রানাঘাটে নজরুল

৪ মে রানাঘাটের নজরুল মঞ্চে ছায়ানট (কলকাতা) ‘নজরুল স্মরণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশেষ সহযোগিতায় বৈশাখী কালচারাল ইউনিট এবং কথাশিল্প। বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সারা জীবন হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ দূর করার চেষ্টা করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমন্ত কুমার সরকারের আমন্ত্রণে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগরে এসে বসবাস শুরু করেন। ছিলেন ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। নজরুল স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো সম্পর্কে সকলকে অবগত করার জন্যই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ছায়ানট। তরুণ প্রজন্মকে নজরুল চর্চায় উৎসাহিত করছে সংগঠনটি। রানাঘাট নজরুল মঞ্চে ‘রানাঘাটে নজরুলের স্মৃতি’ সম্পর্কে আলোকপাত করেন ছায়ানটের সভাপতি ও নজরুল গবেষক সোমঋতা মল্লিক। রানাঘাট পৌরসভার পুরপ্রধান কোশলদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে একটি স্মারক তুলে দেন তিনি। রানাঘাটের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব দেবনারায়ণ গুপ্ত তাঁর স্মৃতিচারণায় নজরুলের রানাঘাটে আগমনের সংবাদ উল্লেখ করেছেন। বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত ‘নজরুল স্মৃতি’ বইতে এই তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। দেবনারায়ণ গুপ্ত রানাঘাটে নজরুলের আগমন সম্পর্কে স্মৃতিচারণায় লিখেছেন- “আমি তখন ছিলাম রানাঘাট পি.সি.এইচ স্কুলের ছাত্র। এইভাবে, এই আবহাওয়ায়, সবেমাত্র যখন যৌবনে পদার্পন করছি, সেই সময় একদিন পরিচিত হয়ে উঠলাম দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মন্ত্র-শিষ্য কৃষ্ণনগরের স্বর্গত হেমন্তকুমার সরকারের সঙ্গে। নদীয়া জেলায় তিনি তখন ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। ছাত্র অবস্থায় একটু আধটু লিখতে পারতাম বলে হেমন্তদা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

সাল তারিখ আজ আর মনে নেই, একদিন তাঁর অভিন্ন হৃদয় সুহৃদ কাজী নজরুলকে নিয়ে রানাঘাটে এলেন। কাজী নজরুল তখন কৃষ্ণনগরে থাকতেন। যতদূর মনে পড়ে তাঁর ‘বিষের বাঁশী’ আর ‘ফণিমনসা’ তখন ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে। ‘বিষের বাঁশী’ তার আগেই আমি লুকিয়ে পড়ে নিয়েছি। শুধু পড়া নয়, এই বইয়ের কবিতাও তখন আমার কণ্ঠস্থ আছে।
রানাঘাটে সেই কবিকে সামনে দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লাম। জানতে পারলাম, আমাদের রানাঘাট বাজারের চাঁদনিতে কবি তাঁর স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবেন, শোনাবেন গান গেয়ে। এ খবর শুনে কবি-কণ্ঠের গান ও কবিতা শুনতে যাবার প্রবল আগ্রহ হল আমাদের। কিন্তু বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কেউ কেউ জানালো পুলিশ গান গাইতে দেবেনা। কবিকে গ্রেপ্তার করবে। সংশয়, সন্দেহ আর ভয় নিয়ে তবু গেলাম। লোকে লোকারণ্য। কবি গান গেয়ে শোনালেন। আবৃত্তি করলেন ‘বিদ্রোহী’। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলো। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হলো। কিন্তু না, ইংরেজদের লাল পাগড়ি কবি বা উদ্যোক্তাদের গ্রেপ্তার করলো না সেদিন।”

দেবনারায়ণ গুপ্ত সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক বক্তব্য রাখেন পীতম ভট্টাচার্য। পুরপ্রধান কোশলদেব বন্দ্যোপাধ্যায় ছায়ানটের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। উপস্থিত ছিলেন রানাঘাট পুরসভার কাউন্সিলর বিজন সরকার, বৈশাখী কালচারাল ইউনিটের পক্ষে অশোক বিশ্বাস, দেবাশীষ গাঙ্গুলি, রতন দত্ত, রাজা চক্রবর্তী প্রমুখ।

এই উপলক্ষ্যে পরিবেশিত হয় নজরুলের গান, কবিতা। ছায়ানটের শিল্পীরা সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় নজরুল সঙ্গীত ও কবিতা আবৃত্তি করেন। ছায়ানটের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করেন – সুকন্যা রায়, ইন্দ্রাণী লাহিড়ী, দেবযানী বিশ্বাস, মিতালী মুখার্জী, রাজকুমার মুখোপাধ্যায়, অনিন্দিতা বিশ্বাস, সঙ্গীতা দাস ভদ্র এবং অমৃতা দাস। কথাশিল্পর রানাঘাট শাখার শিশু শিল্পীরা কাজী নজরুলকে নিবেদিত কবিতা কোলাজ শোনায়। অংশগ্রহণে আগমনী কুণ্ডু, পারিজাত সাহা, দীপমালা ব্যানার্জী, সপ্তদীপা চক্রবর্তী। সঙ্গীত পরিবেশন করেন মহুয়া ভট্টাচার্য, মৌসুমী ভট্টাচার্য, সুমিতা ঘোষ। বঙ্কিম স্মৃতি সংঘের বাচিক শিল্পীরা দেবলীনা চৌধুরীর পরিচালনায় সমবেতভাবে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তি করেন। নজরুলের গানে নৃত্য পরিবেশন করেন মুনমুন মজুমদার পরিচালিত ‘পৌষালী’ সংস্থার শিল্পীরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়।
