অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে ফটোগ্রাফার হয়েছি, ফটোগ্রাফি ভালোবাসি, মৃত্যু অবধি ভালোবাসব

চঞ্চল মাহমুদ দেশের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী। শুক্রবার, ২০ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। আলোকচিত্রী, লেখক ও গবেষক সাহাদাত পারভেজের সম্পাদিত ক্যামেরার জাদুঘর চঞ্চল মাহমুদ বই থেকে ‘আত্মকথন’ অংশটি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশ করা হলো।
ছোটবেলায় আমি বেশ চঞ্চল ছিলাম। আমার নামটি রেখেছিলেন আমার দাদা। আমার জন্ম পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন আমার বাবার কর্মস্থল করাচিতে। সে সময় আমি খুব কার্টুন ছবি দেখতাম। ওদের নড়াচড়া দেখতে খুব মজা লাগতো। দেখে হাসতাম। সেই থেকে আমার মধ্যে ছবি আঁকার একটি ঝোঁকও চাপলো। তখন আমি ভালো ছবি আঁকতাম। অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছি ছবি এঁকে। ছবি আঁকতে আঁকতে অনেক বছর কাটিয়েছি। তারপর বাবা চলে গেলেন ইসলামাবাদে।

তখন ক্যামেরা আসে বাজারে। সেখানে থাকা অবস্থায় আমার মধ্যে ফটোগ্রাফির ঝোঁক চাপল। সবার বাসায় বাসায় ক্যামেরা। বাবাকে বললাম, আমাকে একটা ক্যামেরা কিনে দেন না। বলেই তার কাছ থেকে বকা খেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, যাও, ক্যামেরা ট্যামেরা লাগবে না, ছবি আঁকো। আগেকার সব পিতাই এক রকম ছিলেন। সবার ন্যাচার, ক্যারেকটার একই রকম ছিলো। আমরা ঠাট্টা করে তাদেরকে ‘ব্রিটিশ’ বলতাম। আমার পিতা এখন নেই। কষ্ট লাগে। ১৯৬৮ সালে আমার বাবা প্রথম আমাকে একটি ক্যামেরা এনে দেন জাপান থেকে। ইয়াশিকা। ইলেকট্রো থার্টি ফাইভ পাননি। সেটার দাম বেশি ছিলো। এটার দাম ছিল ৭৮০ টাকা বা ৮০০’র মতো। বাবা চারটা কালার ফিল্মও দিয়েছিলেন সঙ্গে। ক্যামেরা দিয়ে বললেন, আগামী ৬ মাস কিছু পাবে না।

ছবি আঁকতে কষ্ট লাগে। আঁকো, রঙ দাও। কাগজ পাওয়া যায় না। দেখলাম এতো কষ্ট থেকে ফটোগ্রাফি অনেক বেটার। তাড়াতাড়ি তোলা যায়। মনে আছে প্রথম যেদিন ছবি তুলেছিলাম, কিছুই ওঠে নাই। এক্সপোজার, এ্যাপারচার কিছুই বুঝতাম না। নিজেই ফিল্ম লোড করে তুলেছি। ওটার মধ্যে শাটার স্পীড, এ্যাপারচার সব আছে। এখনো আমি ক্যামেরাটি যত্নে রেখেছি। প্রথম দুটো বিড়ালের আর মায়ের ছবি তুলেছিলাম। তারপর এটা ডেভলপ করতে দেয়ার পর কাশ্মিরী এক লোক বললেন, ও মাই গড, এটার শাটার স্পীড আছে, তুমি তো পারো নাই। ফিল্ম কিভাবে লোড করতে হয় তাও জানতাম না। ওই ভদ্রলোক ফিল্ম লোড করা দেখিয়ে দিলেন। তার সুন্দর একটা দোকান ছিল ইসলামাবাদের কাবার্ড বাজারে। ইসলামাবাদ তখন সুন্দর ঝকঝকে শহর। তখন সেখানে আমার এক খালু ছিলেন। তার ছবি তুললাম। মাঝে মধ্যে দু’একটি ফুলের ছবি তুলেছি। ল্যান্ডস্ক্যাপ ভালো লাগত। পরে সেই কাশ্মিরী ভদ্রলোক আমার ছবি দেখে প্রশংসা করতেন। আমি ওই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে প্রায়ই বসে থাকতাম। উনি আমাকে খুব আদর করতেন। তার চেয়ারে বসিয়ে দিতেন। তিনি কিভাবে ছবি শুট করতেন আমি বসে বসে তা দেখতাম।

ছবি তুলতে তুলতে এক সময় থেমে যেতে হত। কারণ ফিল্ম নেই, বাজেটও নেই। তখন বাজেট জোগাড় করতে থাকলাম টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে। হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেয়ে পয়সা বাঁচিয়ে ব্যাট বল কিনেছি, আর ফিল্ম কিনেছি। সে সময় ‘আগফা’ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফিল্ম বেশি কিনতাম। তখনও কালার ফিল্ম আসেনি। তারপর সেখানে থাকাকালীন সময়েই কালার ফিল্ম আসা শুরু হয়। তখন ছিল ইস্টম্যান কালার। পরে তারা কোডাক কালার করে। কোডাক কালার কিছুদিন আগে বিক্রি হয়ে গেল। তাদের ফিল্ম উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আমি স্কুলের স্পোর্টস, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তুলতাম।
ক্লাশে যারা ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড যারা হয় তাদের ছবি তুলতাম। যে কারণে ম্যাডাম, স্যারদের নেক নজরে পড়ে গেলাম। তাদের কাছাকাছি চলে গেলাম। হেডমিস্ট্রেস খুব লাইক করতেন আমাকে।
একবার কাশ্মিরের একটি মেয়ের ছবি তুলেছিলাম। ওর নাম ছিল বিবি। আমাদের পাশের বাসায় থাকত। খুব সুন্দর ছিল। খুব খুশি হয়েছিল সে। অনুপ্রেরণা পেলাম। এরপর আমি মানুষের ছবি তুলতে থাকলাম।

দেশে আসার পর নাসির আলী মামুনের ছবি আমাকে খুব আন্দোলিত করে। তার ছবিতে অদ্ভুত একটা জাদু আছে। বিখ্যাত ফটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন আমাকে আলোড়িত করে। আর আমার গুরু মঞ্জুর আলম বেগ স্যারের পায়ের নিচে কাটিয়ে দিয়েছি অনেক বছর। আমার ‘চঞ্চল মাহমুদ ফটোগ্রাফি’ নামটি স্যারের দেয়া। আমি দিয়েছিলাম ‘টাইম’। উনি কেটে দিয়েছিলেন। এটা ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে আমি অনেক পত্রিকা ও এ্যাডভারটাইজিং ফার্মে প্রচুর কাজ করেছি। স্যারই আমার স্টুডিও উদ্বোধন করেছিলেন। স্যারকে বলেছিলাম কি এমন আমি হয়েছি যে, আমার নামে স্টুডিও করতে হবে। তখন উনি বললেন, আপনি কী শার্ট পড়ে আছেন? আমি উত্তর দিলাম, লিভাইস এর। তখন আমি জিন্স পড়তাম। স্যার বললেন, আপনার স্টুডিও একদিন ব্র্যান্ড হবে, বটগাছ হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমি তো নিজেই বটগাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি বললেন, ছোট বটগাছগুলোই তো বড় হয়। আমি যেদিন থাকব না সেদিন আপনি আমাকে ফিল করবেন। তাই এখন করছি।
অনেক বছর ধরে আমি কাজ করছি। সেই পত্রিকা, স্টুডিও, আউটডোর, ইনডোর, প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফটোগ্রাফি, ফ্যাশন, স্পোর্টস ফটোগ্রাফি, এমন কিছু নেই যার ফটোগ্রাফি আমি করিনি। আমি স্বপ্নের মধ্যেও ছবি তুলি।
১৯৭৫-৭৬ সালে যখন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র তখন বাংলা ছবি দেখতাম খুব। কবরী-রাজ্জাক আমাকে খুব প্রভাবিত করতো। পত্রিকার জন্য স্টারদের ছবি তোলা শুরু করি। তখনকার ‘চিত্রালী’ ও ‘পূর্বাণী’র কথা মনে পড়ছে। তারপর বাংলাদেশের সব বিখ্যাত পত্রিকায় আমি কাজ করেছি। বাংলাদেশের বিখ্যাত মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী এমন কেউ নেই যার ছবি আমি তুলিনি। অনেকের প্রথম ছবি আমি তুলেছি। কোনো বিজ্ঞাপনে কাজ করতে গেলে পোর্টফোলিও চায়। তখন পোর্টফোলিও কি অনেক মডেল জানতেন না। আমি সেটা শুরু করি।

আফজাল হোসেন আমার খুব প্রিয় মানুষ। তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলাম। উনি আমাকে বলেছিলেন। তুমি তো পত্রিকায় কাজ করো, তুমি একটা স্টুডিও করো, পারফেক্ট টাইমটা পাবে। আমার বন্ধু, বিখ্যাত ডিজাইনার, প্ল্যানার ইউসুফ হাসান আমাকে এক সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। পুঁজি অল্প ছিল কিন্তু সাহস আমাদের অনেক বেশি ছিল। আমাদের অফিস ‘রূপ কমিউনিকেশন্স’ এ সন্ধ্যায় আড্ডা হতো। বিখ্যাত অনেকেই আসতেন। গ্রামীণ ফোনের প্রায় সব কাজ করেছি আমরা। তখন ‘লাক্স ফটো সুন্দরী’ প্রতিযোগিতা শুরু হলো। এমন সময় গেছে আমি ঘুমোতে পারতাম না। সকাল থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত একটানা কাজ করেছি। দশ শিফট কাজ করে টায়ার্ড হয়ে গেছি। সেই সময়গুলো কোথায় হারিয়ে গেল? এখন হয়তো সবাই সুপার স্টার, মেগাস্টার। আমি ভাবি, আমি কি হলাম? অনেক কিছু দিলাম, এটাই আমার সান্ত্বনা।
যেটা না বললেই নয়, আমার শিক্ষাগুরু আলোকচিত্রাচার্য মরহুম মঞ্জুর আলম বেগ স্যারের হাতটা আমার মাথার ওপর ছিল। যে কারণে আমি আজ ফটোগ্রাফার পরিচয়টা দিতে পারি এবং গর্ব বোধ করি এদেশে আমি থাকি বলে। দেশটাকে ভালোবেসে মানুষের সেবা প্রদান করি। বঙ্গবন্ধুর কথা না বললেই নয়। অনেক ছবি তুলেছি তার। যা আজ অবধি আমি কোথাও প্রকাশ করিনি। আমার ছোট একটা লাইব্রেরি আছে। আমি খুব গোছানো একটা মানুষ। আমার স্ত্রী রায়না মাহমুদ মিতু। সে ফটোগ্রাফার ও ডিজাইনার। আমাদের সুন্দর একটা জীবন আছে। আমরা কখনো বোর ফিল করি না। ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে বাথরুমে বসে প্রিন্ট করেছি। সেই ছবি বিদেশে পাঠিয়ে পুরস্কার তরুণ বয়সে পেয়েছি। আমি ‘চঞ্চল মাহমুদ ফটোগ্রাফি স্কুল’ করেছি। যার বয়স তেরো প্রায়। এ বিষয়েও বেগ স্যারের অনুরোধ ছিল। এ দেশে ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে পৃষ্ঠপোষকতার খুব অভাব। আজ অবধি সরকারি পর্যায়ে ফটোগ্রাফি বিষয়ক কোনো প্রতিষ্ঠান হলো না। যা শিল্পকলা একাডেমিতে হতে পারত। আমরা বর্তমান ডিজির সঙ্গে আলাপ করেছি। দেখা যাক কি হয়? হাল ছাড়িনি। যতোদিন বেঁচে আছি ততোদিন ফটোগ্রাফি করবো। এত কাজ করেছি-এখন ভাবলে অবাক লাগে। টায়ার্ড হইনা। শিল্পীরা কখনো টায়ার্ড হয় না। সরকারি কর্মকর্তারা টায়ার্ড হন। রিটায়ার্ড করেন। আগে ক্যামিকেল, পেপার সহজলভ্য ছিল না। এগুলো কষ্ট করে জোগাড় করতে হত। রিফিল ইউজ করতাম। অরো ফিফটি ফাইভ ৫৫। এখনকার জেনারেশন এখন ছবি তোলে, এখনই দেখে, এখনই ডিলিট করে ফেলে। তারা খুব কম প্রিন্ট করে। শুধু তারা হার্ডডিস্ক বা ফেসবুক এ সেভ করে রেখে দেয়। শিরোনাম দেয় ‘সুন্দর বনে একদিন’ অথবা ‘বান্দরবনে তিনদিন’। এসব বিষয় পরিহার করে ইয়াংদের উচিত ফটোগ্রাফির ওপর শিক্ষা নেয়া এবং ফটোগ্রাফির গুরুস্থানীয় কারো সান্নিধ্য লাভ করা ও তাদেরকে সম্মান করা। তাদেরকে ছবি দেখানো উচিত।

আমার ছাত্ররা আমার সঙ্গে খুব ফ্রি। আমার ছাত্র সংখ্যা ৫/৬ হাজার হবে। কিছুদিন আগে আমি অনারারি ফেলোশীপ পেয়েছি। এখন আমার স্কুলের সার্টিফিকেট দিয়ে সরকারি চাকরি হয়। এ জন্য আমি সবচেয়ে বেশি গর্ব বোধ করি। আমরা ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট দিচ্ছি। কারণ ডিপ্লোমা না হলে চাকরি হয় না। আমাদেরও সেই যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে। আমি লাইসেন্সের ডিগ্রী পেয়েছি ৮১ সালে। তারপর ডিগ্রি পেয়েছি ১৯৯৩ সালে। ২০১১ সালে পেলাম অনারারী ফেলোশীপ। ডিপ্লোমা আমার দুটো। একটা অস্ট্রেলিয়াতে, একটা বাংলাদেশে। ফেলোশীপ জাপানের টোকিওতে। আবার অনারারী ফেলোশীপ পেলাম। অনেক এ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। যার হিসেব নেই। কতো কিছু হারিয়ে গেছে। ছাত্র রাজনীতি করতাম। জাসদ। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি। হুমায়ুন ফরীদি ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে আজ। তিনিও সমাজতন্ত্র করতেন। আমার সার্টিফিকেট, অ্যাওয়ার্ড অনেক কিছু নষ্ট হয়েছে। গোল্ড মেডেল লুট করে নিয়ে গেছে। আমার অনেক স্মৃতি একটি ছাত্র সংগঠন আমার রুমে জ্বালিয়ে দিয়েছে। অনেক নেগেটিভ পুড়ে গেছে, অ্যাওয়ার্ড নেওয়া ছবিগুলো পুড়ে গেছে। এখানকার যে প্রযুক্তি তাতে অনেক কিছু সেভকরা যায়। একটা ছোট ফটো লাইব্রেরি করেছিলাম সেটাও বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
তখন আমি চিত্রনায়িকা অঞ্জনা রহমানের ছবি তুলতাম। তাজি রহমান ছিল। তার ছবি তুলেছি। চম্পা, ববিতার ছবি তুলেছি। তারপর থেকে একটু চেঞ্জ হয়ে যাই। আফজাল ভাইয়ের সঙ্গে অনেক কাজ করেছি।
তখনকার সময়টা আমার কাছে বেশি ভালো লাগত। এখনকার ক্লায়েন্ট সময় দিতে চান না। ছবি তুলে ফু দিতে দিতে গরম গরম সিডি নিয়ে চলে যান। আমি অবশ্য তাদের বোঝাতেও চাইনা। আমি নিজের কাজের প্রতি সিনসিয়ার সব সময়। সচিবের সন্তান আমি। পড়াশোনা করেছি। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ফটোগ্রাফার হয়েছি। ফটোগ্রাফি ভালোবাসি। মৃত্যু অবধি ভালবাসব।
ছবি তুলতে গিয়ে অনেক ঘটনা আমাকে আনন্দিত করেছে। আবার ব্যথিতও করেছে। একটা ছবিতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। বেগ স্যারের সাথে প্রায় ১২ বছর কাজ করেছি। প্রতি শুক্রবার আমরা আউটিং করতাম। অনেক সময় রাতে ফিরতাম না। ওখানেই থেকে যেতাম। বিজন সরকার, খুরশীদ আলম, মোহাম্মদ আমিন, ড. শহীদুল আলম, বেগ স্যার-আমরা সবাই এক সঙ্গে আউটিং করতাম। বেগ স্যার কিভাবে ছবি তোলেন আমি খেয়াল করতাম। আমি হয়তো ছয় রোল নামিয়ে ফেলেছি, উনি মাত্র ২২টা ছবি তুলেছেন। তখন বুঝতাম গুরু কতো চিন্তা ভাবনা করে ছবি তোলেন। তারপর ওনার স্টাইল ফলো করা শুরু করলাম।

তাচ্ছিল্য করে হয়তো দাদা-নাতির খুনসুঁটির একটি ছবি তুললাম টেলিলেন্স দিয়ে। সেটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেল। আমার গুরুজি একটা কথা বলতেন, যাকে দিয়ে এত টাকা পয়সা রোজগার করো তার কথা কি ভাবো? আমার মনে আছে আমি আমার প্রাপ্ত অর্ধেক টাকাই সবাইকে দিয়েছি। এখন আমার স্কুল থেকে আয়ের টাকায় ১৭টি গরিব বাচ্চার পড়াশোনা চালাই, ৪টা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে চালাই, তাদের মেয়েদের বিয়ে শাদি দিয়েছি। চাকরিও দিয়েছি। আমরা এই শীতে গরীব মানুষদের মাঝে গরম কাপড় বিতরণ করেছি। যতদিন বেঁচে থাকব, কষ্টে থাকা মানুষের সঙ্গে থাকব। যারা প্রভাবশালী, যাদের টাকা পয়সা আছে। তারা যদি একটু চিন্তা ভাবনা করতেন সাধারণ মানুষদের জন্য। একটা ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা বা বৃত্তি প্রদান করতেন। কিছু কিছু বন্ধু-বান্ধব আছেন যারা আমাদের সাহায্য করেন।
ফটোগ্রাফি ইনস্টিটিউশন করতে গেলে পেশাদারী যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। সেটা আমি ১৯৮১ সালে অর্জন করেছি। লাইসেন্স দেয়া হয় বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটি থেকে। যেটা ফটোগ্রাফিবিষয়ক বাংলাদেশের সবচাইতে বড় সংগঠন। যেখান থেকে প্রচুর ভালো ভালো আলাকচিত্রশিল্পীর জন্ম হয়েছে। যারা সবাই বেগ স্যারের ছাত্র। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে মডেল ফটোগ্রাফির ওপর আমিই একমাত্র ফেলোশিপ লাভ করি।। এরপর আমি স্কুল করলাম। ১৩ বছর পার হয়েছে। আমার ছাত্ররা একটা পরিবারের মতো হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে আমরা একটি কম্পিটিশন দিয়েছিলাম। এক্সিবিশন করব সেই ছবি নিয়ে। আরও কর্মসূচি গ্রহণ করার চিন্তা ভাবনা আছে আমার।
বাংলাদেশে ফটোগ্রাফি সবচাইতে আলোচিত সেক্টর আবার অবহেলিতও। কারণ এক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। ১৯৭৫-১৯৭৬ সালে মঞ্জুর আলম বেগ স্যারের সাথে আমার প্রথম যোগাযোগ হয়। আমি তার ওখান থেকে ডিপোমা অর্জন করি। বেগ স্যারের সাথে প্রথম খুব দুরু দুরু বক্ষে দেখা করি। তিনি স্মার্ট ছেলেদের খুব পছন্দ করতেন। আমি সব সময় ফ্যাশন সচেতন। আমাকে সবাই বলে চঞ্চলভাই এখনও আগের মতো রয়ে গেছেন। আমার মনে আছে বেগ স্যার আমার নিচে থেকে ওপর পর্যন্ত খেয়াল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যার জুতোটা খুব চকচকে থাকে তার মানসিকতটা বোঝা যায়।
প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাব একটি পত্রিকায়। আমার ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরা না থাকলে তখন চাকরি হতো না। এখন উল্টো। পত্রিকাগুলো ক্যামেরা দেয়। আমার মনটা খুব খারাপ ছিল। বেগ স্যারের সাথে দেখা করলাম। তিনি ফেস রিডিং করতে পারতেন। তিনি চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেলেন। বললেন, কোথাও সমস্যা বললেন, কি প্রবলেম হয়েছে? ডিস্টার্ব নষ্ট হয়েছে নাকি? আমি শব্দটি শুনে হাসতে শুরু করলাম। স্যার সব শুনে পকেট থেকে চাবি বের করে একটি এফএম টু ক্যামেরা বের করে বললেন, যান এটা নিয়ে যান। সেই ক্যামেরার কারণে আমার দৈনিক বাংলায় চাকরি হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। এক সঙ্গে তিনটা চাকরি করেছি। দুপুরে অ্যাডভার্টাইজিং কোম্পানির ডিজাইনারের চাকরি।
এখনকার জেনারেশন প্রথম চান্সেই ৬/৭ লাখ টাকার ক্যামেরা চালাচ্ছে। ওরা অনেক বেশি ভাগ্যবান।
আমাদের সময় কারোরই ক্যামেরা কেনার পয়সা ছিল না। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম আর চারুকলায় আড্ডা দিতাম। আমরা ক্যামেরা কিনেছি ভাগ ভাগ করে। কেউ বডি কিনেছি কেউ নর্মাল লেন্স কিনেছি। কেউ ওয়াইড এ্যাংগেল কিনেছি, কেউ জুম কিনেছি। আমরা মিলে মিশে কাজ করতাম। তবে একটা শর্ত ছিল। ‘কাফফারা’ দিতে হতো। মানে বিল পেলে খাওয়াতে হতো। এমনকি স্যারকেও খাওয়াতে হয়েছে। স্যার ঠাট্টা করে বলতেন, বিল পেয়েছেন? তাহলে চলেন চাইনিজে যাই। আমরা এইভাবে আনন্দের সঙ্গে কাজ করেছি। কষ্টও হয়েছে। একটা বিখ্যাত কোম্পানির কাজ করতাম। তখন আমাদের ফোন ছিল না। এল পেইজার, তারপর এল মটোরোলার মেসেজ পেইজার। মেসেজ এল, দিস ইজ আরজেন্ট, কল মি, মার্কেটিং ম্যানেজার, বেক্সিমকো ফার্মা। আজকের ফুজি কালারের ওপরে ছিলো ‘ভিডিও প্রসেস’। সেখানকার ফোন নম্বর দিয়েছিলাম। সেখানে ফোন আসতো ওখানকার কাঁকন আমাকে খবর জানাতো। আমরা সে সময় দুপুরে বন্ধুরা এক সঙ্গে খেতাম। যাদের সঙ্গে কাজ করেছি একটি আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল।

ফটোগ্রাফিকে যে পেশা হিসেবে নেয়া যায় তখনকার প্রেক্ষাপটে তা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। চিন্তাই করা যে তো না। রাজনীতি, লেখালেখি আর ফটোগ্রাফি করতাম বলে পরিবার থেকে বের হয়ে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। বাবা, চাচা, ফুপারা পছন্দ করতেন না।
অনেক বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছি। আজ এখানে কাল ওখানে। কোথায় কোথায় চলে গেছি। কত পথ হেঁটেছি, টায়ার্ড হইনি। আমাদের দেখলে ইয়াংরাও উজ্জীবিত হয়।
মাঝে মাঝে ছাত্ররা জানতে চায়, স্যার কিভাবে এত এনার্জি পান। আমি ঠাট্টা করে বলি, এ্যানার্জি প্লাস বিস্কিট খাই, তোমরাও খাও। ওরা চারজন আমার সঙ্গে পারবে না এখনও।
স্টুডিও করার পর দুই মাস তো আমি কোনো কাস্টমারই পাইনি। তারপর ‘লাক্স ফটো সুন্দরী প্রতিযোগিতা’ ও বিভিন্ন ইভেন্ট শুরু হওয়াতে আমাদের কাজ বেড়ে গেল। আমাদের সময় আরেকটা সমস্যা ছিল কোনো বই পাওয়া যেত না। এখন প্রচুর বই বাজারে। প্রতিমাসেই আপগ্রেড হচ্ছে। এখন নেটে গুগলে সার্চ দিলে সব পাওয়া যায়। কি নেই?
আমাদের ছবি তখন রিজেক্ট হতো। গ্রামের ছবিতে বিদ্যুতের তার দেখা যাচ্ছে। এখন সব এডিট করে ফেলে দেয়া যায়।
আমার প্রিয় ফটোগ্রাফার আমার স্যার মঞ্জুর আলম বেগ। তারপর আনোয়ার হোসেন। ড. নওয়াজেশ আহমেদ স্যারের ছবিও আমার প্রিয়। তার বড় ভাই নইব উদ্দিন স্যারেরও। বিটিভিতে নাটকের স্টিল তুলেছি। ডিভিওগ্রাফি করেছি, অনেক ডকুমেন্টারি তৈরি করেছি। মঞ্চ নাটক ও পথ নাটক করেছি।
তার নাম ছিল লুৎফুল বারী। উনি দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন বলে বাবা তার নাম রেখেছিল লাল ভাই। সেই সত্তর দশকের কথা বলছি। তিনি আর্টিস্ট ছিলেন। সে সময় ‘স্টুডিও রূপকার’ নামে তার একটি স্টুডিও ছিলো। সেখানে যেতাম। খুব ভাল লাগতো।
আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হলো, বন্ধুত্বটা ভীষণ গাঢ় হলো। লাল ভাইয়ের অনেকগুলো ক্যামেরা ছিল। আমরা দু’জনে খুব গান পছন্দ করতাম। তিনি আমার অনেক সিনিয়র, এখনও উনি আমাকে দেখলে জড়িয়ে ধরেন। তার আরেকটা ভাই ছিল পাখি ভাই। দুজনেই স্টুডিওতে বসতেন। মাঝে মাঝে আমিও বসতাম। ওনার চেয়ারেই বসতাম। তখন আমি তাকে বিজ্ঞাপনের কাজ করতে দেখছি। তিব্বত সোপ, কসকো সাবান। নায়িকা সুচরিতা একদিন আসলেন। তখন সুচরিতা অনেক জনপ্রিয়। তার ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট ছবির রিটাচ করা প্রিন্ট যখন দেখলাম মনে হচ্ছে ক্রিম বের হচ্ছে। যেটা এখন আমরা করি সফটওয়্যার দিয়ে। সেই কাজ আমি সত্তর দশকে দেখেছি।
তখন আমার ভেতরে এই জিনিসট জাগল যে, আমি এরকম কাজ করতে পারব একদিন। ডিজাইন করতাম। ছবি আঁকতাম, ক্যামেরা চালানো শিখেছি অনেকদিন আগে। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। আমার একটা ইলেকট্রো থার্টি ফাইভ ছিল। তখন এই মডেলটি থাকা প্রেস্টিজের ব্যাপার। উনি আমাকে রলি ফ্ল্যাক্স নামের বক্স ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে সাহায্য করলেন। ভালো ছবি উঠলো। যেহেতু কম্পোজিশন সেন্স খুব ভালো ছিল। উনি আমাকে একটি ক্যামেরা দিয়ে ছিলেন।
লাল ভাইয়ের সাথে সুন্দর সম্পর্ক আজও আছে।
