুষ পোষা প্রাণীটির যত্ন নেয়। এই দায়িত্ববোধ মানুষকে ব্যথার অনুভূতি থেকে মুক্তি দেয়। কেউ সংগীত, যন্ত্র বাজায়—বাঁশী, তবলা, গিটার, পিয়ানো কিংবা ড্রামস কত কী শেখে! কেউ হয়তো মধ্যবয়সে নতুন করে গান শেখে বা গায়। কর্মব্যস্ত দিনের শেষে একাকীত্বের ব্যথা তাড়াতে মানুষ নানা রকম চেষ্টা করে। যোগব্যায়াম করেও অনেকে নিজের ভেতরে পুষে রাখা ব্যথার অনুভূতিকে অন্যভাবে পরিচালিত করে। দেখবেন, অনেকে রসুইঘরে গিয়ে এটা ওটা রান্না করে সুন্দর সময় কাটায়। লোকজনকে খাইয়ে তৃপ্ত হয়। মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তৈরি করতে মানুষ অনেক রকমভাবে নিজেকে বদলে নেয়। ব্যথা স্বপ্রতিভ মানুষকে ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে। আশেপাশের মানুষদেরকেও সেভাবে প্রভাবিত করে। এরাই আবেগকে সৃজনশীল কাজে রূপান্তরিত করতে পারে। এদের আবেগগত গভীরতা বাড়ে। তাই কাজে গভীরতা ও বাস্তবতা যোগ করতে পারে। আমাদের চিন্তার প্রতিফলন আমাদের কর্মে। আমাদের চিন্তা, অনুভূতি বা ব্যথা প্রকাশের মাধ্যম আলাদা। যে যার ব্যথার তীব্রতা আর গুরুত্ব অনুযায়ী সমাধান খুঁজে নেয়। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে সব রকম তথ্য সার্বক্ষণিক আমাদের সামনে আছে। আমি শুধু আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতাটুকুই লিখে জানাতে পারি। বলা যায় না কার কিভাবে কাজে লাগবে। তবে প্রয়োজনমতো পেশাদার কারো সাহায্য নেওয়া উচিত।
ইংরেজিতে প্রবাদ বাক্য আছে—
“Time is the best healer”
—কথাটির বাংলা অনুবাদ হলো “সময়ই শ্রেষ্ঠ আরোগ্যকারী”। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু ক্ষত-আঘাতের ব্যথা ধীরে ধীরে নিরাময় হয়। সময় মানুষকে দুঃখবোধ থেকে উত্তরণে সাহায্য করে, মনের আবেগকে শান্ত করে, এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলোকে মোকাবিলা করার শক্তি দেয়। মানিয়ে নিতে শেখায় এবং জীবনকে সহজ করে। তবে এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে। না লুকিয়ে আগে স্বীকার করে নিতে হয় যে আমার ব্যথাবোধ হচ্ছে বা আমি কষ্ট পাচ্ছি। নিরাময় শুরু হয় আসলে আগে স্বীকার করার মাধ্যমে। কবি ও সুফি রুমি’র বিখ্যাত কথাটা মনে করিয়ে দিই—
“The wound is the place where the light enters you”
— এর অর্থ হলো, ক্ষত বা ব্যথা আমাদের ভেতরে আলো প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে, যা আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে; আর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
শাহনাজ রহমান সুমী, পাবলিক হেল্থ প্রফেশনাল, সংস্কৃতি কর্মী এবং লেখক
